(১)
লাবনীর সাথে ব্রেকআপের পর আমি এতটাই ভেঙে পড়েছিলাম যে, কোন মেয়েকে কিছুতেই আর বিশ্বাস করে উঠতে পারছিলাম না। অনেক চেষ্টা স্বত্ত্বেও ট্রমা থেকে বের হতে পারছিলাম না। বিষণ্ণতা প্রতি মুহুর্তে আমাকে গ্রাস করছিল একটু একটু করে।আমি যেন অনন্ত নরকের পথে হেটে চলেছিলাম উদ্দেশ্যহীনভাবে।
মনের দিক থেকে এতটাই বিক্ষিপ্ত ছিলাম যে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটার হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য মেয়েদের সংসর্গ সব ক্ষেত্রে এড়িয়ে চলতাম।মনে মনে ঠিক করছিলাম নাহ এ জীবনে প্রেম বা বিয়ে কোন পথেই আর পা বাড়াবো না।একা একাই কাটাবো বাকি কটা দিন।
কিন্তু মাস ছয়েক যেতে ক্রমে ক্রমে মন কিছুটা শান্ত হলো।লাবনীর ছায়া আস্তে আস্তে সরে যেতে লাগলো আমার জীবন থেকে। আবার আগের ছন্দে ফিরছিলাম ঠিক সেই সময় আমার বন্ধু তুহিন আমার জন্য একটা বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এলো।সংগত কারনে আমি বিরক্ত হয়ে মানা করে দিলাম।
অবশ্য তুহিনের অনেক অনুরোধের পর আমি বিয়ে প্রসঙ্গ বাদের শর্তে শুধুমাত্র মেয়েটির ছবি দেখতে রাজি হলাম। আসলে তুহিন আমার প্রাণের বন্ধু যাকে বলে জিগরী দোস্ত। ও আমার সুখ দুঃখের একমাত্র সঙ্গী সেই স্কুল লাইফ থেকে। ওকে কোনভাবেই কষ্ট দেওয়া সম্ভব না।
শুধু ওর মন রাখার জন্য বললাম
– ছবি রেখে যা আমি পরে দেখে নেব।
অবশ্য এটা ছিল এড়িয়ে যাওয়ার চমৎকার একটা অযুহাত।যত ভালোই হোক কোন মেয়েকে আমার চাই না।
কিন্তু পরদিন সকালে ঘুম ভাঙতে কি কারণে কে জানে ঘরের মেঝের দিকে চোখ আটকে গেল। সেখানে অচেনা একটি মেয়ের ছবি পড়ে থাকতে দেখে আনমনে আলস্য নিয়ে তাকিয়ে রইলাম।এক দৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কখন জানি হিপটোনাইজড হয়ে গেলাম ছবিটির প্রতি।শত চেষ্টাতে আমি কিছুতেই চোখ ফেরাতে পারছি না। অদ্ভুত তো!
এত মোহময়ী চেহারা আমি এ জীবনে দেখি নি।ছবির মেয়েটি আমাকে অন্যরকম আকর্ষণে আবদ্ধ করলো।
ঠিক তখনই তুহিনের ফোন এলো
– হ্যালো?
– অপূর্ব শোন,আজ বিকালে বাসায় থাকিস?
– কেন?
– থাকতে বলছি থাকবি ব্যস। জরুরী কাজ আছে, বাসায় এসে বিস্তারিত বলব।
– তুই কখন আসবি?
– চারটা নাগাদ।
– আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।একটু হিন্টস দে।
– সময় হলে জানতে পারবি।আর হ্যাঁ একটু চকচকে হয়ে থাকিস।
– চকচকে মানে?
