গল্পঃ তোর পিছু

হিলিয়াম এইচ ই ৪ জুলাই ২০১৫, শনিবার, ০২:০৩:২৮অপরাহ্ন গল্প, বিবিধ ২২ মন্তব্য

সূর্য এখন আর নেই, তবুও সে তার অস্তিত্ব জানান দিয়ে যাচ্ছে। পশ্চিমের আকাশটা এখনও লাল হয়ে আছে। গাছগুলো ছায়া মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে ভয় দেখানোর চেষ্টায় আছে। সেই কখন থেকে ঝিঁঝিঁ পোকাগুলো ডেকে চলেছে। তাদের চিৎকার শুনতে শুনতে অতিষ্ঠ হয়ে যাচ্ছি। রাণু গান ধরলো। রাণুর গানের গলা বেশ ভালো। সে গানে আমি আমার মগজের শুকনো জমিতে কিছু শব্দ আর ছন্দের চাষে ব্যাস্ত হয়ে পড়লাম। আকাশের দিকে তাকাতেই স্মৃতির কলসি ভেঙ্গে একঝাঁক ছবি ছড়িয়ে পরলো এদিক সেদিক।

এক সময় নিজেকে মেঘই ভাবতাম, উড়েছিলাম পাহাড়ের গা বেয়ে, ছুঁয়েছিলাম প্রকৃতি। কাঁচ জলে পা ভিজিয়ে ভেবেছিলাম বাসা বাঁধব ঐ সাঙ্গু পাহাড়ে, নীল আকাশের মায়ায়। তারা গুনতে গুনতে কাটিয়ে দেব রাত। তখন আমার ডানা ছিল স্বপ্নময়। মেঘে মেঘে স্বপ্ন এঁকেছিলাম বিষণ্ণ নীল ক্যানভাসে।

কিছুদিন ধরেই আমার ঘরের মেঝেতে মনখারাপের ধুলো জমা হচ্ছে। আজ সেখানে ঢুকে দেখলাম আনন্দের পায়ের ছাপগুলো প্রায় অদৃশ্য হয়ে এসেছে। কোনায় কোনায় বাস্তবতার মাকড়শার ঝুলে ছেয়ে গিয়েছে। কখনো ভাবিনি বীণা আমার সাথে এমনটা করবে। আমার ডানা কেটে রক্তাক্ত আমি। কিন্তু স্বপ্নগুলোর ওপরে একটু ধুলোও জমতে দেই নি। সেগুলো এখনও আগের মতোই আছে।

বীনার সাথে আমার প্রথম দেখা বেশ আগে। পাহাড়ের কোন এক মেলায় বিকেলে তাকে আমি দেখেছিলাম। সেই দেখায় আমি মনে মনে তার ছবি এঁকেছি। ছিপছিপে শরীরটাকে স্বর্ণলতার মতো জড়িয়ে ছিল একটা লাল শাড়ি। আমি আঙ্গুলের সকল মমতা দিয়ে ধরেছিলাম কালো কালির একটা বলপয়েন্ট। একচিলতে বিকেলের রোদ তার চুল আর চোখের কার্ণিশ বেয়ে নেমে এসে আমার মনের খাতার কোন এক কোণে লক্ষী বেড়াল হয়ে বসেছিল।

