জীবনের গল্প-১৩

নিতাই বাবু ৫ আগস্ট ২০২০, বুধবার, ০১:১৯:৫৫পূর্বাহ্ন স্মৃতিকথা ২৫ মন্তব্য

জীবনের গল্প-১২ এখানে

জীবনের গল্প-১২-এর শেষাংশ:☛ খেলাম শরবত। এরপর কালামের মা আমাদের হাতমুখ ধুয়ে আসার জন্য বললো। কলাম হাতমুখ ধোয়ার জন্য আমাদের নিয়ে গেলো, একটা পুকুরের সিঁড়ি ঘাটে। পুকুরের সিঁড়ি ঘাটটা হলো এক হিন্দু বাড়ির। পুকুর ঘাট থেকে হাত-পা ধুয়ে কালামদের বাড়িতে আসলাম। ভাত খেলাম। কিছুক্ষণ বিশ্রাম করলাম। 

কালামদের ঘরে খাওয়া-দাওয়া করে মনে করেছিলাম, সেদিনই নারায়ণগঞ্জ ফিরে যাবো। কিন্তু বিশ্রাম করতে গিয়ে তা আর হলো না, ফেরা। ঘুম থেকে জেগে ওঠতেই সন্ধ্যা হয়ে গেলো। আমার সাথে কানাইরও একই অবস্থা। কানাইও আর সজাগ পায়নি। কানাইকে ডেকে ওঠালাম। বললাম, ‘তাড়াতাড়ি করে রেডি হয়ে নেয়, এখনই বের হবো।’ আমার কথা শুনে কালামের মা-বাবা, ভাই-বোন সবাই রাত করে নারায়ণগঞ্জ যেতে বারণ করলে, আমরা দুইজন এক রাতের জন্য থেকে যাই কালামদের বাড়িতেই। এরপর কালাম আমাদের সাথে করে ঠাকুরবাড়ির পুকুর ঘাটে নিয়ে আসলো।

এই ঠাকুরবাড়িই বিয়ের উপযুক্ত একটা মেয়ে আছে,  যা আগে কালাম আমার কাছে অনেক বলেছিল। কিন্তু মেয়ে দেখার মন-মানসিকতা নিয়ে কালামদের ওখানে আমরা যাইনি। আমরা গিয়েছি বেড়াতে। যখন কালামদের বাড়ি থেকে সন্ধ্যাবেলা এই ঠাকুরবাড়ির পুকুর ঘাটে আসি, তখন দেখলাম ঠাকুরবাড়ি থেকে কয়েকজন মহিলা আমাদের দেখে কেমন যেন হাঁকাহাঁকি করে চুপেচাপে দেখছিল। তখন ছিলো ভরা বর্ষা মৌসুম। নয়াবাড়ি গ্রমের চারদিকে পানি আর পানি। হাট-বাজারে যেতে হলে নৌকা ছাড়া আর কারোর উপায় ছিল না। আর রাতবিরেতে গ্রামের মানুষ অন্তত বর্ষাকালে অনেকেই বেশি একটা ঘোরা-ফেরাও করতো না। রাতের খাবারের আগপর্যন্ত এই ঠাকুরবাড়ি সিঁড়ি ঘাটেই বসে আড্ডা দিতো, সময় কাটাতো।

কালামের সাথে আমরা যখন পুকুর ঘাটে গেলাম, তখনও পুরো সিঁড়ি ঘাটলা ছিলো লোকে গিজগিজ। কালামের সাথে আমাদের দুইজনকে দেখে সিঁড়ি ঘাটলা থেকে কয়েকজন উঠে দাঁড়িয়ে কানাই আর আমাকে বসতে দিলে, আমরা দুইজন বসলাম। ঠাকুরবাড়ি থেকেও একজন মুরুব্বি এসে আমাদের সাথেই বসলেন। কালামকে জিজ্ঞেস করলো, ‘তোর ওস্তাদের বাড়ি কোথায়, ঘর কোথায়, জাত সম্প্রদায় কী, মা-বাবা আছে নাকি নেই, ভাই-বোন ক’জন, কী কাজ করে ইত্যাদি।’  আমি কিছুই বললাম না, যা বলার কানাই আর কালামই বলেছিলো। এরপর ঠাকুরবাড়ির ওই মুরুব্বি আমাদের দুইজনকে নিয়ে বাড়ির ভেতরে যেতে বললে, আমি আর গেলাম না, কালামের সাথে কানাইকে পাঠালাম। কানাই কালামের সাথে গিয়ে তাঁদের ঘরে গিয়ে বসলে, আমাকে ডেকে আনতে একটা ছোট শিশকে সিঁড়ি ঘাটলায় পাঠালো। কিন্তু তখনও আমি ওই ঠাকুরবাড়িতে আর পেলাম না, সিঁড়ি ঘাটলায় বসে আরও মানুষের সাথে কথা বলতে থাকি। আমার সাথে কালামের বড় ভাইও বসা ছিলো। কালামের বড়ভাইও বলেছিল, ‘যাও ঘুরে দেখে আসো।’ তারপরও আমি ঠাকুরবাড়ি গেলাম না, পুকুরঘাটেই ছিলাম। 

