জীবনের উলঙ্গ অভিজ্ঞতা।

মামুন চৌধুরী ২৩ এপ্রিল ২০১৯, মঙ্গলবার, ০৩:০৩:৩৫অপরাহ্ন একান্ত অনুভূতি ৪ মন্তব্য

যাত্রা!!!!!!!!

এক সময় পত্রিকায় কলাম লেখার খুব ঝোক ছিল। সে সময় আমার লেখা গুলো ছদ্মনাম শব্দ শ্রমিক বা নন্দ ঘোষ নামে প্রচার হত। সে কারনে সমাজে প্রচলিত অনেক কম্ম অনেকে তলেতলে পছন্দ করত। কিন্ত মুখে আনত না। সেই বিষয়গুলি দেখার ও বোঝার চেষ্টা করতাম এবং তার উপর আবোল তাবোল কিছু লিখে কলাম সম্পন্ন করতাম। সে কারনে যাত্রা পালার নামে ফাঁকা ময়দানে কি হয় জানার উদ্দেশ্যে এ দুঃসাহস।

কোন এক সময় – প্রায় দশ/পনের বছর আগের কথা। এ পাশ ও পাশ থেকে শাবল শব্দটি কানে আসত। জীবনে হাজারটা খারাপ ভাল অভিজ্ঞতার ঝুড়ি পূর্ণ করতে যাত্রাপালা দেখার অভিপ্রায় ব্যক্ত করলাম, শেরপুরের একটি বড় গোছের নেতার কাছে। আজকাল নাকি যাত্রাপালায় আর অভিনয় চলে না, চলে শাবল। শাবল হল যাত্রামঞ্চে নারীদের ব্যাকরনহীন নিত্য। যা হোক বড় ভয় ও শঙ্কা যে, সে যাত্রাপালায় যদি আমার মত অভিজ্ঞতার ঝুড়ি পূর্ণ করতে, আমার কলেজ পড়ুয়া কোন ছাত্র হাজির হয়। অবস্থা কি পরিমান বেগতিক হতে পারে। সেই ভয়াবহতা ভাবতেই শিউরে উঠলাম। শেষে চাউর হযে যাবে শিক্ষক ছাত্র এক যাত্রা মঞ্চে।যা হোক নেতার চারচাকার গাড়িটির যাত্রী হয়ে রওনা দিলাম। যাত্রাস্পটে পৌছাতেই উচ্ছল কর্কট কিছু হিন্দি গান ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বেজে চলেছে। মাঝে মাঝে দর্শক টানার জন্য মাইকে বলা হচ্ছে। আসুন আর কিছুক্ষণ পর শুরু হবে প্রিন্সেস রত্নার ঝুমুর ঝুমুর নাচ ও গান। নেতা গাড়ী থেকে নামলেন। সদল বলে সাঙ্গপাঙ্গ এসে হাজির। নেতার কি কি রিকুইজিশন আছে তা জানার আপ্রান চেষ্টা চলছে। সাথে করে রাজকীয় ভঙ্গিতে নিয়ে গেল যাত্রার ভিতর। প্রথম সারিতে চারটি সিট ফাঁকা করা হল। বসে পড়লাম যাত্রা দেখতে। কিক্ষুক্ষন পর শুরু হয়ে গেল যাত্রা নামের শাবল। বিশ্রি একটি কান্ড। ভারতীয় হিন্দি ছবির নায়িকারা স্বল্প-বসনা হলেও তার ভীতর একটি শৈল্পিক রিদম ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়। যদিও সে ছবিগুলোর নাচগান ছেলে মেয়েকে নিয়ে দেখার উপায় নেই।আমার ছেলেতো হিন্দি ছবির গান এলে মাথা নিচু করে হাসে। হতে পারে এটা আমার অসামাজিকতার লক্ষণ। এই প্রিন্সেসরা যখন নাচতে নাচতে ষ্টেজের কাছে আসে। খেয়াল করলাম আমার পাড়ার এক মুরব্বী ও আরেকটি লোক দশ টাকার চকচকা বান্ডিল থেকে টাকা ছিটিয়ে দিচ্ছেন এই নিত্য শিল্পীদের দিকে। পরে খোঁজ নিয়ে জানলাম অন্য লোকটি কোন একটি ব্যাংকের ম্যানেজার বাড়ী চান্দাইকোনা। আমি মনে মনে বৃদ্ধ বয়সের এত রুচির সন্ধান করছিলাম। এই নারীদের নিত্য শিল্পী বলা কতটুকু সমীচিন? তা আলোচনাহীন ভাবেই থাক। তবে এখানে নারী স্পষ্টতই পন্য হিসাবে দৃশ্যমান। গানের মাঝে মাঝে বুকের গোটা কাপড়টাই সরিয়ে ফেলছে। আমি বোবার মত মাথা নিচু করে আছি।

