খুউব জানতে ইচ্ছে করে

সুপর্ণা ফাল্গুনী ১০ ডিসেম্বর ২০১৯, মঙ্গলবার, ১২:৫৪:২৯পূর্বাহ্ন একান্ত অনুভূতি ২২ মন্তব্য

আকাশ হঠাৎ একদিন মৌরিকে একটি পাপা মিলনের গোলাপ হাতে দিলো। মৌরি তখন ক্লাস নাইনের ছাত্রী। সে কিছুটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো। কিন্তু আকাশকে কোনো প্রশ্ন করলো না। মনের মধ্যে একটার পর একটা উত্তর সাজাতে লাগলো। ফলাফল- মৌরি বুঝে ফেললো আকাশের মনবাসনা। কিন্তু সে তাকে কিছুই বুঝতে দিলো না কারণ সে চায়নি আকাশের সাথে সম্পর্ক হোক। যাই হোক এরমধ্যে আকাশ আর কিছু বলেনি। কিন্তু মৌরির মনের গহীনে তাকে দেখলেই একটা অজানা আকর্ষন, ভালোলাগা কাজ করতো। আবার সেই চাইতো না তাকে। একটা দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়লো মৌরি। বয়সে অনেক বড় হওয়াতে তাকে সে ভয় করতো আবার তার ব্যাক্তিত্বের কারনে তাকে যথেষ্ট সম্মান ও শ্রদ্ধা করতো।

মৌরির এস.এস.সি. পরীক্ষা শুরু হলো। এই দু’বছরে আকাশ তেমন কিছু আর করেনি, তবে সে যে মৌরিকে গোপনে দেখতো সেটা মৌরির চোখ এড়ায়নি। ঢাকায় পড়াশোনা করতে এসে সে মৌরিদের বাসায় থাকতো বা থাকতে চেয়েছিল মৌরির কাছাকাছি। পরীক্ষার মাঝে মাঝে আকাশ আনা নেয়া করলো তাকে। পরীক্ষা শেষে আকাশের বাবা-মা মৌরিকে তাদের বাসায় বেড়াতে যেতে বললো। মৌরির কলেজ ভর্তি কোচিং থাকায় সে অপারগতা জানালো। এরমধ্যে আকাশের বাবা ঢাকায় টেলিভিশন কিনতে এসে মৌরিদের বাসায়ই উঠলো। তখন পূজার ছুটি থাকায় কোচিং ও বন্ধ ছিলো। তাই মৌরিকে তাদের বাসায় নিতে আর কোনো বাধা কাজ করলো না। ততোদিনে মৌরির অনেকটা আকাশকে ভালো লাগতে শুরু করেছে। তাই মৌরি মনে মনে যাবার জন্য সিদ্ধান্ত নিল। বাবা-মা রাজী হলেই কেল্লাফতে। যাইহোক সব ম্যানেজ হলো। মৌরিদের যাত্রা শুরু হলো। গাড়িতে পাশাপাশি বসার সুযোগ হয়নি তাই গাড়ি কোথাও দাঁড়ালেই আকাশ বারবার এসে জানালার পাশে এসে দাঁড়াতো এটা ওটা দেয়ার উছিলায়। এভাবে চলতে চলতে ফেরী পারাপারের জন্য গাড়ি দাঁড়ালো। ফেরীতে উঠে ওরা খেলো। অনেকটা সময় পাশাপাশি থাকলো,তেমন কোনো কথা হলোনা। যথারীতি ঘাট পেরিয়ে ওপারে গিয়ে আবার দু’জনের অবস্থান আগের ঠিকানায় হলো। গন্তব্যে পৌঁছাতে রাত অনেক হয়ে গেল। মফস্বলে তখন অনেকটাই শীতের আমেজ বিরাজ করছে। সময় সুযোগ পেলেই আকাশ মৌরির অনেকটা কাছে চলে আসতো, মৌরি বিষয়টি বেশ উপভোগ করতো। সেও তার কাছাকাছি থাকাটাই মনে মনে খুউব চাইতো। একসাথে খেতে বসলে এটা ওটা মৌরির পাতে তুলে দিতো,হাত ধোয়ার পানি এগিয়ে দিতো সুযোগ পেলেই। মৌরি যেন ভালোবাসার দ্বার খুঁজে পেলো, ভালোবাসার রং চিনতে শুরু করলো, ভালোবাসার আবেগে আপ্লুত হয়ে উঠলো ওর নিষ্পাপ হৃদয়। মৌরির হৃদয় আকাশে আকাশ একাই রংধনুর রং ছড়িয়ে দিলো।

