কেমন আছিস তুই//

বন্যা লিপি ১০ অক্টোবর ২০১৯, বৃহস্পতিবার, ০২:৪৬:৩০অপরাহ্ন চিঠি ৩১ মন্তব্য

জানিস্! ভীষণ মনে পড়ছে তোকে। এই মাসটা এলেই আমি বিষণ্ণ হয়ে যাই।আমার বুকের ভেতরে চাপ চাপ কষ্টেরা কিলবিল করে।এ মাসটা এলেই তোর চাঁদের জোছনার মতো মুখটা চোখের তারায় জ্বল জ্বল করে জ্বলতে থাকে। তোর চোখ মুখ ললাট, কদম ছাঁটের মতো ঘন কালো চিকচিকে চুল গুলো। আমার চোখ পোড়ায়,আমার বুক ঠেলে কান্না পায়।আমি একা একা কাঁদি। এমন করে কেন চলে গেলি?

তোকে চিঠি লিখি কোন ঠিকানায়? তুই পারবি তো পড়তে আমার চিঠি। এখনো কি আমার ওপর অভিমান আছে তোর? পারবিনা আমায় মাফ করতে? তুই ভীষণ শান্ত ছিলি। একেবারে মাটির পুতুলের মতো। আমার যে অনেক রাগ ছিলো! একটু এদিক সেদিক হলেই তোকে চড় থাপ্পর মারতাম। খুব কি লাগতো তোর?
কেন বুঝিনি তোর মর্ম? তাই কি এত তারাতারি ছেড়ে চলে গেলি?
তোকে নিতে চাইনিতো, কেন জিদ ধরলি তুই? সেদিনটা আজো জ্বল জ্বল করছে স্মৃতীতে, নিপুর জন্ম হলো সকালে, কোরবানী ঈদের দ্বিতীয় দিন।ঈদের দিনের পোড়ানোর পরেও বাকি থাকা আতশ বোমা (বাঁশের কঞ্চির মাথায় রঙিন কাগজে মোড়া বারুদ)ফাটালাম আমরা সবাই মিলে।রঙ মাখলাম,বায়না ধরলাম পুকুরে গোসল করতে যাবো, জানতাম আম্মা আজ আর বেশি আপত্তি করবেন না। শুধু তোকে আর সাগর’কে নিতে চাইনি, তারপরও তুই বিপু সাগর সবাই বায়না ধরলি আমার বন্ধুদের সাথে তুইও যাবি।আম্মা কিছুতেই রাজি হচ্ছিলেন না। তোদের জন্য আলাদা পানি তুলছিলেন, গোসল করিয়ে দেবেন বলে।
তুই আম্মার সামনে কেমন ভাবে অনুনয় করে করে রাজি করিয়ে নিলি। ১০/১২ জনের দলের সাথে তোরাও চলে এলি।

থানা’র পুকুরের ঘাটে বসিয়ে বিপু, সাগর আর তোকে আমি বলে দিয়েছিলাম, খবরদার,যেখানে বসিয়ে রেখেছি এখানেই থাকবি। আমি ছাড়া এক সিঁড়িতেও নামবিনা তোরা। সাগর,বিপু,তুই লক্ষী হয়ে বসে ছিলি। আমি তোদের মগে পানি তুলে তুলে গোসল করিয়ে দিয়ে বসিয়ে রাখলাম।
তাহলে কি হলো?

