গোলাপখোর

তার ছেঁড়া ১০ ফেব্রুয়ারী ২০১৫, মঙ্গলবার, ০৫:৩৪:২০পূর্বাহ্ন বিবিধ ৭ মন্তব্য

ঘটনাঃ ১
“এই নিন রক্তলাল গোলাপ । ভাববেন না ভালোবেসে দিলাম ! “মেয়েটির কথায় যুবকটা অবাক হয়ে বলল,”তবে কেন দিলেন ?কি করব এটা দিয়ে ?” প্রত্তুত্তরে মেয়েটি বলল ,”খাবেন ।” বলেই মেয়েটি হাসতে শুরু করল কিন্তু হাসিটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলনা ,কারণ যুবকটি ইতিমধ্যে গোলাপটা খেতে শুরু করেছে! মেয়েটি হতভম্ভ হয়ে বলল , “আপনি কি পাগল নাকি?” যুবকটি উত্তর না দিয়ে গোলাপ খাওয়া চালিয়ে গেল আর মেয়েটি আরো বেশি অবাক চোখে তাকিয়ে থাকল !
**
ঘটনাঃ ২
ডক্টর মাহবুব স্বভাবে ভীষণ রাগী ! মাথা একদমই ঠান্ডা রাখতে পারেন না । কথায় কথায় রোগীদের অপদস্ত করেন তো করেনই এবং ইলেকট্রিক শক দেয়া এখন নেশা হয়ে দাড়িয়েছে ! বলে রাখা ভালো, তিনি ঢাকার ভিতরের এক স্বনামধন্য প্রাইভেট মেন্টাল হসপিটালের মালিক । এই মুহূর্তে তিনি ভীষণ উত্‍ফুল্ল, মাত্রই একটা পাগলকে থার্ড ডিগ্রী ইলেক্ট্রিক শক দিয়ে আসলেন । শক দেয়ার সময় রোগীর খিঁচুনী আর ছটফটানী দেখতে তার বেশ লাগে । এই পাগলটা একদম ভিন্ন , চুপচাপ শান্ত প্রকৃতির । কোন ঝামেলা করে না । কিন্তু যদি দিনে তিনটা গোলাপ না পায় তবে তুলকালাম শুরু করে দেয় ! তবুও হত, কিন্তু এই পাগল গোলাপ তিনটা কচকচ করে চাবিয়ে খায় !
**
ঘটনাঃ ৩ (ছয়মাস আগের কথা)
-কি করছেন ?

ফোনে মেয়েটির প্রশ্নে ছেলেটা বলল ,
-চাঁদ দেখি । কুয়াশার মাঝে চাঁদের আলো পড়ায় মনে হচ্ছে আমি আলোর মাঝে ঘুরছি । দারুণ ব্যাপার !

-(বিস্ময়ভরা কন্ঠে) এখন রাত প্রায় আড়াইটা , তার মাঝে প্রচন্ড ঠান্ডা ! এর মাঝে আপনি বাইরে কি করছেন ? অদ্ভুত তো আপনি । সেদিন মজা করে গোলাপ টা খেতে বলেছিলাম , আপনি সেটা সত্যি সত্যি খেয়ে ফেললেন !

-(মুচকি হেসে) আপনি বলেছেন , সেটা কি ফেলতে পারি বলেন ?

-আজব তো ! আমি যা বলব তাই মেনে নিতে হবে ?

-কিছু মানুষ থাকে , যাদের কথা ফেলা যায় না ।

-আচ্ছা বুঝলাম । আমি এখন আপনার সাথে চাঁদ দেখব । দেখাতে পারবেন ?
*
রাত তিনটা দশ । দুটি যুবক যুবতী একটা হ্রদের তীরে বসে আছে । পিছনে কাঁশবন । কুয়াশার কারণে হ্রদের উপরে ঘন ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়েছে ! চাঁদের আলোয় পুরোটা রহস্যময় এক জগতে পরিণত হয়েছে । মৃদু বাতাসে মেয়েটি কেঁপে উঠতেই যুবকটি তার চাদরটি দিয়ে মেয়েটিকে জড়িয়ে নিল । দুজনের পরিচয়টা বছরদুয়েকের হলেও সম্বোধনটা এখনও আপনিতেই রয়ে গেছে । এমনকি কেউ কখনও মুখফুটে বলেনি তারা একে অপরকে ভালোবাসে । কিছু সম্পর্ক থাকে যেগুলোতে মুখের ভাষায় কিছু বুঝাতে হয় না ।

যুবকের কাঁধে মেয়েটি মাথা রেখে গুণগুণ করে গান গাইছে । ছেলেটি মুগ্ধ হয়ে শুনছে সেই সম্মোহনী গান । সময় চলে যাচ্ছে , চাঁদটা পূর্ব দিকে হেলে গিয়েছে , দুইচারটা রাতপাখির ডাক কানে আসছে তবুও তারা অনড় ! এক সম্মোহনী মায়ায় দুজনে বসে আছে হাতে হাত ধরে । প্রকৃতিতে ভালোবাসার গন্ধ ! আযানের শব্দে তাদের সংবিত্‍ ফিরল । ঘড়িতে পাঁচটা দশ । তড়িঘড়ি করে উঠতে উঠতে যুবকটি বলল ,

-আপনার পা টা একটু দেন তো ।
-(দুষ্টুমী ভরা কন্ঠে) থাক মাফ চাইতে হবে না ।
-প্লিজ , এক মিনিট !

