জলতরঙ্গ

নাজমুস সাকিব রহমান ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৬, বুধবার, ০৫:১১:৩৪অপরাহ্ন রম্য ৮ মন্তব্য
আমার এক বন্ধু তার মোটর-সাইকেলে বন্ধু-বান্ধবকে চাপতে না দিলেও বান্ধবীকে নিয়ে ঘুরতে সমস্যা বোধ করতো না। রবিবার গরুর বাজারে যাচ্ছি— এমন সময় দেখলাম, সেই বন্ধুটির বাইকের পেছনে কোনও বান্ধবী নেই। যা আছে, তা দেখে আমি হকচকিয়ে গেলাম। জীবদ্দশায় কখনো চিন্তাও করি নি যে— সে একদিন গরুর খড় নিয়ে রাস্তায় গতির ঝড় তুলবে!
এ শহরে অনেক-বার ঈদ করেছি। কিন্তু কখনো গরুর হাটে যাওয়া হয় নি। এবার যেয়ে দেখলাম, যে-দিকে দু’চোখ যায়, সে-দিকেই গরু। মাইকে কিছুক্ষণ পর পর ঘোষণা দেয়া হচ্ছে, ‘আমরা সিসিটিভিতে সবকিছুর ওপর নজর রাখছি।’
বর্তমান পৃথিবীতে সম্ভবত মানুষই একমাত্র প্রাণী, যা-কে নিয়ন্ত্রণ করার জন্যে সিসিটিভি ব্যবহার করতে হয়। অর্থাৎ, আমাদের জন্য পশু-পাখিদেরও শান্তি নেই!
আর গরুদের আনন্দের জন্যে মাইকে গানও গাওয়া হচ্ছিল। তবে, তারা গানগুলো বুঝতে পেরেছে কি-না জানি না। কথাগুলো ছিল এরকমঃ
অনেক আছে লাল গরু, আমাদের এখানে
একেক করে নিয়ে যা-ন, সব দেখে- শুনে
তোমরা কম দিও না, কম দেয়া লোকের সঙ্গে
লাল গরু যাবে না।
যা হোক, গরুর বাজারে এসে এভাবে হুমায়ূন আহমেদের গান শুনতে পারব— তা ভাবি নি।
ওখানে এক ভদ্রমহিলা তার স্বামী আর পুত্রকে নিয়ে গরু পছন্দ করে বেড়াচ্ছেন। ঘণ্টাখানেক ঘোরাঘুরির পর আমি অবশ্য জেনে গেছি, পঞ্চাশ হাজার হল এই বাজারের এভারেজ রেট। তো, ভদ্রমহিলা বেশ কয়েকটি গরু থেকে একটি পছন্দ করলেন। তারপর বিক্রেতা দাম হাঁকলেন। সত্তুর হাজার টাকা। ভদ্রমহিলা বললেন, পয়তাল্লিশ হাজার টাকা।
এর জবাবে বিক্রেতা বললেন, ‘আপা, আপনাকে কেউ গরু বেচবে না। আপনি কাপড়ের বাজারে যা-ন।’
আমি যাঁদের সঙ্গে গিয়েছি, তারা অনেক গরু দেখার পর, দু-একটা পছন্দ করে বলল, এখন কী করা যায়?
আমি বললাম, ‘যা-ই কিনেন, সমস্যা নেই। তবে, দুটো গুণ তার ভেতর থাকা চাই। প্রথমত, তার বড় শিং থাকতে হবে। আমার ছোট-ভাই বলেছে, তার একটা রকস্টার গরু চাই। আর দ্বিতীয়ত, কিছুতেই সাদা গরু নেয়া যাবে না। আম্মা বলেছে, গতবার সাদা গরুর মাংস খেয়ে মজা পান নি।’
এমন শর্ত শোনার পর আরও কিছু শর্ত বের হয়ে গেল। কেউ বলছে, গরুর গাঁয়ে দাগ থাকতে পারবে না। অথচ বিক্রেতারা বলছে, ‘কতদূর থেকে এসেছে, চামড়ায় দাগ তো একটু পড়বেই।’
সে জন্যে আর তেমন বেশী দূরে না যেয়ে— আমরা দো-হাজারী থেকে নিয়ে আসা একটি গরু কিনে ফেললাম। তাকে নিয়ে ঘরের দিকে যাওয়ার সময় নানা বিড়ম্বনা। গাড়ি দেখলেই সে থমকে যায়। রাস্তা পার হতে সমস্যা হচ্ছিল। বারবার এমন হওয়াতে একজন বলল, দাঁড়িয়ে গেলে লেজ নেড়ে দিও। তিনি আবার জ্ঞানী লোক।
আমি ওকে বললাম, ‘বিরক্ত হয়ে কী লাভ? নাগরিকতার সাথে তো ওর সম্পর্ক নেই। সে তো আপনার মত শিক্ষিত না।’
তো, পথিমধ্যে দুই শিং বিশিষ্ট গরু ও আমরা প্রচুর প্রশ্নের সম্মুখীন হলাম। রিকশা থেকে এক উড়ন্ত যুবক বলল, ‘ভাইয়া, কত?’ আমি অবশ্য প্রথমে বুঝতে পারি নি, প্রশ্নটা ঠিক কা-কে করা হচ্ছে! তা-ই, খানিকটা বিরক্তি চেপে বললাম, ‘তুমি কত পর্যন্ত গুনতে জানো?’
কী আশ্চর্য! যুবক উত্তর দেয়ার আগেই গরুটা প্রথমবারের মতন হাম্বা করে ওঠলো। ভাবলাম, তারও হয়তো খানিকটা আত্মসম্মান আছে। আর, সে-ই হাম্বা শুনে যুবকও আর কিছু বলে নি।
বাসায় আসতেই আমার পরিবারের সদস্যরা পানি-খড়-ভুষি নিয়ে তার ওপর হামলে পড়ল। আজকাল কিছু দৃশ্য খুব চোখে পড়ে। অনেক মানুষ আছেন— যারা কোরবানের জন্য কেনা পশুকে ঠিক-মত খাবার দেন না। ভাব-খানা এমন— কালকেই তো সব শেষ। কেনো জানি না, এবারও তা চোখে পড়েছে। আমাদের পাশের বিল্ডিং-এ এমন হওয়াতে, আম্মাকে মন খারাপ করতে দেখলাম।
পরের ঘটনাগুলো নিয়ে আমার কিছু বলার নেই। কারণটা বলি। ছোটবেলার কথা। ঈদের ঠিক আগের রাতে আমাদের গরুটিকে দেখতে যেয়ে দেখেছিলাম— তার দু’চোখ জলে ভ’রে আছে। এই দৃশ্য আমি আজও ভুলতে পারি নি।
১৪-০৯-২০১৬, চট্টগ্রাম।
৩১২জন ৩১১জন
0 Shares

৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য