গল্পটা যেমন ছিলো

সাবিনা ইয়াসমিন ১৮ জুলাই ২০১৯, বৃহস্পতিবার, ০৩:৩৭:১৩পূর্বাহ্ন গল্প ২৭ মন্তব্য

১_

নিমচাঁদ ও সানাই একে অপরকে ভালোবেসেছিলো খুব দ্রুত। যত দ্রুততায় ঘড়ির কাটা না ঘুরে, যত দ্রুততায় বুনো ঘোড়া না ছোটে, তারচেয়েও অধিক দ্রুততম দ্রুততায় প্রেম হয়েছিলো তাদের মাঝে। কত কথা, কত গান, কত ছবি এঁকেছিলো পথে-প্রান্তরে..সময়ের বাঁকে বাঁকে।

– সানাই, তোমাকে কেন এত ভালোবাসি জানো?

– নাহ! জানিনাতো কেন?

– তোমার মাঝে একটা সরলতা আছে। ঐ সরলতা আমাকে তোমায় অকৃত্রিম ভাবে বুঝতে সাহায্য করেছে। এই জন্যে ভালোবাসি

– তাই? কিন্তু আমি তোমাকে বুঝতে পারিনা। যখনই বুঝতে পেরেছি বলে মনে হয়, তখনই তোমার কোনো না কোনো বদলে যাওয়া রূপ দেখতে পাই।

– সহজ ভাবে ভাবলেই আমাকে বুঝতে পারবে। কই আমিতো তোমাকে ঠিকই বুঝে ফেলেছি। কোনো সমস্যাই হয়নি।

– আমি হলাম এক পাতায় লেখা অল্প সংখ্যার ছোট কবিতা। তাই আমাকে বুঝতে তোমার কষ্ট হয়নি। কিন্তু তুমি! হাজার পাতায় লেখা এক মহাকাব্য। শত পড়লেও পুরোটা বোঝা যায়না। শেষ পৃষ্ঠায় গিয়ে আবার প্রথম পাতায় ফিরতে হয়।

২_

একদিন দুজনের হঠাৎ অকারণ মনোমালিন্য! সানাই নিমচাঁদ কে বুঝতে পারছেনা। নিমচাঁদ অভিমান ভরা মনে সানাই কে চিঠি দিলো..

সানাই..
তুমি কি জানো কতটুকু ভালোবাসি তোমাকে? জানতে চাইলে আমাদের একান্তে কাটানো সময়গুলোর কথা ভেবে দেখো। তোমাকে বলা সমস্ত কথাগুলো মনের কানে বারবার শোনো। এতো বোঝাই তবুও বুঝো না? অনেক ভালোবাসি।
তুমি যদি কখনো আমাকে ছেড়ে যেতে চাও, তাহলে চলে যেও। বাঁধা দিবো না। আমি তোমার হাত কখনো ছাড়বো না। তবে তুমি যদি নিজের ইচ্ছেয় আমার সাথে ব্রেকআপ করো, তাহলে চাইলেই ফিরিতে পারবে না। আমার শর্ত মেনে ফিরতে হবে।

শর্তটা বেশ সোজা। হিল্লা প্রেম করতে হবে তোমাকে। হিল্লা প্রেমটা হলো হিল্লা বিয়ের মতো। হাজব্যান্ড ওয়াইফ যখন একে অন্যকে তালাক দেয়ার পর আবার একত্রিত হতে চায়, তখন ওয়াইফ কে অন্য এক লোকের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে হয়। পরে ২য় হাজব্যান্ড তালাক দেয়ার পর প্রথম হাজব্যান্ডকে পুনরায় বিয়ে করাকে হিল্লা বিয়ে বলে। আমাদের মাঝেও আমি ঐ নিয়ম চালু করলাম। তুমি যদি আমাকে একবার ছেড়া যাও তাহলে আমার কাছে ফেরার আগে তোমায় অন্যকারো সাথে প্রেম করে, ব্রেকআপ নিয়ে তারপর ফিরতে হবে।

