কৃষি ও কৃষকের গল্প : পর্ব -৫

রুদ্র আমিন ৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, সোমবার, ০৪:২০:৪০অপরাহ্ন গল্প ৮ মন্তব্য

বিয়ে বাড়ি, মধ্যবিত্ত পরিবারের সাজসজ্জা। বিয়ের বাঁজনা বাজছে, বাঁজছে দেশি বিদেশী গান, ছেলে মেয়েদের হইহুল্লোর। বিয়ে বাড়ি জুড়ে আমন্ত্রিত অতিথিরা। সবার অপেক্ষা কখন আসবে বর। বর আসা মাত্ই শুরু হবে বিয়ে। যথাসময়ে কাজী সাহেব এসে উপস্থিত।
তার কিছুক্ষণ পরই শোনা যাচ্ছে ছোট ছোট ছেলেমেয়ে চিৎকার, বর এসেছে, বর এসেছে…যথারীতি গ্রামীন পরিবেশে কলাগাছ দিয়ে বানানো গেইট, প্রশ্নপর্ব, আবদার। তারপর..বিয়ের জন্য প্রস্তুত সবাই। বর-কনে অপেক্ষায় কবুল বলার।
বেয়াই সাহেব কেমন আছেন?
— জ্বী ভালো, আপনি?
ভালো। তাহলে আসুন খাওয়া দাওয়া শেষ করে বিয়ের কাজটা সম্পন্ন করি।
খাওয়া দাওয়া শেষ এবার বিয়ের পর্ব শুরু..
কেউ একজন বলে ফেললেন- শুভ কাজে দেরি করে লাভ কি, কাজী সাহেব বিয়ে পড়ানো শুরু করুন।
ছেলের বাবা- না (উচ্চস্বরে)।

ছেলে পক্ষের একজন মেয়ের বাবাকে বলে ফেললেন — মোহন চাচা যৌতুকের মালামাল আগে দ্যাখান তারপর বিয়ে শুরু হবে। আগের বেজার ভালো, পরের নয়।
ছেলের বাবা- তুমি আমার মনের কথাই বলেছো।
রুদ্র- আঙ্কেল আপনি কি বলছেন, আমি অন্তত আপনার কাছে এমন প্রত্যাশা করিনি।আপনি শিক্ষিত মানুষ, পেশায় শিক্ষক। আপনিই তো সমাজ এবং দেশকে বদলে দিবেন, আপনার নিকট থেকে সবাই শিখবে। আপনার একটি কথা অন্যদের হাজার কথার সমান।
ছেলের বাবা- এই কথাটি ঠিক বলেছো, আমার এক কথা হাজার কথার সমান। তাহলে দেরি কেন। আমি যা যা চেয়েছি তা দেখতে সমস্যা কি, এমনটাই কথা ছিলো বিয়ের আগে। মোহন রাজি না হলে তো আমি কথা দিতাম না। আমার ছেলেকে অন্যত্র বিয়ের ব্যবস্থা করতাম। কথা দিয়ে কথা ভঙ্গ করা ভালো না।
রুদ্র -আঙ্কেল, আমি এই কথাটি বুঝলেন কিন্তু যৌতুক দেয়া নেয়া দুটোই অপরাধ সেটা বুঝলেন না।
ছেলের বাবা – রুদ্র শোন, আমি তোমার সাথে কথা বলতে চাই না, আর তুমি তো সাচ্চুর বন্ধু, বন্ধু হয়ে এমন করছো কেন? তোমার বন্ধুই তো তোমাকে নিমন্ত্রণ করেছে তাই না?

রুদ্র -আঙ্কেল, ক্ষমা করবেন। আমি আপনাদের নিমন্ত্রণে আসিনি। আমি আমার বন্ধুদের আগেই জানিয়ে দিয়ে ছিলাম, যে বন্ধু যৌতুক নিয়ে বিয়ে করবে তার সাথে আমি নেই। বন্ধুকে বলেছিলাম সে যে আপনাকে বুঝায়। কিন্তু না, সে কিছুই করেনি। এখন বলতে হচ্ছে আমার বন্ধু সে নয়, সে মেরুদণ্ডহীন এক পুরুষ। আর আমি মোহন চাচার নিমন্ত্রণে এসেছি।

ছেলের বাবা- এইবার বুঝতে পারছি কেন মোহন কথা দিয়ে কথা মত কাজ করছে না। মোহন ভাই তুমি কি তোমার মেয়ে বিয়ে দিবে? যদি মেয়ের বিয়ে ভেঙে দিতে চাও তাহলে আমার কোনো কথা নেই, আর যদি যা কথা ছিলো সেটা পূর্ণ করো তবেই আমি এই বিয়েতে রাজি। তুমি তো জানো আমার এক কথা হাজার কথার সমান।