– কি বোকা বোকা বিহেভ করছিস।যা বলছি মন দিয়ে শোন।Be smart । ভুল যেন না হয়।
(২)
পরিপাটি ড্রইংরুমে আমরা দুজন চুপচাপ বসে আছি।চারিদিকে বাড়াবাড়ি রকমের আভিজাত্যের ছড়াছড়ি। এই বাড়ির বাসিন্দাদের রুচির তারিফ করতেই হয়।পুরো ড্রইংরুমটা এ্যন্টিকের বিশাল এক সংগ্রহশালা।বেশ হকচকিয়ে গেছি দুজনে মাঝেমাঝে একে অন্যের সাথে চোখাচোখি করছি কিন্তু কোন এক অদ্ভুত কারণে আমরা কেউ কারও সাথে কোন কথা বলছি না।কোন কোন সময় কোন কোন পরিবেশ পরিস্থিতিতে নিরবতাই কাঙ্খিত।
সমস্ত বাড়িটা জুড়েই অপার্থিব নিস্তব্ধতা।বাড়ি সংলগ্ন বাগানের গাছগুলি জানালা দিয়ে ঘরের মধ্যে উঁকি দিয়ে আমাদের দেখছে। কিন্তু এত গাছগাছালির ভীড়ে কোন পাখীর ডাক নেই।অপার্থিব মুগ্ধতায় পাখীরাও বুঝি গান গাইতে ভুলে গেছে এই সময়।শনশন বাতাস বইছে। আশ্চর্য এক বিষণ্ণতা চারপাশের পরিবেশকে নিঃশব্দে গ্রাস করেছে শৈল্পিক শূন্যতায়। বর্তমান পরিস্থিতি খুব সহজে আমাদেরকে রহস্যময় অজানা কোন এক কল্প জগতে টেনে নেওয়ার জন্য প্রচ্ছন্ন আমন্ত্রণ জানাচ্ছে যেন।
আমার নিজের কাছে মনে হচ্ছে আমি যেন বিষন্ন নগরীতে বন্দী কোন রাজকন্যাকে উদ্ধার অভিযানে এসেছি। সীমা সেই রাজকন্যা।
আমরা বসে আছি তো বসে আছিই।হালকা স্বরে রবীন্দ্র সংগীত বেজে উঠলো কোথাও তবে এতটাই মৃদু স্বরে যে মনে হলো অপার্থিব কোন সুর ভেসে এলো আমাদের কানে।আমাদের শরীর মন অলীক মোহাচ্ছন্নতায় আবিষ্ট হলো।
অনেকটা পরে একজন সম্ভ্রান্ত ভদ্রমহিলা ড্রইংরুমে প্রবেশ করলেন।পেছনে পরিচারিকার হাতে রেকাবিতে নানা পদের খাবার। আমরা গৃহকর্ত্রীকে সম্মান জানাতে উঠে দাড়ালাম।সালাম দিলাম।
মিষ্টি স্বরে ভদ্রমহিলা বললেন
– না না ঠিক আছে বসো বসো আরাম করে বসো।আসতে পথে কোন অসুবিধা হয় নি তো তোমাদের? কিছু মনে করো না দেরি করিয়ে দিলাম।
আমরা সজোরে মাথা নাড়লাম।
ভদ্রমহিলা মৃদু হেসে বললেন
– ও মা মুখে তো কিছু বল। লজ্জা পেলে হবে?
আমি বললাম
– না তেমন কোন অসুবিধা হয় নি আন্টি।
আচ্ছা তোমাদের মধ্যে পাত্র কে? নিজের অজান্তে বাড়তি সচেতনতায় আমি জামা কাপড় টেনেটুনে ঠিক করতে লাগলাম।তাই দেখে ভদ্র মহিলা মিষ্টি হেসে বললেন
– ও বুঝেছি।আমাকে বলতে হবে না। তোমার সম্পর্কে আগেই যা জানার সব জেনে নিয়েছি।এখন সামনাসামনি দেখলাম,বেশ ভালো লাগলো। আমার কিন্তু তোমাকে পছন্দ হয়েছে।
আমরা আবারও মুখ চাওয়া করলাম।ভদ্রমহিলার কথায় আমি মুগ্ধ।তবে সীমার মতামতটা জরুরী। এই সময় এক সমুদ্র নীল নিয়ে হাজির হলো সীমা।ছবির চাইতেও সুন্দর সে।এক কথায় অপূর্ব ।ওর পুরোটা অবয়ব জুড়ে আশ্চর্য স্নিগ্ধতা ছড়ানো!
নাহ! তুহিন একটুও বাড়িয়ে বলে নি মেয়েটি সম্পর্কে।
সীমা পড়েছে আকাশনীল রঙের শাড়ি সাথে ম্যাচিং ব্লাউজ ও সামান্য কিছু গহনা।ব্যাস।ও কে দেখতে কেমন লাগছে আমি ঠিক বর্ণনা করে উঠতে পারবো না।মনে হচ্ছে হঠাৎ করে আমরা কোন এক অলীক জগতে চলে এসেছি।সীমা সেই জগতের রাজকন্যা। ও ঘরে ঢোকার সাথে সাথে সমস্ত পরিবেশটায় অদ্ভুত রকমের মায়া ছড়িয়ে পড়লো।আবার আমি সম্মোহিত হলাম।তুহিন আমাকে চিমটি না কাটলে আমার ঘোর কাটতো কিনা সন্দেহ। আমি হা করে তাকিয়েই ছিলাম।তীব্র আবেগে আমার শরীরজুড়ে অদ্ভুত শীতলতা ছড়িয়ে পড়েছে। এক ধরনের জড়তা কাজ করছে। হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে।
মিষ্টি আওয়াজে হঠাৎ ঘোর কাটলো
– কেমন আছেন?