দিনে দিনে ওদের কাছাকাছি আসাটা বেড়েই গেল। কিন্তু আকাশ তখন ও মুখ ফুটে সেই কাঙ্ক্ষিত কথাটি বলেনি । পিছন থেকে এসে আলতো করে ছুঁয়ে দেয়া, চোখে চোখে কথার মালা গাঁথা, একসাথে ঘুরতে যাওয়া, শপিং এ যাওয়া কিন্তু কখনো হাত ধরে চলা হয়নি,ভালোবাসি কথাটাই যে আজো বলা হলোনা। সময়ের স্রোতে মৌরির বাড়ি ফেরার সময় ঘনিয়ে এলো। হঠাৎ এক সাঁঝবেলায় আচমকা এক দমকা হাওয়ার মতো আকাশ পিছন থেকে মৌরির দু’গাল ধরে বলেই ফেলল ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’। মৌরির আকাশে দমকা হাওয়াটা ঝড়ে রূপ নিলো। সে বলে উঠলো ‘কি বললেন আপনি!’এটা কি করে সম্ভব? আকাশ বললো ‘কেন সম্ভব নয়, তুমি কি আমাকে পছন্দ করোনা? মৌরি কিছু বলার আগেই কার পায়ের শব্দে আকাশ হকচকিয়ে দৌড়ে বাইরে চলে গেলো। রাতে খাবার পর হাত ধোয়ার পানি এগিয়ে দেয়ার অপেক্ষার প্রহর গুনছে আকাশ। কাঙ্খিত সেই সময় সুযোগ পেয়েই মৌরিকে বললো’প্রশ্নের উত্তর পজিটিভ না নেগেটিভ?’ মৌরি না বোঝার ভান করে বললো ‘কিসের পজিটিভ নেগেটিভ?’আকাশের অনেক অভিমান হলো বা অভিমানের অভিনয় করলো। মৌরি মনে মনে খুউব খুশী হলো আর মজাও পেলো আকাশের অভিমান দেখে। আসলে সে আকাশের ভালোবাসাকে পরীক্ষা করছিলো। উত্তর দেয়ার আগেই মৌরিকে বাড়ির পথে রওনা হতে হলো। মৌরির চাচা এলো মৌরিকে নিতে।আশেপাশে তাকিয়ে কোথাও মৌরি আকাশকে খুঁজে পেলো না। কখন যে তার দু’চোখ বেয়ে অঝোরে বৃষ্টি ঝরতে লাগলো সে টেরই পেলনা। আকাশের বাড়ির সবাই ওকে শান্ত রাখতে চেষ্টা করলো।

মৌরি বাড়িতে এসে কিছুতেই স্বাভাবিক হতে পারছিল না। সারাক্ষণ সে আকাশের অপেক্ষা করতে লাগলো। হঠাৎ খবর পেল আকাশ তাদের বাড়ির রাস্তায় । মৌরি একদৌড়ে রাস্তায় গেলো। ওমা আকাশ কৈ? এতো আকাশের ছোট বোন জামাই। ওর মনটাই ভেঙে
গেলো। সেটা বোন জামাই আঁচ করতে পেরে বলেই ফেললো ‘যার জন্য অপেক্ষা সে অন্য রাস্তা দিয়ে আসছে। মৌরি তবুও মনকে শান্ত করতে পারছিলো না আকাশকে চোখে না দেখা পর্যন্ত। যাইহোক কোনোরকমে অন্য রাস্তার মাথায় গিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। মৌরি এবার সত্যিই কি আকাশকে দেখতে পেলো? সে নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করলো। হ্যাঁ তাইতো-ঐতো ওর কাঙ্খিত সেই ভালোবাসা,সেই আকাশ। মৌরি যেন এবার চলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেললো। বাড়ির লোকজন বুঝে গেলো ওদের মনের ভাব। আকাশ দূর থেকেই ওকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে টিপ্পনী কাটলো ,’কি এখানে আসা যায় না, ওখানে দাঁড়িয়ে থাকলে চলবে?’ মৌরি ওর কথায় হেসেই দিলো। বাড়িতে এসে আকাশ ওকে নিয়ে সবখানে বেড়াতে গেলো,ঘুরলো। একদিন হঠাৎ আকাশ ওকে নৌকায় উঠালো। উঠিয়েই নৌকা চালানো শুরু করলো। বাড়ির কেউ কেউ বিষয়টি দেখলো। আকাশ কোনোকিছুই তোয়াক্কা না করে নৌকা চালিয়ে গেলো। মৌরি বললো,’এ আপনি কি করলেন, বাড়ির লোকজন কি ভাববে?’ আকাশ ওকে শান্ত হয়ে নৌকায় বসতে বললো। কিছুদূর গিয়েই আকাশ মৌরিকে তার প্রশ্নের জবাব চাইলো। মৌরি বললো,’এটা কি সম্ভব? দুই পরিবার কি রাজি হবে। সে পরিবারের বাইরে কিছু করতে পারবেনা।’ আকাশ বললো,’তোমার মতামত জানাও । বাকিটা আমি ম্যানেজ করবো।’ মৌরি বললো,’দুই পরিবার রাজি থাকলে এ সম্পর্কে তার কোনো আপত্তি নেই।’আকাশ বললো,’আমার স্বাবলম্বী হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারবে?’ মৌরি বললো,’পারবো’। শুরু হলো দুজনের ভালোবাসার পথ চলা।

