কৃষ্ণচূড়ার হাতছানি -৩

মুক্তা মৃণালিনী ১০ অক্টোবর ২০১৯, বৃহস্পতিবার, ০৮:৩০:৩৬অপরাহ্ন গল্প ১৫ মন্তব্য

ওপাশ থেকে হাসনাত সাহেব আবারও খুব উচ্চস্বরে হাসলেন । হাসতে হাসতে বললেন , না আমার মন খারাপ হয় না । কখনাে রাগও হয় না তোমার উপর । কেন জানাে ? সােহিনী খুব তরিঘরি করে জানতে চাইলেন , কেন ? হাসনাত সাহেব একটু গম্ভীর স্বরে বললেন , আমি আমার পরিবারের সব ভাইবােনের ছােট হওয়ায় অন্য ভাইবােনের তুলনায় আমার মায়ের আদর- আহােলাদ আমি একটু বেশিই পেয়েছিলাম । আর তাই আমি ‘মা’ বলতেই অজ্ঞান ছিলাম । প্রায়ই আমায় কোলে নিয়ে মা বাবার জন্যে কত রাত অব্দি অপেক্ষা করতেন । আমি বুঝতাম মা চুপিসারে চোখের জল ফেলতেন । তার চোখের পানি আমার মাথার উপর টুপ করে ঝরে পরতাে । আমি কৌতুহলবশত মায়ের কাছে জানতে চাইতাম , মা ! তুমি বাবার জন্যে রােজ অপেক্ষা করে কাঁদো কেন ? বাবা তো একটু পরই বাড়ি ফিরে আসবে । তখন মায়ের মুখে বাবা – মায়ের সুখের সংসারের অনেক গল্প শুনতাম । আমি খুব আশ্চর্য হয়ে যেতাম মায়ের প্রতি আমার বাবার অকৃত্রিম শ্রদ্ধা আর ভালবাসার কথা শুনে । আমি বড় হয়ে যাবার পরও যখনি আমরা মা – ছেলে একসাথে খেতে বসতাম তখনি মা আমায় বলতেন , মেয়েরা হচ্ছে ঘরের লক্ষী , ফুলদানীতে সাজিয়ে রাখা এক গুচ্ছ ফুল । যা নিষ্প্রাণ ঘরে সুবাশ এনে দেয় । মেয়ে মানেই আদরনীয় জিনিস । তাদের কখনো অবহেলা করতে নেই । অসম্মান করতে নেই । মেয়ে হচ্ছে খােদার আশির্বাদ । আর স্ত্রী হচ্ছে স্বামীর আত্মার অংশ । নিজের আত্মাকে কখনাে কষ্ট দিতে নেই । তাতে খােদাতায়ালা নারাজ হয় । স্বামী- স্ত্রী হচ্ছে একে অপরের পোশাক স্বরুপ । শোন বাবা! সবসময় একটা কথা মনে রাখবি । জাজমেন্টাল মানসিকতা নিয়ে কারও জীবন সঙ্গী হওয়া যায় না । জীবন সঙ্গী হতে হয় উদার মানসিকতা আর সেই সাথে অসীম ধৈর্য্য নিয়ে। স্বামীর কাছ থেকে শ্বাশুড়ীর মুখের নারীর প্রতি এমন সৌহার্দপূর্ণ অমায়িক কথা শুনে একদম কেঁদে ফেললেন সােহিনী । সে জানতেন তার শ্বাশুড়ী নিরক্ষর ছিলেন । গ্রামের একজন লেখাপড়া না জানা গৃহিনী নারী , সে সংসারের বাইরে জীবন সম্পর্কে কতটুকু জানেন! কতটুকুই বা বুঝতেন তিনি । যার সারাটা জীবনই কেটেছে শুধু চার দেয়ালের মাঝে সংসার আর সন্তান লালন-পালন করে । তার শ্বশুর ছিলেন একজন সরকারী ম্যাজিস্ট্রেট । সােহিনী শুনেছিলেন তার স্বামী হাসনাত যখন ক্লাস টু – এ পড়তেন তখনই মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হােন তার শ্বশুড় আকরাম চৌধুরী । সােহিনীও খুব বেশিদিন তার শ্বাশুড়ি মিসেস কৃষ্ণচূড়া চৌধুরীকে সেইভাবে খুব একটা কাছে পান নি । তার বিয়ের ছয় মাসের মাথায় ব্রেইন স্ট্রোকে তার শ্বাশুড়ি মিসেস কৃষ্ণচূড়া চৌধুরী মারা যান । এদিকে সােহিনী ইংরেজীতে অনার্স মাষ্টার্সে ফার্স্ট ক্লাস পাওয়া একজন গ্রাজুয়েট। ঢাকার একটা মহিলা কলেজে ইংরেজি বিষয়ে শিক্ষকতা করছেন প্রায় বছর পাঁচেক ধরে । তাদের বিয়ের বহু আগে থেকেই সোহিনীর সাথে হাসনাত সাহেবের একটা সুসম্পর্ক , চেনা-জানা ছিল । সােহিনীর ধারণা ছিল , সে এতাে শিক্ষিত আর সুন্দরী বলেই তার স্বামী হাসনাত তাকে এতােটা ভালবাসেন । এতােটা শ্রদ্ধা করেন । কিন্তু আজ তার এই ধারণা ভুল প্রমাণিত হল । প্রকৃতপক্ষে শুধু একজন মা – ই কেবল পারেন পরিপূর্ণভাবে সুশিক্ষায় গড়ে তুলতে তার পুরুষ সন্তানকে। সুবোধ তৈরি করতে পারেন তার পুরুষ সন্তানের চিন্তা- চেতনার জগতে । নারীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল আরও বেশি উদার আর মানবিক হওয়ার জীবন্ত প্রতিচ্ছবি সৃজন করতে পারেন তার মনোজগতের প্রতিটি কোণায় কোণায় । বাকীটা তৈরি হয় সেই পুরুষের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা আর তার পারিপার্শ্বিকতা থেকে । অনেকক্ষণ যাবৎ স্বামী – স্ত্রী দুজনেই ফোন হাতে নিশ্চুপ হয়ে রইলেন । কিছুক্ষনের জন্যে দুজনের কেউই একটি নিঃশ্বাসও নিতে পারলেন না । শুধু সােহিনীর বারান্দার পাশে পুরােনাে ইউক্যালিপটাস গাছটিতে নাম না জানা অনেক পাখির সাথে ‘ বৌ কথা কও নামে ‘ এক জোড়া ছােট্ট পাখি জনমানবহীন অফিসার্স কোয়ার্টারের এই নিরব বাড়িটিকে একটু পর পর মুখরিত করে তুলছে তাদের কিচির মিচিরের শব্দে । হঠাৎ দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে হাসনাত সাহেব বলে উঠলেন , এনিওয়ে! সােহিনী খুব বেলা হয়ে গেছে । এই সময়ে তােমার খালি পেটে থাকা একদম উচিৎ নয় । যাও হাত মুখ ধুয়ে আগে নাস্তা করে নাও । আমি রুটি আর ডিম ভেজে হটপটে রেখে এসেছি ডাইনিন টেবিলের উপর । ফ্লাক্সে তােমার জন্যে রং চা ও তৈরি করা আছে । যাও দ্রুত নাস্তা সেরে নাও, লক্ষীটি । সােহিনী স্বামীর কথায় শুধু আচ্ছা বলেই ফোন রেখে দিলেন ।

৯৯জন ৩জন
52 Shares

১৫টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য