ইতি
নিমচাঁদ

৩_

সানাই এই চিঠি পড়ে হাসবে না কাঁদবে বুঝে উঠতে পারছে না। এটাও কি সম্ভব! এমন শর্ত দিয়ে প্রেম হয়? এরপর থেকে নিমচাঁদ ধীরে ধীরে আরও অচেনা হয়ে যেতে লাগলো। সানাই আগে তাকে যাওবা বুঝতো এখন একেবারেই হতাশা জনক ভাবে ব্যর্থ! কারণ নিমচাঁদের কথায় আর কাজে সে কোনো মিল খুঁজে পায় না।

তারপর, একদিন সকল কল্পনার অবসান ঘটিয়ে নিমচাঁদ সানাইয়ের জীবন থেকে বিদায় নিলো। প্রেম যেমন দ্রুততায় হয়েছিলো, ব্রেকআপ টা অবশ্য অত দ্রুততায় হয়নি। সানাইটা বড্ডো সরল ছিলো। পরিচ্ছন্ন পানিতে জীবাণু খুঁজে দেখার মতো একজোড়া চোখ তার কোনো কালেই ছিলো না। সে তার সরল চোখজোড়া দিয়ে নিমচাঁদের খুব সহজে চলে যাওয়া দেখতে লাগলো…

৪_

নিমচাঁদ আজ ভীষন আনন্দিত। সে তার অপরাজিতার কাছে ফিরে যাচ্ছে। একদিন ছোট ভুল বোঝাবুঝির কারণে অপরাজিতার সাথে খুব ঝগড়া হয়েছিলো। তারপর কতবার তার কাছে ক্ষমা চেয়েছে। কিন্তু ওর কোনো কথাই শুনেনি অপরাজিতা। শর্ত দিয়েছে, তার কাছে ফিরতে হলে আগে অন্যকোনো মেয়ের সাথে রিলেশন করতে হবে। অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে সেই রিলেশন চালিয়ে যেতে হবে। এরপর যদি সেই মেয়ে স্বেচ্ছায় ব্রেকআপ নেয়, তাহলেই নিমচাঁদ অপরাজিতার কাছে ফিরতে পারবে।

আজ শর্ত পালন শেষ। সানাইয়ের উপর ব্রেকআপ এর অপবাদটা দারুন ভাবে চাপানো গেছে। মেয়েটা একদম বোরিং ছিলো। খুব কষ্ট হয়েছে ওর সাথে এতদিন মিথ্যে প্রেমের অভিনয় করতে। মনে মনে সানাইয়ের ধৈর্যের প্রশংসা করতে ভুলে না। আর হ্যা, অনেক সরল ছিলো। তাইতো ওর সাথে রিলেশনে জড়াতে সাহস পেয়েছে। সততার প্রশংসাও না করলেই নয়। ওর সাথে যত কিছুই করেছে কখনো কারো কাছে মুখ খুলবে না। বিশ্বাস করা যায়।

৫_

সানাই এতদিনে তার নামটা নিয়ে খুশি হয়েছে। মানুষ সানাই বাজায় আনন্দের সময়, খুশির সময়। যদিও সানাইয়ের সুর তখন অত্যন্ত করুণ শোনায়। তাতে কী? কজনই করুণ সুরে কানপাতে! আজ সানাই নিমচাঁদ নামক কাব্যগ্রন্থটা বুঝে নিয়েছে। বুঝেছে, সব কিছু পড়তে হয়না। কিছু বুঝ-বোধ সময়ের সাথেই আসে।

★ সানাই ফিরে যেতে পারেনা। যে সুর আকাশে-বাতাসে ছড়িয়ে যায়, তাকে কেমন করে স্বরতন্ত্রীতে ফেরত নেবে? কিছু জানেনা। সানাইটা খুব সরল, বড্ডো বোকা…

৩২৪জন ৭৩জন
27 Shares

২৭টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য