আমাকে ধাক্কা দিলো কে পেছন থেকে? হাবুডুবু খেতে লাগলাম সাঁতার না জেনে! ডাক্তার কাকার মেয়ে ঈরানী চুল ধরে টেনে না তুললো। তারপরই শুনলাম সুইট সুইট চিৎকার। তোকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা। হাবুডুবু খেতে খেতে আমার শরীর বিবশ।
আমি জোড় গলায় চিৎকার করছি, সুইটি সুইটি সুইটি……..মুক্তি,বনানী, মনি,সেলিনা, শিউলি, পলি ফুপু,হ্যাপী ফুপু, ঈরানী, দুলালী সবাই তোকে ডাকছে। ছুটে যাচ্ছি বাসার দিকে, পা চলছেনা, রাস্তা দিয়ে যাবার সময় মোফাজ্জেল কাকা জানতে চাইলেন এমন করে কাঁদছি কেন? রাস্তার মধ্যেই লুটিয়ে পড়লাম। কাকু সুইটি কে পাচ্ছিনা, কাকু হাতের ঘড়ি খুলতে খুলতে বললেন, তুই বাসায় যাইয়া জানা, আমি যাচ্ছি,বলেই দৌড়ে ছুটে চলে গেলেন পুকুর পাড়ে।
বাসায় এসে লুটিয়ে পড়লাম আম্মার পায়ের কাছে, কেবল গোসল করে বের হয়ে শাড়ি পড়ছিলেন আম্মা।
আম্মা কি ভেছিলো জানিস! আবার বুঝি তোর সাথে আমার মারামারি লেগেছে। যখন বললাম তোকে খুঁজে পাচ্ছিনা,দিগ্বিদিক হয়ে ছুটে বেড়োতে গিয়ে সদর গেটের সাথে শাড়ির আঁচলে ছিঁড়ে আটকে রইলো। চৌমাথা থেকে সোজা থানার পুকুর পর্যন্ত এক দৌঁড়ে রাস্তা পেড়োলেন, সাথে সাথে ছুটলো শত শত মানুষ। পুলিশ সদস্য,সাধারন মানুষ পুকুরে নেমে গেলো তোকে খুঁজতে। ২০/২৫ হাত গভির পুকুরে তোকে কেউ খুঁজে পেলোনা।
পুকুরের ডান দিকে ওই দুরের কোনা ধরে লাবলু কাকাদের বাসা। তাঁদের বাসার পেছন দিকটাতে এই পুকুর। ওখানে ভিড় জমেছিলো দেখার জন্য এ পুকুরে কেউ হাড়িয়ে গেছে বলে। লাবলু কাকা ঘরে ঘুমাচ্ছিলেন, লাবলু কাকার মা তাকে ঠেলে জাগিয় দিয়ে বলেছিলেন… “লাবলু তুই এহনো ঘুমাও ওঠ শিগগীর, দেখ গিয়া চাঁনের ( চাঁদ,আমার আব্বার নাম) মাইয়া পুকুরে পড়ছে মনে হয়।” কাকু সোজা দৌঁড়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন পুকুরে। এক ডাইভে চলে গেলেন পুকুরের গভির অতলে, তোর পিঠেই হাত পড়লো সোজা। দৌড়ে আসার ফলে তাঁর নিঃস্বাশের কষ্ট হচ্ছিলো।ভেসে উঠলেন। জানালেন সবাইকে, তোকে পেয়েছেন খুঁজে। দ্বিতীয় ডাইভে তোকে তুলে আনলেন। সম্ভাব্য সবরকম চেষ্টা চললো। তোর অমন সুন্দর ফর্সা দেহ নিথর রইলো তো নিথরই রইলো। সবাই আমাকে দোষী করলো। আমি কেন পুকুরে যাবার বায়না করেছিলাম। আব্বা আমাকে চড়ও মারলেন। আমি কেন বেঁচে রইলাম বল বুবু? পরে জেনেছি তোকে সাঁতার শেখাবার ছলে কেউ একজন(নাম বলছিনা) পিঠে করে মাঝ পুকুরে নিয়ে গিয়েছিলো। ফিরে আসাতে কষ্ট হচ্ছিলো বলে তোকে ছেড়ে দিলো। কি করে মানবো বল? আমার ওপরে রাগ করে আছিস এখনো বুবু? পারবিনা আমায় মাফ করতে?
আমার বিশ্বাস তুই বেহেস্তি বাগানে ফুল হয়ে আছিস। মহান আল্লাহ তোকে বেহেস্তি বাগানে ফুল করেই রাখুন।
আমি ভাবিনি তোকে কখনো লিখতে পারবো। কষ্ট হয় বুবু, ভীষণ কষ্ট!
যেখানেই আছিস খুউব ভালো থাকিস বুবু।
আজকের দিনটা এলেই আমি বড় বেশি কাঁদি। আমার যে আর কেউ বোন রইলোনা। শুভ’টাও ছেড়ে চলে গেলো।
ওকে তো নিজের বাচ্চার মতো করে পালতাম রে! তাও চলে গেলো।
আর লিখতে পারছিনা।
তুই ভাল থাকিস।
তোর
লিপি আপু

১০: ১০:২০১৯

২১১জন ২জন
24 Shares

৩১টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য