এরমধ্যে মৌরির রেজাল্ট বের হলো। মৌরি ভালো রেজাল্ট করলো। কলেজে ভর্তি হতে আকাশ মৌরিকে সবরকম সাপোর্ট দিলো। সবসময় মৌরির সাথে থাকতো। মৌরি কলেজের বান্ধবীদের সাথে আকাশকে পরিচয় করিয়ে দিলো। দুজনের ভালোবাসার ভেলা ভাসিয়ে নিলো অনেক দূর। আকাশ মৌরিকে খাইয়ে দিত,এলোমেলো চুল আঁচড়ে দিতো, মৌরির কোলে মাথা রেখে চুলে হাত বুলিয়ে দিতে বলতো, মাঝে মাঝে মৌরির মাথাটা আলতো করে টেনে দুজনের ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিতো, পিছন থেকে এসে আলতো করে ছুঁয়ে দিতো। মাঝে মধ্যে বইয়ের ভাঁজে ভাঁজে , ম্যাগাজিনের মলাটের নিচে একপক্ষীয়ভাবে চিঠিপত্র দেয়া হতো। মৌরিই চিঠি লিখতো কারণ সে গুছিয়ে বলতে পারতো না তাই কাগজ কলমে মনের ভাষাগুলোকে সাজিয়ে আকাশকে দিতো। প্রায়ই মৌরি জানতে চাইলে আকাশ বলতো তার চিঠি লিখতে ভালো লাগে না। তাই সে চিঠির জবাব দিতে নিজেই চলে আসতো। মৌরি কষ্ট পেলেও আকাশকে কিছু বলতে পারলো না। কারণ আকাশকে সে খুউব শ্রদ্ধা করতো ও ভালোবাসতো। এভাবেই অনেকটা সময় সময়ের স্রোতে ভেসে চললো।

কিন্তু বিধাতা কারো কপালে সুখ বেশিদিন স্থায়ী করেনা। হঠাৎ ওদের ভালোবাসায় ছন্দপতন ঘটলো। দু পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সম্পর্ক নষ্ট হলো, ওদের সম্পর্ক টা কেউই মেনে নিতে চাইলোনা। আকাশ মৌরিকে তার জীবন থেকে সরে যেতে বললো। মৌরির পায়ের তলার মাটি দু’ভাগ হলো নাকি পুরো পৃথিবী টা ওর মাথায় ভেঙে দিয়ে গেল আকাশ!মৌরি আকাশের কাছে তার অপরাধ জানতে চাইলে আকাশ মৌরিকে বললো,’তুমি আমার চেয়েও ভালো পাত্র পাবে, আমার পক্ষে সম্পর্ক টা রাখা সম্ভব নয়।’মৌরির আকাশের রংধনুর সব রং মিশে কালো হয়ে গেলো। মৌরি কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি চলে এলো, কাউকে কিছু বুঝতে দিলো না।

এরপরও অনেক বার আকাশের সাথে দেখা করার বা কথা বলার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে মৌরি নিজেকে আকাশ বিহীন জীবন গড়ার জন্য তৈরি করলো। নিজেকে পরিবার পরিজন থেকে ধীরে ধীরে সরিয়ে নিলো। কারো বিয়েশাদী, জন্মদিন, পার্টি এসব থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতো। আত্নীয় স্বজন দের সাথে ও দূরত্ব বজায় রাখলো। যেন নিজের চারপাশে একটা অভেদ্য দেয়াল তৈরি করে নিলো। শুধু একটা প্রশ্নের উত্তর আজো তার অজানাই রয়ে গেল। মাঝে মাঝে হৃদয়ের গহীনে একটা কথাই বেজে উঠে’কেন আমাকে ছেড়ে গেলে,কি আমার অপরাধ ছিল? খুউব জানতে ইচ্ছে করে।’ সিডিতে মান্না দের ‘খুউব জানতে ইচ্ছে করে। তুমি কি সেই আগের মতই আছো, নাকি অনেক খানি বদলে গেছো।’গানটি বাজতে ছিলো আর মৌরির ভিতরটা দুমরে মুচড়ে উঠলো, দু’চোখ বেয়ে অঝোরে বৃষ্টি ঝরতে লাগলো।

৩৬৫জন ১২৩জন
12 Shares

২২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য