টুপটাপ বৃষ্টি। সারারাত মেঘের তর্জন- গর্জনে মোটেও ঘুম হয়নি। যদিও সাতটা পার হয়ে গেছে। তবুও কাঁথা মুড়ি দিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা অব্যাহত। কারন না ঘুমালে সারাদিনই মাথা দপদপ করবে।

মেঘকে এতোদিন মেয়ের জাত মানতাম। এখন দেখছি সে বার্ধক্যে কারণ ছাড়াই যৌবন প্রদর্শন করা পুরুষ। সময় অসময় একদমই বোঝে না। যখন তখন আবদারে ডাকাডাকি করে। এবং যে কোন ওয়েতে নিজেকে পুরুষ প্রতিষ্ঠা করাই তার কাজ।

এসময় বাইরে কেউ ডাকছে- ভাবি আছেন? ভাবি বাড়িতে আছেন?

এই বাড়িতে ভাবি আর কাকে ডাকবে। মা তো নয়ই। আমিই হবো। নির্ঘুম মাথার রগ রাগে দপ করে জ্বলে উঠলো।

-আইজ তোরে খাইছি!! সাতসকালে আমি তোর কোন ভাই এর বউ লাগি, এটা বলতে না পারলে বিপদ ঘটাব।

স্বপ্রতিভ হাসিতে ত্রিশোর্ধ যুবক জনাব ‘ কৃষি কর্মকর্তা‘। বন্ধু তাহের যাবার পর ইনি এসেছেন। নির্ঘাত ঘুস দিয়ে চাকুরীতে ঢুকেছেন। না হলে এমন হওয়ার কথা না। একটু বেশিই হাসেন আর প্রফেশনাল কাজে ভাবী ডাকা যে অশোভন এটা তিনি বোধহয় জানেন না।

রাগের কারণ আসলে অন্যকিছু। বেচারার এমন হাসিতেও যা পরছে না। সমস্ত জমির ধান কোমর পানির নিচে। লেবার নেই, এদিকে বিরামহীন বৃষ্টি প্রতিদিন হয়েই চলছে। এর মধ্যে তিনি নিশ্চয়ই  নতুন কোন প্রপোজাল নিয়ে হাজির হয়েছেন। এমন প্রপোজালের কারণেই আজ শখের কৃষকের বারোটা- তেরটা।

তিনি প্রায়ই আসেন। কৃষি বিষয়ক নানা সাহায্য সহযোগিতা নিয়ে। ভাইয়া সম্ভবত গ্রুপ লিডার। শিক্ষিত লোকজন কৃষি কাজে আসা ভীষণ জরুরী এসবও বোঝান। আর আমরাও এসব কথায় কৃষি কাজে নেমে পড়ি। ট্রেনিং এ যাই। লাভের লাভ কিছু হয় না। ওনারা যা বলেন ওর চেয়ে বেশি আমিই জানি। তবুও এনারা ছায়ার মতো লেগে থাকেন। বিশিষ্ট ব্যক্তিদের উৎসাহিত করে ট্রেনিং এ নিয়ে যান। তাদের দেখিয়ে বড় কর্তারা আরও খুশি হন আর তাদের জন্য বড় বড় বিল তৈরি করেন।

বকা দেবার আগে ঠান্ডা মাথায় প্ল্যান করে নিতে হয়। তাই অফিসারকে বসতে দিয়ে সকালের চায়ের সাথে ডিম পাউরুটি বানিয়ে দিলাম। তিনি খুব মনোযোগ দিয়ে খাচ্ছেন। বেচারার বোধহয় বেশ ক্ষুধা হয়েছে কিংবা পুরুষ মানুষ অখাদ্যও মনোযোগ দিয়ে খায় এটাও হতে পারে!

খাওয়া শেষে জানতে চাইলাম- আপনার ভাই কেমন আছে?

-কোন ভাই। ভাবি আমার তো কোন ভাই নেই, আমি একা।

-তাহলে আমি আপনার কোন ভাইয়ের বউ? বেচারা এবার বুঝতে পেরে, অপ্রস্তুত। কিন্তু তার মুখে হাসি লেগে আছে। বোকা বোকা হাসি।

গত দুমাস ধরে রংপুর অঞ্চলে অঝোরে ঝরছে। পাটের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। অধিকাংশ পাটের জমিতে দু’বার করে বীজ ফেলার পরও চারা গজাযনি। কারও কারও গজালেও তার অতি বৃষ্টিতে তারও বেহাল দশা।

এবার আসি ধানে! অতিবৃষ্টির কারণে কৃষকের অধিকাংশ জমির ধান পানির নিচে। কিছু পঁচে গলে একাকার। বাকি যেসব বাঁচানো যাচ্ছে তা একেবারে দ্বিগুণ খরচ দিয়ে। তা নিয়ে আসা না আসা একই রকম। কারন দু একটা অটো রাইস মিল থাকলেও তা লেবারের অভাবে বন্ধ। কাঁচা ধান তাই চলছে না। বৃষ্টির কারণে ধান শুকানো সম্ভব না হওয়ায় ঘরেই ধান পঁচে যাচ্ছে।

এদিকে কৃষককে দ্বিগুণ লেবার পেমেন্ট গুনতে হচ্ছে। ৩৩ শতক বা এক বিঘা জমির হিসাব করলেই বোঝা যাবে কৃষক কতোটা লসে আছে।