আমি বোকার মত বললাম
– জ্বী! আমাকে বলছেন?
সীমা মাথা নাড়লো।
এদিকে বয়স্ক ভদ্রমহিলা আবারো মিষ্টি হেসে উঠে দাড়ালেন,বললেন
-তোমরা কথা বলো?আমি আসছি। রাতে খেয়ে যেও কিন্তু।
যাহোক আমার নিজের আড়ষ্টতার কারণে কথা বেশিদুর এগোলো না ।সীমাও কোন এক কারণে খুব বেশি কথা বাড়ালো না। তবে সীমাকে আমার পছন্দ হয়েছে একথা জানাতে ভুল করলাম না।
কথায় কথায় জানা গেল সীমা ও তার মা থাকে ওর নানার বাসায়।নানা মারা গেছেন দুই মাস হলো।এক মামা আছেন।সেই মামা ও বাবা দুজনে প্রবাসী।সীমার বাবা দেশে আসেন দু তিন বছর অন্তর।…..
আমার মত চালচুলোহীন ছেলের সীমার মত সুন্দরী বিদুষী মেয়েকে স্ত্রী হিসাবে পাওয়া দারুণ সৌভাগ্যের ব্যাপার।
তবে সীমা জানালো তার একটা অতীত আছে। আমার অত অতীত নিয়ে মাথা ঘামাবার সময় নেই অবশ্য।আমার হয়ে তুহিন আগ বাড়িয়ে বলল
– মানুষের বর্তমানটাই আসল। বুদ্ধিহীনরা মানুষের অতীত নিয়ে ঘাটাঘাটি করেন। যা হয়ে গেছে তো গেছে।
সব কিছু ঠিকঠাক হয়ে গেল খুব দ্রুত। এতটাই দ্রুত যে আমার কেমন যেন সবকিছুতে তালগোল পাকিয়ে গেল।সীমার মধ্যে নিশ্চয় কোন জাদু আছে। আমার শয়নে স্বপনে ঘুমে জাগরণে শুধুই সীমা আর সীমা।লাবনীর স্মৃতি সব বানের জলে ভেসে গেল।।যতবার সীমাকে ভাবি ততবার উত্তেজিত হয়ে পড়ি।আমি দিশা হারাই।
অফিসের কলিগ রায়হান আমার এ হেন আচরণ দেখে সরু চোখে তাকিয়ে জানতে চাইলো।আমার এই বিহ্বলতার কারণটা কি?
আমা লজ্জায় বেগুনি হয়ে বললাম
– না না তেমন কিছু না।….
আজ কাজের চাপ কম আর তাই অফিসের লাঞ্চ আওয়ারে ভাবছি।আর অবশ্যই সেই ভাবনা সীমাকে নিয়েই।আচ্ছা আমি কি ওকে একটা ফোন করতে পারি?
ঠিক তখনি সীমার ফোন এলো।এটাকে কি বলে টেলিপ্যাথি?
– হ্যালো?
-অপূর্ব আমি সীমা বলছি
– হ্যাঁ হ্যাঁ আমি জানি।
– আপনার সাথে কিছু কথা ছিল।
-বলুন
– পারসোনাল।সব কথা ফোনে বলা যাবে না।দেখা করে সামনাসামনি বলবো।সময় হবে?
– তথাস্তু! বলে ফোনটা রেখে দিলাম। আমার যে কি অবস্থা, মনের মধ্যে তখন হাজার হাজার লাড্ডু ফুটছে।কখন যে সন্ধ্যা হবে!
উফ!