কিছুক্ষণ পর কানাই আর কালাম বড় এক বাটি ভরে গাছের পাকা পেয়ারা সিঁড়ি ঘাটলায় নিয়ে আসলো। আমাকে দুটো দিয়ে বাদবাকিগুলো ঘাটলায় থাকা দুইএক জনকে দিলো। সবাই পেয়ারা খাচ্ছিল। আমি কানাইকে নিয়ে একটু দূরে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘এই বাড়িতে এতক্ষণ কি করলি?’ কানাই কিছুক্ষণ চুপ  থেকে বললো, ‘তোর ব্যাপারেই কথা হচ্ছিল।’ বললাম, ‘বলে কী পাগলটায়! আমার ব্যাপারে জেনে তাঁদের কী হবে?’ কানাই বললো, ‘তোর জন্য কালাম যেই মেয়ের কথা মিলে থাকতে বাবার বলেছিল, ওই মেয়েটাকে আজ দেখলাম! খুবই সুন্দর!’ আমি আর কোনও কথা বললাম না, সোজা পুকুর ঘাটে এসে কালামকে বললাম, ‘কালাম বাড়ি চলো, ঘামাবো।’ আমার কথায় কালাম আর বিন্দুমাত্র দেরি না করে আমাদের নিয়ে ওঁদের বাড়ির দিকে রওনা দিলো। বাড়িতে আসার সাথে সাথেই রাতের খাবার রেডি হয়ে আছে কালামদের ঘরে। কোনরকম হাতমুখ ধুয়ে কালাম-সহ বসে রাতের খাবার সেরে ঘুমিয়ে পড়লাম।

সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে হাতমুখ ধুয়ে হালকা কিছু খাবার খেয়ে কালামের মা-বাবা, ভাই-বোন সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ির বাইরে আসলাম। এমন সময় কানাই বললো, ‘ঠাকুরবাড়ির সবাইর থেকে বলেকয়ে আসি।’ আমি কানাইকে আর ওই বাড়িতে যেতে দিলাম না, সোজা কালামদের নৌকায় উঠে বসলাম। কালাম-সহ কালামের বড় ভাইও আমাদের সাথে নৌকায় উঠলো। উদ্দেশ্য আমাদের ঢাকার লঞ্চে উঠিয়ে দেওয়ার জন্য। কালাম আমাদের নিয়ে নৌকা বেয়ে সুবচনী বাজারে আসলো। আমরা নৌকা থেকে নেমে কালাম-সহ ওঁর বড়ভাইকে সাথে নিয়ে একটা চায়ের দোকানে গিয়ে বসলাম। লঞ্চ আসতে আরও দেরি হবে বলে অনেকেই বলছিল। সেই সময়টুকু কালামের বড়ভাইয়ের সাথেই কথাবার্তা বলে পাড় করতে চাচ্ছিলাম।

