ফুলী!একটি নাম, একটি ঘূণে ধরা সমাজের উল্টো পিঠের চিত্র যেখানে মানবতার পরাজয়।বড় বড় অট্ট্রেলিকার কঠিন শিলার ভিতরের চাপা কান্নার সুর যা সূশীলদের অতি সমাজ সেবার কর্ম ফল।সে একা,একটি অন্ধকার ঘরের এক কোণে জানালা দিয়ে বাহিরে ছোৎস্নায় তারাঁ ভরা আকাশের দিকে দীর্ঘক্ষন চেয়ে চেয়ে কি যেন ভাবছে।বয়স আর কত, দশ কি বারো।তার ভাবনা হয়তো,মা বাবা ভাই বোনদের ছেড়ে একা এই কঠিন পাথুরে শহরে দু’বেলা দ’মুঠো খাদ্যের খুজে।মা বাবার সবচেয়ে আদরের সন্তানটি ছিল সে তাইতো বাবা সব সময় তাকে আদুরী বলেও ডাকত আর যারা ভাই বোন আছে তারা আরো অনেক ছোট, কারো বয়স পাচঁ কারো বা ছয়।বাবা গ্রামের বাড়ীতে পরের জমিতে বদলি দুইশ টাকা রোজে কাজ করেন।তার কাজের অবস্হাও তেমন একটা ভাল না ,আজ কাজ পায় তো কাল পায়না।মা গ্রামের এক জমিদার বাড়ীতে বুয়ার কাজ করেন।পাচঁ সন্তানের সংসার মেলা খরচ,তাই বড় মেয়ে ফুলীকে দিয়েছে শহরে এক বাসায় কাজ করতে।বেতন পাবে বারো শত টাকা ।তিন বেলা খাবার,থাকা  এবং কাপড় চোপড় বহন করবে কর্তা।ফুলি মবিন সাহেবের বাসায় এসেছে মাত্র দু’সপ্তাহ।নতুন বলে সারাক্ষন কেবল গ্রামের বাড়ীর চিন্তায় থাকে আজও সে ভোর রাত পর্যন্ত তারা ভরা রাতে জোৎস্নার আলোতে পাক ঘরের পাশে জরাজীর্ণ ময়লা আর্বজনার মাঝে ছোট্র একটি আধা ভঙ্গুর চকিতে বসে জানালা দিয়ে দূর আকাশের দিকে চেয়ে থাকে ভোর অব্দি।শেষ রাতে চোখের নির্ঘূমতায় তন্দ্রা নেমে আসে।ভোরে ম্যাডামের কর্কশ শবদে ঘুম ভাঙ্গে ফুলীর।

-কি রে ফুলী তুই এখনও ঘুমাচ্ছিস?আর ঐ দিকে সব ময়লা ভরা থালা বাসন আর কাপড় চোপর পড়ে আছে তেমনিই,ঐগুলো কে করবে? তো মা?যা শিগগীর থালা বাসনগুলো মেজে কাপড়গুলো ওয়াসিং মেশিনে দিয়ে নিশুকে স্কুলে নিয়ে যা….উঠ্ তারাতাড়ি কর….আমার হয়েছে জ্বালা কাজের লোক থাকতেও এত কাজ করতে হয় ঐদিকে আমার অফিসে যাবার সময় চলে যাচ্ছে…আমি যে এখন কি করব?