(৩)
নির্দিষ্ট সময়ের প্রায় আধাঘণ্টা পরে সীমা এলো একটা রূপালী রঙের গাড়িতে চেপে। ওরিয়েন্টের সামনে গাড়ি থামতেই ও নেমে এল ধীর স্থির ভাবে।আজও সে বিষন্ন এবং পোষাকে নীল রং এর আধিক্য যথারীতি ।প্রথমদিনও সে বিষন্ন ছিল অবশ্য অত্যাধিক উত্তেজনার বশে সেভাবে খেয়াল করা হয় নি। তবে পরে যে ওর বিষন্নতা নিয়ে খানিকটা খটকা লাগেনি তা কিন্তু নয় তবে সেটা আমার কাছে তেমন একটা পাত্তা পায় নি।
অল্প সময়ে ভিতরে চলে এলো সীমা ধীর পদক্ষেপে ডানে ঘুরতেই চোখাচোখি হয়ে গেল আমাদের। হাতছানি দিলাম।আমি খোলা টেবিলে বসে থাকলেও কেবিন বুক করা আছে। হাতের ইশারায় নির্দেশ দিলাম সেদিকে।
বসতে বসতে বললাম
– কেমন আছো?
– এই যেমন থাকি।
– কোন কারণে কি মন খারাপ?
– এ কথা কেন মনে হলো? সীমা আমার চোখে চোখে তাকালো।
– মুখটা ভার লাগছে।মনে হচ্ছে একটু আগে কান্না করছিলে।
সীমা চুপ করে রইলো।তখনি একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে সে আমার দিকে।
আমি আরও যোগ করলাম
-আচ্ছা একটা প্রশ্ন করতে পারি তোমাকে?
সীমা নিস্পলক।এ সময় হঠাৎ করে আমার কেমন যেন শীত শীত লাগলো।এসির দিকে তাকালাম। হয়তো টেম্পারেচারে গন্ডোগোল।ওয়েটারকে কল করতে যাবো তার আগে সীমা বলল
– কাউকে ডেকে লাভ হবে না।আপনি যে পথে পা বাড়িয়েছেন সে পথ অতটা মসৃণ নয়।আপনাকে ভুগতে হবে।
– মানে?
– কতটুকু জানেন আমার সম্পর্কে?
আমি কাঁধ ঝাঁকালাম।
– আচ্ছা বল আজ তোমার গল্প শুনবো। যথেষ্ট সময় আছে আমার হাতে।আমি টেবিলের উপর সীমার আলতো করে ছড়িয়ে রাখা ডান হাতটা টেনে নিলাম। নিজের বাগদত্তার হাত ধরবো তাতে আবার অসুবিধা কি?
কিন্তু একি!
আমি যেন হঠাৎ ইলেকট্রিক শক খেলাম।
সীমা হাত ছাড়িয়ে নিলো না তবে বাচ্চা মেয়ের মত হেসে উঠলো,বলল
– আমার জীবনে ভয়ঙ্কর একটা অতীত আছে মিঃ অপূর্ব,জানেন?
– জানি।
– জানেন!?
– হু আমি হাতটা আবার ধরলাম।
– কি জানেন আমার সম্পর্কে ?
– এই যে তোমার অতীত আছে। সেই অতিতের কথা ভেবে বিষন্ন থাকো।বাদ দাও তো ওসব।
কথার ফাঁকে আমি সীমার ঠান্ডা হাতের অনামিকায় একটা গোল্ড রিং পরিয়ে দিলাম।
আমার এ রকম আচরণে সীমা প্রচণ্ড বিরক্ত হলো বলে মনে হলো।গলায় ঝাঁঝ মিশিয়ে বলল
-এটা কি ঠিক হলো?
-কেন?
-বাসায় কি বলবো?
– বলবে আমার জামাই দিয়েছে?
– না জেনে হুটহাট সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক না।আপনি ভুল করছেন।
-মানে?
– আমার কিছু সমস্যা আছে।
– বাদ দাও তো ওসব। সমস্যা কম বেশি সবারই থাকে। আমি ওসব নিয়ে ভাবছি না।জীবন মানে জটিলতা।সমস্যা এখানে নিত্য সঙ্গী।
– আপনি পস্তাবেন।
সীমার চোখ ছলছল করে উঠলো।এ সময় আমাদের কেবিনের ভিতরের ঠাণ্ডাটা হঠাৎ আরো বেড়ে গেল।
– ও এসেছে? ফিসফিসিয়ে বলল সীমা।
-কে?
সীমা নিরুত্তর।
দ্রুত রাত বাড়ছে।সীমার হেঁয়ালী আমার ভালো লাগছে না।
আমি জানতে চাইলাম
– কে এসেছে? কি বলছো এসব?
