চর্বি খেলে চর্বি কমে।

শামীম চৌধুরী ১৩ এপ্রিল ২০২০, সোমবার, ০৭:০২:৪৮অপরাহ্ন চিকিৎসা ৩০ মন্তব্য
“স্বাস্থ্য সকল সুখের মূল”
এই প্রবাদটি আমরা ছোটকাল থেকেই শুনে আসছি। তাই আমাদের শরীর ঠিক রাখার জন্য পুষ্টিকর খাবার দরকার । অতিরিক্ত পুষ্টিকর খাবার যেমন শরীরে বিভিন্ন রোগের কারন হয়। খাবারে পুষ্টির পরিমান কম হলে ঠিক পুষ্টিহীনতায় ভুগতে হয়। আবার আমরা মুখরোচক খাবার পেলে পেট পুরে প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাবার খাই।
তাই খাবারের আরেক নাম “খানা”। খেতেও বলেছে আবার নাও করেছে। অর্থাৎ খা না..!! খাবারের উপর আমাদের নিয়ন্ত্রন না থাকার জন্য আমরা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে ডাক্তারের শরণাপন্ন হই। ডাক্তার বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা করে জানিয়ে দেন আমাদের শরীরে রোগের বাসা বাঁধার কাহিনী। তখন রোগের উপর নির্ভর করে পুষ্টিকর খাবারগুলি আমাদের খাদ্যা তালিকা থেকে বাদ দেই। তাই অনেক সময় “খাদ্য সকল অসুখের মূল” হতে পারে।
গবেষকরা বিজ্ঞান থেকে আধুনিক একটি খাবারের তালিকা বৈশ্বিক ব্যাপী প্রকাশ করেছেন। যার নামকরন হয়েছে “কিটো ডায়েট”।
 
জেনে নেই “কিটো ডায়েট” কি?
———————————————-
কিটো ডায়েট হলো আমাদের দৈনন্দিন খাবারে ফ্যাট বা চর্বি, প্রোটিন ও কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা জাতীয় খাবারের মিশ্রন। খাদ্যের এই তালিকা দেখার পর আমরা ভাবতেই পারি প্রতিদিন যে খাবার খাচ্ছি তাতে এ সব উপাদানই আছে। তবে কেন কিটো নাম হলো?
এমন প্রশ্নের উত্তরে বলা হয়েছে যে, আমাদের খাবারে কোনটার পরিমান কতটুকু থাকবে তা সুনির্দিষ্ট পরিমাপে নেওয়া।
তাহলে এবার জেনে নেই আমাদের খাবারে চর্বি,প্রোটিন ও শর্করার পরিমান কতটুকু রাখতে হবে। রোজ চর্বি খেতে হবে ৭৫% প্রোটিন ১৫% এবং শর্করা ১০% ভাগ। সাথে ভিটামিন এ,ডি ও সি। এবার অবশ্যই চোখ ছানা বড়া হয়ে গেল। আর মনে মনে ভাবছেন চৌধুরী সাহেব এ কেমন খাবারের তালিকা দিলেন। হ্যাঁ ভাই/বোনরা সুস্থ্য এবং সকল রোগ থেকে মুক্ত থাকতে হলে আমাদের এই তালিকানুসারে খাবার খেতে হবে।
যারা ইতিমধ্যে হৃদরোগ,উচ্চ রক্তচাপ (কোন অবস্থাতে উচ্চ রক্তচাপ ঔষধেও নিয়ন্ত্রন রাখা যায় না) কিডনী জনিত রোগ, ও বহুমূত্র বা নিয়ন্ত্রনহীন ডায়বেটিকস রোগে ভুগছেন তারা এই কিটো ডায়েট অনুসরন করতে পারবেন না। তারা অবশ্যই ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে এই খাদ্যতালিকায় আসবেন। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া এই খাদ্য আমাদের জীবনাবসানের ঝুঁকিতে ফেলবে। আর যারা হৃদরোগ ছাড়া নিয়ন্ত্রিত ডায়বেটিকস ও রক্তচাপে ভুগছেন তারা এই খাদ্যাভ্যাসে উপরোক্ত রোগ গুলি ঔষধ ছাড়াই নিয়ন্ত্রন রাখতে পারবেন। যাহা প্রমানিত।
 
