জীবনানন্দের গদ্য কবিতা সংজ্ঞাসূত্রে মাত্রাহীন হলেও সূক্ষ্ম সুর এবং স্পন্দনহীন মোটেও নয়। শুধু ঝরা পালক’এই জীবনানন্দ প্রথাসিদ্ধ স্তবকের চর্চা করেছিলেন। ধূসর পাণ্ডুলিপি থেকেই জীবনানন্দ ঠিক স্তবক রচয়িতা আর নন। ধূসর পাণ্ডুলিপি’র একমাত্র জীবন কবিতার ৩৪টি অংশ স্তবকধর্মী। শকুন কিংবা কবির জীবদ্দশায় অপ্রকাশিত রূপসী বাংলা’র সনেটসমূহও ধ্বনি বিচারে স্তবকরূপী হয়েও স্তবক ধ্বনি-চারিত্র্য থেকে মুক্ত। তেমনি মৃত্যুর আগে ধূসর পাণ্ডুলিপি ‘কুয়াশায়, কবেকার, পাড়াগাঁয়’, ‘মুখের গন্ধ, ঘাস, রোদ, মাছরাঙা, নক্ষত্র, আকাশ’, ‘জানি না কি আহা’, ‘শুনিনি কি’-এইসব স্বরবর্ণ মিল, বিরামচর্চিত ধ্বনির বিস্তার, বাকস্পন্দ, প্রশ্ন-এইসব শ্রুতিকল্প সমন্বিত হয়ে ৮টি স্তবকের প্রত্যেকটি নিজস্ব ধ্বনি-চারিত্র্য নিয়ে কোনোটিই অন্যটির অনুরূপ নয়। শুধু প্রত্যেকটি স্তবক ‘আমরা হেঁটেছি যারা,’ ‘আমরা বেসেছি যারা’, ‘দেখেছি সবুজ পাতা’, ‘আমরা বুঝেছি যারা’-এমন ৮ মাত্রায় শুরু হয়েছে এবং শেষ হয়েছে সুরের পরে ঠিক সমে ফেরার মতো প্রত্যাশিত-অপ্রত্যাশিত ধ্বনিবেগ নিয়ে। স্তবক হিসেবেই যদি ওকে স্বীকার করতে হবে, তবে এও মানতে হবে যে এটি না মধুসূদনের, না রবীন্দ্রনাথের, না সুধীন্দ্রনাথের স্তবক। লয়ের সূক্ষ্ম স্তরভেদের জন্য জীবনানন্দ ক্রিয়াপদকেও দ্বিবিধ সুরে ব্যবহার করেছেন। দেখিয়াছি, করিয়াছি, শুনেছিল, চিনেছিলে-প্রভৃতির ৮ মাত্রার প্রয়োগ কিংবা বেসেছি, হেঁটেছি’র ৩ মাত্রাকে ৮ মাত্রার মধ্যে যোজন অক্ষরবৃত্তের ঢিলে লয়ে মিশিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু ধ্বনি যখন মাত্রাহীন, চলিত ক্রিয়ার প্রক্ষেপধ্বনি তাঁর গদ্য কবিতার বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছে: ‘জীবনের গভীর জয় প্রকাশ করবার জন্য’-হাওয়ার রাত (বনলতা সেন); ‘আবার কি ফিরে আসবো না আমি পৃথিবীতে’-কমলালেবু (বনলতা সেন)। পূর্বোদ্ধৃত ফুটপাথে (মহাপৃথিবী) কবিতাটি তো আগাগোড়াই শিল্পিত এবং নির্মিত মূলত ক্রিয়াধ্বনির পুনশ্চতার মধ্যে: ‘হবে না’, ‘উঠবে না’, ‘ঘষবে না’, ‘পড়বে না’, ‘তুলবে না’, ‘খসিয়ে আনবে না’, ‘নিবিড় হয়ে উঠবে না’।

জীবনানন্দের গদ্য কবিতা একটি স্বতন্ত্র আলোচনার বিষয়। শ্রুতিকল্পের লক্ষ্য নিয়ে শুধু এতটুকুই ইঙ্গিত দেবো যে তিনি গদ্য কবিতার মাত্রাহীনতার মধ্যে প্রায় সর্বত্রই ধ্বনির স্পন্দন বর্জন করেন নি বরং লালন করেছেন। অব্যয়, ক্রিয়াপদের পুনশ্চতা কিংবা ধ্বনির বাঁটেই সূক্ষ্ম ঢেউ উঠেছে, থেমেছে, নেমেছে। অর্ন্তনিহিত এই স্পন্দনের চড়া ব্যতিক্রম তাঁর মৃত্যুর পরে প্রকাশিত কবি এবং মৃদুতরভাবে উনিশ শো চৌত্রিশ, এই সব পাখি-এই তিনটি কবিতা:

            কবিকে দেখে এলাম

দেখে এলাম কবিকে

...    ...    ...