– চুপ। কথা বলবেন না ও বিরক্ত হবে।
(৪)
কিছুক্ষণ ইতস্তত করার পর সীমা শুরু করলো
২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসে আরিফের সাথে আমার বিয়ে ঠিক হলো।পারিবারিকভাবে বিয়ে ঠিক হলেও আমরা একে অন্যকে চিনতাম ছোটবেলা থেকেই। তবে সেভাবে কথা হতো না কোনদিন। আরিফ ছিল যেমন মেধাবী তেমনই পড়ুয়া।কলেজে পড়াকালীন সময়ে অনাকাঙ্খিত ঘটনার সূত্র ধরে আমাদের সম্পর্কটা কিছুটা ঘনিষ্ঠতায় রূপ নেয় । আমরা অপেক্ষা করেছি পড়াশোনা পর্ব শেষ না হওয়া অবধি।যেহেতু পারিবারিকভাবে সিদ্ধান্ত তেমনই ছিল।
সামাজিক অবস্থানগত বিবেচনায় আরিফ পাত্র হিসাবে অসাধারণ। শান্ত ভদ্র মার্জিত মেধাবী দেখতেও দারুণ স্মার্ট। তার উপর শহরের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী হারুণ অর রশীদের একমাত্র ছেলে। ডাক্তারী পড়া সবে শেষ করেছে সে। ভবিষ্যৎ নিশ্চিত উজ্জ্বল।এমন ছেলেকে কেউ হাতছাড়া করতে চাইবে না সেটাই স্বাভাবিক। পড়াশোনার পর্বের পাঠ চুকাতে মহাসমারোহে বিয়ের আয়োজন শুরু হলো আমাদের।আনুষ্ঠানিকতার আগেই আত্নীয়তাও শুরু হয়েছিল খানিকটা।
যেহেতু ওদের বাড়িতে আমার নিয়মিত যাওয়া আসা ছিল সম্পর্কটা অনেক সহজ ছিল। প্রথম থেকেই ওদের বাড়ির কেউ আমাকে বউ হিসাবে ভাবতো না। মেয়ে হিসাবে দেখতো তারা আর আমাদের বাড়িতে আরিফকেও জামাই হিসাবে না দেখে ঘরের ছেলে হিসাবেই দেখতো সবাই।আমি তো মাঝে মাঝে ঠাট্টা করে বলতাম বিয়ের আগেই জামাই আদর পাচ্ছো মহা সৌভাগ্যবান তুমি।
যাহোক মহা ধুমধামের সাথে আকদ ও গায়ে হলুদ পর্ব শেষ হলো আমাদের।
রাত পোহালে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা, দারুণ উত্তেজনাকর সময়।নানাবিধ এলোমেলো চিন্তায় কিছুতেই ঘুম আসছিল না সেই রাতে।কত রাত হয়েছে জানি না বিছানায় এপাশ ওপাশ করছি হঠাৎ ই আরিফের ফোন এলো।এমনিতে প্রতিদিন ঘুমাতে যাবার আগে আমরা কিছুক্ষণ কথা বলি।এটা একটা রুটিনের মধ্যে পড়ে আমাদের জন্য। আজকের বাতচিত পর্ব শেষ হয়েছে বেশ আগে।ওরও কি আমার মত অবস্থা? হতে পারে সেটাই স্বাভাবিক।আমি ফোন রিসিভ করলাম।
– ঘুমাচ্ছিলে?
– না মনে মনে তোমার ফোনের জন্য অপেক্ষায় ছিলাম।ঘুম আসছে না।
– আমারও একই অবস্থা জান।
-তুমি কি একটু বাইরে আসবে?
-এখন? এতো রাতে? কাল অনুষ্ঠান। না না এখন বাইরে বেরোনো ঠিক হবে না।কিছু নিয়ম মানতে হয়।
– আসবে কিনা বলো।
– মা জানলে যদি বকে? বাড়ি ভর্তি লোকজন।বাজে মেয়ে ভাববে আমাকে।না থাক।একটা তো রাত।
-আমরা কাজিনরা মিলে বের হচ্ছি।লং ড্রাইভে যাবো। প্লিজ না করো না। খুব মজা হবে।
– মা কিছুতেই রাজী হবে না।যদি খারাপ কিছু হয়ে যায়।
-মাথা খারাপ?আমি বলছি কোন কিছু হবে না। আমরা তো এখন স্বামী স্ত্রী,না- কি?