ম্যাডামের অনেক ব্যাবসার পাশাপাশি নারী উন্নয়ন সংস্হারও নেত্রী সে।তার স্বামী একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীতে বড় অফিসার।তারা দু’জনেই খুব সকাল সকাল ঘর থেকে বের হয় ফিরে রাত দশটা এগারোটায়।কর্তা মাঝে মাঝে কাজে দু’তিন দিনও বাহিরে থাকেন।ফুলী ঘুম ঘুম চোখে চোখমুখ না ওয়াস করেই কাজে লেগে যায় দ্রুত থালাবাসন মেজে কিছু না খেয়েই সাহেবের সাত বছরের মেয়েকে রেডি করে স্কুলে নিয়ে যায়।নিশুকে স্কুলে ডুকিয়ে ফুলী স্কুল ছুটির সময়টা একটু এদিক সে দিক ঘুড়াগুড়ি করে।সে দুর থেকে রাস্তায় জ্যামে আটকে থাকা গাড়ীগুলোর দিকে চোখ যায় সেখানে আলথু থালথু চোলের একটি ছোট্র ছেলে ফুল হাতে করে গাড়ী গাড়ীতে বিক্রি করছে।ফুলির কেনো যেন ছেলেটিকে দেখে তার ছোট ভাইয়ের কথা মনে পড়ল।কত আদরই না করত সে তার ছোট ভাইটিকে।ফুলবিক্রী ছেলেটিকে ডাক দিয়ে কাছে আনে।

-তোর মা বাবা নাই।

-থাকলে কি আর ফুল বেচতাম,আমার কেউ নাই..মা বাবা কে হেইডাও জানি না।

ফুলি এবার কি বলবে সেটাও বুঝতে পারছে না।সে তো তার চেয়েও অনাথ গরীব এবং অসহায়।হাতে ছিল ম্যাডামের দেয়া পঞ্চাশটি টাকা সেখান থেকে পাশে দোকান থেকে একটি চিপস কিনে ছেলেটির হাতে দিয়ে চলে যাবে স্কুলের গেইটে যাবার পথে রাস্তার এক পাশে দেখে এক বানর খেলার মজমা।ফুলি বসে  পড়ে মজমায়,মাঝে মাঝে খুশিতে হাত তালিও দেয় এরই মধ্যে অনেক সময় পেরিয়ে গেল রৌদ্রে তার শরীরে ফুসকা পড়ার উপক্রম।হঠাৎ মনে পড়ল নিশুর কথা।স্কুলে গিয়ে সিকুরিটিকে জিজ্ঞাসা করল।

-ও..স্যার ও..স্যার স্কুল কি ছুটি অয় নাই?

-ছুটিতো হেই কহন হইছে, তুই কারে খুজস?

-আমার ম্যাডামের মাইয়াডারে….আপনি দেহেছেন তারে?

-নাহ…

ফুলী এবার চিন্তায় পড়ে গেল।এত বড় ঢাকা শহরে কোথায় খুজবে নিশুকে।এ দিক সে দিক হেটেই চলছে ….এভাবে দিক বেদিক খুজতে খুজতে সেই তার বাসা ফেরা ভুলে গেল।চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়ছে চিন্তায়,পেটের অবস্হা আরো কেরোসিন কি ভাবে সে তার গন্তব্যে যাবে।রাস্তায় পাশে বৃক্ষের ছায়ায় ক্লান্ত হয়ে বসে পড়ে।এক সময় সে ঘুমিয়ে পড়ে।মানুষের চলাচলের শব্দ,গাড়ীর হর্ণের আওাজ কোন কিছুই তার কানে যায় না সে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে।ঐ দিকে তার সাহেব আর ম্যাডাম তাকে না পেয়ে অবাক।সন্ধ্যে হয়ে এলো কোন কিছু চুরি করে ভাগেনি তো?তার ম্যাডামের ভাষ্যে জবাব দেয় স্বামী।

-কি যে বলনা,ঐটুকু মেয়েকে নিয়ে…

-তুমি বুঝবেনা,যখন মাল যাবে তখন বুঝবে।মেয়েটাকে স্কুল থেকে বাসায় নিয়ে আসার কথা তা তো করলই না,এখন লা..পাত্তা।শেষমেশ ভাগ্যিস আমি গাড়ী নিয়ে স্কুলের পথে আসছিলাম বলে মেয়েটাকে বাচাতে পেরেছি নতুবা….

