ক্রোধ’ বদলে দেয় জীবনের গতিপথ

রিমি রুম্মান ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২২, বৃহস্পতিবার, ০৮:০৮:৫৩পূর্বাহ্ন একান্ত অনুভূতি ৬ মন্তব্য

রাতের ঝলমলে নগরী ম্যানহাটনের ডিলেনসি ষ্ট্রীটে প্রায়ই উজ্জ্বল শ্যাম বর্ণের এক সুদর্শন যুবককে দেখা যেত লকডাউনের সময়টাতে। আমরা মহামারীর ভয়াবহ আতঙ্কিত দিনগুলোতে গাড়ি নিয়ে বের হতাম রাতের ম্যানহাটন দেখতে। জনমানবহীন শহরটিতে মাঝে মধ্যে নিস্তব্দতা ভেঙে দীর্ঘ বিরতিতে ২/১ টি গাড়ি ছুটে যেত। ডিলেনসি ষ্ট্রীটে রেড লাইটে গাড়ি থামলে সেই যুবককে ছুটে আসতে দেখা যেত। হাত বাড়িয়ে সাহায্য চাইত এইভাবে, ‘ক্যান আই হ্যাভ সাম ডলার প্লিজ’। কেউ গাড়ির জানালার কাঁচ খানিকটা নামিয়ে ডলার দিত, কেউবা পাশ কাটিয়ে চলে যেত। এখনো মাঝে মাঝেই তার দেখা পাওয়া যায়। তবে রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে গায়ের রঙ গাঢ় তামাটে হয়ে গিয়েছে এতদিনে। চুল বড় হয়ে কাঁধ বরাবর নেমে এসেছে। লালচে, জট লেগেছে তাতে। পরনে ময়লা কাপড়। দিনের পর দিন গোসল না করায় শরীর থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। তিনি আর কেউ নন। একজন বাংলাদেশি হোমলেস।

এবার আসি তার গল্পে। ধরে নিলাম তার নাম জিশান চৌধুরী। কেনো জিশানের এই দশা? তার ভাষায়, ‘একদিন দুই চোখ ভরা স্বপ্ন ছিল, ঘর ছিল, সংসার ছিল। স্ত্রী, এক পুত্র ও কন্যা নিয়ে চার সদস্যের সুখি পরিবার ছিল। আজ কিছুই নেই।’ কেনো নেই? কারণ ‘ক্রোধ’। মেজাজ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা। সংসারে যে কোনো বিষয়ে মতপার্থক্য থাকবে। কিন্তু কথায় কথায় স্ত্রীকে অকথ্য ভাষায় গালমন্দ করা, গায়ে হাত তোলার পরিণতি তার জীবনে চরম বিপর্যয় ডেকে আনে। আত্মরক্ষার্থে স্ত্রী ৯১১ নাম্বারে কল করেছে বহুবার। পুলিশ এসেছে। জিশানকে গ্রেফতার করেছে। হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে গিয়েছে। প্রতিবার ট্যাক্সিক্যাব লাইসেন্স সাসপেন্ড হয়েছে মামলা চলাকালীন সময়গুলোতে। এভাবে এক সময় লাইসেন্স বাতিল করে দেয়া হয়। সে পেশা থেকে ছিটকে পড়ে। এই শহরে জিশানের আরো দুই ভাইয়ের বসবাস। কিন্তু কেউ তাকে ঘরে জায়গা দিতে নারাজ। প্রথম দিকে ২/১ বার ভাইয়েরা তার সাহায্যে এগিয়ে এসেছিল যদিও। পারিবারিক সালিশ বসেছে একাধিকবার। কিন্তু ছোটখাটো বিবাদগুলোতে স্ত্রী, পুত্র, কন্যার প্রতি জিশানের মারমুখী আচরণ সঠিক সমাধানের পথে যেতে ব্যর্থ করেছে বারংবার। ফলে ভাইয়েরা দূরে সরে গিয়েছে। নিজের সংসার থেকে বিতাড়িত হয়েছেন জিশান। ঘন কালো নির্লিপ্ত শীতল চোখে তাকিয়ে বললেন, ‘সবই কপাল। কী করবো, রক্ত গরম, নিজেরে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না।’ ভাবলেশহীন চোখে দূরে ছুটে চলা গাড়ির দিকে তাকিয়ে আবারো বললেন, ‘এই ক্রোধই আমার জীবনের অনিষ্টের কারণ। আমারে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়া আসছে।’ ততক্ষণে সড়কের সবুজ বাতি জ্বলে উঠেছে। জিশানের মুখে সবুজাভ আভা ছড়িয়ে পড়েছে। ভেতরে নিজের প্রতি প্রবল ক্ষোভ। তবুও অথৈ বিষাদের পরিবর্তে হাসি হাসি মুখে সে ফুটপাতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। হয়তো যে জীবন সে যাপন করছে, সে জীবনেই সে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে এতদিনে। আমরা ফিরছিলাম উইলিয়ামসবার্গ ব্রিজের দিকে। গাড়ির সাইড মিররে আমি আরেকবার তাঁর চলে যাওয়া দেখছিলাম। ল্যাম্পপোস্টের আলো-মাখা অন্ধকারে তাকে ভগ্নস্বাস্থ্যের সাঁকোর মতো লাগছিল। কোথায় যেন পড়েছিলাম, একজন রাগান্বিত মানুষ যখন যুক্তিতে ফিরে আসে, তখন সে আবার নিজের সাথে রাগ করে।

