গল্পঃ অচেনা অতিথি

ইসিয়াক ২৮ জুন ২০২১, সোমবার, ১০:১১:০৩পূর্বাহ্ন গল্প ১০ মন্তব্য
(১)
টুম্পার চলে যাবার পর থেকে বাড়ির প্রতি টান উঠে গেছে জহিরের। প্রতিদিনই বাড়িতে ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হয়ে যায় তার।কেন জানি বাড়িতে তার ফিরতেই ইচ্ছে করে না।
শুধু মায়ের মুখ চেয়ে ফিরে আসতে হয়। যত রাতই হোক জহিরের জন্য রাহেলা বেগম ভাত নিয়ে বসে থাকেন। সে না ফেরা পর্যন্ত তিনি জলও স্পর্শ করেন না।
টুম্পার ঘটনার পর প্রথম প্রথম তো কোন কাজেই কোন রকম মন বসাতে পারতো না জহির। সারাদিন উদাস হয়ে থাকতো। কেমন পাগল পাগল অবস্থা না খাওয়া না গোসল।তখন বিষন্নতা ছিল তার একমাত্র সঙ্গী।
সহকর্মী মোসলেম তার এ অবস্থা দেখে একদিন জানতে চায় তার সমস্যাটা কি? কেন সে এমন মন মরা হয়ে থাকে? কেন তার কাজ কামে মন নেই? কি তার সমস্যা?
জহির চুপ।
তারপর কয়েকদিনের নিরন্তর প্রচেষ্টায় অনেক কাঠ খড় পুড়িয়ে সবটা জানার পরে মোসলেম বলে,
-এভাবে তো জীবন কাটবে না জহির মিয়া। মা ও চিরকাল বেঁচে থাকবে না। উপযুক্ত জীবন সঙ্গীই পারে এই নিঃসঙ্গতা কাটাতে। তুমি তাড়াতাড়ি আরেকটা বিয়ে করো।
কিন্তু নতুন করে স্বপ্ন দেখতে আর ইচ্ছে করে না জহিরের। ভয়াবহ সেই অভিজ্ঞতার পর থেকে তার মন কেমন যেন বিষিয়ে গেছে।
রাহেলা বেগমও ছেলের বিয়ের জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন ইদানীং কিন্তু মন মত মেয়ে পাওয়া এই যুগে সত্যি দুষ্কর। তার উপর তার নিজেরও কিছু ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতা তো আছেই।
দিন যায়…
একদিন বেশ রাতে বাসায় ফিরছিলো জহির। সেদিন প্রচন্ড ছিল ঝড় বৃষ্টির দিন। বাড়তি কাজ ছিল বলে রাত হয়ে গিয়েছিল, না হলে এই দূর্যোগের দিনে সকাল সকাল বাড়ি ফিরবে বলে ঠিক করেছিল।যাহোক চলমান বৃষ্টি ধরে এলে সে অফিস থেকে বাড়ির পথ ধরে। রাস্তাঘাট শুনশান ৷একটা কোন যানবাহব নেই। বিদ্যুৎ চলে গেছে।
জহির হেঁটে বাড়ি ফিরছিল। তবে বৃষ্টি আরও জোরে আসতে একটা টঙ দোকানের চালার ভিতর আশ্রয় নিতেই ছাতা বন্ধ করতে করতে জহির হঠাৎ টের পেল সেখানে আরেক জনের উপস্থিতি।
বজ্র বিদ্যুতের আলোয় ভালো করে তাকাতে লক্ষ করলো।বেশ সুন্দর দেখতে একটা মেয়ে গুটিসুটি মেরে বসে আছে।
চোখে মুখে তার ভীষণ ভয় আর জড়তা।
জহির কিছুটা অবাক এবং বিব্রত হলো,এখানে অপেক্ষা করা ঠিক হবে কিনা একটু ভাবলো তারপর নিজের অজান্তে মেয়েটিকে প্রশ্ন করল,
– কে তুমি? এখানে কি করছো?
প্রশ্নটা কি বোকার মত হয়ে গেল?
মেয়েটি কোন উত্তর দিল না।
-কথা বল না কেন?
ধমক খেয়ে হোক বা অন্য যে কোন কারণে হোক মেয়েটি আস্তে আস্তে বলল,
-আমি নিলুফার।
-এইখানে বসে আছো কেন? তোমার বাড়ি নেই?
-না।
– না মানে?
– না মানে নাই।
-আজব তো!আগে থাকতে কোথায়? রাস্তায়?
– ছোট মামার কাছে। মামী তাড়ায় দিয়েছে।
-তাড়ায় দিছে মানে কি? এরকম হয় নাকি? মামা জানে?
