সোনেলা দিগন্তে জলসিড়ির ধারে

  1. মাহবুবুল আলম //

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম যোদ্ধা, বামধারার রাজনীতির একনিষ্ঠ সমর্থক জনাব কামাল লোহানী চলে গেলেন আমাদের ছেড়ে।কামাল লোহানী এদেশের সাংবাদিকতা, সাংস্কৃতিক অঙ্গনে শুধু একটি নাম নয়, একটি ইতিহাস। চির বিদ্রোহের অধ্যায়। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ; স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আন্দোলন- সর্বক্ষেত্রে সর্বাগ্রে থাকা মানুষ।কামাল লোহানী সাংবাদিকতা দিয়ে পেশাজীবন শুরু করলেও নানা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে যুক্ত রেখেছেন সবসময়। এদেশের প্রতিটি রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় কামাল লোহানী স্বাধীন বাংলা বেতারের সংবাদ বিভাগের দায়িত্ব পালন করেছেন।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের বার্তা বিভাগেরও প্রধান ছিলেন কামাল লোহানী। মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের প্রথম খবরটি শোনা গিয়েছিল কামার লোহানীর কন্ঠ থেকে “আমরা বিজয় অর্জন করেছি। পাকিস্তান সেনাবাহিনী আমাদের মিত্র বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছে।”খুব সংক্ষিপ্তভাবে এক কথায় বলেছিলেন কামাল লোহানী, তারপর নিজেরা মেতেছিলেন বিজয় উদযাপনে, সেই সঙ্গে গোটা দেশও। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে ধারাবিবরণী দিয়েছিলেন কামাল লোহানী। ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে বঙ্গবন্ধুর কলকাতা সফর উপলক্ষে দমদম বিমানবন্দরেও ধারাবিবরণীও তিনি দিয়েছিলেন।

বাংলাদেশের শিল্পকলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক কামাল লোহানী কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনীতি, সংস্কৃতি ও সাংবাদিকতা জগতে সক্রিয় ছিলেন। বাঙ্গালীর দীর্ঘ স্বাধিকার আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা অর্জনের পথ ধরে স্বাধীন বাংলাদেশের চার দশকে -রাজনীতি, সংস্কৃতি ও সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম যে অসামান্য ভূমিকা রেখে গেছেন তা সবসময়ই নতুন প্রজন্মকে উজ্জীবিত করবে বলেই মনে করেন বিশ্লেষকরা।

এ পর্যায়ে কামাল লোহানীর জীবনের ওপর সংক্ষিপ্ত আলোতপাত করা হলো: কামাল লোহানী হিসেবে পরিচিত হলেও, তার পুরো নাম কিন্তু আবু নঈম মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল খান লোহানী। ১৯৩৪ সালের ২৬ জুন সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া থানার খান সনতলা গ্রামে তার জন্ম। বাবা আবু ইউসুফ মোহাম্মদ মুসা খান লোহানী। মা রোকেয়া খান লোহানী। মাকে হারান মাত্র সাত বছর বয়সে। এরপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকার মধ্যে কলকাতার শিশু বিদ্যাপীঠে তার শিক্ষাজীবন শুরু হয়। দেশভাগের পর ১৯৪৮ সালে চলে আসেন পাবনায়। পাবনা জিলা স্কুল থেকে ভাষা আন্দোলনের বছরে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন। এ সময় তিনি যুক্ত হন রাজনীতিতে। যোগ দেন পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টিতে। পাবনায় রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে গড়ে উঠা আন্দোলন যোগ দেন। এরই মধ্যে পাবনা অ্যাডওয়ার্ড কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পরই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ইতি টানেন তিনি। যুক্ত হন রাজনীতি, সাংবাদিকতা ও সংস্কৃতিচর্চায়।