– তোমার মাথাটা গেছে।
– সে তো অনেক আগেই গেছে।শোন আমরা তোমাদের বাসার সামনে। এই সময়টা ফিরে আসবে না আর একটু ম্যানেজ করো প্লিজ।না হলে আমার প্রেস্টিজ থাকে না। প্লিজ। হর্ণ বাজাবো?
– এই না না না।আমি আসছি।
সে রাতে আমরা খুব মাস্তি করলাম।লং ড্রাইভে অনেকটা দুর গেলাম।মধ্যে একটা রেস্টুরেন্টে কিছু সময় কাটালাম।তখন ছেলেগুলো মদ খাচ্ছিলো।আমরা তিনজন মেয়ে ওদেরকে অনেক করে মানা করলাম ওরা কেমন যেন বেপরোয়া ছিল,শুনলো না। এদিকে কখন যে সময় গড়িয়ে ঘড়ির কাটা রাত তিনটা স্পর্শ করলো নিজেরাই জানি না।বাসায় ফিরতে হবে।সকাল সকাল উঠতে হবে।আরিফও তাড়া দিল।ও খুব একটা মদ খায় নি।সেজন্য স্বাভাবিকই ছিল।আরিফের চাচাতো ভাই অর্ণব খুব বেশি মাত্রায় ড্রাঙ্ক ছিল । সে জেদ করলো গাড়ি সে চালাবে।এই নিয়ে হৈ হট্টোগোল বেধে গেল। সময় নষ্ট হচ্ছে রাতের রাস্তা যেহেতু ফাঁকা সেহেতু ওর দাবি একরকম মেনে নেওয়া হলো তাছাড়া মাতাল অবস্থায় রাস্তায় থাকলে পুলিশ ঝামেলা করতে পারে। তখন বিপদ বাড়বে।
দুরন্ত গতিতে গাড়ি ছুটছে।গান গাইছি হল্লা করছি।ফাঁকা হাইওয়ে দিয়ে হাই স্পীডে ছুটে চলছে আমাদের গাড়ি।মাতাল অর্ণবের হাতে স্টিয়ারিং। তবে ও ভালো ড্রাইভ করে।আমাদের মানা সত্ত্বেও গাড়ি স্পীড দ্রুত গতিতে বাড়তে লাগলো।আমরা তিন জন বারবার নিষেধ করছি ও মজা পেয়ে ছেলেমানুষি শুরু করলো। আসলে মাতাল অবস্থায় অর্ণবের হাতে গাড়ি দেওয়াটা ছিল চরম ভুল।আমি আরিফকে ইশারা করলাম আরিফ কিছু করার আগে আমাদের গাড়িটা একটা মোটা গাছের গায়ে সজোরে আছড়ে পড়লো।
এটুকু বলে সীমা থামলো। কেমন যেন আনমনা হয়ে গেল। ওর চোখে জল।
আমি বললাম
– তারপর?
(৫)
দীর্ঘ তিনদিন পরে আমার জ্ঞান ফিরল।দূর্ঘটনায় আমার মাথার পেছন দিকটায় আঘাতপ্রাপ্ত হয়।হাসপাতালে বেশ অনেকদিন চিকিৎসার পরে আমি বাসায় ফিরে আসি।আরিফ সম্পর্কে বহুদিন আমি কিছু জানতে পারি নি।এ ব্যপারে কেউ কোন কথা বলতো না কিছু জানতে চাইলে বিরক্ত হতো। অজানা কোন কারণে সবাই আমাকে এড়িয়ে চলতো।মাঝে মাঝে মনে হতো আরিফ হয়তো আর এই পৃথিবীতে নেই।ফোন দিতাম । নট রিচেবল বলতো।তখন মনটা বিষন্ন হয়ে যেতো।আচ্ছা সেই রাতে দূর্ঘটনার পর ঠিক কি হয়েছে? আরিফ কি বেঁচে আছে নাকি আমার জীবন থেকে একেবারেই হারিয়ে গেছে?
তবে আরিফের সাথে আমার দেখা হয়।
– দেখা হয়? কোথায়? ও বেঁচে আছে?
– প্রতি রাতে আরিফ আমার ঘরে আসে ।একটা নির্দিষ্ট সময় হলে ওর উপস্থিতি আমি টের পাই।
-এখনও আসে? নিয়মিত?
-হু।এই তো একটু আগে এসেছিল?
– মানে?