‘শেয়ার মার্কেটে নামলে কেমন হয়’, জিজ্ঞেস করলে আমাকে

হায়; আমাকে।

‘লাইফ ইনসিওরেন্সের এজেন্সি নিলে হয় না’, শুধায়

‘লটারির টিকিট কিনলে কেমন হয়? ডার্বির নয় আইরিশ সুইপ

নয়-গোয়ার কিংবা বউবাজারের?’-এই বলে

শীতের সকালে চামসে চাদরখানা ভালো করে জড়িয়ে নেয় গায়ে

[কবি (উত্তরসূরী, কার্তিক-পৌষ, ১৩৬২)]

এই তিনটি কবিতার সুর অ্যান্টি-পোয়েট্টি বলা যেতে পারে। এই মেজাজের কবিতাকে আরো সুস্থির প্রয়াস দিয়ে বৃহত্তর আয়তনে কোনো পুস্তকে রূপ দেবার সূযোগ জীবনানন্দের ঘটেনি। কিন্তু রূপ এবং ধ্বনিভঙ্গিটিকেও তিনি বুঝেছিলেন এবং ‘সমাজ ও সভ্যতার শববাহনের’ কাজ এড়িয়ে কাঁটা-কাঁটা বক্তব্যের পিছনেও সংবেদশীলতাকে গ্রাহ্য করে গেছেন।

শেষ পর্বে কিছু স্বরবৃত্তের চর্চাও জীবনানন্দ করেছিলেন। ‘যুগের অবাধ উচ্ছৃঙ্খলতা দমন করার জন্য সর্বব্যাপী নিপীড়নের যে পরিচয় পাওয়া যায় রাষ্ট্রে ও সমাজে সেইটে কাব্যের ছন্দালোকে নিঃসংশয়রূপে প্রতিফলিত হলে মাত্রাবৃত্ত মুক্তকের জন্ম হয় কি না ভেবে দেখা যেতে পারে।’ এইসব এবং নাট্য-কবিতার সম্ভাবনাও তিনি ভেবে গিয়েছিলেন। এই প্রবন্ধে এই প্রসঙ্গগুলো ব্যাপকভাবে আলোচনার অবকাশ নেই। এটি স্বতন্ত্র আলোচনার বিষয়।

সারমর্ম হচ্ছে: জীবনানন্দ দাশ লয়, ধ্বনি, বিশ্লিষ্ট শব্দচয়ন, বাকস্পন্দ, তদ্ভব শব্দ এবং তার লৌকিক ব্যবহারজাত ক্ষমতার প্রয়োগ, নিঃশব্দতার ব্যবহার, বিশেষণ ও ক্রিয়াপদের কৌশলে বাঙলা কবিতায় একটি অদ্বিতীয় শ্রুতিকল্পের জন্ম দিয়েছিলেন-যা আগে ছিলো না এবং যার পরবর্তী অনুসরণ করতে গেলে নিজস্ব কণ্ঠস্বর থাকে না:

                 একদিন শুনেছ যে-সুর-

ফুরায়েছে,-পুরানো তা-কোনো এক নতুন-কিছুর

আছে প্রয়োজন,

তাই আমি আসিয়াছি,-আমার মতন

আর নাই কেহ!

[কয়েকটি লাইন (ধূসর পাণ্ডুলিপি)]

 

(.................................................................................................................চলবে)

 

অাগের পর্বগুলোর লিংক:

জীবনানন্দের শ্রুতিকল্প : একটি বিশ্লেষণ (১) http://www.sonelablog.com/archives/23872

জীবনানন্দের শ্রুতিকল্প : একটি বিশ্লেষণ (২) http://www.sonelablog.com/archives/23989

জীবনানন্দের শ্রুতিকল্প : একটি বিশ্লেষণ (৩) http://www.sonelablog.com/archives/24057

জীবনানন্দের শ্রুতিকল্প : একটি বিশ্লেষণ (৪) http://www.sonelablog.com/archives/24143

জীবনানন্দের শ্রুতিকল্প : একটি বিশ্লেষণ (৫) http://www.sonelablog.com/archives/24290

জীবনানন্দের শ্রুতিকল্প : একটি বিশ্লেষণ (৬) http://www.sonelablog.com/archives/24372

0 Shares

৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