এমন সময় কালামের বড়ভাই বলছিল, “মেয়েটা ভালো। কিন্তু গরিব। ওঁদের নিজস্ব জায়গা-জমি নেই। বাড়িটাও সত্যগুরু নামে একজন ঠাকুরের। তবে সত্যগুরুর আরও অনেক বছর আগে মৃত্যুবরণ করলে, তাঁর পরিবারের সবাই একসময় এই বাড়ি তাঁদের দান হিসেবে দিয়ে যায়। তারপর থেকে তাঁরা আজ অনেক বছর যাবত গ্রামের আরও দশজন মুসলমানের সাথে মিলেমিশে এই বাড়িতে বসবাস করছে। বাড়ির মুরুব্বির নাম নারায়ণ সরকার। উনার চার মেয়ে দুই ছেলে। মেয়েগুলো বড়, ছেলে দুটো মেয়েদের ছোট। বড় মেয়ের বিয়ে হয়েছে আরও অনেক আগে। ছেলের বাড়ি নোয়াখালী জমিদারহাট। এখন অবিবাহিত আছে তিন মেয়ে। করলাম আরও অনেক আগেই তোমার কথা বলেছিল। কিন্তু তুমি তো ওই বাড়িতে গেলেই না। কেন গেলে না, তা আমার মাথায় ঢুকছে না। মেয়ে যখন দেখতে এসেছ, তখন মেয়েদের বাড়িতে গেলে না কেন?”

আমি কালামের বড় ভাইয়ের কথা শুনে হেসে বললাম, ‘দাদা, আমিতো আপনাদের এখানে কোনও মেয়ে দেখার উদ্দেশ্য নিয়ে আসিনি। আমি এসেছি কালামকে দেওয়া কথা রক্ষা করতে। অন্যকিছু মনে করে আমি আসিনি, দাদা। অবশ্য কালাম-সহ ফাইন টেক্সটাইল মিলের আপনাদেরই গ্রামের আবুল মুন্সি, আপনার চাচা জব্বার কাকাও এই বাড়ির কথা অনেকবার বলেছিল। কিন্তু আমি তাঁদের কিছুই বলিনি। কারোর সাথে কথাও দেইনি। তাছাড়া এখনো আমার বিয়ের বয়স হয়নি দাদা। এই বয়সে বিয়ে করবো, এ চিন্তা আমি কখনোই করি না। যদি কপালে থাকে তাহলে কেউ আবার বাধাও দিতে পারবে না, যেকোনো একভাবে-না-একভাবে হবেই হবে।’ কালামের বড় ভাইয়ের সাথে কথা বলতে বলতে একসময় বালিগাও থেকে সুবচনী লঞ্চঘাটে লঞ্চ এসে ভিরলো। কানাই আর আমি লঞ্চে উঠে এক জায়গায় দাড়ালাম। লঞ্চ  ছাড়লো।

ফতুল্লা লঞ্চঘাটে নেমে নারায়ণগঞ্জ গেলাম। এরপর কানাই গেলো ওঁদের বাসায়, আমি আমার বড়দা’র বাসায় গিয়ে পৌঁছলাম। এর একদিন পরই ঈদের ছুটি শেষ হয়ে মিল চালু হলো। সব শ্রমিকরা যাঁর যাঁর বাড়ি থেকে এসে মিলে হাজির হলো। তখন ফাইন টেক্সটাইল মিলের বেশিরভাগ তাঁতিই ছিল সুবচনী এলাকার। আমরা যে ঈদের বন্ধে কালামদের বাড়িতে গিয়েছিলাম, তা পুরো নয়াবাড়ি গ্রাম-সহ ফাইন টেক্সটাইল মিলের মালিকের বাড়ি পার্শ্ববর্তী কড়পাড়া গ্রাম পর্যন্ত জানাজানি হয়ে গিয়েছিল। মিল চালু হবার পর সে বলে, ‘আমাদের বাড়ি গেলে না কেন? ও বলে আমাদের বাড়ি গেলে না কেন?’  বললাম, ‘আরে দাদারা, আমাদের কি আর কারোর বাড়ি চেনা আছে? তাছাড়া সারা গ্রামই তো আমাদের কাছে সাগরের মতো মনে হলো। এই অবস্থা দেখে কারোর বাড়িতে আর যেতে মন চায়নি দাদা। আবার সুদিনে একবার যখন যাবো, তখন সবার বাড়ি খুঁজে খুঁজে বের করে ঘুরে আসবো।’ অনেকেই আবার জিজ্ঞেস করছিল, ‘মেয়ে পছন্দ হয়েছে কি-না? মেয়েদের বাড়িতে গিয়েছিলাম কি-না ইত্যাদি।’ এরকম আলাপ আলোচনার মধ্যে এসব কথা আমার বড়দ’র কানে পৌঁছে গেলো। বড়দা বাসায় গিয়ে বৌদির কাছে বললো। এরপর বৌদি আমার মায়ের কাছে বললো।

