ক্রীতদাস নির্মম এক ইতিহাস পর্ব-৪

রিতু জাহান ২ মার্চ ২০১৭, বৃহস্পতিবার, ০৭:২৮:১১অপরাহ্ন বিবিধ ২০ মন্তব্য


মঙ্গোলিয়ান পরাশক্তির বিস্তৃতি ও ক্রীতদাস প্রথা।
১৩ শতকের দিকে বিভিন্ন রাষ্টে মঙ্গোলিয়ানদের অনুপ্রবেশ ও রাজ্য বিস্তৃতি ক্রীতদাস প্রথাকে আরো জটিল করে তোলে এবং ক্রীতদাস ব্যবসায় নতুন শক্তির উদ্ভব হয়। মঙ্গোলরা প্রশিক্ষিত ও সাধারণ নারী, পুরুষ এবং শিশুদেরকে জোরপূর্বক বন্দি করে মঙ্গলদের রাজধানী কারাকোরাম এর সারাই শহরে নিয়ে গিয়ে সেখান থেকে তাদেরকে ইউরেশিয়াতে বিক্রয় করা হতো। অনেক ক্রীতদাসকে জাহাজে করে রাশিয়ার বান্টিক সমুদ্র হতে ওরাল পর্বতমালা পর্যন্ত বিস্তৃত নভোগোরদ স্টেটসের ক্রীতদাস বাজারে বিক্রি করা হতো। ( রুশ চিত্র শিল্পী সার্গে ভেসিলিভিচ ইভানভের, Sergey Vasilievich Ivanovo’s চিত্রকর্ম। ১৯০৭ সালে আঁকা চিত্রকর্মটি আমেরিকার লাইব্রেরি অব কংগ্রেসে সংরক্ষিত আছে)।
মধ্যযুগের শেষের দিকে ক্রীতদাস ব্যবসা মূলত ভেনিস ও জেনোয়ার ক্রীতদাস ব্যবসায়ী ও তাদের অ্যালায়েন্সের নিয়ন্ত্রনে ছিল। ১৩৮২ সালে গোল্ডেন হর্দ খাননেত এর শাসক খান তখতামিশ মস্কো অবরোধ করেন এবং শহরে আগুন ধরিয়ে দিলে সেখানকার অধিবাসীরা দিকবেদিক ছুটতে থাকে। তখতামিশের সেনাবাহিনী এই পলায়নপর হাজার হাজর মানুষকে ধরে নিয়ে ক্রীতদাস বানায়। ১৪১৪-১৪২৩ সাল পর্যন্ত পূর্ব ইইরোপ হতে অন্তত ১০,০০০ জনকে ভেনিসে ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রয় করা হয়। রাশিয়ার ইতিহাসে নথিবদ্ধ আছে যে, ১৬ শতকের প্রথমভাগে কাজান দস্যুরা রাশিয়ার সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে অন্তত ৪০ বার আক্রমন করেছিল। ১৫২১ সালে ক্রিমিয়ার খান মেহমেদ জিয়ারি ও কাজান খানেত যৌথভাবে মস্কো আক্রমন করে লুটতরাজ শেষে হাজার হাজার মস্কোবাসীকে ধরে নিয়ে ক্রীতদাস বানায়।
রাশিয়ার বিশাল তৃণভূমির অপর পার্শ্বে ছিল শক্তিশালী অটোমান সম্রাজ্য আর দক্ষিণাঞ্চলে ছিল আরো ভয়ঙ্কর মঙ্গল উত্তরসূরি ক্রিমিয়ান খানেত। ক্রিমিয়ার খানেতের অর্থনীতিই টিকে ছিল রাশিয়ান স্লাভদের অপহরন করে নিয়ে গিয়ে ক্রীতদাস হিসেবে অটোমান সম্রাজ্যে বিক্রয় করার অর্থের উপর। অটোমান সম্রাজ্যের পাশাপাশি তারা ইরান ও অপরাপর আন্তর্জাতিক ক্রীতদাস ব্যবসায়ীদের নিকট। অটোমান সম্রাজ্যে হাজার হাজার ক্রীতদাস থাকার ফলেই ১৬ শতকে ইস্তাম্বুল ইউরোপের সবচেয়ে বড় শহরে পরিণত হয়েছিল।
কৃষকরা যখন তাদের মাঠে কাজ করত তখন ক্রিমিয়ান দস্যুরা আতর্কিত হামলা করে তাদের ধরে নিয়ে যেতো। রাশিয়াতে ক্রিমিয়ানদের এই আক্রমন প্রতিবছরই হতো। মাইকেল খোদারকোভোস্কি তার Russia’s Steppe Frontier গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, ১৭ শতকের প্রথম দিকে রাশিয়ান সমাজের যে পরিমান লোক অপহারন করা হয়েছে এবং অনেককে মুক্তিপন দিয়ে ফিরিয়ে আনতে যে অর্থ ব্যায় হয়েছে তা দিয়ে প্রতি বছর অন্তত ৪টি শহর তৈরি করা যেতো। ১৭৮৩ সালে ক্রিমিয়া রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত হলে এই ক্রিমিয়ান আক্রমন বন্ধ হয়।
বিখ্যাত পরিব্রাজক ইবনে বতুতা তার ভ্রমণ কাহিনীতে অনেকবারই বর্ণনা করেছেন যে, তাঁকে অনেকবারই ক্রীতদাস উপহার দেওয়া হয়েছে এবং তিনি নিজেও ক্রীতদাস ক্রয় করেছেন। ১৪ শতকে বিখ্যাত পন্ডিত ও ইতিহাসবিদ ইবনে খালুদুন বর্ণনা করেছেন, ‘ কালো চামড়ার মানুষরা অনেকটা স্বাভাবিকভাবেই এই ক্রীতদাস হয়ে থাকতো। তাদের ছিল অসহ্য রকম সহ্য ক্ষমতা। কারণ মানুষ হিসেবে একজনের যতোটুকু বুদ্ধি থাকা দরকার তাদের তা ছিল না। তারা ছিল অনেকটা বুদ্ধিহীন জন্তুর মতো।’
যখন ক্রীতদাস হিসেবে তাদের বন্দী করা হতো সাথে সাথে তাদের হাতে পায়ে বেড়ি পরিয়ে দেওয়া হতো। খাবারও কম দেওয়া হতো যাতে করে তারা পালানোর শক্তি না পায়। এবং গলায় পরানো থাকতো কাঠের এক ধরনের বেড়ি। ক্রীতদাস আনা নেওয়ার একটা বড় মাধ্যমই ছিল সমুদ্রপথ। জাহাজের একেবারে নীচে ডেকে হাত পা বাধা অবস্থায় অন্ধকারে তাদের রাখা হতো। সমুদ্রপথে অনেক ক্রীতদাসই অসুস্থ হয়ে পড়তো তখন তাদের সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হতো। সমুদ্রের লবন পানি, ঠান্ডা, হিংস্র প্রানীর আক্রমনে ধীরে ধীরেই তার মৃত্যু হতো। এরকম হাজার হাজার মানুষকে সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হতো।
চলবে,,,,,,,,,,,,,,,,,

ক্রীতদাস নির্মম এক ইতিহাস পর্ব -৩

৫০৬জন ৫০৫জন
0 Shares

২০টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