খুঁজে ফিরি তবুও

রোকসানা খন্দকার রুকু ২৬ আগস্ট ২০২২, শুক্রবার, ০৮:০৫:৪৬অপরাহ্ন রম্য ৮ মন্তব্য

“বাবা মাঈ উঠো দুধ বাতাসা পিয়া কারো, যুগ যুগ জিয়া কারো”- এ হলো সাত-সকালে মায়ের আহ্বান। সারারাত সোফার গরমে পিঠ পুড়ে, না ঘুমিয়ে চেখে- মুখে রাজ্যের বিরক্তি ভর করছে। তবুও খুশি খুশি মুখে উঠে গিয়ে দেখা গেল, কোথায় দুধ আর কোথায় বাতাসা। কপালে বড়জোর এককাপ আদা চা বা কফিই জুটতে পারে!

 

বাড়িভর্তি সিজেনাল গেষ্ট। মায়ের মিলন মেলা টাইপ দাওয়াত। শোয়ার জায়গা সংকুলানে সবসময়ের মতো সোফায় আমারই ঠাঁই হয়। কারন ওল্ড কাপলদের এখনও একজনের বুকে অন্যজন না শুলে ঘুম হয় না। তাই তেনারা জোড়ায় জোড়ায় বিছানায়। সোফার ঘরে ঢালাও বিছানায় ফাষ্ট ওল্ড বিধবা জেনারেশানের সাথে আমি।

বুবু বলে- ওর তো একা শুতে পছন্দ, খালাম্মাদের সাথেই থাকুক। আর সে হাফ বিধবাও!

কাজ করে অনেক ক্লান্তিতে ঘুমিয়েই গেছিলাম। বাবারে বাবা! অতি ভোজনের কারনে দূর্গন্ধময় বায়ু দোষ। বিকট শব্দে হাত- পায়ে যেন কেঁপে উঠতে হয়। দরজা- জানালা সব খুলে রেখেও সে দূর্গন্ধ যেন যায় না। একেক জনের ভিন্ন ভিন্ন স্টাইলের নাকের ডাক। কারও আবার বুড়ো বয়সে গায়ের চুলকানীতে আমার অবস্থা- ” ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি”।

অগত্যা ঢালাও বিছানা ছেড়ে সোফায় শুতে হয়। এ সময় বালিশ মুখে চাপা দিয়ে একজনকে ভীষন মিস করতে থাকি। সে থাকলে অন্তত আমিও কাপল হয়ে বিছানা পেতাম।

তাকে ম্যাসেজ দিলাম- মিস ইউ আপনাকে!

উত্তর এলো- জ্বর এসেছে নাকি?

মেজাজ গেল খিস্তি হয়ে। এজন্যই কাউকে কিছু বলতে নেই। আনরোমান্টিক, এরোগেন্ট মানুষদেরও যে আবেগ থাকে এটা ক্যামনে বোঝাই।

 

সকালে মোটামুটি সবাইকে চা দিয়ে কেবল কফিটা নিয়ে বসেছি। বড়দাদা বীরমুক্তিযোদ্ধা সাহেব ভারী গলায় ফোন দিয়েছেন মনে করিয়ে দিতে।

– বাবু, আজ তোমাদের জরুরি কাজ মনে আছে, নাকি শুধু গেষ্টদের সাথে হৈ হৈ করছো। এসিল্যান্ড অফিসে অবশ্যই হাজিরা দিতে হবে। অবসরে যাওয়া মানুষ না হলে এসব আমার কোন ব্যাপার ছিল না।

 

বড়দাদাকে কিছু বলা যায় না। শুধু হু, হ্যাঁ বলতে হয়। তবুও বলতে মন চাইলো- একদিনও তো গেলেন না বস। শুধু গল্প ছাড়েন। বাপের সম্পত্তি উদ্ধার করতে আমাদের দুভাই বোনের পাছায় লাল লাল বানরের মতো কড়া যে পরেছে, সেটার খেয়াল রেখেছেন? আর আপনি শুধু শাসন করেন। বাপের সাথে মাস্তি করে এখন এমন ভান ধরেন- ‘ ‘ ন্যামন্যাম দাঁড়ি ভোকলোম দাস বাগ ( বাঘ) মারচোং মুই গোটা পঞ্চাশ।”