বিক্রমপুর বেড়াতে যাওয়ার কথা, মেয়ে দেখার কথা বৌদির কাছে মা শুনে আমাকে আর কিছুই বলেনি। জিজ্ঞাসাও করেনি যে, কোথায় গেয়েছিলি! জিজ্ঞেস করেছিল আমার বৌদি। বিক্রমপুর থেকে আসার দুইদিন পর বৌদি আমাকে জিজ্ঞাসা করলো, ‘ঠাকুরপো মেয়ে কেমন দেখলে?’ আমিতো একেবারে হক্কার-মা-টক্কা হয়ে গেলাম! বৌদিকে বললাম, ‘তোমার কাছে কে বলেছে যে, আমি মেয়ে দেখতে গিয়েছিলাম?’ বৌদি বললো, ‘চুপেচাপে কি আর বেশিদিন চলা যায়, ঠাকুরপো? চোরের দশদিন, গৃহস্থের একদিন। তো মেয়ে কেমন? পছন্দ হলে বলো, আমরা একদিন গিয়ে দেখে বিয়ের দিন-তারিখ ঠিক করে আসি!’ বললাম, ‘দূর বৌদি, সব মিথ্যে কথা। যেই বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলাম, সেই বাড়ির সাথে একটা ঠাকুরবাড়ি আছে। সেই বাড়িতে তিনটা মেয়ে আছে। কিন্তু আমিতো আর মেয়ে দেখতে যাইনি। তিনটা থাকুক আর দশটা থাকুক। তাতে আমার কী? আমার কথা বিশ্বাস না হলে কালই কানাইকে বাসায় নিয়ে আসবো, তুমি কানাইকে জিজ্ঞাসা করবে।’ এই বলেই সেদিনের মতো বৌদিকে বুঝিয়ে দিলাম।

পরদিন কানাইকে নিয়ে বাসায় আসলাম। আমার বড় বৌদি কানাইকে জিজ্ঞাসা করলে, কানাই বললো, ‘নিতাই তো ওই বাড়িতেই যায়নি। আমি গিয়েছিলাম বলে আমার সাথে ও অনেক রাগারাগি করেছিল। তোমরা যা শুনেছ, তা ভুয়া খবর।’ কানাইর কথা শুনে বৌদি ও মা বিশ্বাস করলো। এরপর এব্যাপারে আর কোনদিন কোনও কথা হয়নি। নিয়মিত নারায়ণগঞ্জ গোয়ালপাড়া থেকে আসা-যাওয়া করে ফাইন টেক্সটাইল মিলে কাজ করতেছিলাম।

একদিন হঠাৎ করে ফতুল্লা মিলন টেক্সটাইল মিল থেকে এক লোক এসে আমাকে খুঁজতে লাগলো। খুঁজে বের করে বললো, ‘মিলন টেক্সটাইল মিল এখন “ওয়েল টেক্স” নামে পরিচিত। মিলটি একজন পাকিস্তানি মালিক কিনে নিয়ে সেখানে নতুন কোরিয়ান মেশিন বসিয়েছে। বর্তমান ওয়েল টেক্সের মালিকের নাম নিয়াজ সাহেব। উনি খুবই ভালো লোক। এখন মিলের ম্যানেজার রমিজ উদ্দিন সাহেব তোমাকে অতিশীঘ্র দেখে করতে বলেছে।’ লোকটার কথা শুনে বললাম, আজ আর যেতে পারবো না। আপনি ম্যানেজার সাহেবকে বলবেন, নিতাই  আগামীকাল বিকালবেলা এসে দেখা করবে।’ আমার কথা শুনে লোকটা চলে গেলো। কিন্তু আমি ভাবতেছিলাম! নতুন মিল। কোরিয়ান মেশিন। এখানেই বা কাকে দিয়ে যাই। এসব নিয়েই ভাবছিলাম!

চলবে…

জীবনের গল্প-১৪ এখানে

জীবনের গল্প-১ এখানে

২০৭জন ৪৫জন
0 Shares

২৫টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য