মাঝ পথে সাহেব ম্যাডামকে ধমক দিয়ে থামিয়ে দেয়।

-কি যা তা ভাবছ?তোমার কি একটুও মায়া নেই এতিম মেয়েটার প্রতি।এখন রাত আটটা,এখনও সে এলোনা।কি হলো কে জানে?

রাত দশটা বেজে গেল এখনও কোন খবর নেই মেয়েটি কোথায়।সাহেব খুব চিন্তায় পড়ে গেল, না জানি আবার কোন বিপদ ডেকে আনে।আনমনে ভাবতে ভাবতে হঠাৎ টেলিফোনের শব্দে চমকে উঠে সাহেব।ফোনটা রিসিভ করেন সাহেব।

-হ্যালো…কে?

-আমি রমনা থানা থেকে বলছি……..আপনাকে একটু থানায় আসতে হবে।

-কেনো?কি হয়েছে?

-একটি মেয়ে আমাদের এই ফোন নম্ভরটি দিল…মনে হয় মেয়েটি আপনার বাসায় কাজ করে..বাসা চিনতে না পেরে রাস্তায় ঘুমিয়ে ছিল।আমরা তাকে থানায় নিয়ে এসেছি।

-ওকে….আমি এখনিই আসছি।

সাহেব থানার কথা ফোনে পেয়ে প্রথমে গাভরে গিয়েছিল পরক্ষনে মেয়েটির কথা শুনে শান্তি পেলেন ।ঐ দিকে ম্যাডাম রাগে ফুস ফুস করছেন।

-এত রাতে তোমার যাবার দরকার নেই,সকালে অফিসে যাবার পথে যেও।

-তুমি যে কি….ছোট্র মেয়ে সারা রাত আমরা থাকতে থানায় পড়ে থাকবে….না?আমি চললাম থানায়।

বলেই সাহেব থানায় যাবার সাথে সাথে কান্না কণ্ঠে মেয়েটি সাহেবকে জড়িয়ে ধরে।সাহেব মেয়েটিকে বুঝলো,তার চোখের পানি মুছে তাকে শান্তনা দেয়।

-তুমি কাদছোঁ কেনো…আমি আছি না আর কোন ভয় নেই।

থানার কাগজ কলমের কিছু কাজ সেরে মেয়েটিকে নিয়ে চলে আসে বাসায়।চলার পথে মেয়েটিকে জিজ্ঞাসা করে বাসার ফোন নং কি ভাবে পেল?

-তুমি কি ভাবে ফোন নম্ভর পেলে?

-আপেনারা মাঝে মাঝে এই নম্বটা ফোন এলে অন্যকে বলতে আমি হেডা শুনতে শুনতে মুখস্হ হয়ে গেছিল।

-সাবাস,মা এইতো বুদ্ধিমতি তুমি।

-বুদ্ধিমতি কি আংকেল?

-যার উপস্হিত বুদ্ধি থাকে….

-আংকেল নিশুকে খুজে পাইনি…নিশুকে খুজতে খুজতে আমিই হারাইয়া গেছি…নিশুকে খুজবেন না? কোথায় আছে জানেন আংকেল?

-আর খুজতেঁ হবে না,সে এখন ঘুমাচ্ছে তার ঘরে।

মেয়েটি মুখে এবার হাসির ঝিলিক।সাহেব আর মেয়েটিকে দেখে ম্যাডামের রাগ বেড়ে যায়।না পারে স্বামীকে ঘর থেকে বের করে দেয়।সাহেব মেয়েটিকে তার রুমে গিয়ে বিশ্রাম নিতে বললেন।মেয়েটি তার রুমে ঢুকে ক্লান্ত দেহে শুয়ে পড়ে।পরদিন সকালে ঘুম ভাঙ্গে ম্যাডামের কর্কশ আওয়াজে।ম্যাডাম কয়েকটি ফুলী…ফুলী বলে কয়েকটি ডাক দেয়ার পর তার কোন উত্তর না পাওয়াতে ম্যাডাম নিজেই মেয়েটির রুমে ঢুকে মেয়েটিকে ঘুমন্ত অবস্হায় জোরে এক লাথি মারে তার পাছায় মেয়েটি হতভম্ব হয়ে কান্না শুরু করে।