মেয়েটি আর কোন কথা বলে না। জহির সন্দেহ করে এ মেয়েটির মাথায় মনে হয় কোন সমস্যা আছে,না হলে এই দূর্যোগের রাতে কেউ বাড়ি ছাড়ে। কে জানে কি হয়েছে! কিন্তু একা একটি মেয়ে, এই ঝড় জলের রাত। নির্ঘাত বিপদে পড়বে।
তারপর ভাবে যা হয় হোক তার অত কি? এসব ব্যপার নিয়ে তার মাথা না ঘামালেও চলবে।
এদিকে কিছু বাদে বৃষ্টি একটু কমে আসতেই জহির বাড়ির যাওয়ার উদ্দেশ্য ছাতা মেলল।
মেয়েটি হঠাৎ বলে উঠল
-কোথায় যান?
– বাসায়।
-একলা একটা মেয়েকে ফেলে চলে যাবেন?
-আমি তো আপনাকে চিনি না। আপনাকে ফেলে চলে যাবার প্রশ্ন আসছে কেন? আপনি কি আমার সাথে এসেছিলেন?
-বেশ মানুষ তো আপনি? আমি একলা মেয়ে, এখন অনেক রাত। বাইরে প্রচন্ড বৃষ্টি, আমাকে একা ফেলে চলে যাচ্ছেন, যদি বিপদে পড়ি?
জহির কি বলবে বা করবে বুঝতে পারছে না। এসব নাটকীয়তা তার পছন্দ হচ্ছে না। মেয়েটার মধ্যে এক ধরনের আকর্ষণ আছে। তাকে অগ্রাহ্য করা যাচ্ছে না। তাছাড়া মানবিকতা বলে একটা ব্যপার আছে। মেয়েটি একা। একা রেখে গেলে এই দূর্যোগের রাতে নির্ঘাত বিপদে পড়বে।
জহির কিছু বলছে না দেখে মেয়েটি বলল,
-এক রাতের জন্য আমায় একটু আশ্রয় দিতে পারবেন? বিশ্বাস করুন সকাল হলেই আমি চলে যাবো। আপনার বিরক্তির কারণ হব না।
জহির কিছুক্ষণ কি যেন ভাবলো তারপর গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
-আসুন
(২)
রাহেলা বেগম আগেই জানালা দিয়ে লক্ষ করছেন এই রাত দুপুরে জহির অচেনা একটি মেয়েকে নিয়ে বাড়ি ফিরছে। একটু অবাকই হলেন তিনি, চেনা নেই জানা নেই কাকে নিয়ে এলো জহির? দরজা খুলেই এক রাশ বিরক্তি নিয়ে বললেন,
-এই রাত দুপুরে কাকে আবার সাথে করে এনেছিস? কে ও?
– জানি না।
– জানি না মানেটা কি? ইয়ার্কি মারিস।
– মা ও কে তা আমি সত্যি জানি না।
রাহেলা বেগম সরু চোখে তাকালেন। সেই সাথে প্রচন্ড বিরক্তিতে পুরো মুখ বিকৃত হয়ে এলো তার
– কি সব ভুল ভাল বকছিস ? চিনি না জানি না একজনকে সাথে করে নিয়ে এলাম আর হয়ে গেল। এটা কোন বুদ্ধিমানের কাজ? মাথা ঠিক আছে তো।
অবস্থা যে তার অনুকূলে নেই তা নিলুফার ভালোই বুঝতে পারছে পরিস্থিতি জটিল হবার আগে সে জহিরের পেছন থেকে বেরিয়ে সামনে এগিয়ে এলো।
– খালাম্মা আপনি আমার মায়ের মত। মায়ের মত মানে মা। আমার নিজের মা নেই। জনম দুঃখী আমি। সৎ মায়ের সংসারে মানুষ। অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে পথে নেমেছি।
সাথে সাথে জহির বলল,
-এই মেয়ে একটু আগে না বললে,তুমি মামীর অত্যাচারে বাড়ি ছেড়েছো।
– আপনি যে ভাবে ধমকে ধামকে কথা বলছিলেন, আমার সব গুলিয়ে যাচ্ছিল তাই মিথ্যা বলেছি। বিশ্বাস করুন। কিছু মনে করবেন না প্লিজ ।
তারপর রাহেলা বেগমের দিকে ফিরে বললেন,
আপনি মুরুব্বি মানুষ আপনার কথায় আমি কিছু মনে করিনি।অচেনা অজানা মানুষকে আশ্রয় দেয়া এখনকার যুগ জমানায় খুবই সমস্যার ব্যপার আমি জানি। অনেক রকম ঝামেলা হতে পারে। আমি সব জানি আর বুঝি।আমি শুধু একটা রাত আপনার কাছে আশ্রয় চাই। একটা রাত। দেবেন না মা আশ্রয়? আমি কিছু ভুল করে ফেলেছি।রাগের মাথায় বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছি। এটা ঠিক হয়নি।