ধান কাটতে খরচ হচ্ছে ৬০০০- ৬৬০০ টাকা। আবাদে করতে খরচ হয়েছে ৯০০০- ১০০০০ টাকা। অন্যান্য সহ এক বিঘা জমিতে মোট খরচ – ১৭০০০-১৮০০০ টাকা।

এখন আসি, কৃষকের পাওনা। কৃষক ধান পাবে  ৩৩ শতক জমিতে ২০-২১ মন। যার মূল্য বর্তমান বাজারে ৭০০টাকা মন দরে ১৪০০০-১৪৭০০ টাকা। তো কৃষকের লস হলো ৩০০০ মতো টাকা। সরকার এ ব্যাপারে পদক্ষেপ না নিলে সামনের দিনগুলোতে কৃষকের করুন পরিনতি কতোটুকু তা বেশ বোঝা যাচ্ছে।

হাসি খুশি অফিসার পকেট থেকে মায়ের কার্ড বের করে দিলেন। যার নাম ‘কৃষি ভর্তুকি কার্ড‘। যাদের নিচু আবাদি জমি আছে এবং তা একফসলি তাদের জন্য এই কার্ড। এটি আমারও আছে। সরকার ভর্তুকি দেয় প্রতিবছর বিশ কেজি মিশালী সার আর এক কেজি সরিষা।

এই কার্ড এর জন্য এবার নতুন প্রপোজাল আছে। কারণ আমাদের শ্রদ্ধেয় খালাম্মা বলেছেন, বাড়িতে কুনও পতিত জমি রাখা যাবে না। সেখানে সবজি চাষ করতে হবে। জনাব কৃষি কর্মকর্তা আমার জন্য সবজি বাগানের প্রপোজাল নিয়ে এসেছেন। তিনি বলছেন আমি শুনছি। কারন একবার অপমান করে দ্বিতীয় বার চুপ থাকতে চাই।

জমি লাগবে পাঁচ থেকে দশ শতক। আর তাহারা দেবেন কিছু অন্যান্য সার ও কম্পোস্ট সার আর শাক সবজির বীজ। ৫ শতক জমি লেবার নিয়ে তৈরি করে সবজি লাগাতে আমার খরচ হবে ১০০০ টাকা। এরপর মাচা দিতে হবে তার খরচ ২০০০, এরপর কীটনাশক দিতে হবে, নিরানী দিতে হবে। মোটকথা ৫-৬০০০ মতো খরচ হবে।

আমি জানতে চাইলাম- আপনার বাড়িতে এ প্রোজেক্ট আছে।

-না নেই।

-খরচের টাকা হলে আমি সবজি কিনে কতোদিন খেতে পারবো জানেন?

তিনি জানালেন – জানেন না।

তিনি কিছুই জানেন না। সরকারী এসব প্রজেক্টের নাম- ‘ হাতির খরচে ছাগল পালন‘। সামান্য কিছু কৃষককে দেন আর সরকারী হাস্যজ্জ্বল এই কর্মকর্তারা লক্ষ লক্ষ টাকার বিল বানিয়ে নিজেকে পূর্ণ করেন।

অফিসার আমার কোন কার্ড, কোন প্রজেক্ট কিছুই চাই না। পাশের রুমে আমার মা আছেন তিনি অনেক জমির মালিক। তাকে বোঝান, তাকে এসব ফাঁদে ফেলেন। আমার দরকার নাই। আর হাতির খরচে ছাগল না পুষে উন্নত দেশের মতো সরকারী খরচে সফল উদ্যোগ নেন। অটো রাইচ মিল বানান। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছাড়া সরাসরি সঠিক পদ্ধতিতে ধান কেনেন। আধুনিক পদ্ধতিতে ফসল রোপন, কর্তন, উত্তোলন ইত্যাদির ব্যবস্থা করেন। লেবার সংকটে সমবায় ব্যবস্থা চালু করেন। এসব লোকদেখানো ভন্ডামি কাজ বন্ধ করে কৃষক বাঁচান। আর আপনার সাথে খারাপ ব্যবহার করার জন্য আমি সরি!!!

কারও সাথে দূর্ব্যবহার করলে মন খচখচ করতে থাকে। অশান্তি আরও বাড়ে। আমার ও তাই কাটলো সারাদিন। বেচারার আর কি দোষ! যা হুকুম তাই তো শিরোধার্য।

সন্ধ্যায় বন্ধু হালিমা ফেরদৌসী ফোন দিয়েছে।

বললাম- ভাবি কেমন আছো।

অপর পাশ থেকে কোন কথা নেই, কিছুক্ষন চুপচাপ।

আবার জানতে চাইলাম- কি হলো কথা বলছ না যে!

-ও নাম্বার চেক করলাম। তুমি হঠাৎ ভাবি ডাকছো  ভাবলাম অন্য কোথাও ফোন গেল কিনা। দেখলাম ঠিকই আছে। কি হয়েছে, কোন সমস্যা!

-না সমস্যা নেই। ভাবি ডাকার প্রাকটিস করছি। চাইলে তুমিও ডাকতে পার। এখন থেকে আমরা সবাই ভাবি- ভাবি।

-তুমি বোধহয় কোন কারনে ডিস্টার্ব। ঠিক আছে রেষ্ট নাও পরে কথা হবে। ফোন কেটে গেল- ঘটাস!

২০৬জন ৫১জন
0 Shares

৯টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন



লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য




ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