কোন কোন খাবারে এই উপাদানগুলি পাবেন?
——————————————————–
ডিম, সামুদ্রিক ও তৈলাক্ত মাছ, দেশী তৈলাক্ত ও সব ধরনের মাছ, শুটকি মাছ, মাংস,(গরু,খাসী বা মুরগী) শাক-সব্জি, বাটার, মাখন, ঘি, নারিকেল তেল, এক্ট্রা ভার্জিন অলিভ ওয়েল, অর্গানিক সরিষার তেল, পনির, স্ট্রবেরী, আমড়া,লেবু,তেঁতুল, বেবী কর্ণ (সব্জি) ,শসা, খিরা ও টমেটো। সব ধরনের মসলা। আদা,রসুন, পিয়াজ, কাঁচামরিচ, শুকনা মরিচ, রং চা বা কফি বা গ্রীন টি। তবে লবন খেতে হবে পিংক সল্ট। বাজারের প্রচলিত লবন রক্তচাপ বাড়িয়ে দেবে। দেশী চিনা বাদাম,কাজুবাদাম, কাঠবাদাম পেস্তা ও আখরোট।
এসব খাবার থেকেই চর্বি ৭৫% প্রোটিন ১৫% এবং শর্করা ১০% ভাগ নিতে হবে। মোট কথা উপরের খাবারগুলিই আমাদের দেহে চর্বি প্রোটিন ও শর্করার যোগান দিবে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে জীবন থেকে যে যে খাবার বাদ দিয়েছেন তা সব খেতে পারবেন কিটো ডায়েটে। অপরিমিত ও নিয়ন্ত্রনহীন খাবার খেয়ে যারা ওজন বাড়িয়ে মোটা হয়েছেন তাদের জন্য কিটো ডায়েট অত্যন্ত জরুরী। যদি সুস্থ্য ভাবে বাঁচতে চান তবে স্থূলাকার বা মোটা, নিয়ন্ত্রিত ডায়বেটিকস ও রক্তচাপের রোগীরা শুরু করতে পারেন। অল্প দিনেই কাংখিত ফল পাবেন। এখন প্রশ্ন আসতে পারে কি ভাবে খাবেন? আমি তিন বেলা খাবার তালিকায় দিয়ে দিবো।
 
কোন কোন খাবার খাবো না?
————————————-
যে কোন চাউল বা চাউল জাতীয় খাবার। যেমন ভাত,পোলাও,বিরিয়ানী, আটা ও ময়দা বা আটা, ময়দার তৈরীর যে কোন খাবার, যে কোন ডাল ও ডাল জাতীয় খাবার, পাস্তা, নুডুলস,সব ধরনে বিস্কুট, বেসন, সুজি ও সুজি দিয়ে তৈরী খাবার, দুধ ও দুধ জাতীয় খাবার, ছানার মিষ্টি, চিনি ও চিনি দিয়ে তৈরী খাবার, দুধ চা, দুধ কফি, গোল আলু, মিষ্টি আলু, মিষ্টি কুমড়া,মাটির নীচের সব্জি যেমন কচু,ওল কচু, গাজর, মূলা, যে কোন ধরনের মিষ্টি জাতীয় ফল। (তবে সব ধরনের টক জাতীয় ফল খেতে পারবেন।) সয়াবিন তৈল,অলিভ ওয়েল, ধানের কুঁড়া থেকে তৈরী তৈল, ডালডা, পাম ওয়েল ইত্যাদি। এ খাবারগুলিতে উচ্চ শর্করা থাকায় আপনার হজমে অনেক সময় নেয়। তার উপর আপনি খাবারের উপর খাবার গ্রহন করেন। যাতে আপনার মেটোবলিজম বুষ্ট (মল) হয় অল্প অল্প ও বার বার। যা আপনার পেটে গ্যাস বাড়িয়ে দেয়। আর শর্করা খাবারগুলি আপনার রক্তে গ্লুকোজ হয়ে মিশে যায়। চর্বি বা প্রোটিন জাতীয় খাবার হজম বা বার্ণ না হওয়ায় এগুলি কোলেষ্টরেল বাড়িয়ে দিয়ে হার্টে চর্বি হয়ে জমতে শুরু করে এবং আপনার ওজন দ্রুত বাড়তে থাকে। তাই নিজেদের স্বার্থের জন্য এই খাবারগুলি বর্জন করতে হবে।
 
তিন বেলা খাবারের তালিকাঃ
———————————-
সকালের নাস্তাঃ
যে কোন ধরনের সব্জি সরিষার তৈল বা মাখন বা বাটার বা ঘি বা এক্ট্রা ভার্জিন অলিভ ওয়েল দিয়ে রান্না করবেন। সাথে দুটি ডিম পোঁচ বা ভাজি বা সিদ্ধ যে ভাবে আপনার পছন্দ মতন (তা অবশ্যই বাটার বা ঘি দিয়ে ভাঁজতে বা পোঁচ করতে হবে।) করে নিবেন। কারন এখান থেকেইা আপনাকে সারাদিনের ৭৫% ভাগ ফ্যাটের একটা অংশ নিতে হবে। সাথে সালাদ খেতে হবে। এখান থেকেই আপনি সারাদিনের শর্করা,ফ্যাট ও প্রোটিনের একটা অংশ পাবেন। সকাল ৭টার মধ্যে নাস্তা করতে পারলে ভালো। যদি ১০/১১টায় নাস্তা সেরে নেন তবে দুপুরের খাবার খাবেন তিনটার পর। নইলে দুপুরের খাবার ১:৩০ মধ্যে সেরে নিবেন।
 
