গল্প, কিন্তু গল্প নয় – ২য় পর্ব

আজিজুল ইসলাম ১০ এপ্রিল ২০১৪, বৃহস্পতিবার, ০৭:০৯:০৩অপরাহ্ন গল্প, সাহিত্য ৪ মন্তব্য


 

আজিজ বলেন , দেখ সামাদ বিষয়টা আমার জানা ছিলনা । যা হোক জানলাম এবং এটার বিহিত করতে হবে । আমরা চেয়ারম্যানের কাছে যাব । এরপর মিটিং-এ আলোচনা যা হল , তা সংক্ষিপ্ত । মূল জিনিসটা আবার স্মরন করিয়ে দিলেন আজিজ এভাবে , আমরা আর চেয়ারম্যান , মেম্বারদের কোন অন্যায় কাজ মেনে নেবনা । প্রতিবাদ করব এবং প্রতিবাদ করে উক্ত অন্যায় কাজটি ন্যায়ভাবে করতে বাধ্য করব । যতক্ষন অন্যায়টি সংশোধন না হয় , ততক্ষন প্রতিবাদ করা বন্দ করা যাবেনা । শেষে অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানগুলি সম্পর্কে জানতে চেয়ারম্যানের কাছে সকালে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে সভা শেষ হয় ।

সব শুনে চেয়ারম্যান বলেন , সবাইকে তিনি তুমি-ই বলেন , দেখ বাবারা , এটা এমপি সাহেব বলতে পারবেন । আমি কিছু জানিনা । পারলে এমপি সাহেবের কাছে তোমরা যাও । ব্যাপারটিতে আমিও খুব বিরক্ত ।

এমপি সাহেবের বাসার বিরাট বৈঠকখানা । এখানেই মিটিং হবে তাঁর সাথে । এসেছেন আজিজ , সামাদসহ আরো ৩/৪ জন গ্রামবাসী । আগে থেকেই সময় নেয়া ছিল তাঁদের । এমপি সাহেবের দুইজন সঙ্গী বসে আছেন , যারা থাকেন বিপদে-আপদে সবসময় তাঁর সাথে ।

কিছুক্ষন পর এলেন তিনি , যার জন্য অপেক্ষা করে বসে আছেন সবাই । তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলেন , সামাদ কথাটা পাড়তেই । বললেন , পেয়েছ কি তোমরা , তোমাদের কাছে আমাকে জবাবদিহি করতে হবে আমার কাজের ? প্রতিষ্ঠান নাই তো কি হয়েছে ! হবে । আমার ক্ষমতা যে কি এবং কোথায় , তা তোমরা গ্রামের মানূষ কি বুঝবা ? এক ফুতকারে মিলিয়ে দিব সব । যাও , কথা আর না বাড়িয়ে এখনই চলে যাও এখান থেকে । হুংকার ছাড়েন তিনি ।

শান্ত কন্ঠে এবং হাসিমুখে বলে উঠেন আজিজ , জানেন , হাসিমুখ না করলে এখন কথাই বলতে পারবেননা তিনি এমপি সাহেবের হুংকারের কারনে । বলেন , দেখেন স্যার , আপনার কাছে আমরা এসেছিলাম বিষয়টা জানতে, আসলে । তাঁর উত্তেজনা প্রশমন করতে হবে আগে । নতুবা কথাই বলা যাবেনা আর ।

আসলে জনগনের জন্য এই বরাদ্দগুলি আসে এবং আপনিও জনগনের ভোটেই নির্বাচিত হয়েছেন । তাই আপনার ভাব-মূর্র্তির ক্ষতি হবেনা কি , যদি জনগনের কাজে তা না লাগে ?

কিছুটা শান্ত হওয়ার ধারায় ফিরে এলেন এমপি । বললেন , আমিতো বললাম , যেসমস্ত সংগঠনের কথা বলা হচ্ছে , সেসমস্ত সংগঠনের অস্তিত্ব না থাকলে ঐ সংগঠন তৈরী করা হবে এবং টাকাও খরচ করা হবে ।

কিন্তু ছয়মাস আগে টাকা উত্তোলন করা হলেও এখনও কিছুই করা হয়নি , বলেন আজিজ ।

সঙ্গীদের দিকে ইংগিত করে এমপি বলেন , কি ব্যাপার ! তাঁরা আমতা আমতা করতে থাকলে এমপি আবার বলেন , আমিতো বললাম সব করা হবে , যান , এখন আমার অনেক কাজ আছে , আর বিরক্ত করবেননা । যান ।

