ক্রাশ

এস.জেড বাবু ১ নভেম্বর ২০১৯, শুক্রবার, ০৮:৩৬:৫৩অপরাহ্ন গল্প ১৮ মন্তব্য

কাঁত হয়ে নুঁয়ে পড়া গাছ থেকে পুকুরের ঠিক মধ্যিখানে, টুপ করে ঝড়ে পড়া তালের ডুবে যাওয়ায় সৃষ্ট; মিষ্টি জলের বুকের উপর দিয়ে যে কিশোরী ঢেউ গুলি ছুটে গিয়ে আছড়ে পড়ে পুকুর পাড়ে-
তেমনি চনমনে দুরন্ত ঢেউ খেলানো ছন্দে ভরা কোন মায়াবী জলপরী; হটাৎ চোখে পড়ে ঘুমন্ত শহরের ছিটকে পড়া আধো আলোয়- চলন্ত ইন্টারসিটি ট্রেনের দুই বগির মধ্যিখানের সংযোগে।

পালমোলিভের হালকা সুবাসের সাথে ওডি অ্যাপারেল বা কেলভিন ক্লাইন এর মিক্সড পারফিউমের গন্ধে মৌ মৌ পরিবেশ। গোলাপী বর্ডারের সাদা এডিডাসের উপর গাঢ় নীল ‍জিন্সের কোমরের বাম পাশে ঝুলে আছে গোলাপী আস্তরের বেল্ট এর ডগা। তার ঠিক আড়াই ইঞ্চি উপরে লাগানো বোতামটার নিচের অংশ টান লেগে আছে কাঁধে ঝোলানো চামড়ার ভ্যানিটি ব্যাগে। মেদহীন তুলতুলে চামড়ার খানিক কম্পন থেকে যখন চোখ সরে, ততক্ষনে শহরের আলোরা লুকুচুরি খেলতে শুরু করেছে। পরের তিন মিনিটে মুখখানা দেখি। এক হাঁটু ভাঁজ করে কালচে লোহার পিঠে পিঠ ঠেকিয়ে দাড়িয়ে আছে কোন জীবন্ত অপ্সরা।

বেহায়া চোখ- ভূত দেখেনিতো আবার! চিমটি কেটে শিউর হতে মন চাইছিল। মনে হয় মধ্যরাতে তন্দ্রাভাঙ্গা মানুষের চোখ শুধু রূপটাই দেখে, দোষ-গুণ খুঁজে দেখার জন্য মস্তিষ্কের যে অংশটার চেতনা দরকার, সে অংশটা সম্ভবত ঘুমন্ত থাকে সে সময়ের নিদ্রা বিরতিতে। তাইতো বিবাহিত জীবনে হাজারটা সন্ধ্যারাতের ঝগড়া, মাঝরাতে মিটে যায় অজানা ইশারায়।

কি আর করা- চার চারটি তাজা হুইস্কির পেগ এতো নেশা ধরায় না, যতটা নেশা বিধাতার পূর্ণ অবসরের নিদারুণ মমতায় গড়া সৃষ্টিতে।
আসলে হলদেটে গোলাপী জলে শিহরণ জাগে মনে- সে তো ইচ্ছের কাছ থেকে সুখের নেশায় কেড়ে নেয়া অবসন্নতা, অপ্সরীদের চোখ ধাঁধানো কাঠামো আলোড়ন তুলে চোখে- সে যে অবেলায় ভেঙ্গে যাওয়া কৈশর নিদ্রার আন-কনট্রোল্ড দুরন্তপনা।
মনে হয় কোন আমাবস্যার চিকচিকে আঁধারে প্রচন্ড কালবৈশাখীর ঝড়ের বিপরীতে সাগরের ঠিক মধ্যিখানে লোনা জলে তিন ঘন্টা সাঁতরানোর পর এক পেয়ালা মিষ্টি জলের নেশা।

শুনেছি পুরুষের চোখ- দুনিয়ার সমস্ত ঐশর্য একীভূত করে, একটা কবিতায় সাজায় একটাই নারীমূর্তী। তেমন শতশত প্রেমিক কবিদের কল্পনায় আর উপমায় লিখা হাজারো উপসর্গের বাস্তব সামঞ্চস্য খুঁজে দেখার ইচ্ছেটা আপাতত ধামাচাপা দিয়ে যাচ্ছিলাম সামনের কম্পার্টমেন্টে- একটা খুব কড়ড়া কফি খেতে ইচ্ছে হচ্ছিলো- মেস্ত্রে থেকে ভিসুভিয়ানো প্রায় এগারো ঘন্টার পথ- ট্রেনে একবার ঘুম ভাঙ্গলে আমার আর তেমন চোখ লাগেনা কখনো- বারোটা বেজে বিশ, আরও ছয় ঘন্টা বাকি।
থেমে গেলাম- অনিচ্ছায়, অজান্তেই । কখনো কেন জানি, অজানা কোন জংলী ফুলের নাম জানতে খুব ইচ্ছে হয়। বিশেষ করে তেমন ফুল, যে ফুলের সুবাসিত রূপ, এতো কাছে থেকে আগে কখনো দেখেনি দু চোখ।

মুখ ভরে একরাশি ধোঁয়া টেনে নিয়ে চকচকে গোলাপি ঠোটদুটি ঠিক চুমুর ভঙ্গিতে ঠেলে দিলো সোজা—— মুখ বরাবর-
খেয়াল করলাম, বেড়ে যাচ্ছে হার্টবীট। আধো অন্ধকারে ধোঁয়া ঠিকঠাক দেখতে না পেলেও নাকের সামনে হাতের তালু এপাশ ওপাশ করতে করতে মুখে প্রচন্ড মিষ্টি একটা হাসি নিয়ে ধরা গলায় বললাম- হ্যালো-
অর্ধেক পোড়া সিগারেটটা ভেন্টিলেটর দিয়ে বাইরে ফেলেই তেমন সুন্দর এক হাসি ফিরিয়ে দিল সে, ও – হাই, হ্যালো-
বলেই দ্রুততার সাথে আমার সামনের কম্পার্টমেন্টের দিকে সোজা আঙ্গুল তুলে বলল- ২৪/বি এর উপরে গ্রীন রংয়ের একটা ছোট ব্যাগ আছে, কষ্ট করে আনবে-

ব্যাগ নিয়ে ফিরে আসার আগেই ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে নোঙ্গর করে ট্রেন- ইতিমধ্যে সে দরজার নিচে প্লাটফরমের হলদে দাগটার উপর। হাত বাড়িয়ে ব্যাগটা ওর হাতে তুলে দিতেই অন্য হাতটা উঁচু করে বলল- ধন্যবাদ বন্ধু – আবার দেখা হবে।
জনসমুদ্রে হারিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত পুকুরের মিঠা জলে সেই দুরন্ত কিশোরী মায়াবী ঢেউ দেখছিলাম-
ফিরেও তাকায় নি একটিবার-।

আজকাল মাঝে মধ্যে স্বপ্নে দেখি-
সে আর আমি,
পাশাপাশি দুটি সীট,
উড়ন্ত সোনালী চুলে দুরন্ত ঢেউ,
ট্রেনের মিষ্টি দুলনী সাথে দুলে উঠে মন-
এবার বুঝি নামটা জানা হবে ;
আবারও ভাঙ্গে স্বপ্ন-
এক ফুট দুরে দাড়িয়ে থাকা জীবনের একটি মাত্র ক্রাশের নাম আজও অজানা_____॥
-0-

১২৮জন ৮জন
4 Shares

১৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য