-আর কাদতেঁ হবে না,কত কাজ পড়ে আছে …যা জলদি….বলেই আরেক লাথি।লাথিটা গিয়ে লাগল তলপেটে।মা মা বলে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে অজ্ঞান হয়ে যায়।ম্যাডাম এবার চিন্তায় পড়ে সাহেবকে ফোন করে।সাহেব তাড়াহুড়া করে এসে মেয়েটিকে নিয়ে হাসপাতালে চলে যায়।নিথর দেহ হাসপাতালের ইমার্জেনসি বিভাগে ট্রলি দিয়ে নিয়ে গেল অপারেশন থিয়েটারে।ম্যাডাম এবং সাহেব সাথে নিশু অপেক্ষায় আছে কখন অপারেশনের ডাক্তার একটি শুভ সংবাদ নিয়ে আসে।প্রায় ঘন্টা খানেক পর ডাক্তার সাহেব বের হয়ে তাদের তার চেম্ভারে নিয়ে যান।

-মেয়েটি কি হয় আপনাদের?

-না,তেমন কিছু নয় আমাদের বাসায় কাজ করে।গ্রাম থেকে নিয়ে এসেছি।ডাঃ সাহেব কোন সমস্যা?

-না,তবে কয়েকটি টেষ্ট দিবো,করে নিয়ে আবার আসবেন আর মেয়েটি অনেক দুর্বল তাকে ভাল মন্দ কিছু খেতে দিবেন আর আপাতত ভারী কোন কাজে দেবেন না।ঠিক আছে কিছুক্ষনের মধ্যে মেয়েটিকে নিয়ে যাবেন।

বলে ডাক্তার সাহেব চলে গেলেন অপারেশন রুমে।কিছুক্ষন পর মেয়েটিকে এক নার্স নিয়ে আসে।তাকে নিয়ে ম্যাডাম এবং সাহেব তাদের প্রাইভেট কারে বাসায় চলে আসে এবং সাহেব আবারও বাহিরে বের হন।সাহেব বাহিরে বের হবার পর বাসায় আসে নারী উন্নয়ন সংস্হার কিছু কর্মকর্তা নারী।তাদের আপ্যায়নে ফুলীকে ডাক দেয়।ফুলীঁ তার কথা শুনতে পায়নি তার উপর শরীরে জ্বর ভাব থাকায় সে ডাক বুঝতে পারেনি বলে ম্যাডাম রাগান্নিত হয়ে ফুলীর কাছে গিয়ে ফুলীকে জোড়ে ধাক্কা মারে।

-কি রে হারামীর বাচ্চা,আমার কথা কানে যায় নি….?ফুলী কি বলবে বুঝতে পারেনা আবার ম্যাডাম যখন বকা দিয়ে কথা বলে তখন ফুলী উত্তর দেয়।

-আংটী….আমার মা বাবারে গালি দিয়েন না

-অরে… হারামীর বাচ্চা যত বড় মুখ নয় তত বড় কথা।বলে হাতে রান্না ঘরের তরকারী পাতিল হতে ছেনি এনে বারি মারে পিঠে।সাথে সাথে মা মা বলে চিৎকার করতে থাকে।মেহমানরা ভেজালের আচ করতে পেরে ম্যাডামকে একজন বলে উঠে….যারে দিয়ে তোমার কাজ হয় না তাকে রেখে কি লাভ?বিদায় করে দাওনা কেনো?

-আর বলিস না আমার হয়েছে জ্বালা…যা যা আমার বাসা থেকে বের হ হারামজাদী……বলে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে দরজার বাহিরে বের করে দেয়।

চলবে…

 

 

 

 

২৬১জন ২৬১জন
0 Shares

২০টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য