আমরা আপনাকে আরো একমাস সময় দিলাম এমপি সাহেব । এই এক মাসের মধ্যে আপনাকে এই টাকা খরচের বিষয়ে কি করা হল , তা বলতে হবে । আজিজ বলেন উত্তেজিত কন্ঠে ।

না হলে ! না হলে কি করবেন আপনি ? উত্তেজিত কন্ঠ শোনা গেল এমপির ।

তা হলে বলি , স্পষ্ট কন্ঠে বলেন আজিজ , ভেবেছিলাম আপনি সন্মানিত লোক , আপনাকে এভাবে কথা বলতে হবেনা । যা হোক , উক্ত সময়ের মধ্যে এবিষয়ে ব্যাবস্থা গ্রহন না করলে ইউনিয়নব্যপী এমন বিক্ষোভ সৃষ্টি করা হবে যে , আপনি হিসাব দিতে বাধ্য হবেন । বলে প্রস্থান করতে উদ্যত হলেন তাঁরা ।

সঙ্গীরা ততক্ষনে উঠে দাড়িয়েছে । এমপি সাহেবের দিকে তাঁদের চোখ , নির্দ্দেশের অপেক্ষায় । কিন্তু না , কিছুই বললেননা তিনি । ঘটনার আকস্মিকতায় বিমূঢ় হয়ে পড়েছেন তিনি নিজেও ।

আজিজ সামাদকে ওয়ার্ড কমিটিগুলি সম্পন্ন করার তাগিদ দিয়ে অন্যত্র চলে গেলেন , কিছুসময় একা থেকে ভাবা দরকার তাঁর ।

নিজের স্কুল থেকেই শুরু করা দরকার তাঁর , এখান থেকেই তাকে শুরু করতে হবে ।

দিন দুয়েক পর স্কুল ছুটির পর স্কুলের বিরাট হলরুমে জমায়েত হয়েছে স্কুলের উচ্চ শ্রেনীর ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে পাশের কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা । তাদের প্রিয় এই শিক্ষক কি বলেন , তা শোনার জন্য তারা বসেছে অনেক আগ্রহ নিয়ে । জানে তারা , এমনি এমনি ডাকেননি তাদের এই স্যার ।

দেরী না করে আজিজ এলেন । জানেন , স্কুল ছুটির পর কিছু শোনার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে শিক্ষার্থীরা । কোন ভূমিকা না করে বলতে শুরু করলেন তিনি ।

আমার প্রিয় ছাত্র-ছাত্রীরা , তোমাদের একমাত্র কাজ শিক্ষা গ্রহন । তবে তোমাদের বাসায় যদি কোন চুরিদারি , আরো পরিষ্কারভাবে বললে , তোমাদের পাওনা টাকা যদি তোমদের না পাওয়ার মত কোন ঘটনা ঘটে , তখন তোমরা নিশ্চয় চুপ করে থাকবেনা । জানি , অধিকাংশই তোমরা দরিদ্র ঘরের সন্তান । এই এলাকার উন্নয়নের জন্য , তোমাদের বাবারা-মায়েরা কাজ করবেন তার জন্য সরকার কিছু অনুদান দিয়ে থাকে । সেই অনুদান যদি কেউ তোমাদেরকে না দিয়ে নিজেরা হজম করে নেয় , তবে তোমাদের কোন দায়িত্ব থাকে কি-না সেটা উদ্ধারের ?

