ঘূণে ধরা সমাজের ফুলীঁরা-০৩

আজ ফুলীঁ খুব সকাল সকাল উঠে বাহিরে বের হলেন চাকরী খোজাঁর ধান্দায়।মেয়েদের চাকরী সাধারনতঃ এখন তেমন কোন সমস্যা না।গার্মেন্টস শিল্পের প্রসারে তা এখন সকাল সন্ধ্যা মাত্র।প্রথমে সে চেষ্টা করে একটি স্হানীয় গার্মেন্টস ফেক্টরীতে।প্রথম চেষ্টাতেই কাজ হয়ে যায় কিন্তু বেতন জীবন ধারনের জন্য তুলনামুলক হারে অনেক কম তবুও সে সেখানেই যোগ দেন।শুরু হয় ফুলীর কর্ম জীবন।এখানে প্রায় ছয় সাত মাস যাবৎ কাজ করছে একদিন হঠাৎ জুট সন্ত্রাসীদের ঝগড়ার মাঝে পড়ে যায় ফুলীঁ।

দুপুরে লাঞ্চের এক ঘন্টা বিরতী।ফুলীঁ বাসা থেকে আনা খাবার টিফিন বাটি দিয়ে এনে নিদিষ্ট খাবারের কোন রুম না থাকায় সে সিড়ির এক পাশে বসে লাঞ্চ করছে এমন সময় হঠাৎ দু’জন লোক তার থালার উপর পা দিয়ে দৌড়ে পালালো ভাত গুলো ছিটকে সারা সিড়িতে ছড়িয়ে পড়ে ঠিক সেই মুহুর্তে পিস্তল হাতে সেই অপরাধ জগতের ছোটন রাজা ছড়ানো ছিটানো ভাতের উপর পা দিয়ে যেতে বিবেকে বাধে সে স্টিল সেখানে দাড়িয়ে যায় চোখঁ পড়ে ফুলীঁর দিকে।ফুলীঁও তাকে চিনে ফেলে।পিস্তলের দিকে তাকিয়ে ফুলীঁ ভয়ে ঝড়োসরো মৃদু কম্পনের সহিত দাড়িয়ে থাকে।

-তুমি ফুলীঁ না?

ফুলীঁ কোন মুখে কথা বলে না শুধু মাথা নাড়িয়ে হ্যা সম্মতি জ্ঞাপন করে।

-এখানে কাজ করো কত দিন?……আরে তুমিতো দেখছি কাপছ,ঘটনা কি?

ফুলীঁ পিস্তলের দিকে তাকি থাকে তা ছোটন বুঝতে পেরে অট্ট্রো হাসিতে ফেটে পড়ে।

-এটা….এটা হলো….যাক পরে তোমাদের হাউসে যাবো এখন তাড়া আছে।

বলে ছোটন দৌড়ায়ে পালাল শত্রুর পিছু।ফুলীঁর আর খাওয়া হলোনা ।তার সেকসনে এসে সে জানতে পারে আজ গেঞ্জামের কারনে মালিক ছুটি দিয়ে দিয়েছে।ফুলীঁ বাসায় চলে আসে।গার্মেন্টসে পুলিশ এসে ভরে যায়।ছোটনের গ্রুপ আগ থেকেই এখান থেকে জুট নামায় আজ অন্য এক গ্রুপ চেয়েছিল জুট নামাতে এ নিয়ে দন্ডে দু’পক্ষে অবশেষে গুলাগুলি।ঘটনার শেষে পুলিশ এসে মালিকের গরম ভাতে পানি ঢেলে বেশ কিছু টাকা হাতিয়ে নিল।মালিক পক্ষ ফ্যাক্টরী নিরাপত্তার অজুহাতে কিছু দিনের জন্য বন্ধ ঘোষনা করেন।

ফুলীঁ তার রুমে চুপচাপ বসে আছে ।খালা মানে বাড়ীর সর্দারনী ফুলীঁর নিরবতা দেখে অবাক হন।

-কি লো তোর কি জামাই মরছে নাকি,এভাবে গালে হাত দিয়া বইসা আছোত।

-না খালা ঐ…যেখানে চাকরীটা করতাম সেটা বন্ধ হয়ে গেছে।গতকাল ছোটন ভাইয়ের সাথে আরেক মাস্তানের ঝগড়ায় মালিক মেইলে তালা লাগাইছে।

-কছ্ কি ছোটনরে দেখলি কি ভাবে?

