একজন লেখক,সাহিত্যিক কিংবা হালের ব্লগার সবাইকেই হতে হবে মননশীল মুক্তচিন্তার অধিকারী। আস্তিকতা নাস্তিকতার উর্ধ্বে থাকতে হবে তার চিন্তা চেতনা। আমি এটা বলছিনা লেখক, সাহিত্যিক এবং ব্লগার মানেই নাস্তিক। ধর্ম যার যার ব্যক্তিগত বিষয়, তবে অন্যের ধর্মকে কটাক্ষ করা কোন লেখক বা ব্লগারের অভিরুচি হতে পারে না।

সাহিত্যচর্চাও ঠিক সেরকম একটি বিষয়। আস্তিকতা নাস্তিক্যবাদের চিন্তা থেকে বের হয়ে একজন লেখককে হতে হয় সার্বজনীন মানবাত্মার প্রকাশিত রুপ। যারা গুনী লেখক তারা কখনই লেখায় ধর্মকে টেনে আনেননা। তারা সাধনা করেন শব্দশিল্পের, আরাধনা করেন মানবপ্রেমের।

অন্যদিকে যারা ধার্মিক তারা আবার নিজ ধর্মের বাইরে গিয়ে নিজের লেখায় বা কর্মে এমন কিছু প্রকাশ করেননা যা ধর্মকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। ধর্ম যার যার ব্যক্তিগত অভিরুচি বলে জোর করে কাউকে ধর্ম মানানো যায়না। তবে সাহিত্যশিল্পীরা অনেকেই আস্তিকতা নাস্তিক্যবাদকে উর্ধ্বে রেখে তাদের মতামত প্রকাশ করে সাহিত্যচর্চা করেন। এমন লেখকের সংখ্যাও নেহাত কম নয় কিন্তু।

তেমনি একজন লেখক পারস্য সুফিসাধক মাওলানা জালালুদ্দিন রুমী। তার লেখা বুঝতে হলে আপনাকে অতীন্দ্রিয়বাদ বুঝতে হবে। জানতে হবে লেখার সমসাময়িক প্রেক্ষাপট, পারস্য রীতিনীতি। সে সময় পারস্যে মদ, নারী এসবের অবাধ বিচরন ছিলো। মুসলমান সমাজে এটি হারাম হলেও সবাই তা মানতেননা।

জালালুদ্দিন রুমি একজন মিস্টিক (অতীন্দ্রিয়বাদী) সুফি সাধক ছিলেন। তার মর্মভেদী মিস্টিসিজম বা অতীন্দ্রিয়বাদমূলক কবিতা কিংবা শায়েরী বুঝতে হলে নিজেকে নিদেনপক্ষে ইশ্বরের আধ্যাত্মিকতা বিশ্বাস করতে হবে। পারস্য সুফি কবিদের কবিতা অনেকাংশে বাহ্যিক দিক দিয়ে নিতান্ত মানবীয় রস-লিপ্ত পার্থিব ভোগের কবিতা। সুরা, সাকী ও রমণীতে তাদের কবিতা পূর্ণ হলেও তাদের কবিতা-ভাবের অভ্যন্তরে রয়েছে রূপকরুপে আধ্যাত্মিক তাৎপর্যের ইঙ্গিত। আজ আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে জালালুদ্দিন রুমি’র লেখা একটি কবিতার অন্তর্নিহিত সারমর্ম সম্পর্কে আপনাদের সাথে নিজের অনুভূতি শেয়ার করবো।

“With Thy sweet Soul, this Soul of mine—
Hath mixed as Water doth with Wine.
Who can the Wine and Water part,
Or me and Thee when we combine?
Thou art become my greater Self;
Small Bounds no more can me confine.
Thou hast my Being taken on,
And shall not I now take on Thine?
Me Thou for ever hast affirmed,
That I may ever know Thee mine.
Thy Love has pierced me through and through,
Its Thrill with Bone and Nerve entwine.
I rest a Flute laid on Thy Lips;
A Lute I on Thy Breast recline.
Breathe deep in me that I may sigh;
Yet strike my Strings, and Tears shall shine.”