১৯৫৩ সালে পাবনার তৎকালীন জিন্নাহ্ পার্কে (বর্তমান স্টেডিয়াম) মুসলিম লীগ কাউন্সিলে নুরুল আমিনের আগমনের প্রতিবাদ করায় প্রথম গ্রেপ্তার হন তিনি। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের পক্ষে কাজ করায় আবারও গ্রেফতার হন তিনি।১৯৫৫ সালের জুলাই মাসে জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পরে পারিবারিক মতবিরোধ হওয়ায় ঢাকা চলে আসেন কামাল লোহানী। চাচাতো ভাই ফজলে লোহানীর সহযোগিতায় ওই বছরই দৈনিক মিল্লাত পত্রিকা দিয়ে কর্মজীবন শুরু হয় তার। একই বছর তিনি ন্যাপে যোগ দিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯৫৮ সালে সামরিক আইন জারি হওয়ার পর আত্মগোপনে চলে যান তিনি।ঢাকার আসার পরেই নাচের প্রতি আগ্রহ জন্মে কামাল লোহানীর। বুলবুল ললিতকলা একাডেমির হয়ে কামাল লোহানী তার নৃত্যগুরু জি এ মান্নানের ‘নক্সী কাঁথার মাঠ’ প্রযোজনায় অংশ নেন তিনি। পাকিস্তান সাংস্কৃতিক দলের হয়ে মধ্যপ্রাচ্যসহ বেশ কয়েকটি দেশে তিনি যান। এরই ফাঁকে তিনি চাকরি করেন দৈনিক ‘আজাদ’, দৈনিক ‘সংবাদ’, ‘পূর্বদেশে’।

১৯৬০ সালে চাচাতো বোন সৈয়দা দীপ্তি রানীকে বিয়ে করেন কামাল লোহানী৷ ২০০৭ সালের ২৪ নভেম্বরে তার দীর্ঘ সংগ্রামী জীবনের অনুপ্রেরণাদাত্রী স্ত্রী দীপ্তি লোহানীর প্রয়াণে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন কামাল লোহানী। এ দম্পতির এক ছেলে ও দুই মেয়ে সাগর লোহানী, বন্যা লোহানী ও ঊর্মি লোহানী। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী পালনে সরকারি নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে তার ছিল দৃঢ় ভূমিকা। শতবর্ষ পালনের আয়োজনে ‘শ্যামা’ নৃত্যনাট্যে তিনি বজ্রসেনের ভূমিকায় অংশ নিয়ে প্রশংসিত হন৷ ১৯৬২ সালে স্বল্পকাল কারাবাসের পর কামাল লোহানী ‘ছায়ানট’র সাধারণ সম্পাদক হন৷ সাড়ে চার বছর এই দায়িত্ব পালন করার পর ১৯৬৭ সালে গড়ে তোলেন ‘ক্রান্তি’ নামে সাংস্কৃতিক সংগঠন।
১৯৭৭ সালে রাজশাহী থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক বার্তা’র নির্বাহী সম্পাদক হন। ১৯৭৮ সালে তাকে সম্পাদক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ১৯৮১ সালে তৎকালীন তথ্যমন্ত্রীর সঙ্গে মতবিরোধ হলে ‘দৈনিক বার্তা’ ছেড়ে বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটে (পিআইবি) যোগ দেন। প্রকাশনা পরিচালক ও ‘ডেপথনিউজ বাংলাদেশ’ এর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করার কয়েক মাস পরেই তিনি সেখানকার সহযোগী সম্পাদক পদে নিযুক্ত হন। ১৯৯১ সালে তিনি প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৬ মাসের মাথায় বিএনপি সরকারের সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে মতবিরোধ হওয়ায় তিনি পিআইবিতে ফিরে আসেন। ২০০৯ সালে দুই বছরের জন্য আবার শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন৷ বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সভাপতি ছিলেন চার বছর৷ তিনি ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন৷ এর বাইরেও তিনি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সদস্য৷

ছায়ানটের সাথে গভীরভাবে জড়িত ছিলেন। একনিষ্ঠ দেশপ্রেম ছিল বলেই ঘাতক দালাল ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আন্দোলন, স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ও গণতন্ত্রের জন্যও কামাল লোহানী ভূমিকা রাখতে পেরেছিলেন এবং এ ধরণের মানুষ ছিলো বলেই বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলন কখনো পথ হারায়নি। ব্যক্তিগত জীবনে কামাল লোহানী ছিলেন একজন সৎ ও দেশপ্রেমিক মানুষ। অন্যায়ের সাথে আপোষ করননি বলেই জীবনের বিভিন্ন সময়ে চাকুরী হারাতে হয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরেই বার্ধক্যজনিত নানা রোগে তিনি ভুগছিলেন এবং ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন। ২০ জুন ২০২০ শনিবার সকালে ঢাকার শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রয়াত হয়েছেন কামাল লোহানী। ’৫২-র ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ— সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার— প্রতিটি আন্দোলনের প্রথম সারির এই যোদ্ধার মৃত্যুতে বাংলাদেশে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। ৮৭ বছর বয়সি কামাল লোহানী বার্ধক্যজনিত নানা সমস্যার পাশাপাশি করোনায় আক্রান্ত হয়ে প্রয়াত হলেন।

