জীবনানন্দের শ্রুতিকল্প : একটি বিশ্লেষণ (৬)

সাতকাহন ২৭ নভেম্বর ২০১৪, বৃহস্পতিবার, ১০:৪৮:২০অপরাহ্ন সাহিত্য ৮ মন্তব্য

ক্রিয়াপদের পৌনঃপুনিকতা, পুনশ্চতার ধ্বনি ব্যতিরেকে কি সম্ভবপর ছিলো? তিনি যে সারপদার্থ ভেবেছিলেন তাকে বহন করবার মতো লয় এবং ধ্বনিকেও আবিষ্কার করেছিলেন ক্রিয়াপদের সমূহ ব্যবহারে (সঙ্গে সঙ্গে অব্যয় এবং বিশেষণকেও প্রচুর প্রয়োগ করে)।

“মানুষ হিসেবে অনুদার আমি হতে পারি, কিন্তু সময়-ও-সীমা-প্রসূতির ভিতর সাহিত্যের পটভূমি বিমুক্ত দেখতে আমি ভালোবাসি। তবু এটা স্বীকার করবো না যে, ‘মেমোরেবল স্পীচ’ মাত্রই কবিতা। কবির পক্ষে সমাজকে বোঝা দরকার, কবিতার অস্থি’র ভিতরে থাকবে ইতিহাসচেতনা ও মর্মে থাকবে পরিচ্ছন্ন কালজ্ঞান। ...এই সমস্ত চেতনা নিয়েই মানবতার কবিমানের ঐতিহ্য। কিন্তু এই ঐতিহ্যকে সাহিত্যে বা কবিতায় রূপায়িত করতে হলে ভাব-প্রতিভার প্রয়োজন-যা প্রজ্ঞাকে স্বীকার করে নিয়ে নানারকম ছন্দে অভিব্যক্ত হয়। ছন্দের অনেকরকম বৈচিত্র্য রয়েছে; গদ্যও তো একরকম ছন্দ।”

                                          [উত্তররৈবিক বাংলা কাব্য (কবিতার কথা)]

৩. সূক্ষ্ম সুর, স্থুল সুর ও গদ্য কবিতা 

উল্লিখিত প্রবন্ধে জীবনানন্দ আরো নির্দেশ করেছিলেন:

“অনেকের ধারণা বর্তমান বাংলা কবিতা মোটা চালে ও গদ্য ছন্দেই চলে ভালো । কিন্তু সে ধারণা ঠিক নয়। যেখানে আধুনিক কবিতা সূক্ষ্ম সুর বজায় রেখে চলছে সেখানে স্বয়ং স্বাতন্ত্র্যও আয়ত্তে রাখবার জন্য রবীন্দ্রকাব্যের সঙ্গে অজ্ঞাতসারে, এবং কোন কোন ক্ষেত্রে অল্পবিস্তর চেতনায়, তাকে স্বভাবতই গভীর সংঘর্ষে আসতে হয়েছে। কেননা এ হচ্ছে রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব জিনিস নিয়ে আধুনিকের বোঝা-পড়া।”

এই উক্তি এবং এর তাৎপর্য কিছুটা বিশ্লেষণসাপেক্ষ। মাইকেল, রবীন্দ্রনাথের অক্ষরবৃত্ত যে লয়ে চলতো তার চেয়ে বিলম্বিততর লয়েই জীবনানন্দের শুরু। এবং ‘কেউ যাহা জানে নাই-কোনো এক বাণী-আমি বহে আনি’ কিংবা ‘মনে পড়ে কবেকার পাড়াগাঁর অরুণিমা সান্যালের মুখ’-এই গতি থেকে শুরু করে যতোটা বিলম্বিত সম্ভব সেই চলন পর্যন্তই জীবনানন্দ কবিতা রচনা করেছেন। ধূসর পাণ্ডুলিপি, বনলতা সেন-এর চেয়ে মহাপৃথিবী’র, সাতটি তারার তিমির এবং বেলা অবেলা কালবেলা’র সুর মন্থরতর:

নব-নব মৃত্যুশব্দ রক্তশব্দ ভীতিশব্দ জয় ক’রে মানুষের চেতনার দিন

অমেয় চিন্তায় খ্যাত হয়ে তবু ইতিহাসভুবনে নবীন

হবে না কি মানবকে চিনে-তবু প্রতিটি ব্যক্তির ষাট বসন্তের তরে!

সেই সব সুনিবিড় উদ্বোধনে-‘আছে, আছে, আছে’ এই বোধির ভিতরে

চলেছে নক্ষত্র, রাত্রি, সিন্ধু, রীতি মানুষের বিষয় হৃদয়;

জয় অস্তসূর্য, জয় অলখ অরুণোদয়, জয়!

[সময়ের কাছে (সাতটি তারার তিমির)]

যতক্ষণ পর্যন্ত বিষয় সূক্ষ্মতম লয়ের সাহায্য নিয়ে গরীয়ান হয়ে উঠতে পারে, জীবনানন্দ মাত্রাকে ডিঙিয়ে যাননি। ‘বোধি’, ‘অবসরের গান’, ‘ক্যাম্পে’ এমনকি ‘আট বছর আগের একদিন’ অক্ষরবৃত্তে লিখেছেন। ভাবা যেতে পারে এইসব কবিতায় যদি সূক্ষ্মতম লয় না থাকতো তবে এই কবিতাগুলোর সংবেদন কীভাবে এবং কতোখানি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে শেলতীব্র হয়ে উঠতো! ভাবলেই বোঝা যায় ধীর-মাত্রার এই কবিতাগুলোর বিষয়, বোধ ও গভীরতার অঙ্গাঙ্গি। একইভাবে ‘হাওয়ার রাত’ কিংবা ‘আদিম দেবতারা’ তাদের নিজস্ব সারপদার্থ গদ্য জাতীয় ধারালো আঙ্গিক বিনা আত্মপ্রকাশে অসমর্থ।

(..............................................................................................চলবে)

আগের পর্বগুলোর লিংক:

জীবনানন্দের শ্রুতিকল্প : একটি বিশ্লেষণ (১) http://www.sonelablog.com/archives/23872

জীবনানন্দের শ্রুতিকল্প : একটি বিশ্লেষণ (২) http://www.sonelablog.com/archives/23989

জীবনানন্দের শ্রুতিকল্প : একটি বিশ্লেষণ (৩) http://www.sonelablog.com/archives/24057

জীবনানন্দের শ্রুতিকল্প : একটি বিশ্লেষণ (৪) http://www.sonelablog.com/archives/24143

জীবনানন্দের শ্রুতিকল্প : একটি বিশ্লেষণ (৫) http://www.sonelablog.com/archives/24290

0 Shares

৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