অনুমতির অপেক্ষা না করেই ছেলেটি হাঁটুগেড়ে বসে পড়ল । একটা পা টেনে নিয়ে উরুর উপরে রাখল ! মেয়েটির কোন আপত্তিই কানে নিল না । হাতের কাছে সদ্য ফুটন্ত কুঁড়িযুক্ত একটা লতা ছিঁড়ে পায়ে পেচিয়ে দিল । উঠে দাড়িয়ে বলল ,”মুহূর্তগুলোর স্মৃতি জড়িয়ে দিলাম আপনার পায়ে ।” মেয়েটি কিছু না বলে শব্দ করে হাসতে থাকে ! পর্যাপ্ত আলোর অভাবে যুবকটি মেয়েটির চোখের কোণের জলবিন্দু দেখতে পেল না ।
*
এর সাতদিন পর মেয়েটি তার পরিবার সহ মালেশিয়া চলে গেল অজ্ঞাত কারণে !
*
(দুইমাস পর)
ছেলেটি আর মেয়েটি সেই হ্রদের পাড়ে বসে আছে , যেখানে তাদের জীবনের সবথেকে স্মরণীয় মুহূর্তটা কেটেছে । মেয়েটি কালকেই মাত্র বাংলাদেশে এসেছে । মেয়েটির মাঝে অনেক পরিবর্তন এসেছে । বোরখা পড়েছে , একটু শুকিয়ে গেছে , তবে চোখদুটো আগের থেকে ভীষণ উজ্জ্বল ! ছেলেটি শক্ত হয়ে বসে আছে । চোখ জলে ভরে গেছে । মেয়েটি অনেকক্ষণ এপোলজি করে বলল ,

-আপনার জন্য দুটি জিনিস আছে ? নিবেন নাকি ফেরত নিয়ে যাব ?
-কি ভেবেছেন , গিফট পেলেই আপনাকে মাফ করে দিব ? গিফট নিবো কিন্তু মাফ করব না ।
-(একটু হেসে) আচ্ছা মাফ করতে হবে না । এইযে একটা চিঠি । খবরদার এখন পড়বেন না । আমি চলে গেলে পড়বেন । আর আপনার জন্য তিনটা গোলাপ । আমার সামনে বসে খাবেন এই তিনটা । আমি দেখব !
*
ছেলেটি গোলাপ খাচ্ছে । মেয়েটি মুগ্ধ চোখে দেখছে , ভালোবাসায় ছেলেটির কাঁধে মাথা রাখল ! চোখ থেকে দুফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল ছেলেটির কাঁধে !
**
ঘটনাঃ ৪
ডক্টর মাহবুব হতবাক হয়ে চেয়ে আছেন গোলাপখোর পাগলটার দিকে । পাগলটা বিস্ফারিত চোখে অপলক তাকিয়ে আছে ছাদের দিকে । শকটা বোধয় আজ বেশি দেয়া হয়েছে ! পাগলটার চোখ গড়িয়ে অশ্রুর দাগ এখনও সতেজ ! মুখের ফাঁক দিয়ে রক্ত গড়িয়ে কান অবধি পৌঁছে গিয়েছে ! রক্তে ভেসে আছে কুচি কুচি গোলাপের পাপড়ি !
**
ঘটনাঃ ৫
ডক্টর মাহবুবের হাতে একটা চিঠি । গোলাপখোর পাগলের পাজামার লুকোন পকেট থেকে পাওয়া ।
*
“মাফ করে দিবেন এই দুটি মাস যোগাযোগ বন্ধ রাখার জন্য । আমি অত্যন্ত দুঃখিত । কাল সারারাত ভেবে বুঝলাম কথাটা আপনার জানা দরকার । আমার লাংস ক্যান্সার , লাস্ট স্টেজ ! হাতে একদম সময় নেই । এই দুই মাস থেরাপীতেও কাজ হয়নি । “ভালোবাসি” কথাটা আপনাকে কখনও বলা হয়নি । এখন আর বলতেও চাই না । আমার গন্তব্য যে ঠিক হয়ে গিয়েছে । আমি চলে গেলে কষ্ট পাবেন না । আমি থাকব আপনার পাশেই , যখন গোলাপ খাবেন ভাববেন আমি দেখে হেসে আপনাকে পাগল বলছি । যখন চাঁদ দেখবেন , ভাববেন আমি আপনার কাধে মাথা রেখে গান গাইছি ।
বেশি কথা বলে আপনার মায়া বাড়াব না । আপনি মজা করে বলেছিলেন , আমার বিয়ের প্রথম কার্ডটা যেন আপনাকেই দেই । তা সম্ভব না হলেও আমার শেষকৃত্যের অনুষ্ঠানে আপনাকেই প্রথম ইনভাইট করলাম । welcome to my funeral.

নিজের যত্ন নিবেন । আমার চিন্তা করতে হবে না, অন্তিম মুহূর্তে আপনার গোলাপ খাওয়ার দৃশ্যটা মনে মনে ভাবব, তবে কষ্ট আর আমায় ছুঁতেই পারবে না ! বিদায় ।

ইতি-
আত্রলিতা
**
ঘটনাঃ ৬
ডক্টর মাহবুব উদভ্রান্তের মত গোলাপ খেয়ে চলেছেন । একটা, দুটো, তিনটা খেয়েই চলেছেন ! বিড়বিড় করে একটা কথাই বলছেন,”গোলাপখোর পাগলরা বেঁচে থাকুক, বেঁচে থাকুক !”

৩৫৭জন ৩৫৭জন
0 Shares

৭টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