(১)

ঝিরি ঝিরি বৃষ্টিতে ভিজছিল ওর শরীর। সে দাঁড়িয়ে ছিল আমাদের সামনেই, ডান দিকে।

বৃষ্টিতে ভিজছিলাম আমরাও – আমরা যারা সেদিন ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরাইলের বর্বর হামলার প্রতিবাদে সমাবেশের ইভেন্টে এসেছিলাম। মুষলধারে বৃষ্টি হলে হয়তো সমাবেশ আর চালিয়ে যাওয়া হতনা। কিন্তু, বৃষ্টিটাও সেদিন ‘কুকুর-বিড়াল’ ছিলনা। ছিল ঝিরি-ঝিরি।

বৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য এক সাইডে কোন কিছুর আড়ালে যাওয়ার যে চিন্তা মাথায় আসে নাই, তা নয়। কিন্তু, আমার অনাগত বন্ধুটিও যেখানে মেয়ে হয়ে বৃষ্টির মধ্যে থাকতে পারছে, আমি কাপুরুষের মত কোন ছাউনির আড়ালে যাই কেমন করে? আর ফিলিস্তিনের মানুষেরা যদি বোমাবর্ষণ সহ্য করতে পারে, তবে আমরা কেন এই সামান্য বৃষ্টিবর্ষণ সহ্য করতে পারবোনা?

বৃষ্টির মধ্যেই সমাবেশ চলছিল। আমার 'অনাগত বন্ধুটি' ছিল সেটির সঞ্চালক। সমাবেশে আমরা যারা এসেছিলাম, তারা শাহবাগের রাস্তায় বসে অবস্থান নিয়েছিলাম। আমি ছিলাম দ্বিতীয় সারিতে বসা। সামনের সারিতে বসা ছিল মূল বক্তারা আর একটি বিশেষ আন্দোলনের নেতৃত্বস্থানীয় কয়েকজন। আর সঞ্চালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছিল বলে ওকে আমাদের সামনেই ডানদিকে দাঁড়িয়ে থেকে সেটা করতে হচ্ছিল।

যাই হোক, ওকে দেখলেই আমার মনটা খুশি হয়ে যায়। আমি ওর দিকে তাকিয়ে ছিলাম। ও দেখলাম বিষয়টা খেয়াল করলো। দুষ্টুমি করে আমি মাঝে-মাঝেই ওর দিকে তাকিয়ে ছিলাম। দেখলাম, সে-ও এটার প্রতি-উত্তর দিয়ে যাচ্ছিল – মাঝে মাঝেই আমার সাথে দৃষ্টি বিনিময় করে।

সমাবেশ এগিয়ে চলছিল। একসময় ও আমার দিকে তাকাতেই আমি নিজের মনেই ঠোঁট নেড়ে বিরিবিড় করে বলছিলাম, “ এই মেয়ে, তুমি ফেসবুকে আমার মেসেজের রিপ্লাই দেওনা কেন? সেলিব্রেটি হয়ে গেছ, না?”

আমি যে ওর দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে কিছু বলেছি, ও সেটা বুঝতে পারলো। তখন ও একটা দারুন মজার কাজ করে বসলো। ও সামনের সারিতে বসা সেই সমাবেশের প্রধান সমন্বয়কারী ভাইয়াকে বিষয়টা জানালো এবং আমার দিকে হাত দিয়ে ইশারা করে কি জানি বললো। (ঐ ভাই আবার নিজেও একজন সেলিব্রিটি। কিছুদিন আগে তার ফেসবুক পেজও ফেসবুক কতৃক ভেরিফায়েড হয়েছে) ঐ ভাইও পিছন ফিরে পেছনের সারিতে বসা আমার দিকে তাকালো।

আমিতো তখন লজ্জায় আর টেনশনে আর কোনকিছু করার নেই দেখে মুখে একটা হাসি ফুটিয়ে মাথা নিচু করে বসে থাকলাম।

