জার্নি বাই ট্রেন

খাদিজাতুল কুবরা ১৪ জানুয়ারী ২০২৩, শনিবার, ১২:০১:৪৫পূর্বাহ্ন একান্ত অনুভূতি ৪ মন্তব্য

ট্রেন জার্নি কারো কাছে রোমাঞ্চকর, কারো কাছে বেদনাদায়ক। আমার কাছে ট্রেন জার্নিটা এক দ্বৈত অনুভূতির আহ্বায়ক। আমি যতই স্বাভাবিক ভাবে সফর শেষ করার চেষ্টা করিনা কেন কখনো তা পারিনা। যে বিষয়গুলোকে সচেতনতার সাথে এড়িয়ে যাই, সরিয়ে রাখি নিজেকে, সেগুলোই দলবেঁধে ভিড় করে মনের মধ্যে। কখনো আমি চিঠি লিখি মনে মনে মনের গোপনকে, কখনো আবার হারিয়ে যাই সোনালী শৈশবে! সেদিন চিঠি লিখলাম  তাকে এভাবেই _

প্রিয় অনিমেষ!

কেমন আছ? আমি বিবাগী যাপনের সব কৌশল আয়ত্ত করে বাঁচতে শিখে গেছি । ভালো আছি কিনা সেটা মূখ্য নয়। বেঁচে আছি সেই ঢের! যে ললাটে চন্দনের ফোঁটা পড়েনি কখনো তাকে তুমি সিঁদুরে রাঙিয়ে দিতে পারোনা, এ সহজ সত্যিটা আমি জানি, তবুও দিনশেষে ভালোবাসা তার অনিবারিত দাবি নিয়ে আমাকে জ্বালাতন করে। শূন্য কুন্তল ঘেমে নেয়ে একসার হয় অস্থিরতায়। সমাজের কুঞ্চন রেখা, শাস্ত্রীয় সংকীর্ণতার তোয়াক্কা না করে যে নদীর স্রোত বয় এবং সমুদ্রের ডাকে মিলিত হয় মোহনায় তাকে আমরা অস্বীকার করলে ও অবচেতন মন তা পারেনা।শুধু তফাৎ এটাই যে দিন শুরুর কোলাহল, শব্দের শতদল একসময় পিনপতন নীরবতায় রুপ নেয়। হারিয়ে যায় প্রেম! অপ্রেমে গড়ে উঠে ইট কাঠ পাথরের ভবন। টিকে থাকে কালের স্বাক্ষী হয়ে যুগের পর যুগ। ভালোবাসা হয়ত এক অলীক অনুভব ! কিংবা ক্ষয়ে যাওয়া পাললিক শীলা! দিনভর সূর্য যেমন  বিরতিহীন চাতূর্য দেখিয়ে পরিশেষে এক আকাশ লাল আভা হৃদয়ে রক্তকরবী ফুটিয়ে আঁধারে মিলিয়ে যায় নিঃশব্দে! ভালোবাসা ও আলোছায়ার খেলা শেষে নৈঃশব্দ্যে লুকিয়ে পড়ে।

এমন কেন হয়?কেন এই দ্ব্যর্থতা?বুকের ভেতর অহর্নিশ চোরা স্রোত বয়, সত্যি বলতে তেমন কোনো কারণ নেই, দুঃখ সুখের মধ্যিখানে তাওয়াফ শেষ করার তাড়া নেই, আর্জি নেই আর ফিরে দেখার, কিংবা গ্যাছে যে পাতা ঝরে তার হিসেব চুকোবার।নেই আর একটি বার চোখের দেখার প্রার্থনা!নেই ভ্রুকুঞ্চিত দৃষ্টির ভয়, আমার পাথর চোখে কান্না নেই খুব একটা, কদাচিৎ যদি বা কাঁদি তা-ও আঁধারের ও অলক্ষ্যে। মানিয়ে নিয়ে হারতে হারতে জিতবার আকাঙ্ক্ষা ও মরে গ্যাছে সংগোপনে, মোড়ানো নেই কোনো স্মৃতি সুরক্ষিত ন্যাপথালিনে, এক শূন্য দৃষ্টি আর উঁকিঝুঁকি দেওয়া সাদা চুল ছাড়া অবশিষ্ট নেই কিছু মাত্র দ্বিধা। জীবন এক মরিচীকার নাম জেনেছে বেওয়ারিশ মন, ভালো থাকার অভিলাষে, জেনেবুঝেই আটকে গেছি গোলকধাঁধায়,অথচ অসীম দূরত্বে থাকে সূর্য আর সে।সমদ্বিবাহু ত্রিভুজের মত সরল রেখায় আঁকা ছকের সম্পর্কগুলো ও কি ভীষণ বাঁকা,মেনে নিয়েছি সবটা,নিঃস্ব হবার সবটুকু দায় আমার একার! তুমি শুধু ভালো থেকো নিরন্তর।

ইতি রু

ট্রেনে বসে কেমন যেন আনমনা হয়ে পড়ি সবসময়। ট্রেন সামনের দিকে ছুটে চলে ঝিকঝিক করে আর আমি যেন পেছনে ফিরে যাই, একসাথে সব স্মৃতিগুলো তাড়া করে, শৈশব- কৈশোর, তারুণ্য, স্কুল, কলেজ, খেলার মাঠ, পুকুর পাড়, নারিকেল গাছের চিরল পাতা, ফুল, চাঁদনী রাতের উঠোন, দাদীর গায়ের আদুরে ঘ্রাণ, বাঁশঝাড়ের ঝিরিঝিরি হাওয়া আরো কত কী?

চোখ দিয়ে কখন টপটপ করে পানি পড়ে টের পাইনা অথবা ইচ্ছে করেই বেদনাকে কেঁদোনা বলিনা। নিজেকে হয়ত নিজেই কিছুটা ছাড় দিই অভিমানের ধূলো অশ্রুতে ধূয়ে সাফ করবার জন্য। মেয়ে আমার পাশেই বসা থাকে। কয়েক মাস পর মা মেয়ে ট্রেন জার্নি করি চিকিৎসা নেওয়ার জন্য অন্য শহরে। হঠাৎ ও ধমকে উঠে! কাঁদছ কেন? আমি অপরাধীর মত বলি, এটা ঠিক কান্না নয়।ও বলে আমি তোমার চোখ দেখতে পাচ্ছি। বললাম তোমার মা আছে মানে সব আছে, তাই তুমি বুঝবেনা।আমার মা নেই মানে কিছু নেই। চোখ বড় করে কঠিন মুখে সে বলে, নেই কাজতো খই ভাজ। আমি বুঝতে পারি সে আমাকে ভালোবাসে! এটুকুই চলার পথের পাথেয়। আমি ফিক করে হেসে দিই সে-ও হাসে। আমি আবার বেঁচে উঠি, ফিরে আসি আমার বর্তমানে।একই নিয়মে ট্রেন থামে প্ল্যাটফর্মে, হুড়মুড় করে নেমে পথ ধরি গন্তব্যের, রাজপথে যানজট ভীষণ, অলি গলি ঘুরে ঘুরপথে বাড়ি ফিরি, ফিরে দেখি অন্ধকার ঘর আমার ধূলোময়লায় জেরবার!

১৯০জন ৬০জন
0 Shares

৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