– জানেন,আমি ওকে অনুভব করতে পারি।ও যখন আসে তখন চারপাশের তাপমাত্রা কমে যায়।হালকা কুয়াশায় ঢেকে যায় চারপাশ।কেউ বোঝে কি না জানি না আমি ওর উপস্থিতি টের পাই।প্রথম প্রথম আমি অবশ্য এরকম পরিস্থিতিতে ভয় পেয়ে যেতাম।মাকে বলতে উল্টা পাল্টা কি সব ভেবে মা আমাকে একজন সাইক্রিয়াটিস্টের কাছে নিয়ে গিয়েছিল। লাভ হয় নি কোন। বরং আমি ওদের নির্বুদ্ধিতায় মজা পেয়েছিলাম।
-এ ঘটনা সত্যি!
– বিশ্বাস অবিশ্বাস আপনার ব্যপার।বললাম তো আমি হাসপাতাল থেকে বাসায় ফেরার ক’দিন পর একরাতে আমার ঘুম ভেঙে যায়। সেদিন ছিল তীব্র শীত আর কুয়াশাও পড়ছিল খুব।তারপর সেই ঘন কুয়াশার রাতে আমি সর্ব প্রথম আরিফকে দরজায় দাড়িয়ে থাকতে দেখি।অস্পষ্ট অবয়বে আমি লক্ষ করি কেমন যেন অভিমানী দৃষ্টি নিয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে আমার দিকে।
– আমি একই সাথে বিষ্মিত ও পুলকিত।বারবার ওকে ভিতরে আসতে বলি ও আসে না।ও তো এত লাজুক ছিল না কোনদিন।হঠাৎ কি হলো?কত অনুরোধ করলাম। ও শুধু বলতে লাগলো তুমি কেন বাসায় আসো না।
– আমি ওকে কত করে বোঝাই। আমার পক্ষে যাওয়া সম্ভব না বর্তমান পরিস্থিতিতে।আমি এখনও অসুস্থ। ডাক্তার সাহেব জানতে পারলে রাগ করবে। ও অভিমান করে চলে যায়। আমার কান্না পায়। ভীষণ কান্না পায় ওকে না দেখলে কষ্ট হয়। তারপর ক’দিন যায় ও আবার আসে আবার একই অভিযোগ করে।মায়ের ভয়ে ওর কথা আমি কাউকে বলতে পারি না।
জানেন, গতকালই তো ও এলো ভীষণ উত্তেজিত ছিল। অভিমান করল। কি করবো আমি! আচ্ছা আপনাকে একটা অনুরোধ করবো।রাখবেন?
– কি?
– আমি যা আপনার সাথে বললাম প্লিজ কাউকে বলবেন না।তাহলে কিন্তু মা ভীষণ রাগ করবে ।
-ওর সাথে তোমার আর কি কথা হয়?
– হয় তো, অনেক কথাই হয়।কাল খুব রেগেছিল শেষে তো বাচ্চাদের মত ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,তুমি আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছো কেন?
– মানে?
– তোমার তো বিয়ে।আমি সব জানি।আমাকে ছেড়ে লুকিয়ে লুকিয়ে বিয়ে করছো তুমি।তোমার বিয়ে হয়ে গেলে আর তোমার সাথে দেখা করা সম্ভব হবে না। আমি এবার সত্যি সত্যি মরে যাবো।
ওর এসব কথা শুনে আমার খুব কান্না পেল।ভাবলাম আপনার সাথে কথা বলি কিন্তু আপনি…
– আমি কি?
– মা, দিদা এরা খুব পঁচা।আচ্ছা আপনি বিয়েটা ভেঙে দিতে পারবেন? তাহলে আমি বেঁচে যাই।আসলে আমি মরতে চাই না।
– মানে? কি বলছো এসব?
অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে আছি দুজন।আমি কি বলবো ভাবতে পাছিলাম না।এর মধ্যে সীমা উঠে চলে গেল।টেবিলের উপর আমার দেয়া আংটিটা আমার দিকে তাকিয়ে উপহাস করছে যেন।
(৬)
বাসায় ফিরতে ফিরতে বেশ রাত হয়ে গেল।মনটা ভীষণ বিক্ষিপ্ত।সীমাকে নিয়ে তুহিনের সাথে বেশ কিছু আলোচনা হলো।অনেক কিছু জানলাম। তুহিন অবশ্য আগেই জানাতে চেয়েছিল আমি পাত্তা দেই নি। আসলে সীমাতে নিয়ে বিভোর ছিলাম আমি।
ভু্ল কি ঠিক জানি না তবে সীমার জন্য আমার সত্যি দুশ্চিন্তা হচ্ছে। আচ্ছা এক মনে কত জনকে ভালোবাসা যায়? আমি কি সীমাকে ভালোবেসে ফেলেছি?