– The Divan (The Festival of Spring- Hastie’s translation, p.10)

রুমি বলছেন- প্রভুভক্ত তিনি সৃষ্টিকর্তার সাথে মিশে গিয়েছেন। ভক্ত হৃদয়ের ক্ষুদ্র ও সীমাবদ্ধ পার্থিব সত্ত্বা এক বৃহৎ ও অপার্থিব সত্ত্বার সাথে মিশে গিয়ে একটি বৃহৎ ও পরিপূর্ণ সত্ত্বার স্বার্থকতা লাভ করেছে। প্রেমের অত্যাশ্চর্য অলৌকিক শক্তিতে ক্ষুদ্র হয়েছে বৃহৎ, সসীম হয়েছে অসীম আর ক্ষণিক হয়েছে চিরন্তন। ইশ্বরপ্রেম সাধনায় ঐশ্বরিকতায় বিশ্বাসী মানুষ পার্থিব সত্ত্বার খোলস ছেড়ে ঈশ্বরের সত্ত্বায় রূপান্তরিত হয়েছে।

এই অবস্থা জগতের অধিকাংশ মিস্টিকদের কাম্য। এই মহামিলনই তাঁদের প্রেম-সাধনার চরম ফল, আধ্যাত্মিক জীবনের শেষ পরিণতি। এই পার্থিব ও ব্যক্তিসত্ত্বার মায়া নাশ হয়ে চিরতরে আত্মবিলোপ নয়, এটি বৈদান্তিকের এর অভেদ জ্ঞান নয়, জলবিম্বের জলে মিশে যাওয়া নয়। এটি জ্ঞান ও কর্মের প্রতি কোন আধ্যাত্ম-সাধনার নির্দিষ্ট পরিণামও নয়। প্রেমভক্তি ও সহানুভূতির পথে এটি একটি চরম অবস্থা যা ক্ষুদ্র, খন্ড জীবনের বৃহৎ ও অখন্ড জীবনে রূপান্তরিত হওয়া মাত্র।

সুফি মতে ঈশ্বর একমাত্র সত্য, তিনি সৌন্দর্য ও প্রেম স্বরূপ। সৃষ্টি তাঁর ইচ্ছের প্রকাশ। মানুষের মধ্যে ক্ষুদ্র আধারে ইশ্বরের সমস্ত ঐশ্বরিক অংশই বর্তমান। মানবাত্মা ইশ্বর হতে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর ক্রমাগত তাঁর সাথে মিলিত হবার চেষ্টা করছে। উপযুক্ত ব্যক্তি মৃত্যুতে ইশ্বরের সাথে মিলিত হয়, কিন্তু পার্থিব দেহেই মানুষ প্রেমের প্রবল শক্তিতে ইশ্বরের সাথে সময় সময় মিলিত হতে পারে। সে এক পরম আনন্দের মহা মাহেন্দ্রক্ষণ। পার্থিব প্রেম ভগবৎ প্রেমের সোপান, প্রকৃত প্রেমিক ইশ্বরপ্রেমের সাথে একেবারে মিশে যায়।

ইশ্বরের সাথে মানবপ্রেমের একটি নির্দিষ্ট তত্ত্ব, মত বা সাধন প্রণালী কবি মানষের পশ্চাতে থাকায় রুমি’র এই মিস্টিক কবিতায় ইশ্বরের সাথে মানবীয় প্রেমকে বিস্তৃতভাবে অবলম্বন করা হয়েছে। তার লেখকীয় অনুভূতির প্রকাশ কোন কোন সময়ে রূপক ও সাংকেতিকতার সাহায্যে প্রকাশ পেলেও তা প্রত্যক্ষ ও নিরপেক্ষ। রুমির এই কবিতায় ইশ্বর স্থির, অচঞ্চল ও আনন্দময়। আর মনুষ্য কুল কেবলমাত্র ইশ্বর প্রেমের সাথে একবার মিশে যেতে পারলেই তাদের জীবনের চরম সার্থকতা লাভ করতে পারে।

কবিতায় রুমি মানবাত্মার এ অবস্থাকে একটি অনন্ত আনন্দময়, সৌন্দর্যময় ও সংগীতময় জীবনের সাথে তুলনা করেছেন। একে এক প্রকারের পুনর্জন্ম বলা যেতে পারে। রুমি’র মতে মানবজীবনের সমস্ত আশা-আকাঙ্ক্ষার তৃপ্তি ও শান্তি এতেই নিহিত রয়েছে।

৪৩৫জন ২২০জন
72 Shares

২২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য