কিছুই বলা হয় না। এ সময় বুবুকে যদি বলা যায় তিনি সহজ উত্তর দেন- আমি এসবের কিছুই বুঝিনা। তাছাড়া বুড়া মানুষের এসব কাজ নাকি? আর শোন- “এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার শ্রেষ্ঠ সময় তারই”।

সারারাত কাপল বিছানায় ঘুমিয়ে তিনি এখন বৃদ্ধ। কার্য উদ্ধারের কি অদ্ভূত বাক্যালাপ। আমি নিজেকে আয়নায় দেখি- কেন এঙ্গেলে যদ্ধে যাবার মতো যৌবন খুঁজে পাই না। তবুও কার্য হাসিলের যৌবন টাইটেল ভর করে আমার উপর।

ছোট ভাইয়া কেবলই ঘুম থেকে উঠে ভাবীর সাথে আধবোজা চোখে উঠে এলো।

– দাদা ফোন দিয়েছিল! কখন যাবি?

তিনি ভাঙ্গা গলায় জানালেন – ময়না আমি আজ খুব অসুস্থ রে; তাছাড়া কলেজে মিটিং আছে। তোর ভাবীকে স্কুলে নামায় দিয়ে আমি ঘুমাবো। গ্রামে ঘুম হয়না। আজ তুই একাই যা। ওখানে কোন সমস্যা হলে ফোন দিস। আর এসিল্যান্ড এর সাথে তো তোর ভালো খাতির!

এই সাতসকালে বাবু, ময়না শুনলেই চেয়াল শক্ত হয়ে যায়। এসব ডাকে গভীর ষড়যন্ত্র লুকিয়ে থাকে।  ফায়দা হাসিলের ডাক। কারন আমি খুব ভালো করে জানি আমি বাবুও না, ময়না টাইপ কিউটও না।

 

– মা গেলাম, ফিরতে দেরী হবে।

মা আমার দিকে বিস্ফোরক চোখে তাকিয়ে। কারন হলো, অন্যসময় ফাটা কোম্পানীর কমদামী ট্রাউজার আর গাউছিয়ার ওয়ানপিসই আমার সঙ্গি। আজ যখন হাতে ঘড়িও পরে ফেলেছি, তখন ঘটনা সন্দেহজনক!

এসিল্যান্ড কমবয়সী ধানী মরিচ। তার বন্য চোখের চাহনীতে সততার মশাল ভরপুর। অন্যান্যরা যখন ঘুস আর প্রাসাদ বানিজ্যে ব্যস্ত। তখন সে ভাবে তাদের পয়সা দিয়ে হবে কি? তার হাজব্যন্ড এক্সিকিউটিভ ইন্জিনিয়ার সাহেবও ভালো মানুষ। সমাজটাতে এমন মানুষের ভীষন দরকার। কোথাও এই মেয়েটার সাথে আমার যায়। তার সাথে সময় কাটাতে ইচ্ছে করে। পাশ থেকে অনেকক্ষন দেখতেও ইচ্ছে করে।

অনেকবার বলে- বাসায় আসুন। এখানে তো অনেক ব্যস্ত!

