” ওকি গাড়িয়াল ভাই, হাকাও গাড়ি তুই; হামরা চিলমারী বন্দর যাই”! ভাওয়াইয়া আর নদী ভাঙ্গনের ছোট্ট একটা জেলা কুড়িগ্রাম। মানুষজন সহজ- সাধারন, বোকা- সোকা, মফিজ। নদী, বন্যায় সংগ্রামী জীবন। এখানকার মানুষ মফিজ নামে পরিচিত কারন গাড়ির টিকিট কেটে ছাদে বসে ঢাকা যাই। বাসের ভেতরে গরম লাগে।

তবুও আম, কাঁঠাল, শাক- সবজি, টাটকা দেশী মাছে ভরপুর জেলা। এমন শ্রাবন সকালে একগামলা পানতা বা চালের কুঁড়োর সাথে কাঁঠাল আমেজ আনে। বিখ্যাত বৈরালী মাছ, সিদল, শুটকী, টাকী ভর্তা, পাটশাক লোকজনের প্রিয়। সারাদিন কৃষকের মুখে ভাওয়াইয়া গান আর পানে ঠোঁট লাল প্রিয় তালিকায় যেন- এ সুখের নেই কোন সীমানা।

শিক্ষা, চাকুরীতে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রনালয় দখল করতে ছেলেমেয়েরা ঢাকামূখী হয়েছে। এলাকায় অধিকাংশ বউ দুধে আলতা ঢাকাবাসী। ছেলেরা ঢাকাইয়া দুধে-আলতা প্রেমে হাবুডুবু খায় কেন এ নিয়ে এলাকার কন্যা মহলে চরম আক্রোশ রয়েছে।

জেলায় প্রবাহিত নদ-নদী ১৬টি হলেও প্রধান নদনদীঃ
১। ব্রক্ষ্মপুত্র নদ
২। তিস্তা নদী
৩। ধরলা নদী
৪। দুধকুমর নদী
৫। ফুলকুমর নদী।


আয়তনে ছোট আর নদীর জেলা কুড়িগ্রামে এর আগে কোন বিশ্ববিদ্যালয় ছিলনা। প্রধানমন্ত্রী জনাব শেখ হাসিনা ঘোষনা দিয়েছেন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের। কারন এখানকার মানুষ হাসিমুখে কঠোর পরিশ্রম করতে জানে এবং এই জেলায় কৃষিতে একটা দারুন সম্ভাবনাময় পরিবেশ রয়েছে। আসুন দেখি বিশ্ববিদ্যালয়ে কি কি পড়ানো হবে-

মনোগ্রামের ব্যাখ্যাঃ
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান চারটি বিষয় শিক্ষা দান,আধুনিক গবেষণার মাধ্যমে কৃষির রুপান্তর ও উন্নয়ন, নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশের সমৃদ্ধি আনয়ন।

ক. কুড়িগ্রামের কুড়ি (২০) কে নিয়ে কুড়িটি পাট গাছের (বাংলাদেশের সোনালী আঁশ) পাতা দিয়ে কৃষি বিষয়টি বোঝানো হয়েছে
খ. চারটি প্রস্ফুটিত ফুল দিয়ে চারটি ডিসিপ্লিন বোঝানো হয়েছে।
গ. ডিসিপ্লিন -১: কৃষির রুপান্তরে স্মার্ট কৃষি (Symbol of drone agriculture)

ডিসিপ্লিন ২: লাইভস্টক এ স্মার্ট লাইভস্টক (IoT sensor message receiver হলো মোবাইল সদৃশ ডিভাইস)

ডিসিপ্লিন ৩: ফিসারিজ এ কুড়িগ্রামের লোকাল ঐতিহ্যবাহী বইরালি মাছ, তিনটি বড় নদীকে (ব্রহ্মপুত্র,তিস্তা ও ধরলা) বোঝানো হয়েছে তিনটি পানির লাইন দিয়ে, ছোট ছোট পানি দাগ দিয়ে ১৩ টি শাখা নদী কে বোঝানো হয়েছে। গ্রাফ দিয়ে উন্নয়নের অগ্রযাত্রাকে বোঝানো হয়েছে।

ডিসিপ্লিন ৪:  বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এর প্রতীক, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি কে ভিত্তি ধরে।

ঘ. চাকা- চারটি ডিসিপ্লিনের উন্নয়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়ন।
ঙ. জ্ঞানের আলো ছড়ানোর নির্দেশক বই (চারটি পাতা দিয়ে চারটি ডিসিপ্লিন বোঝানো হয়েছে)
চ. কনভোকেশন ক্যাপ দিয়ে মানসম্পন্ন গ্রাজুয়েট তৈরি বোঝানো হয়েছে।
ছ. প্রতিষ্ঠা ২০২২ খ্রি.