থাকে স্যার , থাকে স্যার । সমস্বরে শোনা যায় ।

আবারো বলি পড়াশোনা করাই তোমাদের প্রথম কাজ ; তবে দেশের তথা এই ইউনিয়নের মানুষ হিসেবে ইউনিয়নে অন্যায়-অবিচার কিছু হলে সেগুলো রুখাও তোমাদের কর্তব্যের বাইরের কোন বিষয় নয় । তোমরা কেউ কেউ হয়তো জেনে থাকবে , এ-বিষয়ে মাননীয় এমপির সাথে আমাদের কয়েকজনের কথা কাটা-কাটি হয়েছে গম-চাল-টাকার হিসাব চাওয়ায় । আমাদের কথা, আমরা কাউকে  আমাদের প্রাপ্য সম্পদ লুটপাট করতে দিবনা । আমরা এমপি সাহেবকে মাস সময় দিয়েছি ; এর মধ্যে তিনি যেসমস্ত অস্তিত্ববিহীন প্রতিষ্ঠানের নামে বরাদ্দ দিয়েছেন, যেগুলির তালিকা আমাদের কাছে রয়েছে, সেগুলির বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যাবস্থা নিবেন । হয় তিনি সেই প্রতিষ্ঠানগুলি বানিয়ে বরাদ্দ মোতাবেক অর্থ খরচ করবেন অথবা টাকাগুলি অতি দরিদ্রদের মধ্যে বিলিয়ে দিবেন । মোট কথা, প্রান্তিক দরিদ্রদের নামে যে টাকাগুলি সরকার প্রদান করে, তা কাউকে আমরা মেরে খেতে দিবনা । তোমাদের এসব বলা হল এজন্য যে, আমাদের একার পক্ষে এসব বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহন করা যদি সম্ভব না হয়, তবে তোমরা এগিয়ে আসবে । এটা তোমাদেরই কাজ এবং প্রয়োজনে তোমাদেরকে এগিয়ে আসতে হবে ।

তোমরা জানো, আমাদের রাজনীতি করার কোন ইচ্ছা নাই এবং হবেওনা । তবে ন্যায়ের পথে এই ইউনিয়ন যাতে সবসময় থাকে, সেবিষয়ে আমরা সবসময় সজাগ থাকবো এবং তাতেও যদি কাজ না হয়, তবে আমরা কর্তৃপক্ষকে চাপ প্রয়োগ করে তা করতে বাধ্য করবো । আগামী এক মাস এই ঘটনার প্রতিবাদস্বরূপ প্রতি শুক্রবার বৈকাল ৪ ঘটিকা থেকে ৬ ঘটিকা পর্যন্ত এই কলেজমাঠে আমরা বসে থাকবো । তোমাদের যাদের পড়াশোনা অথবা অন্য কোন কাজ থাকবে, তারা এসোনা । তোমরা তোমাদের পড়াশোনা অক্ষুন্ন রাখবে, কারন এটাই তোমাদেরকে আলোকিত করার একমাত্র পথ এবং এটা হেলায় হারালে অথবা এতে অলসতা করলে জীবনে পস্তাতে হবে মনে রাখবা । আপাততঃ আর কোন কথা নাই, ধন্যবাদ ।

চার সপ্তাহের শেষ সপ্তাহ আজ । গত তিন সপ্তাহের চেয়ে আজকের জমায়েত অনেক বেশী ঘন । কেমন যেন একটা গুমোট ভাব দেখা যায় সারা মাঠময় । আগের জমায়েতগুলিতেও ছাত্র-শিক্ষক, বিভিন্ন, বিশেষতঃ ছোট ব্যবসায়ীদের, এমনকি পাশের ইউনিয়নেরও অনেক মানুষ এসেছিলেন । ধীরে ধীরে এই জমায়েত সমৃদ্ধ হয়েছে । কথাবার্তাও কেউ কেউ বলেছেন । তবে কিছু বলেননি আজিজ । ঠিক চারটায় এসেছেন তিনি । ওয়ার্ড কমিটিগুলির সাথে মতবিনিময় করেছেন আর সমাবেশ দেখেছেন । একমাস শেষ হয়ে যাচ্ছে । আজ তিনি বলবেন এবং নতুন কর্মসূচী দিবেন । সামাদের বক্তব্য শেষ হতে চলেছে । ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি , এমন সময় মাঠের দুই প্রান্ত থেকে হইচই শুরু হচ্ছে । কারা যেন ধর ধর করতে করতে মঞ্চের দিকে ধাবিত হয়ে আসছে ।

এমন সময় সামাদকে সরিয়ে মাইক নিলেন তিনি এবং বললেন, ভাইসব আপনারা ভয় পাবেননা । আমি জানি এরা কারা অর্থাৎ যারা গম-চাল-টাকা লুটের হিসাব দিতে চায়না, হামলা তারাই করছে । ভাইসব, আপনারা হতভম্ব হবেননা , মেরুদন্ড খাড়া করে থাকুন ; কিচ্ছু হবেনা । ওদের ভয় আছে , ওরা—(চলবে)

২১২জন ২১২জন
0 Shares

৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য