কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে।

ইঞ্জা ৩ অক্টোবর ২০২০, শনিবার, ০৮:০৫:৫৯অপরাহ্ন সমসাময়িক ৩৩ মন্তব্য

দেশে চালের দাম এখন উর্ধগতি, চারিদিকে হায় হায় রব চালের দাম বেড়ে যাওয়াতে, কিন্তু একবারও কি আমরা ভেবেছি এই অত্যধিক দামে লাভবান কারা?

এতে কি যারা চাল উৎপাদন করে, তারা কি লাভবান?

সত্যি বলতে না, তারা উল্টো লস করে প্রায়ই সময়, তার অনেক কারণের মধ্যে কিছু কারণ বলি আপনাদের কাছে বলি।

চাষিরা ফসল ফলান তা থেকে লাভ করার জন্য হলেও তাদের থেকে চাল মিলের মালিকরা কম দামে কিনে নেয়, ফড়িয়ারা কিনে নেয় অল্প দামে, এতে চাষিরা ধানের উচ্চমূল্যের সুবিধা চাষিরা পাইনা, উচ্চমূল্যের সুবিধা পাই মিলের মালিকরা, আবার এদের থেকে কিনে আড়তদাররা, তারাও উচ্চমূল্যের সুবিধা লাভ করে।

এছাড়া বন্যা, খড়া, পোকামাকড়ের উপদ্রব, ঘুর্ণিঝড়, শিলাপাত ইত্যাদির কারণেও চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে।

এখন আসুন জাপানের গল্প শুনাই যা কালেক্টেড বলতে পারেন।

জাপানিরা সবচেয়ে বেশি পছন্দ করে যে ভাত সেটার নাম ‘স্টিকি’, মানে ভাতের দানা একটার সাথে আরেকটা লেগে থাকে।

আমার ধারণা ছিল, স্টিকি ভাত কাঠি দিয়ে সহজে খাওয়া যায় বলেই জাপানিরা এটা এত পছন্দ করে।  আমি এই ভাত খেতে একদমই পছন্দ করতাম না। ইন্টারেস্টিং বিষয় হলো জাপানের বাজারে জাপানি কৃষকদের উৎপাদিত এই বিশেষ ভাতের চালের দামই সবচেয়ে বেশি।

বাজার থেকে কয়েকবার বিভিন্ন ধরণের চাল কেনার পর বুঝলাম এই চাল যদি জাপানিরা নিজেরা উৎপাদন না করে আশেপাশের কোনও দেশ থেকে আমদানি করতো তাহলে এর দাম বেশ কম পড়তো।আমি কৌতুহলী হয়ে আমার সুপারভাইজার প্রফেসর কামিজিমাকে একবার জিজ্ঞেসই করে ফেললাম..

“আচ্ছা প্রফেসর, তোমরা এই চাল বিদেশ থেকে আমদানি করো না কেন? আমদানি করলে তো দাম অনেক কম পড়তো!”

কামিজিমা: “তা হয়তো পড়তো..”

আমি: “তাহলে?”

কামিজিমা: “সরকার ইচ্ছে করেই কৃষকদের কাছ থেকে উৎপাদন খরচের অনেক বেশি দামে এই চাল কেনে।”

“কেন?”

“কৃষকদেরকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য।”

“মানে?”

“কৃষক যদি ভালো দাম না পায় তাহলে কি ওরা আর কৃষিকাজ করবে? পেশা বদলে ফেলবে না!”

“তাই বলে সরকার এত বেশি দামে চাল কিনবে কৃষকদের কাছ থেকে?”

“শোনো, আমরা আসলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা ভুলিনি। জাপান একটা দ্বীপরাষ্ট্র। ঐরকম একটা যুদ্ধ যদি আবার কখনো লাগে আর শত্রুরা যদি আমাদেরকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে! তখন কী হবে ভেবেছ?”

“বুঝলাম না!”

“বাইরে থেকে কোনও খাবার জাপানে আসতে পারবে? আমরা কি তখন এই টয়োটা গাড়ি খাব? কৃষক যদি না বেঁচে থাকে তাহলে ঐসময় আমরা বাঁচব?!”

আমি অনেকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইলাম কামিজিমার কথা শুনে। ভাবলাম, আমরা কি অবলীলায়ই না আমাদের দেশের কৃষকদেরকে বছরের পর বছর উৎপাদিত শষ্যের ন্যায্য মূল্য না দিয়ে মেরে ফেলার যাবতীয় আয়োজন সম্পন্ন করছি!

উল্লেখ্য জাপানিজ সরকার বছর শেষে তাদের মজুদ চাউল নষ্ট করে ফেলে দেয়। পুনরায় চাল কেনার জন্য। কৃষকদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য।

“The Mind Game” বই থেকে উদ্ধৃত।

 

তাহলে একই বিষয় আমাদের সরকার করেনা কেন?

আসুন কিভাবে করা যায় তা নিয়ে কথা বলি, আমাদের সরকারের উচিত ধান চাষিদের কাছ থেকে নিজেরাই কেনা, বা ধানের ন্যায্য উচ্চ মূল্য নির্ধারণ করা যেন তা চাষিরা পাই, এবং মিল মালিকরা যেন সরকারের নির্ধারিত দামেই কিনতে বাধ্য হয় তা নজরদারিতে আনতে হবে, এবং মিল মালিকরাও যেন সরকারের নির্ধারিত ন্যায্য দামেই আড়তদারদের কাছে বিক্রি করতে বাধ্য হয় তা দেখতে হবে, আবার আড়তদারদের জন্যও নির্ধারিত দাম করে দেওয়া উচিত সরকারের এবং তা নির্ধারিত দামেই বিক্রি কর‍তে হবে, তাহলেই হতে পারে কৃষকরা লাভবান।

এতে কৃষকরা ধান চাষ কর‍তে কখনোই না করবেনা, তারা আশার আলো দেখবে, এতে করে আমাদের চালের দাম বাড়তি হলেও সাধারণরাও নিশ্চয় হাসিমুখে  কিনবে, কোনো আপত্তি থাকবেনা।

একিভাবে অন্যান্য জরুরি খাদ্য দ্রব্য উৎপাদনেও সরকার অনুরুপ ব্যবস্থা নিতে পারে, তাহলেই এই দেশ খাদ্যে সয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে বলেই আমার বিশ্বাস, সাথে আমদানি নির্ভরতাও নিশ্চয় কমে যাবে।

আমাদের সবার বুঝা উচিত, কৃষকরা বাঁচলে আমরা বাঁচবো, এবং দেশ বাঁচবে।

সমাপ্ত।

২২৯জন ৩০জন
0 Shares

৩৩টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