কামাল লোহানীর লেখা বইগুলো মধ্যে রয়েছে- ‘আমরা হারবো না’, ‘সত্যি কথা বলতে কী’, ‘যেন ভুলে না যাই’,, ‘মুক্তিসংগ্রামে স্বাধীন বাংলা বেতার’, ‘রাজনীতি মুক্তিযুদ্ধ স্বাধীন বাংলা বেতার’, ‘মুক্তিযুদ্ধ আমার অহংকার’, ‘এ দেশ আমার গর্ব’, ‘আমাদের সংস্কৃতি ও সংগ্রাম’, ‘লড়াইয়ের গান’, ‘সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও নৃত্যশিল্পের বিস্তার’, ‘দ্রোহে প্রেমে কবিতার মত’ এবং কবিতার বই ‘শব্দের বিদ্রোহ’৷

কামাল লোহানী ২০১৫ সালে সাংবাদিকতায় একুশে পদক লাভ করেন৷ এছাড়াও তিনি কলকাতা পুরসভার দ্বিশতবর্ষ সম্মাননা, প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক সম্মাননা, রাজশাহী লেখক সংঘ সম্মাননা, ক্রান্তি স্মারক, ঋষিজ সম্মাননা ও স্মারক, জাহানারা ইমাম পদকসহ বহু পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন৷

প্রয়াত কামাল লোহানীর সাথে ব্যক্তিগত পরিচয়ের বিষয়ে আলোকপাত করেই লেখায় ইতি টানবো। ২০০৮ সালে একুশে গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত আমার উপন্যাস-“কেবলই ভেঙে যায়” এবং কাব্যগ্রন্থ-“নির্বাচিত প্রেম প্রণয়ের কাব্য” গ্রন্থ দুইটির প্রকাশনা উৎসব মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর সেগুন বাগিচায় অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিশেষ অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন সর্বজনাব -সেক্টর কমান্ডার আবু ওসমান চৌধুরী, অর্থনীতিবিদ আতিউর রহমান, বিটিভির ডিজি আবু বকর সিদ্দিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ অনুষদের অধ্যাপক কবি মোহাম্মদ সামাদ, ঢাকা বিশ্বদ্যিালয়ের অধ্যাপক বাবু নিরঞ্জন অধিকারী, কবি ও শিশুসাহিত্যিক আসলাম সানী এবং আবৃত্তিজন শাহদাৎ নিপু আর প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জনাব কামাল লোহানী। সেই দিন একই মঞ্চে বসে অনেক কিছু আলাপ হলো। আমার বই দুটি নিয়ে অনেকক্ষণ অলোচনা করলেন। সদালাপি বন্ধু বৎসল এমন মানুষ জীবনে আমি কমই দেখেছি। এর পর শিল্পকলার ডিজি থাকা অবস্থায় দুএকবার ওনার অফিসে গেছি। যতবারই গেছে শিল্প সাহিত্যের বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলেছেন, কখনো চা না খাইয়ে বিদায় করেননি।

সেই মানুষটি আজ আর আমাদের মাঝে নেই। তাই তাকে নিয়ে কিছু একটা লেখা আমার দায়বদ্ধতার পর্যায়েই পড়ে বলেই কলম ধরা, যাতে বর্তমান প্রজন্ম তাঁকে জানতে পারে। আজ কেবলই মনে হয়, কামাল লোহানীর মহাপ্রয়ানের মধ্য দিয়ে আর এক নক্ষত্রের পতন হলো। তিনি জীবিতকালে নীতি ও আদর্শে অবিচল থেকে সবসময় দেশ ও মানুষের জন্য কাজ করে গেছেন তিনি। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজের অপূরনীয় ক্ষতি হয়ে গেল। তার মৃত্যুতে জাতি হারালো একজন সুনাগরিককে আর সাংস্কৃতিক জগৎ হারালো একজন প্রিয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বকে।

৪১৮জন ২২৩জন
0 Shares

২৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য