এ তো গেলো অচেনা জিশানের জীবন গল্প।

নিজের পরিবারের এক সদস্যের গল্প বলতে চাই এবার। এক ভর দুপুরে দরজায় টোকা দেয়ার শব্দে এগিয়ে যায় পরিবারের কর্তা। দরজা খুলে দেখতে পায় অচেনা কৃষ্ণাঙ্গ এক নারী। ইউনিফর্ম পরিহিতা নারী গলায় ঝোলানো আইডি কার্ড দেখিয়ে নিজেকে অপটিমা ক্যাবল কোম্পানির কর্মী পরিচয় দেন। সে তার কাজের অংশ হিসেবে কোম্পানির সুযোগ সুবিধা সম্পর্কে অবহিত করে চলছিলেন। পরিবারের কর্তা এ বিষয়ে নিজের অনাগ্রহের কথা স্পষ্ট জানিয়ে দেন। তবুও কৃষ্ণাঙ্গ নারী নাছোড়বান্দা। সে জানতে চায় পরিবারটির সদস্য সংখ্যা কতো ? কে কখন ইন্টারনেট ব্যবহার করে? এতে কর্তা বিরক্তি বোধ করে। সে তার ব্যক্তিগত তথ্য জানাতে চাচ্ছিলেন না। তাই ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। তিনি রাগান্বিত হয়ে উঠেন। সেই কর্মীকে রীতিমতো গলাধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়ার চেষ্টা করেন। এহেন পরিস্থিতিতে দুইপক্ষই পুলিশ ডাকেন সাহায্য চেয়ে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে পুলিশ এসে নারী কর্মীকে বাইরে নিয়ে যায়। ঘটনা এখানেই শেষ হয়ে যেতে পারতো। কিন্তু না! এর পরের পরিস্থিতির জন্যে পরিবারটির কেউই প্রস্তুত ছিল না। ঘটনার ঠিক একমাস পর এক রাতে পরিবারের কর্তার ফোন রিং বেজে উঠে। হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে জানায়, ‘ থানা থেকে ফোন করছি। মিস্টার খান, আমরা তোমাকে খুঁজছি একটি জরুরি বিষয়ে। তুমি কী একটু থানায় আসতে পারবে?’ কালবিলম্ব না করে সরল বিশ্বাসে মিস্টার খান থানায় গিয়ে হাজির হন। তারপরই তাকে হাতকড়া পরিয়ে জানানো হয়, ‘ ইউ আর আন্ডার এরেস্ট।’ সেই কৃষ্ণাঙ্গ নারী মিস্টার খানের বিরুদ্ধে হেনেস্থার অভিযোগে মামলা দায়ের করেছেন। আইন অনুযায়ী মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া অব্দি মিস্টার খান দীর্ঘ চারটি মাস কর্মস্থলে ফিরতে পারেননি। প্রচণ্ড রকমের কাজপাগল কর্মঠ মানুষটি আচমকা কাজে যেতে না পারায় ভয়াবহ মানসিক, আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। তার ভাষায়, ঘরে বসে থাকা অর্থাৎ কাজে ফিরতে না পারার যন্ত্রণা অনেকটা হাত, পা বেঁধে গভীর সমুদ্রে ফেলে দেয়ার সামিল। আমার জন্যে এর চেয়ে বড় আর কোনো শাস্তি হতে পারে না।’

এবার আসি খুব কাছের চেনা এক বন্ধুর বিষয়ে। বিশ্বের রাজধানী নিউইয়র্কে কৈশোর পার না হতেই জীবন শুরু করা এক সংগ্রামী, কঠোর পরিশ্রমী মানুষ আমার বন্ধু নেহাল (ছদ্মনাম)। ব্যয়বহুল এই শহরে অনেকেই মাথার উপরে একটি ছাদ, নিজের একান্ত একটি ঠিকানা বানাতে হিমশিম খায়। অথচ আমার বন্ধু নেহাল দুই দুইটি বাড়ির মালিক। সে তার স্ত্রী এবং দুই পুত্রকে সুন্দর বাসস্থান দিতে পেরেছে। সংসার, সন্তানদের প্রতি দায়িত্বশীল একজন মানুষ। রোজ কাজ শেষে বাড়ি ফিরতে দেরী হলে স্ত্রীর বিরামহীন প্রশ্নে জর্জরিত হতে হয় নেহালকে।… এতক্ষণ কোথায় ছিলে, কার সঙ্গে সময় কাটিয়েছ, দেরী হলো কেনো … এমনতর নানান প্রশ্ন। একদিকে কাজের চাপে ক্লান্তি, অন্যদিকে স্ত্রীর কাছে কৈফিয়ত দেয়া, এমনটি চলল দিনের পর দিন। নেহালের ভাষায়, ‘এখন বয়স বেড়েছে। চাইলেও আগের মতো রাগ নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। আমাদের মধ্যে বিবাদ হাতাহাতি পর্যায়ে  চলে গিয়েছে বেশ অনেকবার।’

