আজ আঁধার ছুঁয়ে যাচ্ছে খুব

মাসুদ চয়ন ৬ আগস্ট ২০১৯, মঙ্গলবার, ১২:১০:৩৩অপরাহ্ন গল্প ৪ মন্তব্য

ছোটগল্পঃ-আজ আধাঁর ছুঁয়ে যাচ্ছে খুব//

রুদ্র ভীষণ অসুস্থতায় ভুগছে।পৃথিবীর চিরাচারিত নিয়ম মতে,অসুস্থ মানুষকে সেবা প্রদান করে সুস্থ করে তোলাই বন্ধু স্বজনদের দায়িত্ব।চিকিৎসা তো অতি স্বাভাবিক পথ্য।
ওটাও একান্তভাবে কাম্য।কিন্তু,রুদ্রর ক্ষেত্রে এর কোনোটাই হচ্ছেনা।রুদ্র জানতে পারেনা তার রোগের নাম।
ঠোঁটে মুখে ব্রনের মতো ঘাঁ হয়েছে।
মাথার খোলসের আবরণীীতে ক্ষতর স্মৃষ্টি হয়েছে।সাথে তলপেটেও তীব্র ব্যথা।যন্ত্রণাগুলো নিভৃতে সয়ে যাচ্ছে একান্তে।খুব ভালো গায়ক।নিজেই গান লিখে নিজেই সুর তোলে।এক সময় পুরো এলাকায় বেশ কদর ছিলো।কণ্ঠনালীতে সমস্যা হওয়ার পর সুরে স্বরে ভাঁটা পড়ে গেছে।তাই নির্জনতায় নিজেকে আড়াল করে রেখেছে।কাউকে কিছুই জানায়নি।ও আসলে করুণাাকামী হতে চায়না।
তবে গান লেখাটা বন্ধ হয়নি।নিয়মিত গান লিখে ফেসবুকে আপলোড করে।ভার্চুয়াল বন্ধুরা ভালোলাগার বিহ্বলতায় সিক্ত করে দেয়,কখনো উপেক্ষিত করেও রাখে।এভাবেই সারাদিন শুয়ে বসে নির্জন গৃহ কোণে অতিবাহিত হয় সময়।
..
রুদ্র এখনো হাল ছাড়েনি।ও জানে এমন অসুস্থতা থেকে কিছুতেই মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়।অর্থ নেই,কি দিয়ে চিকিৎসা করাবে!
যদিও সে একা থাকেনা।তার সাথে বাবা থাকে,একমাত্র ছোটো ভাইয়ো থাকে।
যাদের সাথে ভয়ানক রকম মনোমালিন্য হয়েছে রুদ্রর।এর পেছনে অবশ্য যৌক্তিক কারণ আছে।প্রথমত রুদ্রর বাবা উদাসীন ঘরানার মানুষ।একসময় রুদ্রকে প্রচন্ডরকম ভালোবাসতেন।তখন রুদ্রর স্টুডেন্ট লাইফ।ব্রেলিয়ান্ট স্টুডেন্ট।এস এস সি এইচ এস সি উভয়তেই জিপিএ ফাইভ।তাই বাবাও উচ্চবাচ্য করতেন ছেলেকে নিয়ে।ছেলের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিয়ে আশার ফানুষ উড়াতেন।একে অপরের সাথে গল্প গুজবে মেতে থাকতেন।সমস্ত আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু ছিলো ছেলে দুটি।রুদ্রর দু’বছরের ছোটো ভাইয়ের নাম ইমরান।সেও মেধাবী শিক্ষার্থী।দু’জনের এক ক্লাস ডিসটেন্স।
