খেজুরের রস

সুপর্ণা ফাল্গুনী ৮ ফেব্রুয়ারী ২০২০, শনিবার, ১১:৪৩:২৪পূর্বাহ্ন একান্ত অনুভূতি ৩০ মন্তব্য

আমার ছোটবেলাটা পুরোপুরি শহরকেন্দ্রিক ছিল। গ্রামের বাড়িতে যেতাম বছরে একবার। লঞ্চে যেতে হতো বলে পুরো একদিন লাগতো। আগেরদিন বিকেলে উঠলে পরেরদিন বিকাল হয়ে যেত পৌঁছাতে। মামার বাড়ি আগে পড়তো বলে আগে ওখানেই উঠতাম। ওখানে আমার বেশী ভালো লাগতো না । মায়ের কারণে বাধ্য হতাম ওখানে থাকতে। নিজের কোনো কাজিন ছিলোনা বলে খেলার সাথী হতো গ্রামের সমবয়সী পাড়াতো ভাইবোন, খালা মামারা। তবে শীতকালে গেলে মামার বাড়ি টা বেশী ভালো লাগতো। কেন?- কারণ একটাই শীতকালের খেজুরের রস আর কীর্তনের আসর। খেজুরের রস সেটাও পেতাম প্রতিবেশী মামার বাড়ি। মামী খুউব ভালোবাসতো । গাছিদের গাছ কেটে রস বের করার পন্থা গুলো খুব মনোযোগ দিয়ে দেখতাম। বিকেলবেলা রসের হাঁড়ি বসানো, কুয়াশামাখা ভোরে রসের হাঁড়ি গাছ থেকে নামানো ইত্যাদি ইত্যাদি খুব ভালো লাগতো। আমার জন্য রস আলাদা করে রেখে দিতো, যত ইচ্ছা খেতে পারতাম। ঠান্ডার জন্য বেশী একবারে খেতে পারতাম না। তবুও এক/দেড় লিটার খেয়ে ফেলতাম। সেই মামাদের অনেক গাছ ছিল তাই রস পেত ৩০/৪০ হাঁড়ি।

সে যে কি অনুভূতি, তৃপ্তির ঢেকুর তুলতাম পেট পুরে খেয়ে। রস দিয়েই সকালের নাস্তা করতাম। সেই মামীর ছেলেমেয়েরাও আমাকে খুব পছন্দ করতো, তারা সবাই আমার এক দু’বছরের ছোট-বড় ছিল। খেলার সাথী, খাবারের সাথী, ঘোরাঘুরির সাথী সবকিছুতেই আমাকে সঙ্গী করতো। কাঁচা রসতো খেতামই , তারপর বেঁচে যাওয়া রস জ্বাল দিয়ে নরম গুড় বানাতো সেটা দিয়ে তেঁতুল মেখে খেতাম। সেটা ছিল আরো লোভনীয়। রাতেও রস চুরি করেই খেয়েছি কারণ মামী আবার ওটা পছন্দ করতো না। কিন্তু মামাতো ভাইবোন গুলো খুব ডানপিটে স্বভাবের কারণে মামীকে ভয় পেতো না। চুরি করে পায়েস রান্না করা আবার সেই উপলক্ষে সবাই চাল-ডাল,মুরগী এনে বনভোজন করাটা ছিল আরেক উৎসবের আমেজ। লুকানোর কিছু বাকী থাকতো না। গ্রামের সবাই আসতো আমাদের ছোটদের বনভোজন দেখতে, তারাও কমবেশি খাবারে ভাগ বসাতো। ক্ষেতের মধ্যে ঢুকে কলাইয়ের শাক তুলতাম, সকালের শিশির ভেজা ঘাসে পা ভিজাতাম । অন্যরকম ভালোলাগা, আকর্ষণ অনুভব করতাম। আমাকে খুব বাধা দিতো বলে লুকিয়ে লুকিয়ে বের হয়ে যেতাম সঙ্গীদের নিয়ে। রাস্তার দু’পাশ ধরে খেজুর গাছের সারি ছিল। বড় রাস্তা হবে বলে মামী সব গাছ কেটে ফেললো, বাড়ির মধ্যে দু-চারটে যা ছিল তাই দিয়েই তৃষ্ণা মেটাতে হতো। গাছ কেটে ফেলার জন্য কি যে কষ্ট পেয়েছিলাম । এখন আর বাড়িতে যাওয়া হয় না, রস ও খাওয়া হয়না। খুব খুব মিস করি সেসব দিনগুলি- আমার সোনালী দিনগুলি।

৪৩৮জন ২১৩জন
6 Shares

৩০টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য