নামজারী কি?

নামজারী হলো – কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কোন বৈধ পন্থায় ভূমি/জমির মালিকানা অর্জন করলে সরকারি রেকর্ড সংশোধন করে তার নামে রেকর্ড আপটুডেট (হালনাগাদ) করাকেই নামজারি বলা হয়। কোন ব্যক্তির নামজারি সম্পন্ন হলে তাকে একটি খতিয়ান দেয়া হয় যেখানে তার অর্জিত জমির একখানি সংক্ষিপ্ত হিসাব বিবরণী উল্লেখ থাকে। উক্ত হিসাব বিবরণী অর্থাৎ খতিয়ানে মালিকের নাম, কোন্ মৌজা, মৌজার নম্বর (জে এল নম্বর), জরিপের দাগ নম্বর, দাগে জমির পরিমান, জমির শ্রেণি, একাধিক মালিক হলে তাদের নির্ধারিত হিস্যা ও প্রতি বছরের ধার্যকৃত খাজনা (ভূমি উন্নয়ন কর) ইত্যাদি লিপিবদ্ধ থাকে।

নামজারী/ জমি খারিজ করতে যেসব কাগজ লাগেঃ–

১) সংশ্লিষ্ট জমির এস এ খতিয়ানের ফটোকপি

২) আর এস খতিয়ানের ফটোকপি

৩) জমির দলিলের ফটোকপি

৪) বায়া দলিলের ফটোকপি (প্রয়োজন হলে)

৫) ওয়ারিশান সনদ ( প্রয়োজন হলে)

৬) ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের দাখিলার কপি

৭) ভোটার আইডি কার্ড এর ফটোকপি

৮) এক কপি পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি।

 

এতোসব জানা ছিল না। জমি কেনার পর দলিল হয়ে গেলেই শেষ হয় বলেই জানতাম। ব্যাংকে লোন নিতে গিয়েই জানতে পারলাম আমার নিজ নামে নামজারী/নামখারিজ করতে হবে। আমি চাইলে বাড়িতে বসেই অনলাইনে আবেদন করতে পারবো এমনটা জানার পর আবেদন করতে বসে গেলাম। প্রথম ধোকা আপনার এখানেই খেতে হবে। ২০ টাকার স্ট্যাম্প আর ঘোষনার জন্য ৫০ টাকা লাগার কথা। অথচ আবেদনকারী আপনার কাছে নিবে অনেক বেশি টাকা। তো যাই হোক, আবেদন করার পর ম্যাসেজ এল ভূমি অফিসে যোগাযোগ করুন।

“চালু হলো ই- নামজারি, টাউট দালালদের মাথায় বারি”- সরকারী স্লোগান সম্বলিত পোষ্টার। আপনি বাসায় বসেই আবেদন করতে পারবেন। প্রতারক/দালাল ধরে প্রতারিত হবেন না। নিম্নলিখিত খরচ হলেই আপনার নামজারী সম্পন্ন হবে। অতিরিক্ত খরচ দাবী করলে আপনার এসিল্যান্ডকে জানান ইত্যাদি ইত্যাদি। বড়ই শান্তির বার্তা। তবুও কাগজপত্র দেখার জন্য কিছু খরচ লাগবে। একদম ভূমি অফিসে বসে ঘুস দাবী। ঘাড়ের বাঁকা রগ টনটনে হলেও নিজেকে সামাল দিলাম। জানতে চাইলাম কেন?

-অতোসতো বুঝলে কি আর এখানে আসতেন?

তাও কথা, পড়াশুনা কম জানি বলেই এ অবস্থা। আর কটা টাকার জন্য এতো হিসাব করা ঠিক না।দিয়ে দিলাম।

এবার যোগাযোগের পালা ইউনিয়ন তহশীল অফিস। টসটসে দুধে-আলতা তহশীলদার সাহেব বসে আছেন। জমির কাগজ- পত্র বের করে দিলাম। তিনি পরীক্ষা নিরীক্ষায় কি পেলেন জানিনা বাইরে বসতে বললেন। অনেকক্ষন বসার পর পান খেতে খেতে এক মহিলা এসে এই করোনাকালেও আমার কোলঘেঁসে বসলেন। ফিসফিসিয়ে বললেন, ‘কিছু খরচাপাতি লাগবে।’

-কেন? একেবারেই অবান্তর প্রশ্ন?

