খোলা চিঠি – তোমার তরে

সাবিনা ইয়াসমিন ৮ মার্চ ২০১৯, শুক্রবার, ১২:৪৫:৪৪পূর্বাহ্ন একান্ত অনুভূতি ৩৩ মন্তব্য

ফাগুন,

কেমন আছো প্রিয় ? প্রথম দেখার বিদায় বেলায় কথা দিয়েছিলাম, প্রতি বসন্তে একটি করে চিঠি লিখবো তুমি-আমি। তুমি তোমার কথা রেখেছো। আমি কথা রাখার ছলে ভুলে ছিলাম তোমাকে দেয়া প্রতিশ্রুতি। মনে পড়েনি তা নয়, উদাসীনতায় লেখা হয়নি। পাছে তোমার আমার দূরত্ব আরো বেড়ে না যায় তাই আজ লিখছি, জানি পৌছে যাবে তোমার অজানা ঠিকানায়।

প্রিয়, তুমি জানো ? এখন কেউ কাউকে হাতে- কলমে পত্র লেখে না। আগে যেমন রাস্তার মোড় গুলোতে বা প্রায় প্রতিটি বাড়ির প্রবেশ দ্বারে একটি করে চিঠির বাক্স থাকতো , তার কিছু কিছু এখনো আছে। বাক্স গুলোতে এখন চিঠির পরিবর্তে ধুলো- বালি, ইঁদুর- তেলাপোকা আর মাকড়শা গুলো আবাস গড়েছে। ডাক পিয়ন গেছে অবসরে। খুব ক্লান্তিময় দিন কাটে তার আজ- কাল। লাল-নীল, হলুদ- গোলাপী রঙহীন খামে চিঠি বিলি করতে তার নাকি আর ভালো লাগে না। সুগন্ধ মাখা পরের চিঠি গুলো বিলি করে বেচারা পিয়ন যে সুখটুকু পেতো আজ সে ঐ সুখ থেকে বঞ্চিত হয়ে গেছে, ডিজিটাল চিঠি ব্যবস্থার কারণে।

এবারের পহেলা ফাগুনে শাহাবাগ গিয়েছিলাম, উদ্দেশ্য ছিলো বই মেলায় যাবার। তুমিতো জানো, এই একটি মেলা যেখানে যাবার জন্যে আমি সারাটা বছর প্রতিক্ষায় থাকি। পথে গাড়ির জ্যামে আটকে বসে ছিলাম একটি রিক্সায়। দেখছিলাম ব্যস্ত নগরীর শতশত অধিবাসীরা কত আগ্রহ নিয়ে ফাগুনের সাজ নিয়েছে। রঙ্গীন পোশাকে ফুলের অলংকারে সু-সজ্জিত তরুন-তরুণী থেকে বাচ্চা-বুড়ো- প্রৌঢ় সবাই বসন্তকে বরণ করার উৎসবে মেতেছিলো। হাসি- গল্প- মিষ্টি ঝগড়া আর কাঁচের চুড়ির রিনিঝিনি শব্দে মুখোরিত এক সোনালী বিকেল। জ্যামে আটকে বসে থাকার চেয়ে পায়ে হেটে চলার পক্ষে ছিলো ফাগুনের বিকেলটি।

পথ চলতে চলতেই সব দেখছিলাম, আর এগোচ্ছিলাম গন্তব্যে। হঠাৎ একটি দৃশ্য আমায় কিছুক্ষণের জন্যে থমকে দিয়েছিলো। এক প্রেমিক যুগলের প্রতি দৃষ্টি আটকে ছিলো। হলুদ পাঞ্জাবি আর নীল জিন্স পরা ছেলেটি বাইসাইকেল চালাচ্ছিলো, পেছনে পরম আস্থায় কাধে হাত রেখে মেয়েটি বসে ছিলো বাসন্তী শাড়িতে ফুলের মুকুট মাথায় দিয়ে। হাসছিলো কেউ কারো দিকে না তাকিয়েই। তুমি হয়তো বলবে, এটা এমন কি দৃশ্য ? তবে তুমি যদি আমার দৃষ্টিতে দেখো তাহলে তোমাকেও মুগ্ধতা ছুঁয়ে যাবে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে, আজকের তরুন-তরুনীরা যেখানে নামী-দামী বাইক-মোটর সাইকেলে চড়ে অভ্যস্থ সেখানে এই বিশেষ দিনে বাইসাইকেলে ঘুরে বেড়ানোটা কোনো সাধারণ দৃশ্য নয় প্রিয়।

