চিঠি

নীরা সাদীয়া ১৪ অক্টোবর ২০১৯, সোমবার, ১২:৩১:৪৩পূর্বাহ্ন চিঠি ৩২ মন্তব্য

প্রিয় আকাশ,
জানি তুমি আকাশের মত বিশাল নও, আকাশের মত নীলও নও। তবু আমি তোমার নাম দিয়েছি আকাশ। তোমাকে কল্পনা করি আকাশের বিশালতার মত, তোমাকে খুঁজে ফিরি আকাশের ঐ নীল রঙে। টুকরো টুকরো মেঘের ভেলায় লিখে রেখেছি তোমার স্মৃতি খুব যতনে। তাই তোমার নাম দিয়েছি আকাশ।

অনেক দিন থেকে ভাবছি, তোমাকে একটা চিঠি লিখবো। কিন্তু কি লিখবো, কেন লিখবো, এসব ভেবেই থেমে গেছি। কিন্তু কিন্তু বাদ দিয়ে আজ লিখেই ফেললাম। তুমি জানতে চেয়েছিলে কেন তোমাকে ভালোবাসি? এর উত্তর আজো নিজেই খুঁজে পাইনি। কি বলবো বলো।

কবে যে তোমাকে প্রথম দেখেছিলাম মনে নেই। তবে রবি ঠাকুরের “শেষের কবিতা” পড়তে গিয়ে বার বার তোমাকেই মনে পড়ত। অমিত বলতে তোমাকেই ভাবতাম, আর লাবণ্য যেন আমি! সেই যে সেদিন জানতে পারলাম, তুমি আমার অমিত নও, আকাশ ও নও, তখন থেকেই বইটা যত্ন করে শেলফে তুলে রেখেছিলাম, আর কোনদিনই পড়া হয় নি।

যেদিন এই সত্যটা প্রথম জেনেছিলাম, সেদিন আড়াই ঘন্টা শুধু নিজের মাথায় পানিই ঢেলেছিলাম, কোনদিকে যে এত সময় পার হয়ে গেছে টেরই পাইনি। মা গোসলখানার দরজা চাপড়ে বলছেন, “কোনদিন তো এত দেরী হয় না, আজ কি হলো? এত পানি ঢেলো না, তোমার তো ঠান্ডা লাগার ধাত আছে।” আচ্ছা তুমি কি জানতে যে আমার ঠান্ডার ধাত আছে? কোনদিন যদি আমার সম্পর্কে একটু জানতে চাইতে…আমি ভালোবাসা নিয়ে ঝড়ে ঝড়ে পরতাম। কিন্তু তখন তা হলো না। কেন হলো না? কী হতো তা হলে?

যেদিন থেকে এই তিক্ত নির্মম সত্যটা জানলাম, তারপর থেকে আমার কী যে হলো…আমি আর নিজের মধ্যে রইলাম না। নিজেকে কোথায় যেন হারিয়ে ফেললাম। এরপর থেকে একটু একটু করে প্রতিদিন তোমাকে ভোলার বৃথা চেষ্টা, তোমাকে ভুলতে গিয়ে আরও বেশি করে ভুলে যাচ্ছিলাম নিজেকেই!

ততদিনে তুমি অন্য কারো কৃষ্ণ হয়ে বাজাতে শুরু করেছো সুরের বাঁশি। আমারই চোখের সামনে আমার আকাশে অন্য কোন মেঘ, অন্য কোন রংধনু, আমি কি করে সই? ততদিনে জেনে গেছি আকাশটাই আমার নয়, তাতে খেলা করে অন্য মেঘ। এদিকে আমার মাথায় খটখটে রোদ। কোথাও কেউ ছিলো না জানো? কেউ ছিলো না যে একটু ছাতা ধরবে, বলবে, “অত ভেবো না, একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে।”

জানতাম কিচ্ছু ঠিক হবার নয়। গোটা আকাশটা আমার দুমড়ে মুচড়ে গেছে। এই আকাশে আজ খেলা করে অন্য অন্য মেঘ। সেখানে কোথাও আমি নেই… ভাবতেই নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসতো। চারপাশে অক্সিজেন শূন্যতা দেখা দিত। মনে হতো এই বুঝি বন্ধ হতে চললো নিঃশ্বাস, থেমে যেতে লাগলো হৃদপিণ্ডের কম্পন। সেদিন থেকে আমার যা যা রোগ হয়েছিল তা আজও সারেনি। ভাতের থালায় খেতে না পারা ভাত রেখে ওঠা রোগ, যখন তখন তোমাকে মনে পড়া রোগ, সবকিছু ভুলে যাওয়া রোগ, তোমাকে আরও বেশি ভালোবাসার রোগ…

আমি যখনি বিষম খেতাম, ভেবে নিতাম তুমি হয়ত ভাবছো আমাকেই। জানতাম তা হবার নয়, তবু নিজেকে এতটুকু আনন্দ দেবার জন্য এই মিথ্যে ভাবনা ভাবা ছাড়া আর কিছুই করার ছিলো না আমার।

সেই যে সেদিন থেকে আমার পড়াশোনা ঘুচেছে, তা আর আগের মত হলোই না।তালটা কোথায় যেন কেটে গেলো। ক্লাসে যে মেয়েটা বরাবর প্রথম হতো, সে সেদিন থেকে ফেল করতে শুরু করলো, ভাবা যায়! সেদিন থেকে পড়ার টেবিলে ধূলোরা এসে জমতে থাকলো। ধূলোগুলকে মুছতে মন চাইতো না। মনে হতো, থাকুক না ওরা, ওদের ভালোবাসার বুকে।

সেদিন থেকে আমার চুল এলোমেলো, ঘর, টেবিল,আলনা কলমদানি সবই এলোমেলো। আমি গোছাতে ভুলেছি, নিজেকে সাজাতে ভুলেছি, নিজেকে যত্ন করতে হয়, তাও ভুলেছি। আমি আর আমাতেই ছিলাম না, কোথায় যেন ভেসে গেছিলাম। বৃষ্টি হয়ে ঝড়ে পরেছিলাম অথৈ সাগরে। তারপর ঢেউ আমাকে একবার এদিক পানে ভাসায়, তো আবার ওদিক পানে ডুবায়। ঢেউয়ে ঢেউয়ে বেলা হলো অনেক। ততদিনে তুমি একটা বিরাট রোগে পরিনত হয়েছো। রোগটা কেমন যেন মাথা ব্যাথার মতই…

তুমি যেন মাথাব্যথার মতই
সবসময় কপাল জুড়ে থাকো।
তুমি একঘেয়ে কালো কালি,
মনের ভেতর আঁকিবুকি আঁকো।

তুমি মশার ভ্যান ভ্যান
শুনতে চাই না তবু চাই,
তুমি গগন দহন রোদ
আমি পুড়ে ভষ্ম হয়ে যাই।

তুমি গরম তেলের ফোঁটা,
দাগ হয়ে বেঁচে থাকো,
তুমি কার্বনমনো অক্সাইড,
দম বন্ধ করে রাখো।

আমি হালকা শীতল ছাতা,
গেলাসে চিমটি বরফ
অথবা খাতার রাফ পাতা,
একটু উষ্ণ পরশ।

আমি ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো,
অপ্রয়োজনে ছুঁড়ে ফেলো।

পর্ব ১

চলবে…

৩৯৮জন ১৫৩জন
15 Shares

৩২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য