-তার হাতে বন্দুক আছিল সিড়িতে খাবারের সময় অন্য একজনরে তাড়া করছিল।

-তয় কাম ছাড়ছে ,দেখিস ছোটন তোকে আবার অন্য কোথাও লাগিয়ে দিবে ,তুই দেখে নিস ও আসবে।

ছোটনের কথা বলার সাথে সাথে ছোটন এসে হাজির।

-ও…তো এসে গেছে নাগর।

ছোটন ঘরে ঢুকার সাথে সাথে ফুলীঁ আড়ালে লুকিয়ে পড়ে।ছোটন খালার সাথে রসিকতা করে প্রায় সময় খালাও কম যায় না।

-কি গো নাগর কপাল পোড়া মেয়েটার সর্বনাশ করলে কেনো?

ছোটন বুঝতে অসুবিদে হয়নি যে মেয়েটি সেদিনের ঘটনা খালাকে বলেছে।

-ফুলীঁকে আসতে বলো খালা ওর সাথে কথা আছে।

খালা ফুলীঁকে কয়েকটি ডাক দেবার পর ফুলীঁ ছোটনের সামনে এসে মাথা নীচু করে দাড়িয়ে থাকে।ছোটন একটি কাগজের টুকরো হাতে দিয়ে বলে।

-এখনে ঠিকানা এবং আমার নাম লিখা আছে তুমি ঐ ঠিকানায় গিয়ে ফ্যাক্টরীর জি,এম কে বলবে আমি পাঠিয়েছি বাস্ আর কিছু বলতে হবে না জি এম সাব তোমাকে কাজ বুঝিয়ে দেবে…..ঠিক আছে?ঠিক আছে আজ তাহলে যাই….

-কেনো গো নাগর আজ এত তাড়া কেনো?তুমিতো আবার মেয়ে টেয়ে ভোগে পছন্দ করো না তয় কোক এনেছি খেয়ে যাবে।

ফুলীঁ ছোটনকে কোক আপ্যায়ন করে এরই মধ্যে খালা পাশে অন্য এক খদ্দেরের ঝমেলায় চলে যায়।ছোটন কোক পান করতে করতে চোখে পানি এসে যায়।ফুলীঁ অবাক হয়ে ছোটনকে প্রশ্ন করে।

-ভাইয়া আপনার চোখে পানি!

-কই নাতো এমনিই,…ঐ কোকের ত্যাজে চোখেঁ পানি এসে গেছে।

-আসিরে….বলে ছোটন চোখের পানি মুছতেঁ মুছতে চলে যায় ফুলীঁ অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে ছোটনের দিকে।

পরদিন ফুলীঁ ছোটনের দেয়া ঠিকানায় একটি গার্মেন্টসে কাজ পায় সেখানে সে আড়াই হাজার টাকায় কোয়ালিটিতে চাকরী করে।বেশ কয়দিন ভাল ভাবেই কেটে গেল।এরই মধ্যে এক মাসের অর্ধেক পনের দিনের ওভার টাইম সহ প্রায় দু হাজর টাকা বেতন পায়।এক হাজার টাকা সে দেশের বাড়ীতে মা বাবার জন্য পাঠায় বাকী এক হাজার টকা থেকে কিছু মিষ্টি কিনে বাসায় গিয়ে বাকী সাত শ পুরা টাকাই খালাকে দেয়।

-কি রে বেতন পাইছ?