মোহন- বেয়াই, আপনার কথা যথাসাধ্য রাখার চেষ্টা করেছি কিন্তু মোটর সাইকেলটা কিনতে পারিনি, জমি বিক্রির জন্য অনেক জায়গায় গিয়েছি কিন্তু যারা জমি কিনতে চায় তারা খুব কম দাম বলে। জমিটা বিক্রি করতে পারলে বাবাজির জন্য মোটর সাইকেলও কিনে রাখতে পারতাম। এই জমিটি আমার পরিবারের বছরের খাবার জোগান দেয়। তবুও বিক্রির জন্য অনেক চেষ্টা করেছি।

ছেলের বাবা- ও, তুমি তাহলে বড় আবদারটাই কিনতে পারোনি। আরে ওইটাই তো আসল চাওয়া। ওটা ছাড়া তো বিয়ে হবেই না।
মোহন – বেয়াই, আমার দুইজন মেয়ে। দুইজনকেই আমি শিক্ষিত করে গড়ে তুলেছি। অধরার বিয়ের জন্য আমি একটি জমি খুব কম দামে বিক্রি করেছি, আমার ছোট মেয়েকে নিয়েও তো ভাবতে হইবো, তাই না। আর আপনার সাথে যা যা কথা হয়েছে সবটাই দিয়ে দিবো, আমারে একটু সময় দেন। এখন আর অমত কইরেন না। আমি কথা দিলাম এক মাসের মধ্যেই বাবাজীর জন্য মোটর সাইকেল কিনে দিবো।
ছেলের বাবা- আর কতো সময় লাগবো মোহন, বাকির নাম ফাঁকি আমি ভালো করেই জানি। তাই আমি জেনে শুনে আমার ছেলেকে বিপদে ফেলতে পারি না।

রুদ্র – আঙ্কেল, এমন কাজ করা কি ঠিক হবে। মোহন চাচা তো বলছে বিয়ের পর আপনার মেরুদণ্ডহীন ছেলের জন্য মোটর সইকেল কিনে দিবে।
ছেলের বাবা- তুমি বারবার আমাদের মাঝখানে আসছো ক্যানো, তুমি জানো না মুরুব্বীদের কথার মাঝে কথা বলতে হয় না।
রুদ্র -আঙ্কেল আপনার একটি ভুল সিদ্ধান্তে একটি পরিবারের কতো বড় ক্ষতি হতে পারে একটু ভেবে দেখুন। আর আপনি হয়তো জানেন না যৌতুক কতোটা জঘন্য কাজ।

ছেলের বাবা- তুমি বিসিএস ক্যাডার বলে কি আমাকে এখন শিক্ষা দিবে। নিজের এঘেয়েমির জন্য সরকারি চাকরি করলে না। কিন্তু আমার ছেলে তো আর তোমার মতো বেকার নয়। এখন হয়েছো শিক্ষিত কৃষক। গ্রামের মানুষের মাথা নষ্ট করে যাচ্ছো। মনে রেখো তোমাকেও আমি স্কুলে পড়িয়েছি। আর আমাকে ভয় দেখিয়ে কোনো লাভ হবে না। তোমার যদি এতো মায়া হয় তাহলে আমরা চলে যাবার পর না হয় তুমিই মেয়ের পরিবারকে উদ্ধার করো। দেখি তোমার বাবা তোমাকে তখন কি করে গ্রহন করে। কিভাবে মেনে নেয় একটি মেয়ের জীবন নষ্ট করা।
রুদ্র- আঙ্কেল, ছি! ছি! ছি!, এমনটা আপনার কাছ থেকে শুনতে হবে তা কখনোই ভাবতে পারিনি। আর একটি কথা শুনে রাখুন, বর্তমান সরকার যৌতুক নিরোধের যে আইন পাস করেছে সেটা কি আপনি জানেন? এই যৌতুকের জন্য আপনার কতোটা জরিমান হতে পারে, আমি চাইনা আপনার জেল জরিমানা হয়। তবুও আপনাকে জানানোর জন্য বলছি…
যৌতুক নিরোধ আইনের তিন নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, কেউ যৌতুক দাবি করলে, তিনি পাঁচ বছরের জেল বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। আগে অর্ডিন্যান্সে জরিমানার বিধান থাকলেও জরিমানার পরিমাণ নির্ধারিত ছিল না। এছাড়া, নতুন আইনের চার নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, কেউ যৌতুক নিলে এবং দিলে উভয়েই দণ্ডিত হবেন। তারা সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের জেল, সর্বনিম্ন এক বছরের জেল বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
আর, আইনটির পাঁচ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, কেউ যদি যৌতুক সংক্রান্ত মিথ্যা মামলা দায়ের করেন, তারও সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের জেল থেকে সর্বনিম্ন একবছরের জেল বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