আসলে কি বলবো? ওর এই কাজগুলোই আমার অনেক ভালো লাগে। ওর জায়গায় অন্য কোন মেয়ে হলে হয়তো, ওর প্রতি আমার এই দুষ্টুমিগুলোকে মোটেই পাত্তা দিতনা। আমি ওর দিকে তাকালেই হয়তো চোখে-মুখে একটা বিরক্তির ভাব নিয়ে অন্য দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে রাখতো । আর সেখানে ওতো একজন সেলিব্রিটি। আমার মত একটা ভোকচোদ পাবলিককে পাত্তা না দিয়ে একদম ড্যাম কেয়ার ভাব দেখানোটাই ছিল ওর জন্য স্বাভাবিক।

ও এগুলো না করে যে পজিটিভ আর রহস্যময় প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, সেটাই আমার কাছে অনেক ভালো লেগেছে। অনেক মজার লেগেছে! বুঝলাম, ও আসলে বিন্দুমাত্র নিজেকে সেলিব্রিটি ভাবেনা।

এখানেই শেষ নয়! একসময় বৃষ্টি থেমে গেল। সমাবেশের শেষের দিকে আমাদের আরেকবার দৃষ্টি বিনিময় হল। যেন বৃষ্টিতে ভেজা দুটো কাক পরস্পরকে তাকিয়ে দেখছিল। আমি ওর দিকে সটান তাকিয়ে আছি, তো ও-ও আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো। ভেবেছিলাম ও একটু পরেই দৃষ্টি সরিয়ে নেবে। কিন্তু, দেখলাম ও আর চোখ সরায় না। যেন আমার সাথে চোখে চোখে তাকিয়ে থাকার প্রতিযোগিতায় নেমেছে। আমি তখন বাধ্য হয়ে চোখ সরিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলাম।

আমার কাছে এটাই খুব ভালো লেগেছে যে, ও একজন সেলিব্রিটি হয়েও একটা সাধারণ মেয়ের মতই আচরণ করেছে আমার সাথে – আমার মত একজন ‘প্রায় অপরিচিত’ ‘ভাদাইমা’র সাথে।

(২)

যারা আমার 'চাইছি তোমার বন্ধুতা’র প্রথম অংশটি পড়েছেন (চাইছি তোমার বন্ধুতা! http://istishon.com/node/8848 ) , তারা তো জেনেই গেছেন যে ওর প্রতি আমার ফিলিংসটা জাস্ট একজন বন্ধুর প্রতি আরেকজন বন্ধুর ফিলিংসের চেয়ে বেশি কিছুনা। ওর সাথে ঘনঘন চোখাচোখি করার উদ্দেশ্য ছিল শুধু জাস্ট দুষ্টুমির মাধ্যমে ওর নজরে আসার জন্য।

ওর একজন ভক্ত হিসেবে বিভিন্ন পেপারে ছাপা হওয়া কিছু ছবি আমি কালেকশনে রেখে দিয়েছি। তার মধ্যে ওর হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকা ছবিও আছে। ওই ছবিটা দেখলে আমার মনে হয়, আমার ছোট একটা বোনই যেন অসুস্থ হয়ে শুয়ে আছে।

আর আমি আমার জীবনে সত্যিকার অর্থে তেমন কোন মেয়েকে সত্যিকার বন্ধু হিসেবে পাইনি। যেসব মেয়ের সাথে একটু অন্তরঙ্গতা হয়েছিল, তারা বেশিরভাগই দেখেছি নারী-পুরুষের মধ্যে যে নিস্পাপ একটা বন্ধুত্ব হতে পারে, সেটা বুঝতে চাইতোনা। আমি তদেরকে যতই ইনোসেন্টলি দেখার চেষ্টা করতাম, তারা সেরকম ছিলনা এবং আমার অনুভূতিকে তারা বুঝতোও না।

তাই, এই জায়গায় আমার একটা অভাববোধ সবসময় ছিল। এখনো আছে। তাইতো, আমার এই ‘অনাগত বন্ধু’টির সাথে এখনো ফরমালি পরিচয় না হওয়ার পরও আমার মন বলে, ও হয়তো আমার সেই অভাবের জায়গাটা পূরণ করতে পারবে।

আর যে একটা ভালো বন্ধু পেল, সে তো অনেক কিছুই পেল, তাই না?

0 Shares

৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