প্রতিদিন বিকেলবেলা গোদনাইল চৌধুরীবাড়ি চিত্তরঞ্জন ফুটবল খেলার মাঠ ঘেঁষেই আমার কর্মক্ষেত্রে যেতে হয়। প্রতিদিন মাঠ ঘেঁষে আসতে যেতে  ছোট-বড় ছেলেপুলেদের ফুটবল খেলা দেখতে কিছুটা সময় দাড়িয়ে থাকি। তারা খেলে, আমি দর্শক সারিতে দাড়িয়ে দাড়িয়ে খেলা দেখি, আর নিজের ছোটবেলার স্মৃতিতে হারিয়ে যাই। আজ আমি প্রায় বুড়ো। খেলার জো নেই ঠিক, কিন্তু ফুটবল খেলা দেখার স্বাদ মনের মাঝে ঠিকই রয়ে গেছে।

তাই প্রতিদিন চিত্তরঞ্জন ফুটবল খেলার মাঠে অন্তত একবার হলেও চুপি দিই। সময়তে কিছুক্ষণের জন্য হলেও মাঠের কোণে দাঁড়িয়ে খেলা দেখি। আমার চাকরির অফিসের মালিক দু’জনও ভালো খেলোয়াড়। উনারাও প্রতিদিন এই মাঠেই ফুটবল খেলে। তাই মাঠ ঘেঁষে যেতে আরও ভালো লাগে। সময়তে উনারা আমাকে ছবি তোলার জন্য মাঠে ডাকে। আমি ওনাদের ছবি তুলি। উনারা ভীষণ আনন্দ পায়। আমিও আনন্দ উপভোগের সাথে ছোটবেলার সেই ছেঁড়া-ফাঁড়া কাপড়ে পেছানো তেনার বল নিজের মনের টেলিভিশনের পর্দায় ভেসে ওঠতে দেখি!

ছোটবেলায় স্কুলে যাবার সময় কান্নাকাটি করেও দশ পয়সা তো দূরের কথা, পাচটি পয়সাও সময়তে পেতাম না। মায়ের কাছেও না, বড়দা ও বড় দিদিদের কাছ থেকে না। যা পেতাম, তা কেবল বাবা ও বড়দা বেতন পেলে। সবসময় না পাবার কারণ হলো, তখনকার সময়ে টাকার খুবই মান ছিলো। দামও ছিলো। সেসময়কার টাকার সাথে এসময়কার টাকা তুলনা করতে গেলে, সেসময়কার দশ টাকার সমান বর্তমান সময়ের ১০০০/= টাকার মতো  পারে, তা আমি পুরোপুরিভাবে নিশ্চিত।

সেসময়ে টাকার ওইরকম দাম আর মানের জন্যই আমাদের ছোটবেলার সময়টাই ছিলো টাকার অভাব। টাকার সেই অভাবে দিনে লেখাপড়ার পাশাপাশি ফুটবল খেলার খুবই শখ  ছিলো, আমার। কিন্তু আমাদের সমবয়সী কারোর কাছেই তখন ফুটবল ছিলো না।

চামড়ায় মোড়ানো ফুটবল তো ছিলো সোনায় মোড়ানো এক হরিণ। সেই সোনায় মোড়ানো ফুটবল ছিলো সবারই কল্পনার বাইরে। বর্তমান বাজারে কমদামি প্লাস্টিকের মোড়ানো ফুটবলও তখন সবার কাছে ছিলো না। যে ক’জনের কাছে থাকতো, সামান্য একটু ঝগড়াঝাটি হলেই সে তার শখের প্লাস্টিকের ফুটবলটা আর খেলতে দিতো না।

তো কেউ কারোর শখের ফুটবল মন খারাপ করে  না দিলেও সমস্যা হতো না। আমার মতো কাঙাল সমবয়সীদের ফুটবল খেলাও আর বন্ধ হতো না। প্রতিদিন স্কুল পর বই খাতা মাঠের কোণায় রেখেই শুরু হতো খেলা।  তো অনেকেই প্রশ্ন করতে পারে, তাহলে বল পেলে কোত্থেকে? আমাদের খেলার ফুটবল ছিলো ছেঁড়া-ফাঁড়া কাপড়ে (তেনা) মোড়ানো ফুটবল। আর সেই ছেঁড়া-ফাঁড়া কাপড়ের টুকরোগুলো ছিলো কাপড়ের মিল থেকে ফেলে দেওয়া সূতার জুট। সেই জুট দিয়েই মুড়িয়ে মুড়িয়ে বানাতাম শখের ফুটবল।

সেই বলগুলো বানানো হতো বিশেষ কায়দায়। সূতার জুটগুলো প্রথমে টেনিস বলের মতো করে দলা করা হতো। তারপর এর উপরে শক্ত রশি দিয়ে পেচানো হতো, আর পেচানোর সাথে সাথে আরও আরও বাতিল জুট ঐ টেনিস বলের সাথে পেচানো হতো। দীর্ঘসময় পেচাতে পেচাতে একসময় খেলার উপযুক্ত এক চামড়ায় মোড়ানো ফুটবল আবিস্কার হয়ে যেতো। তার উপরে জুট থেকেই পাওয়া নোংরা ছেঁড়া-ফাড়া কাপড়ের টুকরা সুন্দরভাবে আরও ভালো করে পেচানো হতো। তাই সেটাকে অনেকই বলতো, “তেনার বল”। এই বিশেষ ধরনের ছেঁড়া-ফাঁড়া কাপড়ের তেনার বলের মেয়াদ থাকতো মাত্র দুইদিন। যেতো ভালোভাবেই বানানো হোক-না-কেন, মাত্র দুই টাইম খেলার পরই তা আর খেলার উপযোগী থাকতো না। তাই একদিন পরপরই ফুটবল তৈরি করা হতো।

