সোনেলা দিগন্তে জলসিড়ির ধারে

খ.ম. আলী সম্রাট

আরজু মুক্তা ২৭ জুলাই ২০২১, মঙ্গলবার, ১০:৪৯:৪৫পূর্বাহ্ন খ্যাতনামা ব্যক্তি ২৬ মন্তব্য

ধরলা, তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র সহ বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলের নদী অববাহিকার মানুষের প্রাণের গান ভাওয়াইয়া। এই ভাওয়াইয়া এ অঞ্চলের সংস্কৃতিকে করেছে বেগবান। ভাওয়াইয়াকে সারা বিশ্বে পরিচিত এবং এর অস্তিত্ব ধরে রাখতে যাঁরা কাজ করছেন তাঁদেরই একজন খন্দকার মোহাম্মদ আলী সম্রাট।

যখন আমরা খুব ছোট। মাইকে গান বাজতো ” ফাঁন্দে পরিয়া বগা কান্দে রে। ” গলা শুনেই বুঝতাম সম্রাট ভাই গাইছেন। আর দল বেঁধে দৌড়।

তাঁর জন্ম সম্ভ্রান্ত এক মুসলিম পরিবারে। ১৯৫৭ সালে ২১ শে ফেব্রুয়ারী কুড়িগ্রাম জেলার ব্যাপারী পাড়ায়  জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম মৃত আলহাজ্ব মনির উদ্দীন এবং মাতা মৃত সহরজান নেছা। কট্টর মুসলিম পরিবার এবং তাঁর বাবা  এম. এ করেছেন আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হাদীস নিয়ে। এমন পরিবারে সঙ্গীত চর্চা কল্পনাতীত। তাইতো চুরি করেই সঙ্গীত ভুবনে আসা। তাঁর হাতে খড়ি হয় বাবু উপেন্দ্র নাথ এবং ওস্তাদ সামছুল হকের কাছে। পরবর্তীতে ভাওয়াইয়া যুবরাজ কছিম উদ্দীনের কাছে গান শিখেন। তাঁর সাথে কথা বলে জানা যায়, তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় গ্রামোফোন রেকর্ডে ” আগা নাওয়ে ডুবো ডুবো পাছা নাওয়ে বইসো” এই গান শুনে তাঁর ভাওয়াইয়া প্রীতি বাড়ে।

কুড়িগ্রামের স্কুল কলেজের গণ্ডী পেরিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এম. এ করেন। এছাড়া, রংপুর পলিটেকনিক থেকে ইলেকট্রিক্যালে ডিপ্লোমা করেন। বর্তমানে তিনি রেডিও ও টেলিভিশনের গীতিকার, সুরকার এবং সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে কাজ করছেন। সেইসাথে চলছে গবেষণাও। তিনি ২ হাজার ভাওয়াইয়া, পল্লীগীতি ৫ শত, লোকগান ১ শত, আধুনিক গান ২ শত  লিখেছেন। এছাড়া পালাগানও লিখেছেন পাঁচ খণ্ডে। তাঁর লিখা প্রথম ভাওয়াইয়া গান হলো :

“ও মোর দয়ার ভাবি

ও মোর গুণের ভাবি

এইবার বিয়া না দিলে মোক

যাইম বাড়ি ছাড়ি।”

এই গানটি ১৯৭৪ সালে লিখেছেন। বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রথম প্রোগ্রাম করেন ১৯৭৯ সালের মার্চ মাসে।

১৯৭৪ সালে মোগলবাসা ইউনিয়নে যাত্রাপালা হবে, নাম ” আলোমতি প্রেম কুমার “। এই যাত্রার প্রেম কুমারের চরিত্রে অভিনয় করবেন তিনি। বাবা হাজি, রাজী না। লুকিয়ে লুকিয়ে অভিনয় চালিয়ে গেলেন। রীতিমতো শো এর আগের দিন মাইকিং, যাত্রা যাত্রা যাত্রা….এক ঝাঁক ডানা কাটা পরীর সাথে আজকের আলোমতি প্রেম কুমার এর নাম ভূমিকায় অভিনয় করবেন মনির হাজির ছেলে সম্রাট।  আর যায় কই? গ্রামবাসী হাজির। হাজির ছেলে এই কাজ করলে ধর্ম শেষ। কেয়ামত নাযিল। হাজি সাহেব রাগে গজগজ করতে করতে ছেলেকে ধরে এনে ঘরে দিলেন তালা। পাহারাদার বসালেন দরজায়। দস্যি ছেলে। মন তার পরে আছে যাত্রায়। তাকে পায় কে?  জানালা কেটে যাত্রা মণ্ডপে অভিনয় করে ভোরে এসে ঘুমাতেন। আবারও গুনগুন শুরু গ্রামের লোকদের। সম্রাট কাজটা ঠিক করলো?  মাথা কাটা যাবে হাজি সাহেবের। হাজী সাহেব তালা খুলে তাঁকে রিমান্ডে নিলেন। দস্যি ছেলের ব্রেন আবার ভালো। বললো, ঘরে তো তালা। গ্রামের এক মুরুব্বি বললো, তোমার মুখে তাহলে পাউডার কেনো? যাহ্। গত রাতে মুখ ধোয়ার কথা মনে ছিলো না তাঁর। সবার সামনে এক লাফ দিয়ে বাবাকে ফাঁকি দিয়ে দৌড়ে ফুপুর বাড়ি।

এই হলো আমাদের প্রাণের সম্রাট ভাই। সাধারণ বেশেই তাঁর চলাফেরা। নিরহংকার সাদাসিধে একজন। দারুণ সদালাপী। শিল্পীদের অসম্ভব সম্মান করেন। কোন শিল্পী বিপদে পরলে তিনিই আগে ছুটে যান। মানবিক গুণে গুণান্বিত। কুড়িগ্রামের ঐতিহ্যবাহি শিদল আর ঠাকরীর ডাল তাঁর পছন্দের খাবার। ব্যক্তিগত জীবনে তিন সন্তানের জনক। তারাও গান চর্চা করে। তাঁর সহধর্মীনি মারুফা বেগম একজন গৃহিণী।

তিনি ভাওয়াইয়া একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক এবং বিশ্ব ভাওয়াইয়া পর্ষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। যার কার্যালয় কোলকাতায়। ৩১ টি দেশ এর সদস্য।

তাঁর প্রকাশিত কয়েকটি বই হলো : ” প্রাণের সুর ভাওয়াইয়া” ” প্রাচীন লোকসঙ্গীত” ” ছোটদের ছড়া”। তিনি বিভিন্ন পুরস্কার এ ভূষিত হয়েছেন। যেমন: ভাওয়াইয়া একাডেমী রংপুর, পশ্চিমবঙ্গ লালন একাডেমী, লোক সঙ্গীত গোষ্ঠী নদীয়া, কোলকাতা নাট্য গোষ্ঠি ইত্যাদি।

ভাওয়াইয়া সঙ্গীত যেনো নিজস্বতা ধরে রেখে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে জনপ্রিয়তা লাভ করে তাঁর কাজের মাধ্যমে এমন প্রত্যাশা আমাদের সবার। তিনি সুন্দরভাবে, সুস্থভাবে আরও বহুদিন আমাদের মাঝে থাকুন এই কামনা করি।

তাঁর বিখ্যাত একটা গানের লিংক দেয়া হলো।

 

৯৪০জন ৭৪জন
424 Shares

২৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য