মোহন চাচা এবং আপনার, দুজনের মঙ্গলের জন্যই কথাগুলো বললাম। আচ্ছা মোহন চাচা, আপনি মেয়েকে শিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন কি এইজন্য? অন্যায়কে মাথা পেতে গ্রহন করার জন্য। আমি আগেই পারতাম পুলিশে খবর দিতে কিন্তু দেইনি শুধু এই ভেবে যে আমি যদি আপনাদের বুঝতে পারি, দুটি পরিবারের মাঝে একটা ভালো বন্ধন তৈরী হোক। আর যারা বিয়ে বাড়িতে এসেছে তারাও দেখুক, বুঝুক যৌতুক দেয়া নেয়া দুটোই অপরাধ।
ছেলের বাবা- তুমি যতই আইন দেখাও না কেন আমি আমার সিদ্ধান্তে অটল। এই বিয়ে হবে না। বাবা সাচ্চু উঠো, মিথ্যেবাদীদের সাথে আমি নেই। সব নষ্টের মূলে তোমার বন্ধু। এখন মোহন বুঝুক তার মেয়েকে কে বিয়ে করে দেখি।
অধরা- বাবা, আমি মেরুদণ্ডহীন ছেলেকে বিয়ে করবো না, যারা যৌতুকের জন্য এতোটা নির্মম হতে পারে তারা তো বিয়ের পরেও যৌতুকের জন্য তোমাকে আমাকে কষ্ট দিতে একটুকুও দ্বিধাবোধ করবে না। ধন্যবাদ রুদ্র ভাই আপনি আমাকে আলোর পথ দেখিয়েছেন।
মোহন – মা, আমাদের মতো দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের বিয়ের আসর থেকে একবার বিয়ে ভেঙে গেলে আর কেউ বিয়ে করতে চায় না। তুই তো জানিস তোর খালাত বোন উর্মির কথা। তার বিয়ে হয়নি, এভাবে থাকতে থাকতে একদিন নিজেই নিজের জীবন শেষ করে দিলো। আমি চাই না তোর জীবনও সেই পথে হাঁটুক।
অধরা- বাবা, আমি শিক্ষিত এজন্য মেয়ে, হয়তো আগে বুঝতে পারিনি তবে আজ বুঝতে পেরেছি। একটা কথা শুনে রাখো বিয়ে যদি না হয় তবে কোনো আফসোস নেই, তোমাদের তো সুখ দিতে পারবো।
অধরার কথা শুনে রুদ্র মোহন চাচাকে বললেন, চাচা আমাকে অভয় দিলে আমি একটি কথা বলতে পারি। যদি কিছু মনে না নেন।
মোহন- কি আর বলবে বলো, এখন তো আমার আর কোনো কথাই রইল না। মেয়েটার জীবন নষ্ট হয়ে গেলো।
রুদ্র- চাচা, আমি অধরাকে বিয়ে করতে চাই যদি, অধরার সম্মতি থাকে। আপনি তো জানেন আমি কোনো কাজ করিনা, কৃষি নিয়েই আছি। গ্রামের কৃষকদের আধুনিক চাষাবাদে সহযোগিতা করছি এবং আমিও কৃষি কাজ করে সংসার চালাচ্ছি।

মোহন- বাবা (রুদ্র হাত ফেলে হঠাৎ করেই), তুমি আমার মেয়েকে বিয়ে করবে! আমার কোনো অমত নেই, আশা করি অধরারও অমত থাকবে না। তোমার মতো একজন ভালো ছেলে হাজারে কয়টা পাওয়া যায় বলো। সত্যিই আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন। মা, অধরা-তুই আর না করিস না।
অধরা- বাবা, তোমাদের কোনো কথার অবাধ্য হয়নি কোনোদিন। যৌতুক দিয়ে বিয়ে দিচ্ছিলে তবুও কিছুই বলিনি। আমার পক্ষ থেকে সম্মতি আছে।
রুদ্র তার দুই বন্ধুকে সাক্ষী করে বিয়ের কার্য সম্পন্ন করে। অধরাকে বিয়ে করে নিজের বাড়িতে চলে যায়। রুদ্রের বাবা পুরো ঘটনা জেনে রুদ্রকে বলেন– বাবা, তুমি খুব ভালো কাজ করেছো, তোকে নিয়ে আমার গর্ব হয়। এসো মা ঘরে এসো।

৯১জন ৭জন
12 Shares

৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য