দুপুরের খাবারঃ
——————-
সব্জি এক বাটি, মাছ বা মাংস (গরু খাসী বা মুরগী) ছোট হলে দুই পিস। এখানে মাছ বা মুরগীর মাসং গ্রীল করে খেলে তাড়াতাড়ি ওজন কমাতে সাহায্য করবে। সালাদ ও সাথে যে কোন একটি ফল বা লবন ছাড়া পনির।
 
বিকালের নাস্তাঃ
——————–
চিনাবাদাম,কাঠবাদাম,কাজুবাদাম ও পেস্তা পরিমান মতন নিয়ে বাটার বা ঘি দিয়ে ভেজে নিবেন। সাথে পিয়াজ কুচিকুচি করে কেটে কাঁচামরিচ টমেটু ও লেবু দিয়ে সালাদের মতন করে খেতে পারেন। সাথে চিকেন সসেস বা চিকেন কিমা থাকলে স্বাদটা ভালো লাগবে। রং চা বা লিকার কফি এক কাপ খেতে পারবেন। আপনি সাতদিনের ম্যানুটা ঠিক করে নিবেন। এক খাবার রোজ রোজ তিন বেলা ভালো লাগবে না। একদিন মুরগীর গ্রীল, ফ্রাই গরুর মাংসের কোপ্তা বা চিকেন সসেসে বা বেঙ্গল মিটের রেডিমেড অনেক খাবার আছে সেগুলিও বিকেলে নাস্তা হিসেবে খেতে পারেন ।
 
 
রাতের খাবারঃ
—————–
রাতের খাবার সন্ধ্যা ৭-৮টার মধ্যে খেতে হবে। কারন ঘুমানোর ৪ ঘন্টা আগে আপনাকে রাতের খাবার সেরে নিতে হবে। নইলে ওজন কমার চেয়ে বেড়ে যাাবর বেড়ে যাবার সম্ভাবনা থাকবে। কমপক্ষে আট ঘন্টা ঘুমাতে হবে। তাই রাত ১০-১২টার মধ্যে ঘুমানোর অভ্যেস করতে হবে।
রাতের খাবার দুপুরের খাবারের অনুরূপ। আপনি আপনার স্বাদ অনুযায়ী খাবারগুলি সাজিয়ে নিবেন।
সবচেয়ে জরুরী হচ্ছে এই খাবার শুরু করলে আপনাকে প্রচুর পানি পান করতে হবে। কম করে হলেও ৪-৫লিটার পানি রোজ আপনাকে নিতে হবে। কারন উচ্চমাত্রার শর্করা খাবার পরিহার করার জন্য আপনার দেহেরে ত্বক ঢিলে হবার সম্ভাবনা থাকবে। সাথে অতিরিক্ত মেদ কমতে শুরু করলে আপনার পেটের চামড়ায় ভাঁজ পড়বে। সেটা পূরন করার জন্যই ৪/৫ লিটার পানির দরকার। এর ব্যাতিক্রম হলে অসুবিধার সম্মুখীন হবেন। কিডনিতে সমস্যা হবে। তলপেটে ডান দিকে ব্যাথা শুরু হবে। সুতারাং পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে।
 
আমি গত এক মাসে এই কিটো ডায়েটে ১২কেজি ওজন কমিয়েছি।ডায়বেটিকস বিনা ঔষধে খাবার আগে ও পড়ে ৫:১/ ৫;৮ । আপনি যদি ওজন কমাতে আগ্রহী হোন তবে চেষ্টা করে দেখেতে পারেন। ফলাফল পাবেনই পাবেন। তবে কিটো শুরু করার আগে ইউটিউব চ্যানেলে প্রচুর ভিডিও দেয়া আছে সেটা একবার দেখে নিবেন। তাতে আপনার খাবারের ম্যানু ও রন্ধন প্রনালী জানা হবে।
 
সবাই ভালো থাকুন।
ঘরে থাকুন, ঘরে থাকুন এবং ঘরে থাকুন।
২৬৩জন ২জন
40 Shares

৩০টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য