আমি চাইছিলাম মেয়েটার সাথে কথা বলতে। আর তার জন্য আমি পিছু নিয়েছি। বেশ খানিকটা পথ পেড়িয়ে এলাম। হাঁটার গতি বাড়িয়ে অবশেষে তাকে ধরেই ফেললাম। হাঁটতে হাঁটতে জিজ্ঞেস করলাম,
– তোর নাম কি?
– তুই কে? কোথায় থাকিস?
– আমি এখানেই থাকি। এবার বল তোর নাম কি?
– আমার নাম দিয়া তুই কি করবি?
– এমনেই জানতে চাইলাম। থাকস কই?
– সামনের পাহাড়ের চূড়ায়।
– ওইখানে তো রাজায় থাকে।
– হ আমি ওনেই থাকি।
রাজার বয়স অনেক। বুড়ো রাজার মাসখানেক আগেই প্রথম স্ত্রী মারা যায়। তাছাড়া সে লোক ভালো। আমাকে বেশ আদর করে। আমিও তাকে যথাযথ সন্মান দেই। বুড়োর কাছে আমার কিছু কাজ ছিল। সেদিকেই যাচ্ছি।
– এবার নামটাতো বল?
– বীনা।
– বাজাতে পারিস?
– তুই কি চাস?
– তোরে চাই।
– ফাইজলামি করিস না।
– ফাইজলামি না, তোরেই চাই।
– দূরে গিয়া মর।
– মরলেও তোরে চাই।
– তুই জানিস আমি কে?
– তুই প্রধানমন্ত্রীর মাইয়া হইলেও তোরে চাই।
– আমার কাছে দা আছে। এক কোপে তোর কল্লা কাইট্টা দিমু।
– দে। তাও তোরে চাই।
রাজা ভালো লোক। তার কাছে অনেক অবিবাহিত ছেলে মেয়ে থাকে। আমি বীনাকে চাইলে সে মানা করবে না। দিয়া দিবে। তাই সাহস করেই বললাম। তাছাড়া সে আমাকে বেশ আদরও করে।
– আমার পিছু নিস না। যা ভাগ।
– ভাগুম কই? আমি রাজার বাড়িত যামু।
– ঐখানে গেলে অন্যপথ দিয়া যা। পিছু নিস না, লোকে মন্দ বলবে।
– এদিক দিয়াই যামু। তোর বাপের কাছে গিয়াও আমি তোরে চামু ।
– হেয় আমার বাপ না।
– তোর বাপ না?
– না।
– তাইলে কে?
– আমার স্বামী।

বিশাল বড় একটা ধাক্কা খেলাম আমি। মনে হচ্ছিল হাত থেকে কি যেন একটা ছুটে যাচ্ছে। ধরে রাখার চেষ্টা করছি, কিন্তু কিছুতেই সেটা নাগালে আসছে না। একবার মেলায় ১০ টাকা দিয়ে চাকা ঘুড়িয়েছিলাম। লক্ষ্য ছিল ১ কেজি চাল। কাঁটা টা চালের ঘরে পরেছিল ঠিকই কিন্তু চাকার বেগ একটু বেশি থাকায় ভাগ্যে জুটেছিল পাশের ঘরে থাকা একটা চকলেট। মারাত্মক আফসোস হয়েছিল বটে। হতে হতেও হল না। হাত থেকে ফসকে গেল। আজ আমার সেই অনুভূতি হল। সত্তর বছরের বুড়ো যে তার প্রথম স্ত্রীর চেয়ার পূরনের জন্য আরেকটা বিয়ে করবে কল্পনাও করিনি। তাছাড়া তার আরোও পাঁচ টা বউ আছে। কিছুদিনের জন্য এখানে ছিলাম না বলে এতকিছু হুট করে হয়ে যাবে ভাবিনি কখনো। আমি নির্বাক হয়ে দাড়িয়ে রইলাম। বীনা খিলখিল করে হাসতে থাকে।
– কিরে বোল বন্ধ হইয়া গেল?
– নাহ …. কি আর কমু!
– কি কইবি? এতোক্ষণ যা কইতাসিলি।
– কেন? ভাল্লাগছে তোর?
– হ
– লবি আমার লগে?
– কোনে?
– সাঙ্গু পাহাড়ে।
– ওইহানে গ্যালে তো কেও ফিরে না।
– আমরাও ফিরুম না।
– পালামু?
– হ, পালাবি।
– আমারে রাখবি তুই?
– রাখমু। সারাজীবন।
– খাওয়াবি কি?
– আমার পাতের অর্ধেক?
বীনা হাসতে থাকে। ওর হাসি পাহাড়ের গায়ে গায়ে মিলিয়ে যেতে লাগলো। আর আমিও পড়ে গেলাম, ওর হাসির প্রেমে। বাতাসে ওর ঘন কালো চুলগুলো আমার মুখে এসে পড়ছে। আর কি দরকার এ জীবনে? একজন অন্ধ হয়তো এই অনুভূতি নিয়েই পার করে দিতে পারে বাকিটা জীবন।