হাতে বানানো সেই বল প্রতিদিন স্কুলে যাবার সময় আমরা কেউ-না-কেউ একজন সাথে করে স্কুলে নিয়ে যেতাম। তা লুকিয়ে রেখে দিতাম স্কুলমাঠের এক কোণায়, জঙ্গলে। দুপুরবেলা টিফিনের সময়ও শুরু করে দিতাম খেলা। স্কুল ছুটির পর তাড়াতাড়ি বাসায় চলে আসতাম, বিকালবেলা আদর্শ কটন মিলের মাঠে মনোমত খেলার জন্য। আমরা খেলতাম। আমাদের সেসময়কার খেলা মিলের শ্রমিকরা মাঠের চার পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতো। খেলা দেখে তারাও আনন্দ উপভোগ করতো, আমরাও আনন্দ পেতাম।

একসময় মিল অভ্যন্তরে থাকা শ্রমিক-কর্মচারীদের কয়েকজন নেতা আমাদের একটা চামড়ায় মোড়ানো ফুটবল কিনে দিলো। কথা থাকে, এই বল তারাও খেলবে, আমরাও খেলবো। খেলা শেষ হবার পর ফুটবলটা থাকবে শ্রমিদের ক্লাবে। তা-ই হতো।

তাদের কথা মেনেই প্রতিদিন খেলা হতো। যেদিন কোনও কারণবশত সময়মতো ক্লাব থেকে ফুটবল বের করতে না পারতাম, সেদিন আমাদের নিজেদের তৈরি “তেনার বল” দিয়ে যথাসময়ে খেলা শুরু করে দিতাম।

তখন একটা সময় ছিলো, শুধু ফুটবলেরই সময়। বাংলাদেশে যে ক’টা সরকারি বড়বড় প্রতিষ্ঠান ছিলো, সব প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব খেলার টিম ছিলো। শীতলক্ষ্যা নদীর এপারওপার থাকা প্রতিটি মিল ইন্ডাস্ট্রিরও নিজস্ব ফুটবল খেলার টিম ছিলো। আদর্শ কটন মিলেরও টিম ছিলো। তা-ও আবার মাসিক বেতনভোগী খেলোয়াড়। এখন আর সেসব মিল ইন্ডাস্ট্রিও নেই, ফুটবল খেলাও তেমনটা নেই। তখনকার সময়ের মতো ফুটবল প্রেমীও নেই। এখন শুধু ঘরে ঘরে ক্রিকেট প্রেমী।

মনে পড়ে, ঢাকা স্টেডিয়ামে যখন মোহামেডান আবাহনী খেলা হতো, তখন সেই খেলার উত্তেজনা আমাদের চারপাশেও বিরাজ করতো। যেদিন খেলা হতো, সেদিন সেই খেলা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত রেডিওতে সম্প্রচার করা হতো। সেই উত্তেজনাকর খেলা উপভোগ করতাম রেডিওতে সম্প্রচার শুনে। সময়তে আবাহনী মোহামেডান-এর ভক্তদের মারামারির খবরও পাওয়া যেতো। সেসব দেশের আনাচে-কানাচেতে এতো এতো ভিনদেশী ক্লাবের পতাকা টানানো হতো না। ওইসব ভিনদেশী ক্লাবের নামই অনেকে জানতে না। জানতো শুধু আমাদের দেশের ক্লাবগুলোর নাম। সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় ক্লাব ছিলো আবাহনী মোহামেডান। যেদিন মোহামেডান বনাম আবাহনী ক্লাবের খেলা হতো, সেদিন সারাদেশেই থাকতো উত্তপ্ত, উত্তেজনা। যারা ঢাকা স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে যেতো, তাদের পরিবারবর্গরা থাকতো আতঙ্কে।

সেসময় ঘরে ঘরে টেলিভিশন ছিলো না। রঙিন টেলিভিশন তো দূরের কথা, দশ গ্রাম খুঁজে একটা সাদা-কালো টেলিভিশন পাওয়া যেতো না। দেশ-বিদেশের খবর, খেলার খবর শোনা হতো, একমাত্র রেডিওতে। এখনকার এই দিনে বাংলাদেশ রেডিওতে ওইসব আর সম্প্রচার করা হয় না। আর আগেকার মতো রেডিও কেউ ব্যবহারই করে না। এখন খেলা দেখা হয় দেশীয় টিভি চ্যানেলগুলোতে আর ভারতীয় চ্যানেলগুলোতে। এদেশি বিদেশি চ্যানেলগুলোতে যেসব খেলা দেখা হয়, সেগুলো আমাদের দেশের খেলা নয়! এসব খেলাগুলো ভিনদেশী খেলা। ওইসব খেলার আবার আকর্ষণীয় চুম্বকীয় কিছু দৃশ্য ইউটিউবে হরহামেশাই পাওয়া যায়, দেখাও যায়।

এসব দেখে সে সময়ের সেই জনপ্রিয় ফুটবল খেলার অনেক স্মৃতি নিজের মনের মণিকোঠায় জাগ্রত হয়ে ওঠে। তারপর ভাবতে থাকি আর নিজে নিজে আপনমনে বলতে থাকি, “কোথায় যে হারিয়ে গেলো সেসময়কার জনপ্রিয় ফুটবল খেলা।”

বি.দ্র: পোস্টের ছবিটি এডোবি ফটোশপ থেকে এডিটিং করা। বিলবোর্ডে থাকা ফুটবল খেলোয়াড়েরা সোনালী অতীত ক্লাবের।

২২৩জন ১০৪জন
0 Shares

২৫টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