নেহালের সঙ্গে আমার দেখা আইনজীবীর অফিসে। সে কাগজপত্রের ফাইল নিয়ে বসে আছে। ডিভোর্স হবার পর স্ত্রীকে সম্পত্তির কতোটুকু দিতে হবে এইসব বিষয়ে কথা হচ্ছিল তাদের। নেহাল জানালো, ডিভোর্স সে দিতে চায়নি। দিতে বাধ্য করা হয়েছে তাকে। কে বাধ্য করেছে? সোশ্যাল ওয়ার্কার। অর্থাৎ এ পর্যন্ত যতবার হাতাহাতি হয়েছিল, নেহালের স্ত্রী পুলিশ ডেকেছিল প্রতিবার। দুইদিন বাদে সব মিটমাটও হয়ে গিয়েছিল। তারা আবার একসঙ্গে আগের মতোই ঘুরে বেড়িয়েছিল। স্বজনদের বাসায় দাওয়াতে গিয়েছিল। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। পুলিশের কাছে মায়ের পক্ষ নিয়ে অভিযোগ করেছে নেহালের নিজের পুত্র। বাবার বিরুদ্ধে পনর বছর বয়েসি পুত্রের অভিযোগ আমলে নিয়েছে আদালত। সেই মামলা চলমান। সোশ্যাল ওয়ার্কার সমস্যা সমাধানে এগিয়ে এসেছে। তারা নেহালকে জানিয়ে দিয়েছে যে, কারাগারে যেতে না চাইলে স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদে যেতে হবে। অন্যথায় স্ত্রী-পুত্রের অভিযোগের ভিক্তিতে তার জেল, জরিমানা শতভাগ নিশ্চিত। নেহালের স্ত্রী পুত্ররা তারই কষ্টার্জিত বাড়িতে বসবাস করছে। কিন্তু সে নিজে বাড়ির আশেপাশেও যেতে মানা। আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। সংসার হারিয়েছে। স্ত্রী, পুত্রদের হারিয়েছে। বিচ্ছেদের পর এতদিনের কষ্টার্জিত সম্পত্তির ভাগবাটোয়ারা শেষে কিছুই আর অবশিষ্ট থাকবে না তার। সামনের দিনগুলো কেমন কাটবে, এমন ভাবনায় ক্রমাগত ঘন হয়ে উঠে নেহালের শ্বাস। কাজ শেষে কাগজপত্র গুছিয়ে বিদায় নিয়ে চলে যায় সে কক্ষের বাইরে। চার দেয়ালের সেই ঘরে রেখে যায় বেদনার নীল সমুদ্রে আছড়ে পড়া তরঙ্গমালা।

এই যে জীবনের গল্পগুলো বলছি, কেনো বলছি? চারপাশের মানুষকে দেখতে, জানতে, তাদের জীবনের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিতে কিংবা অন্যকে জানাতে ভালো বোধ করা মানুষ আমি। জীবন চলার পথে ছদ্মনামে নিজের গল্প কিংবা অন্যের গল্প বলে চলি। অন্তত যে গল্পগুলো আমাকে নাড়া দিয়ে যায়, যে গল্প পড়ে আমরা অনেকেই নড়েচড়ে বসি। সচেতন হই। যদিও ‘ক্রোধ’ মানুষের একটি স্বাভাবিক মানসিক অনুভূতি। ভেতরের অসন্তোষ প্রকট হয়ে উঠলেই মানুষ রাগান্বিত হয়ে উঠে। কিন্তু তা কখনোই ইতিবাচক ফল বয়ে আনে না। জিশান, মিস্টার খান এবং নেহালের জীবনগল্প আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় ‘ক্রোধ’ ক্রমশ মানুষের সুন্দর যাপিত জীবনের গতিপথ বদলে দেয়। সহজ, সরল পথে চলমান এক একটি জীবনকে জটিল করে তোলে। কখনোবা নিঃস্ব করে পথের ভিখারি বানিয়ে ছাড়ে।

রিমি রুম্মান
নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র

১৫১জন ৮৬জন
0 Shares

৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য