কোথায় আমি

নীরা সাদীয়া ৩ মার্চ ২০২১, বুধবার, ০৮:৫৬:৪৬অপরাহ্ন অণুগল্প ১২ মন্তব্য

বিকেল বেলা ছাত্র পড়িয়ে বাসায় ফিরছি। এমন সময় হঠাৎ অটোরিকশাটা নষ্ট হয়ে গেল। অগত্যা চালক বললো, “বাকিটা হেঁটেই চলে যান। এটা আর ঠিক হবে না।” আমি নেমে হাঁটতে শুরু করলাম। বাসায় ফেরার পথে যখন হাঁটতে থাকি, তখন সাধারণত মনে মনে কিছু না কিছু ভাবতে থাকি। সেরকম কিছু ভাবতে ভাবতে পথ ভুল করে অন্য এক পথে চলে গেলাম। হঠাৎ তাকিয়ে দেখি চারিদিক অচেনা। এ আমি কোথায় এলাম? নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করে কোন উত্তর পেলাম না। তখন হন্যে হয়ে চারপাশে কাওকে খুঁজতে লাগলাম, কেউ যেন আমাকে পথের ঠিকানা বলে দেয়। কিন্তু তেমন কাওকেই দেখতে পেলাম না। চারপাশে গাছপালা, পাখি, নদী, ওপরে আকাশ, মেঠোপথ সবই আছে কিন্তু কোন মানুষ নেই, কোন ঘরবাড়িও নেই।

 

দেখে মনে হচ্ছে পথের দু’ধারে সারি সারি গাছ কেউ খুব মেপে যত্ন করে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে লাগিয়েছে। কিন্তু কে লাগালো? আরেকটু এগিয়ে যাই, মনে হয় কোন না কোন বাড়ির সন্ধান পাব। কিন্তু নাহ্! কোথাও কেউ নাই। আমি পেছনে তাকাই, সামনে তাকাই, ডানে, বায়ে সবদিকে দেখি। কিন্তু কোথাও কেউ নেই। এ আমি কোথায় এলাম? একবার চিৎকার করলাম, “কোথাও কেউ আছো?” আমার কন্ঠই প্রতিধ্বনিত হয়ে আমার কাছে এলো। প্রতিধ্বনির উৎস কোথায়? কোথায় বাঁধা পেয়ে ফিরে এলো এ আওয়াজ? কিছুই বুঝতে পারছি না।

 

তবে দিনের আলোটা গায়ে কেমন নরম কাঁথার মত লাগছে। ঝিরিঝিরি বাতাস যেন সুখের পরশ। পাখির কূজনে সুরেলা একটা পরিবেশ। কালো ধোঁয়া নেই, বিষাক্ত নিকোটিন নেই, গাড়ির আওয়াজ নেই, ব্যঙ্গ করার মত লোকগুলোও নেই। কী যে ভালো লাগছে! হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত লাগছে। একটা আম গাছের নিচে বসলাম একটু জিরিয়ে নিতে। এমন সময় ওপর থেকে পাকা আম আমার কোলে এসে পরলো! আজব তো! এটাতো মাটিতে পরে ফেটে যাওয়ার কথা ছিলো। তা হলো না কেন? আমি কি তবে নিউটন যে আপেল পরবে মাথায়? নিউটনের মাথায় আপেল আর আমার কোলে আম, মন্দ নয়।

 

আম খেয়ে ক্ষুধা তৃষ্ণা দুটোই মিটানোর পর এবার চারদিকে অন্ধকার হয়ে এলো। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নামলো। আমি ভয় পাচ্ছিলাম, চারিদিকে হয়ত ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে যাবে। কিন্তু তা হলো না। একটা মস্তবড় চাঁদ চারপাশে আলো ছড়াতে লাগলো। জানি এটা সূর্য থেকে ধার করা আলো। কিন্তু চাঁদ এ আলোকে নিজস্ব মহিমায় আরও মধুর করে তুলেছে।তাইতো পৃথিবীতে যত মানুষ চাঁদকে নিয়ে সাহিত্য রচনা করেছে তার সিকিভাগও সূর্যকে নিয়ে করেনি। বেচারা সূর্য, ধার দিয়েও ঠাঁই পেলনা হৃদয়ে।

 

এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে বালির বিছানায় ঘুমিয়ে পড়লাম কে জানে। হঠাৎ জেগে দেখি আমি অপারেশন টেবিলে। ডাক্তাররা একটা ডিজিটাল বোর্ডে কিসব যেন দেখেছেন৷ আর আমার শরীরে অনেক যন্ত্রপাতি লাগানো। হঠাৎ দেখি তারা হেসে উঠলেন। আর একজন তো বলছেন,

 

“It’s miracle!”

“I never saw it in my life!”

 

একজন ডাক্তার আরেকজনকে ধন্যবাদ দিচ্ছেন। আমি বুঝলাম না এত ধন্যবাদের কি হলো? এরই মধ্যে আমাকে অন্য একটি বিছানায় স্থানান্তর করা হলো। আমার বাবা, মা সবাই হুরমুর করে ঐ কক্ষে ঢুকে পরলেন এবং আমি বেঁচে আছি কিনা তা দেখতে এলেন। তাঁরা কান্নাকাটি করছেন আবার শুকরিয়া আদায়ও করছেন।

 

আমি কিছুতেই ভুলতে পারছি না ঐ বিশাল উদ্যান, আম গাছ, নরম রোদ আর রূপোলী চাঁদ। আমি তো ফিরে আসতে চাইনি। তবে কেন এলাম?

২১২জন ১২২জন
0 Shares

১২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য