সেদিন থেকে আমার আর বীনার রহস্যময় বন্ধুত্ব। বীনার জন্য রোজ রোজ রাজার বাড়িতে যাতায়াত করতে লাগলাম। রাজার সব কাজেই সাহায্য করতে লাগলাম। খুটিয়ে খুটিয়ে কাজ আবিষ্কার করে সাহায্য করলাম। আর বেশি সময় তার বাড়িতে থাকতে লাগালাম। এসময় অবশ্য বীনা আমার সামনে আসতো না। তবে দূরে থেকে ওর দেখা পেতাম মাঝেমধ্যে। আর তাই তো এতকিছু করা। আমার কাজ শেষ হলে ফেরার পথে নির্দিষ্ট একটা জায়গায় বীনার জন্য অপেক্ষা করতাম। দুজনে মিলে গল্প করবো বলে। মাঝে মাঝে দুজন নদীর কাছে চলে যেতাম। আমার ছোট্ট নৌকায় দুজনে বসে গল্প করতাম, উড়ে যাবার স্বপ্ন বুনতাম। সেদিন স্বপ্নের কথা বলতে বলতে আমি বীনার হাত ছুঁয়ে ফেলি। আর তাতেই কাজ সেরেছে।
– তুই আমার হাত ধরলি কেন?
বীনা মারাত্মক রেগে গেল। বীনা আমাকে পারলে মুখ দিয়ে জুতিয়ে দেয়। পারলে তখনই রাজাকে ডেকে এনে পিটিয়ে গোত্র ছাড়া করে দেয়। আমি হতবাক হয়ে যাই। সামান্য হাত ধরাতেই বীনা এতোটা হিংস্র হয়ে যাবে বুঝিনি। সামান্য একটু ছোঁয়াতেই এতো ভয়ংকর? তাহলে পাহাড়ের স্বপ্নগুলো কি নিছক খেলা ছিল? বীনার কোন কথার জবাব দিতে পারিনি হতবাক আমি। রেগেমেগে বীনা চলে যায়, আমি দাঁড়িয়ে থাকি। সামনেই পূর্ণিমা আসবে। তার পরের দিনই পাহাড়ের উদ্দেশ্যে রওনা দেবার কথা ছিল। বীনাও এতে পূর্ণ সম্মতি জানিয়েছিল। আর ওর কথামতো নৌকা ঠিক করে রাখা। এখন তো আর বীনা আসবে না। নৌকা করে যাব, তারপর অনেকটা হাঁটার পথ, তারপর সাঙ্গু পাহাড়। পাহাড়ে বসতি। কোন কিছুই এখন হবে না।

আকাশের দিকে তাকিয়ে বেশ খানিকটা সময় কাটিয়ে দিলাম। পূর্ণিমার চাঁদ কে মেঘেরা ঢেকে দেয়ার চেষ্টা করছে। আমার দীর্ঘশ্বাস দীর্ঘ থেকে দীর্ঘ হয়। বীনার জন্য আমি আমার যাত্রা বাতিল করবো না। কালকে রওনা দিতে হবে। বীনাকে ভুলতেও পালাতে হবে এখান থেকে।
– ওই গান থামা। বাড়িত যা।
– তুমি বাড়ি যাবা না?
জিজ্ঞেস করে রাণু।
– না যামু না।
– আইজকাও নৌকায় রাইত কাটাইবা?
– তুই বাড়িত যা তো।
– যাইতাছিগা।
রাণু খানিকটা বিরক্ত হয়ে চলে গেল। ইদানিং আমার যে মেজাজ খারাপ সেটার কারণ ও জানবে কি করে? শুধু শুধুই বেচারা ধমক খাচ্ছে। মাঝেমাঝেই রাত কাটাই নদীতে। নির্জন একটা স্থানে নৌকা বেধেঁ রাখি। সেখানে লোকজন আসে না। কোনমতে রাতটা পার করে দিলাম।