আমি আমার ভুল বুঝতে পারছি।কিন্তু এখন এই অবস্থায় একলা একা মেয়ে বুঝতেই পারছেন কি করে ফিরে যাই।সকাল হোক এক মুহুর্ত দেরি করবো না সোজা চলে যাবো।দয়া করুন মা, মেয়ের দাবি নিয়ে বলছি। আমাকে বিশ্বাস করতে পারেন সকাল হলেই চলে যাবো। প্লিজ।
রাহেলা খুবই কঠিন হৃদয়ের মানুষ। তিনি এধরণের ঘটনাকে কখনও প্রশ্রয় দেন না। কিন্তু কেন জানি আজ তার মন নরম হলো।মেয়েটাকে তিনি বিশ্বাস করলেন।
দরজা থেকে তিনি একপাশে সরে দাঁড়িয়ে কড়া গলায় বললেন,
– ঠিক আছে, শুধু আজ রাত টুকু সকাল হলে চলে যেতে হবে। আমি কাউকে বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াতে পারবো না।
– না খালাম্মা আমার খাওয়া নিয়ে ভাবতে হবে না আর আমি সকাল হলেই চলে যাবো।
-যাও ফ্রেশ হয়ে নাও,দুজনেই তো ভিজে ঝড়ো কাক হয়ে গেছ। আর এই মেয়ে শোন,তোমার কি মনে হয় তোমার বাবার বাড়িতে একটা খবর দেওয়া উচিত না? নিশ্চয় চিন্তা করছেন তারা।
– হ্যাঁ তা ঠিক। আমার কাছে ফোন আছে আমি ফোন দিয়ে দিচ্ছি।
নীলুফার নিজের ব্যাগ থেকে ফোন বের করে,সুইচ অন করলো।এতক্ষণ ফোন বন্ধ ছিল,নাম্বার পাতিয়ে কাকে যেন ফোন করল। বেশ কিছুক্ষণ কথা বলে সে তারপর রাহেলা বেগমকে ফোন ধরিয়ে দিল।
নিলুফারের বাবার সাথে কথা বলে রাহেলা বেগম আশ্বস্ত হলেন। বুঝতে পারলেন এই মেয়েে আশ্রয় দিলে সমস্যা নেই।
মেয়েটি রাগের মাথায় না হয় একটা ভুল করে ফেলেছে। তাকে আশ্রয় দেওয়া কর্তব্যের মধ্যেই পড়ে। হাজার হোক তিনি নিজেও এক মেয়ে।
একদিকে বহুদূরের পথ আর দূর্যোগের রাত না হলে তিনি নিজে গিয়ে মেয়েটাকে তার বাড়িতে পৌঁছে দিতেন।
কিছুটা বাদে রাহেলা বেগম খাবার গরম করতে গেলেন।ততক্ষণে নীলুফার তার স্বভাব সুলভ ভঙ্গিতে রাহেলা বেগমের সাথে বেশ ভাব জমিয়ে ফেলেছে। গল্পের ফাঁকে ফাঁকে নীলুফার টেবিলে খাবার সাজাতে লাগলো। অনেকদিন পরে বাড়িতে অন্য রকম পরিবেশ এলো,জহিরও হাসি কথায় মেতে উঠলো সহজে।
সবাই মিলে গাল গল্পে সে রাতে ভোজটা বেশ ভালোই হলো। ঘুমাতে ঘুমাতে অনেকটাই রাত হয়ে গেল।
পরদিন দুপুরের পরে সেল ফোনের আওয়াজে ঘুম ভাঙলো জহিরের,জহির উঠে মাকে জাগালো। এত বেলা অবধি ঘুম? এমন কেন হলো বুঝতে পারলো না তারা দুজনেই ।
জহিরের হঠাৎ নিলুফারের কথা মনে পড়ল,কোথায় গেল মেয়েটি? তাড়াতাড়ি তাকে খুঁজতে লাগলো কিন্তু কোথাও নেই নীলুফার।ভোজবাজির মত উবে গেছে । একে একে সব ঘর ঘুরে অবশেষে জহির বুঝতে পারলো বাসা থেকে মূল্যবান জিনিস সব খোয়া গেছে। কিছুক্ষণের মধ্যে মা ও ছেলে এটাও বুঝতে পারলো, আসলে নিলুফার ছিল কোন একটা ডাকাত চক্রের সদস্য।
পুরো ঘটনাটা পরিকল্পনা করেই করা।
শেষ
© রফিকুল ইসলাম ইসিয়াক
১৭৭জন ৭৬জন
0 Shares

১০টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য