ফাগুন, বলোতো একটি স্বপ্ন থেকে আরেকটি স্বপ্নের দুরত্ব কত ? আমি অনেক ভেবেছি, কিন্তু হিসেব মেলাতে পারি না। তোমার কি মনে আছে ? কোনো এক ঘুমহীন স্বপ্নময় রাতে তুমি আমি এক স্বপ্ন গাছ বপন করেছিলাম। আমি পারছিলাম না, তুমি আমার হাতে-হাত রেখে গাছটি বপন করে দিয়েছিলে। বীজ বোনার পর প্রথম সার দিয়েছিলে তুমি। আমি দিয়েছি জল। গাছটি বেড়ে উঠেছিলো চোখের পলকেই স্বপ্ন জল-সারে। ফুল ফুটেছিলো এক মুহূর্তে।

প্রথম ফুল তুমি আমার হাতে দিয়েছিলে। সেখানে ছিলো এক জনমের জনম-গাঁথা। সেই জনমে, তুমি ছিলে কৃষান আমি কৃষাণী। ভোর থেকে সন্ধ্যা তুমি তোমার স্বপ্ন মাঠে সোনালী ফসল ফলাতে, আমি তোমার স্বপ্ন কুটিরটাকে আরো স্বপ্নীল সাজে সাজাতাম দিনভর। সন্ধ্যায় তুমি ফিরে এলে, আমার শাড়ির আচলে মুছে নিতাম তোমার ঘর্মাক্ত মুখ-কপাল। আর তুমি _ আমার সারাদিনের কর্মব্যস্ততায় এলোমেলো হয়ে যাওয়া কপাল ঢেকে থাকা চুল গুলো সরিয়ে ঠিক করে ললাটে এঁকে দিতে ভালোবাসা-মমতার চুম্বন টিকা। আমরা সারারাত পার করতাম ঝলমলে চাঁদের পাহারায় থাকা ঝিকিমিকি তাঁরার উঠোনে।

প্রিয়, তোমায় কি বলেছি পরের ফুলটি এখনো ফোটেনি। অপেক্ষায় ছিলাম এবারের ফুল আমি তোমাকে দিবো। হটাৎ বৃষ্টি এসে সব শেষ করে দিলো। অদিনের বৃষ্টিতে ভিজে রাগে-দুঃখে- অপমান আর অভিমানে বসন্তের কোকিল কাক হয়ে গেছে। কৃষ্ণচুড়ার হাসি উষ্ণ বৃষ্টির জলে আরো রক্তাক্ত হয়ে পরলো। বসন্ত এনে দিলো একরাশ শ্রাবণের মেঘ। অথচ, আমাদের স্বপ্ন গাছটির সহ্য সীমা অসীম হওয়ার কথা ছিলো। প্রবল ঝড়-বৃষ্টি বা প্রচন্ড ক্ষরায় হেসে উঠার কথা ছিলো । কথা ছিলো ডাল-পালায় বিস্তারিত হয়ে অজস্র স্বপ্ন ফুলে সুবাসিত হবে, সৌরভে বিমোহিত করবে আমাদের জন্ম-জন্মান্তরের পৃথিবী …

কথা ছিলো, আমরা আমাদের স্বপ্ন বনে
হাতে-হাত রেখে পথ চলবো, এগিয়ে যাবো,
কথা ছিলো, আমরা এক হবো- অচেনা
পথের দিগন্ত সীমানায়।
এক সাথে পৌঁছবো আমাদের নিজ অক্ষে,
নক্ষত্র-তাঁরা গুলোকে আড়ালে রেখে
চাঁদ হয়ে জোছনার বাসর সাজাবে তুমি
ডাকবে আমায়,
সাড়া দিবো নদী হয়ে –
সাজবো তোমারই আলোয়,
আকুল হবো তোমার প্রেমের আহ্বানে-আলিঙ্গনে,
আমায় অলংকৃত করে দিও
তোমার রঙধনু মনের সপ্ত রঙে।
প্রিয়, তুমি জোছনা হয়ে ছুঁয়ে যেও আমায়,
আমি উত্তাল হবো জোয়ারে-প্রতি পূর্ণিমায়..

ভালোবাসা নিও,
তোমারই নদী ।

৬১৪জন ২৯৪জন
54 Shares

৩৩টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য