বুকের কাপড় সড়ানো, বিভিন্ন আকর্ষিত ভঙ্গিতে নাচ, ইত্যাদি নিয়ে আমি ভাবছিলাম। এটা কি ভাবে খুব স্বাভাবিক থেকে একটা মেয়ের পক্ষে সম্ভব। হঠাৎ চমকে উঠলাম, আমার চিন্তায় ছেদ পড়ল। আমাদের এ চারজনের মধ্যে একজনকে যাত্রাকর্তৃপক্ষ প্রিন্সেস রত্নাকে দেখিয়ে দিয়ে বলেছে। ওটা মালদার পাটি ও বড় নেতা, কাছে গেলে ভালোই টাকা পাবি। হঠাৎ উড়ে আসার ভঙ্গিতে প্রিন্সেস রত্না আমাদের ঐ মালদার পাটির কোলে উঠে পড়ে, গলা জড়িয়ে ধরেছে। আমি উঠে দৌড় মারার সময় খেয়াল করলাম। মেয়েটি প্রচন্ড ভাবে দেশি মদ খেয়েছে। তার গন্ধ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। তার তীব্র গন্ধ আমার নাকে লাগল। তখন খুব স্বাভাবিক থেকে মানুষের মনোরঞ্জন করার উত্তর খুঁজে পেলাম। মেয়েটি যা করছে তা মাতাল অবস্থায়।

আসলে যে মেয়েগুলো এ কাজগুলোর সাথে জড়িত তারা কিন্ত খুব সহজে বা খুশিতে এ পেশা বেছে নেয়নি। আমি এ গুলো প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য যাত্রার গেটের বাঁহিরে দাড়িযে ছিলাম। তারপর প্রিন্সেস রত্নার পালা শেষ হবার পর, যাত্রা ম্যানেজারকে তার সাথে কথা বলার ব্যবস্থা করে দেবার কথা বলায় উনি মুচকি হেসে আমাকে নিয়ে গেলেন। তিনি আমার দৌড় দেখে যা ভেবেছিলেন। এখন তার চিন্তা মোটেও ঐ জায়গায় নেই, বুঝলাম। আমি মেয়েটির কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম। কেমন আছেন? প্রশ্ন শুনে উনি এদিক ওদিক তাকিয়ে বললেন কাকে বলছেন? হেসে বললাম আপনাকে। উনি বোধ হয় খুব আশ্চর‌্য হয়েছেন। উনি অত্যান্ত সম্মানের সাথে আমাকে একটি চেয়ার এগিযে দিলেন। খেয়াল করলাম তার ষ্টেজের পোশাকের উপর একটি চাঁদর মুড়িয়ে দিয়েছেন। বললাম আমি বসব, আপনি দাঁড়িযে থাকবেন। উনি বোধ হয় আরো আশ্চর‌্য হয়েছেন। তখন বলেই ফেলল আমাদের সাথে কথা বলার একটাই উদ্দ্যেশ্য, ধান্দা। আপনি কি উদ্দ্যেশ্য নিয়ে এসেছেন সেটা বলেন। আমি বললাম আপনার বাড়ি কোথায়? বলল-যশোহর, বললাম আচ্ছা রত্না আপনার এ সব করতে কেমন লাগে? উনি নিরলিপ্ত ভাবে বললেন ভালো না লাগলে কেমনে এ সব করি ভাই। তার এ কথার ভিতর যে কি কষ্ট দেখেছিলাম। তার ওজন একেবারে কম নয়। তার চোখে এ সমাজের প্রতি যে ঘৃনা দেখেছি তা বলে বোঝাতে পারব না। রত্না তার আসল নাম নয়। মানুষ জীবনের তাগিদে মুখ লুকিয়ে ছদ্মবেশ ধারন করে পথ চলে, এটিও কম কষ্টের নয়। তা নিজ পরিচয় লুকিয়ে রাখতে হচ্ছে। তার নিজস্ব পরিচয় নেই। ডঃ মুহাম্মদ ইউনুস নোবেল বিজয়ী একজন অর্থনীতিবিদ। তার মেয়ে একজন যাত্রাশিল্পী। চমকে উঠলেন? এদেশের নয় বিশ্বমোড়লদের দেশে। আমাদের এখানকার যাত্রাপালা আর অন্যদেশের যাত্রাপালা এক নয়। যাত্রাপালার অভিনয় শৈলী অন্য সব অভিনয় থেকে একেবারেই আলাদা। সেটা টিভি নাটক,মঞ্চ নাটক,সিনেমা বা মুখাভিনয়।