নানারকম চিন্তায় মস্তিষ্কের নিউরণগুলো উত্তেজিত। আসলে কি করতে হবে বা কি করা উচিত কিছুই বুঝতে পারছি না।কিছুতেই ঘুম আসছিলো না আরও কিছু আলোচনা বাকি। সিদ্ধান্ত যা নিতে হবে এখনই দেরি করা যাবে না। তুহিনের কাছে ফোন দেওয়া দরকার কিন্তু কেন জানি ফোন দিতে ইচ্ছে করছে না।
রাত বাড়ছে বারান্দায় পায়চারি করছি। কত রাত জানি না।হঠাৎ মনে হলো টেম্পারেচার ভীষণভাবে ফলডাউন করেছে। শীত লাগছে।এই প্যাচপেচে গরমের আবহাওয়ায় শীত লাগার কথা নয়।তবে কি সীমার কথা ঠিক? এবার কি আরিফ আমার সাথে দেখা করতে আসছে? চারপাশের পরিবেশ এমন ধোঁয়াশা লাগছে কেন? আমার অস্বস্তি লাগা শুরু হলো।
এ সময় ফোন এলো তুহিনের।
– হ্যালো?
– অপূর্ব শোন তুই এখনই কুইন্স হাসপাতালে চলে আয়।দ্বিতীয় গেটে।জলদি।
ওর বলার ধরনটা কেমন যেন হাহাকার মেশানো।
আমি উত্তেজিত হয়ে বললাম
– কেন? কি হয়েছে?
– সীমা আত্নহত্যা করার চেষ্টায় করেছে।অবস্থা খুব খারাপ বেশিক্ষণ টিকবে কিনা বলা যাচ্ছে না। এক্ষুনি আয়।
আমি সঙ্গে সঙ্গে বাইক বের করে হাসপাতালে ছুটে গেলাম।
কিছুক্ষণ আগের সীমা আর এই সীমাকে মেলাতে পারলাম না। কি বিভৎস! মেয়েটি বাঁচবে না এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। ভীষণভাবে থেতলে গেছে ওর নিম্নাংশ।মাথাটাব মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত। ওফ!
আমি সীমার পাশে গিয়ে দাড়ালাম।নার্স ও ওয়ার্ড বয় প্রাথমিক পরিচর্চা করছে।সীমা আমায় দেখতে পেয়ে মনে হলো হাসবার চেষ্টা করলো।কিন্তু সেটাকে কান্নার মত দেখালো। আসলে দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া শরীরে কোন অভিব্যক্তি ফুটে ওঠা মুশকিল। আমি দিশাহারা হয়ে বললাম
– এটা কি হলো? কি করে হলো? এমন পাগলামি কেউ করে?
সীমা একটা দীর্ঘ শ্বাস ছাড়লো তারপর অস্পষ্ট স্বরে বলল
– স্যরি অপূর্ব।
এর কিছুক্ষণ পরে সীমা না ফেরার দেশে চলে গেল।আমি কিছুতেই ভাবতে পাছি না জলজ্যান্ত একটা মানুষ কিভাবে নেই হয়ে যায়।এটা কি করে সম্ভব।
পরিশিষ্ট
সীমা চলে গেছে আজ একমাস।আবার আমার নিরানন্দ জীবন।সেই জীবনে নেই তেমন কোন সুখবর।এখন আমি আরও বেশি একাকী ও নিঃসঙ্গ।তবে রাতের বেলাটা বিশেষ করে মধ্যরাত আমার জন্য বেশ সুখকর। সেই সময় সীমা আসে যে……. সীমার সিজোফ্রেনিক উইথ প্যরাসাইকোলোজিক্যাল ডিল্যুশন সিম্পটম কি আমার মধ্যে বিস্তার লাভ করেছে? তাহলে তো সর্বনাশ!
আমি প্রচণ্ড ঠাণ্ডার মধ্যে সিগারেট ধরালাম।তিনটা বাজতে পাঁচ মিনিট বাকি। সীমা আসবার সময় হয়ে গেছে……..
সমাপ্ত
© রফিকুল ইসলাম ইসিয়াক।
১১৪জন ৩৬জন
0 Shares

৫টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