তিনি অবাক হয়ে বললেন, ‘ভূমি অফিসে যেতে হবে কাগজ জমা দিতে। তারখরচ আছে না। ১০০০ টাকা দেন আর বাড়িতে গিয়ে ঘুমান বাকি কাজ আমরা দেখবো।’

বাড়িতে এসে ঘুমালাম এক টাকাও না দিয়ে। কারন ৪০ টাকার অটো ভাড়া কেন ১০০০  হবে? আর এটাতো আমার দেবার কথা না। অফিস তাকে দেবে।

দুমাসেও কোন ম্যাসেজ এলো না। ফোনও না। আবার গেলাম তহসীল অফিস। আমাকে দেখে তহশীলদার সাহেব বিকট চিৎকার- ‘এই করোনার সময় এতো ভীড় কেন? যান সব গিয়ে বাইরে বসেন?’ বউকে মেরে ঝিকে শেখানো আরকি? দুমাস চলে গেছে তাই আর দেরী করা যায় না। ১০০০ টাকা দিয়ে সাথে অনুরোধ ও করলাম যেন কাজটা তারাতারী হয়।

এবার ফোন এলো ভূমি অফিস থেকে। বয়স্ক এক লোক এলেন। আমার সিগনেচার লাগবে তা নিতে। নামকা ওয়াস্তে সিগনেচার দেবার পর খরচাপাতি চাইলেন, এতোদুর এসেছেন। দিলাম ১০০ টাকা। ১০০ টাকার নোট দেখে তার মুখের অবস্থা দেখবার মতো ছিলো। আমার মতো কৃপন মহিলা তিনি জীবনেও দেখেননি এমন অভিশাপ মনে মনে দিয়ে গেলেন। গালীও দিয়েছেন হয়তো।

এরপর কর কমিশনারের পালা। তিনি পঁয়ত্রিশ বিসিএস, অমায়িক ইয়াং লেডি এবং মুক্তিযাদ্ধার মেয়ে। একে একে ডেকে নিচ্ছেন। আমার পালা এলো সব দেখে শুনে আমাকে পাশের রুমে পাঠালেন। সেখানে শুভ্র দাড়ি টুপি ভদ্রলোক যিনি ‘নাজির’ নামে পরিচিত। তিনি টাকা জমার রসিদ দেবেন। তাকে নাকি দিতে হবে ১৪০০ টাকা। সাইনবোর্ডে লেখা বেশি টাকা চাইলে আপনার এসিল্যান্ডকে জানান।

বড় আশায় জানালাম, ‘স্যার ১১০০ টাকার জায়গায় ১৪০০ টাকা যে নেয় কিন্তু রিসিট তো ১১০০ টাকার।’

এসিল্যান্ড আমার দিকে তাকালেন, ও মাই গড এ কি চোখ। চশমা খুললে আমার আরও বিপদ!

-তো, আমাকে কেন জিজ্ঞেস করছেন?

-না, আপনি অফিসের উদ্ধর্তন কিনা! তাই?

এরপর চশমা খুলে তামিল ভাষায় কি যে বললেন। মুহূর্তই তাঁর ড্রাইভার, দারোয়ান, পিয়ন সব হাজির। তিনি গাড়িতে উঠে চলে গেলেন। কিছুপরে আমি নিজেকে আবিস্কার করলাম বসার ঘরে। পাশেই এক দালাল আমায় বলছে, কি দরকার ছিলো স্যারকে রাগানোর। এখন সামলান এ কাজ আর হবে না।

সেদিন পাশের এক চাচা আমার উত্তর দিয়েছিলেন, ‘মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কষ্টের টাকায় জমি কিনি।আর নামখারিজ করতে আসাটা মানে অন্যায়। নিজেকে তখন বোকাচোদা, বালুয়া সাজানো। উনি তো আর জানেন না সব চোর, চুতিয়ারা এখানে ঘুস খাওয়ার জন্যে বসে আছে। দিনে কতটা খারিজ পার হয় আর ১০০ টাকা করে ভাগে পেলেও এসিল্যান্ড কতটাকা পান খেয়াল করছেন।’

কাজ হলো না, আর হয়তো হবেও না। ডেট পার হবার পর নাকি আবার নতুন করে সব করতে হয়।  এসব ভেবে সত্যিই নিজেকে বোকাচোদা, বালুয়া মনে হচ্ছিল। দুপুরের রোদে মাথা তখন পুরাই হ্যাং। শুধুই মাথায় ঘুরছে ’বালুয়া’ শব্দের সন্ধিবিচ্ছেদ, ভাঙলে কি হয়?  বাল+,,,,,

ছবি- নেটের

১৭৩জন ৪জন
0 Shares

১৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য