রাত্রি বেশি হচ্ছিল বলে বার বার তাদের তাড়া দিচ্ছিলাম। আর ওরা বলছিল আরে থাম এখনই তো আসল যাত্রা শুরু হবে। আমি বললাম পাবলিক যে হৈচৈ করছে আর যে ভাবে শাবল শাবল বলে চিৎকার মারছে তাতে আর যাত্রা হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এখন সারারাত এই শাবলই চলবে। তখন আমাদের একজন বলল-ব্যাটা এখন উলঙ্গ নাচ হবে। গায়ে কোন কাপড় থাকবে না। গায়ের কোন কাপড় না রেখে নাচার কথা আমি গুপিনাথের মেলার যাত্রার কথা শুনেছি। বিশ্বাস করিনি। তবে আজ এই প্রেক্ষিতে বলতেই হয় উলঙ্গ নাচ হওয়া কোন অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়। আমি ওদের বললাম বাড়িতে গেলে আজকে আব্বা-আম্মার নানান প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। আমি আর দেখব না আমার দেখার স্বাধ মিটে গেছে তোরা থাক, আমি চলে গেলাম। বলে বাহিরে এসে একটা সিএনজি নিয়ে শেরপুরের উদ্দ্যেশ্যে রওনা হলাম।

পুনশ্চঃ

আসলেই বর্তমানে যারা যাত্রা দেখে তারা সত্যই ফাত্রা। কিন্ত এসব না চললে রত্নাদের কি হবে? রুচিহীন কিছু মানুষের জন্য রত্নারা পেটে খেয়ে, পিঠে হাজারটা খেলেও আমার কাছে এটা কোন অপরাধই নয়। তবে সবার আগে তাদের মানুষ কেন ভাবতে পারি না। তারা তো যন্ত্র নয়।

৪৪২জন ৩৫৬জন
10 Shares

৪টি মন্তব্য

  • নীলাঞ্জনা নীলা

    বর্তমানের যাত্রা সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই। তবে শুনেছি খুবই জঘন্যতম নাচ-গান হয়। অবশ্য আমাদের ছোটবেলায় পূজোর সময় যাত্রাপালা হতো। তখন যথেষ্ট রুচিশীলতা ছিলো।

    ধন্যবাদ এমন একটি পোস্টের জন্য।

  • তৌহিদ

    অনেক জায়গাতে দেখেছি যাত্রাপালার নামে নোংরামি। তবে এখন প্রসাশন অনেক সজাগ।

    একটা সময় যাত্রা শিল্পের পর্যায়ে ছিলো, আবারো হয়তো ফিরে আসবে সে পুরাতন ঐতিহ্য।

  • মোঃ মজিবর রহমান

    এটা আমাদের সমাজের সমাজ প্রতিনিধ ও উচ্চমান সম্পন্ন নোংরা জাতীয় কিছু মানুষ করে। আর এর দোষ গিয়ে পড়ে যাত্রার সদস্যদের উপর। অনেক সময় সংগঠকদের আদেশে এগুল করতে হয় বা বাধ্য হয়। আবার কিছু কিছু জায়গায় সচরাচর হয়।

  • সাবিনা ইয়াসমিন

    আমি কখনো সরাসরি যাত্রা দেখিনি। বিটিভি তে ছোটো বেলায় নবাব সিরাজ উদ দৌলার একটা যাত্রা দেখেছিলাম। তখন বেশি বুঝতাম না। যাত্রার অভিনয়ের চেয়ে কলাকুশলীদের পোশাক–আশাক বেশি ভালো লেগেছিল।

    আপনার লেখা পড়ে যাত্রাপালা সম্পর্কে যা জানতে পারলাম তা খুব একটা সুবিধাজনক নয়। এই শিল্প সম্ভবত বিলুপ্ত হতে চলেছে এসব নোংরামির কারনেই। অথচ, ঐতিহ্যবাহী যাত্রা শিল্পটি সুন্দর ভাবে পরিচালনা করতে পারলে আমাদের গ্রাম–বাংলার শিল্প সংস্কৃতি সমৃদ্ধ হতে পারতো।

    লেখা খুব ভালো হয়েছে মামুন। আপনি ব্লগে নিয়মিত আসুন। নিজের লেখা পোস্ট করার পাশাপাশি অন্যদের লেখা গুলো কম–বেশি পড়ে মতামত দেয়ার চেষ্টা করুন। ব্লগ একটি পরিবারের মতো। এখানে আন্তরিক ভাবে থাকা খুব জরুরী। আশা করছি আপনি সোনেলায় আন্তরিকতার সাথেই নিজেকে উপস্থাপন করবেন।

    ভালো থাকবেন, শুভকামনা রইলো 🌹🌹

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য