ইন্টার শেষ করে ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার পর বাবাকে না জানিয়ে বিপ্লবী যুব সংগঠনেের দিকে ধুকে পড়ে রুদ্র।সমাজ সেবা এবং সংস্কৃতিক কাজকর্মের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়ে।অপশক্তি অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে থাকে মিছিলে মিটিংয়ে সমাবেশে।বাবা,এসব চাইতেননা,তিনি চাইতেন,ছেলে তার মতো আত্নকেন্দ্রিক পরিবার তন্ত্র করুক।এ জন্য কোচিং করিয়ে দুখী দুস্থদের পাশে দাঁড়ানোর প্রয়াস চালাতো রুদ্র।জমিজমার একটা কানাকড়িও রুদ্রকে দেয়া হয়না। কিন্তু এই পরিক্রমা বেশিদিন চালিয়ে যেতে পারেনা।দু’বছর কেটে যাওয়ার পর মারাত্মক টাইফয়েড জ্বরে ভুগতে থাকে-এর পর অসুস্থতা লেগেই থাকে।শরীর শুকিয়ে নিস্তেজ হয়ে যায়,পুষ্টিহীনতায় ভুগতে থাকে।বাবাও মুখ ফিরিয়ে নেয়।রুদ্রর চিকিৎসার দায়িত্ব নেয়ার মতো কেউ থাকেনা।বাবা জামাত ইসলামের রাজনৈতিক চেতনা হৃদয়ে ধারণ করেন।আর ছেলে পুরোপুরি মানবিক প্রগতিশীল চেতনার মানুষ।এ জন্য নানান সমস্যা লেগেই থাকতো।রুদ্রও আপোষ করে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার মতো ছেলে নয়।তবে ছোটো ভাই ইমু সকলের সাথে তালমিলিয়ে চলার অভ্যাসে সম্পূর্নরুপে পাকাপোক্ত।রুদ্রর কাছে যেটা অযৌক্তিক বলে মনে হতো রুদ্র তার সাথে কখনোই সম্মতি পোষণ করতোনা।একদিন বাবা প্রচন্ড রাগে অসুস্থ রুদ্রর গায়ে হাত তুলে বসলেন।অভিশাপ দিয়ে বললেল,অবাধ্য কুলাঙ্গার!দেখে নিস!ইমুই তোর আগে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে বেড়ুবে।তুই আমার কথার সাথে সহমত হতে পারলিনা,তোর মতো ছেলের জন্য এই হৃদয়ে বিন্দুমাত্র স্থান নেই।তুই মরে যা,তোর অসুস্থ শরীরের গলা খোঁকড়ানো দেখে আমার ঘেন্না হয়।তুই কি বিপ্লব করবি বল!তুই কি মানব সেবা করবি!তোর ওই শরীর দেখে মানুষ হাসবো।কটাখ্য সূচক হাসি দিয়ে রুম থেকে বের হয়ে আসেন পিতা।রুদ্র দেয়ালে মাথা হেলান দিয়ে অতীত স্মৃতিতে ডুবে যায়।
..
মা মরা ছেলে রুদ্র সেদিন মায়ের অভাবটা তীব্রভাবে অনুভব করতে পারে।ও বুঝতে পারে_পাশে মা থাকলে বাবার কথার প্রতিদান নিজ মুখেই ফিরিয়ে দিতেন।ছোটো ভাই ইমরান কিছুই বলেনা।নিজের পড়ার টেবিলে অনুশীলনে নিমগ্ন।রুদ্র একটা জবাবো দেয়নি_মনে মনে ভাবে শরীরটা একটু সুস্থ হলেই জাহান্নাম থেকে কেটে পড়বে।সেই সুস্থ আর হয়ে ওঠেনা।রুদ্র তখন গান লেখা,ইউটিউব,ফেসবুকে সময় কাটানোকেই বেঁচে থাকার একমাত্র অনুসঙ মনে করতো।মাঝে মাঝে পত্রিকায় গানছাঁপা হতো।সেই টাকা দিয়েই মোবাইল এমবি খরচ উঠতো।
..