-হ’খালা।দুই হাজার টাকা পাইছি এক হাজার দেশের বাড়ীতে মা বাবার কাছে পাঠাইছি আর কিছু মিষ্টি কিনেছি।

-বাকী সব টকা আমারে দিলি তুই চলবি কি ভাবে?

-খালা তুমি আছ না!এ শহরে তুমি ছাড়া আমার আর কে আছে বলো?তুমিই আমার মা……বলে ফুলীঁ কেদেঁ দেয়।যখন আমার বিপদ ছিল তখন তুমিই আমারে সাহারা দিছ।তোমাদের এমন উপকার আমি কি দিয়ে শোধ করব বলো?

-ঠিক আছে….ঠিক আছে…আর কাদঁতে হবে না আরে এ সমাজে আমাদের কেউ মানুষ বলে গণ্য করে না সবাই বলে আমরা বেশ্যা,চামড়া বেচে জীবন চালাই…..এ সমাজের কিট আমরা,আমাদের যে একটা মন আছে তা তুই প্রথম আবিস্কার করলি সমাজের আর সব সালারা আমাদের কেবল ভোগের পণ্য ভাবে।তোর সাহস এবং সৎ থাকার উদ্দ্যশ্য দেখে প্রথম থেকেই তোকে আমি অন্য সবার চেয়ে আলাদা ভাবে দেখি।যা এখন থেকে তুই আমার মেয়ে।বলে ফুলীঁকে বুকে জড়িয়ে নেয় খালা।ফুলীঁও নিবির ভাবে খালার বুকে লেগে তার মাতৃত্ত্বের সাধ মিটান।বুকে জড়িয়েই খালা একটি প্রশ্ন করে।

-হ্যা রে ফুলীঁ ছোটনকে তোর কেমন লাগে?ও খুব ভালরে একেবারে এতিম ।ওর সব ঘটনা শুনলে তোরও মায়া এসে যাবে ওর প্রতি।ও হলো জীবন সংগ্রামে লড়ে যাওয়া একজন সৎ প্রতিবাদী মানুষ।

ফুলীঁ খালার বুক থেকে আলগা হয়ে খালাকে কিছু উত্তর না দিয়েই ঘরের ভিতরে গিয়ে খাটে উপর উপুর হয়ে শুয়ে বুক ফুফায়ে কান্না জুড়ে দেয় ।খালা ঠিক বুঝতে পারছেনা ফুলীরঁ আবার কি হলো সে এ কথা বলার পর কাদঁছে কেনো কিছুক্ষন চিন্তা করার পর খালার মাথায় ফুলীঁর অতীতে ঘটে যাওয়া একটি কলঙ্গের ইতিহাস মনে পড়ে যায় সে জন্য হয়তো ফুলীঁ কাদছেঁ।খালা ঘরের ভিতরে ঢুকে ফুলীকেঁ বুঝাতে থাকে।

-দেখ ফুলীঁ..ওটা তোর জীবনের অ্যাকসিডেন্ট।এত অল্প বয়সে তোর জীবনটা বিফলে যাবে আমি তা হতে দিবো না।

ফুলীঁ চোখেরঁ কষ্টের জল মুছতে মুছতে।

-কিন্তু খালা ছোটন ভাইয়া যখন এ সব জানবে তখন সে কি ভাববে আমাকে বলো?

-ছোটনকে আমার চেয়ে তুই বেশী চিনিস না ও অনেক ভালরে…দেখবি ও মেনে নিবে।

-ও মেনে নিলেওতো আমার বিবেক আমাকে ছাড়বে না খালা……।

চলবে….

 

২৩০জন ২৩০জন
0 Shares

১৫টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

️️ 🍂️️ 💝 ️️ 🌟 🌺 💐 💥 🌻 🍄 🌹 💐 ⭐️ 🎉 🎊