পরদিন সকাল, আমি আমার যাত্রার ব্যাবস্থা করতে লাগলাম। নৌকো টা ভালোমতো মেরামত করতে হবে। তার জন্য বাজারে গেলাম জিনিসপত্র কিনতে! আর এই নৌকা মেরামত করতেই সারাদিন চলে গেল। সন্ধ্যার দিকে রাণু এল।
– রাজায় তোমারে ডাকসে।
বুকের ভেতরটা ছ্যাত্ করে উঠলো। বোধহয় বীনা রাজার কাছে আমার নামে নালিশ করেছে। রাজার কথার অবাধ্য হইনি কখনো, আজ পর্যন্ত কাওকে হতেও দেখি নি। কিন্তু আমার যাওয়া সম্ভব না। গেলেই আমাকে শেষ করে দিবে। ভয় লজ্জা দুঃশ্চিন্তা আমাকে কুঁকড়ে খেতে শুরু করলো।
– কি হল? যাবা না?
– না যামু না।
– রাজা ডাকসে। আর তুমি যাইবা না?
– কইলাম তো না। রাজারে গিয়া কইস আমার অনেক জ্বর। আইতে পারুম না।
রাণু দাঁড়িয়ে ছিল কিছুক্ষণ। কি জানি কি মনে করে চলে গেল। আমিও আমার কাজে মনোযোগ দিলাম। বাজারে যেতে হবে কিছু মালামাল কিনতে হবে। ভেগে যাচ্ছি কিছু না থাকলে তো মরতে হবে। আবারও বাজারে গেলাম। বাজার থেকে পুবে তাকালে রাজার বাড়ি দেখা যায়। নিচে তখন সন্ধ্যা, কিন্তু পাহাড়ের উপরে বাড়িটাতে এখনো সূর্যের আলো এসে পড়ছে। বারান্দাটা দেখা যাচ্ছে। বীনা এই বারান্দাতে বসে গান গাইতো। একবার লুকিয়ে লুকিয়ে ওর গান শুনতে গিয়ে ধরা পড়েছিলাম। বীনা কি যে লজ্জা পেয়েছিল। থাক সে কথা। বীনাকে কিছু বলার সুযোগই পেলাম না। বুকের ভেতর অচিন একটা ব্যাথা অনুভব করলাম। ঘাটের দিকে রওনা দিলাম। ঘাটে গিয়ে আরেকটা হোঁচট খেলাম। নৌকা টা যেখানে বাধাঁ ছিল সেখানে নেই। এখানে তো মানুষজন আসে না। তাছাড়া চুরি ডাকাতি কিছুই তো হয় না। তাহলে নৌকা টা গেল কই। তবে কি শাস্তি স্বরূপ রাজা আমার নৌকাটা নিয়ে গেল? ভয় বাড়তে লাগলো আমার। কি করবো আমি এখন? হঠাৎই ছলছল আওয়াজ আসতে লাগলো। চাঁদের আলোতে নদীতে নৌকার মতো কিছু একটা দেখতে পেলাম। চিৎকার করতে লাগলাম। পাহাড়ের গায়ে ধাক্কা লেগে অবশেষে আমার আওয়াজ চোরের কান অবধি পৌঁছাল। চোর দেখি নৌকা ঘুড়িয়ে ঘাটের দিকে আসছে। অনেক সাহসী চোর দেখছি। তখনই মনে হল এটা বোধহয় চোর না, ডাকাত। ছুরিটা বের করলাম। নৌকা ধীরে ধীরে ঘাটে আসলো। কিন্তু আমিতো নৌকায় একজন ছাড়া আর কাওকেই দেখছি না। চাদর দিয়ে আগাগোড়া মোড়ানো চোর লাফ দিয়ে তীরে নামলো। এগিয়ে আসছে ধীর পায়ে। আমিও আমার প্রস্তুতি নিলাম। কাছে এসে চাদরটা উঠালো সে। নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছি না, এ যে বীনা।
– রাণুকে পাঠিয়েছিলাম। বললো, তোর নাকি জ্বর?
– জ্বর ছিল। চইলা গেসে।
– কি আনলি দেখি? কিরে আমার জন্য কিছুই আনোস নাই?
– ভাবসিলাম তুই যাবি না।
– আমারে ছাড়া ঐ পাহাড়ে থাকবি কেমনে রে পাগল?

৩৬৩জন ৩৬৩জন
0 Shares

২২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