মাঝে মাঝে ছোটো ভাইয়ের দাড়স্থ হতো।ছোটো ভাইয়ের ইনকাম ভালো।টিউশন করিয়ে ১০/১২ হাজার আয় করে।অথচ ভাইয়ের চিকিৎসা নিয়ে একটা কথাও বলেনা বাবার সাথে।প্রেমিকার সাথে কথা বলে,হাজার হাজার টাকার গিফট কিনে দেয়,রুদ্র সবকিছু দেখে,আর আফসোস করে।ইমরান মনে মনে ভাবে বাপ এবং ভাই দুজনের সাথেই তার ভালো সম্পর্ক। রুদ্র নীরব হয়ে গেছে বহুকাল ধরে।নিজের মতামত প্রকাশ করেনা তাদের সাথে।শুধু খাওয়া দাওয়া আর বিশ্রামের জন্য এখানে পড়ে আছে।অথচ তার মানবিক মতামতগুলো অনলাইন জগতে মানুষকে সেবা প্রদান করে যাচ্ছে।ছোটো ভাই ইমরান অবশ্য ভালোই জানে।কিন্তু বাবা জানেনা।কারণ তিনি ফেসবুক ব্যবহার করেননা,ইমরানো কখনো বাবাকে জানায়নি,ভাইয়ার লেখা গান পত্রিকায় প্রকাশ হয়,ভাইয়া অনলাইনে অনেক অন্ধ বিবেককে গানের মৌলিকতায় জাগিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে_বাবা চলো আমরা ওকে স্যস্থ করে তুলি,ওর প্রতিভা বিকাশের পথকে আরও বিস্তৃত করে দেই।এসব অনুভব ইমরানের মুখে কখনোই শোনা যায়না।
..
এভাবেই আরও দু’বছর অতিবাহিত হয়ে যায়।ছোটভাই অনার্স কমপ্লিট করে চাকরিতে জয়েন করে।রুদ্র সেই অনার্স সেকেন্ড ইয়ারেই পড়ে থাকে,ভার্সিটি থেকে নাম কেটে দেয়।
এ খবর শুনার পর পিতা আলিম আহমেদ গালাগাল শুরু করেন,সেই পুরনো নিয়মেই,তুই তোয়াক্কার ঝড় তুলে,আর ইমু পোষা বেড়ালের মতো নিজের কাজ নিয়ে মগ্ন থাকে।কিরে জানোয়ার কইছিলাম না!দ্যাখ আমার কথাই সত্যি হইছে!তুই পারিসনাই,ও পারছে।রুদ্র বহুদিনের জমানো ক্ষোভ আর চেপে রাখতে পারেনা-অসুস্থ শরীর নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করে।অনেক হইছে অনেক!তোমরা মানুষের জাতেই পড়োনা।
তোমরা সত্যিই মহান!এমন মহৎ পরিবার এই পৃথিবীতে আর কয়টাই বা আছে।একজন অসুস্থ মানুষ চিকিৎসার অভাবে ধুকে ধুকে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হচ্ছে,আর তোমরা সেই তাকেই প্রতিযোগিতার মঞ্চে তুলনায় আনছো।একবার সুস্থ হওয়ার সুযোগ দিতে,চিকিৎসা করাতে!আমিতো তো মাদেরি রক্ত তাই না!তবুও হাল ছাড়িনি,অন্য কেহ হলে সুইসাইড করতো,দেখো আমি মানসিকভাবে কতটা শক্তিশালী,আমি হেরে যাইনি,দুটি মানুষের মনুষ্যত্ব হারিয়ে গেছে আমার চোখের সামনে.যেনো সুস্থ না হই,এই নিয়ে পার্থনা করো।শুধুমাত্র অসুস্থতাই আমাকে দমিয়ে রেখেছে বাস্তব জগৎ থেকে।সুস্থ হলে তোমাদের অমানবিক টর্চার পৃৃথিবী জেনে যাবে।এই বলেই নিজের প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি নিয়ে রাস্তায় নেমে আসে রুদ্র।
বহুদিন পর আলোর সান্নিধ্যে এসেছে।তবুও আঁধার ছুঁয়ে যাচ্ছে খুব।
(মাসুদ চয়ন)

৯৫জন ২২জন
15 Shares

৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য