দরজায় দাঁড়িয়ে আসতে পারি বললেই রাগী চোখে তাকিয়ে আমাকে দেখে হেসে দেন। রাগী মানুষের হাসি নির্ভেজাল সুন্দর হয়! চা খাই, সামান্য গল্প হয়। চাইলেই বাসায় যাওয়া যায় কিন্তু আমার কেন যেন মনে হয় এর বেশি ঠিক নয়। ‘ দুরত্ব সম্পর্ক মধুর রাখে ‘।

যারা কাছের মানুষ বলে পরিচিত তারা দুদন্ড শান্তি দিতে কুন্ঠাবোধ করে। তখন জীবন হন্নে হয়ে শান্তি খুঁজে মরে। সামান্য কিছু পাওয়া হয়ে গেলেই মনে হয়, অনেক পেলাম।

সারাদিন যেন বিরাট আনন্দময় সময় কাটিয়ে ফিরলাম এমন এক অভিব্যক্তি সবার চোখে-মুখে। আদতে আমি কাগজ ঘাঁটতে ঘাঁটতে ক্লান্ত। গোসল সেরে মনে হল শরীর বিছানায় দেই। তা আর হলো না। সারাদিন বুবু অনেক কাজ করেছে।

রাতের রান্নায় লবন বেধরক বেশী হয়েছে। খেতে বসা মানুষগুলো ভীষন বিরক্ত। আমারও নিজের উপর বিরক্ত লাগছে। পুরুষ- মহিলা দুই দায়িত্বই কেন সমান ও ঠিকঠাক করতে পারিনা এজন্য। কিছু মানুষের কাজের  বেলায় যে একদম পারফেক্ট হতে হয়। জীবনের উপর অভিমান হলো ভীষন রকম।

যদিও আমার মতো কিছু জীবনের অভিমান, অভিযোগ হতে নেই। চাওয়া সেতো বড্ড অবান্তর। অবসাদ, ক্লান্তি কখনো যেন না ছোঁয়। কে ভালোবাসলো, কাছে ডাকলো, পাশে বসলো এসবের হিসেব ছাড়া চলতে হবে। রাগ ভাঙ্গানোরও কেউ থাকবে না। দায়িত্ব নামক শক্ত শেঁকলে নিজেকে বেঁধে উদ্ধশ্বাসে দৌড়ে মরতে হবে। তবুও কখনো সখনো কেউ এসে বলবে না একটু জিরিয়ে নাও।তোমারও তো কষ্ট হয়, মন আছে, বেদনা, দুঃখ কষ্ট সব হয়। বলোতো তোমার কথাও একবার শুনি,,,,কেউ জানতেও চায় না তারও কোন কষ্ট আছে কিনা!!!তবুও মন চায়,,,,,

কোন একদিন জীবন এসে বলবে

এসো বসি মুখোমুখি, আজকের স্নিগ্ধ সকাল শুরু হোক আমাদের মুগ্ধ আলাপনে।

আমি ভাগ নেবো তোমার সমস্ত অভিমান, ক্লূেদ, যন্ত্রণার

সেগুলো বস্তা বন্দী করে নিয়ে যাবো দুর বহুূুদুরে,

বিমিময়ে ফিরিয়ে দেব একটু জিরিয়ে নেবার আশ্বাস।

কেউ তোমাকে ভালো না বাসলেও,

আমি বাসবো ভালো তোমায় মুঠি মুঠি,

শুধাবো যা বলতে চাও, শোনেনি কেউ যা কোনকালে

প্রশস্ত কাঁধে বইবো তোমার অনাদিত আকাঙ্খা,

বালু কনা হয়ে ফিরবো চোখের কোনায়,

এবেলা ওবেলা বলে কোন বেলাই রাখবো না তাতে।

চারিপাশের বৈরিতা ধরা দেবে অর্থহীন হয়ে,

শ্রাবণের শেষ বর্ষণের মতো প্রশান্তি ছড়াবে ফোঁটা ফোঁটা

একা তুমি নও কখনও, প্রয়োজনও নও,

তুমি আমার একান্ত আপন, প্রিয়জন!!!

ছবি- নেটের।

২৩৯জন ১৪২জন
0 Shares

৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

  • রোকসানা খন্দকার রুকু-এর মায়া পোস্টে
  • রোকসানা খন্দকার রুকু-এর মায়া পোস্টে
  • রোকসানা খন্দকার রুকু-এর হরন পোস্টে
  • রোকসানা খন্দকার রুকু-এর হরন পোস্টে
  • রোকসানা খন্দকার রুকু-এর হরন পোস্টে

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