** কুড়িগ্রাম জেলায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানঃ

মহাবিদ্যালয়ের সংখ্যা                ঃ ৪৩টি
উচ্চ বিদ্যালয়ের সংখ্যা                ঃ২৫৭টি
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যাঃ ৫৬৩টি

বেসরকারি রেজিঃ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যাঃ৫৫২টি

মাদরাসার সংখ্যা ঃ ২২৪টি

এবতেদায়ী মাদরাসার সংখ্যা ঃ২২৪টি

পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ঃ ০১টি

টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ ঃ  ০১টি।

এতো ছোট জেলায় অসংখ্য মাদ্রাসা রয়েছে। এছাড়া ছাতার মতো অসংখ্য লিল্লাহ বোডিং নুরানী ও হাফেজীয়া মাদ্রাসা আছে। যা আদতে দ্বীন শিক্ষার নামে অশিক্ষা। বিশ্ববিদ্যালয় হলে জনগনের সচেতনতা বাড়বে। তারা ছেলেমেয়েকে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে এগিয়ে আসবে।

সম্ভাবনাময় চিলমারী বন্দরঃ  কুড়িগ্রাম জেলা সদর থেকে ৩৫ কিমি দক্ষিণে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে অবস্থিত। ব্রহ্মপুত্র নদ পৃথিবীর অষ্টম বৃহত্তম নদ। চিলমারী বন্দরকে নিয়ে আব্বাস উদ্দীনের বিখ্যাত ভাওয়াইয়া গান আজও বাংলার লোকসঙ্গীতের সম্পদ। এই চিলমারী বন্দর সংলগ্ন ব্রহ্মপুত্র নদী দিয়ে ব্রিটিশ আমলে বড় বড় জাহাজ চলাচল করতো । বর্তমানে এইবন্দর নদীর নাব্যতা হ্রাসজনিত কারণে জাহাজ চলাচলের অনুপযোগী, কেবল নৌপরিবহন ব্যবসাহাটিই টিকে আছে । সীমিত আকারে হলেও বন্দর বর্তমানেও ব্যবহ্নত হচ্ছে। সম্প্রতি এ বন্দরটির পুরোনো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে সরকার এটিকে নৌবন্দর হিসেবে ঘোষণা করেছে ।

ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর মধ্যে দেবী চৌধুরানী ও ভবানী পাঠক ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। গভীর অরণ্যে তারা গোপন আস্তানা গড়ে তোলেন। ১৭৭০-১৭৮৩ সাল পর্যন্ত তারা বৃহত্তর রংপুর এলাকায় ইংরেজ ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে অনেক যুদ্ধে অংশ নেন। ভারত ছাড় আন্দোলন, তেভাগা আন্দোলন, সত্যাগ্রহ আন্দোলন কুড়িগ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় কুড়িগ্রামের রৌমারী, রাজিবপুর (কোদালকাটি ইউনিয়ন বাদে) এবং ফুলবাড়ী এলাকা মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস মুক্তাঞ্চল ছিল। কুড়িগ্রামে পাক সেনাদের সংগে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রচন্ড যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং শতাধিক মুক্তি যোদ্ধা হতাহত হন।

এই এলাকার এনজিও কেন এসেছিল উন্নতির জন্য? সেই মেয়েটি যে জাল গায়ে জড়িয়ে নদীতে মাছ ধরছিল তার অবদান অনস্বীকার্য। আজও তার কথা সবাই বলে। গোড়ামী, অশিক্ষা আর মাদ্রাসা শিক্ষায় ভরপুর এমন এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয় হতে যাচ্ছে। কুড়িগ্রাম তারামন বিবি আর সৈয়দ শামসুল হকের এলাকা। সৈয়দ শামসুল হক সারাজীবন বাইরে কাটালেও বর্তমান কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ মাঠে শায়িত আছেন।

কুড়িগ্রাম জেলার দর্শনীয় স্থান ঃ

সোনাহাট স্থলবন্দর ( Shonahat Land Port): ভূরুঙ্গামারী উপজেলার বঙ্গ সোনাহাট ইউনিয়নের সোনাহাট সীমান্তেএ স্থল বন্দর অবস্থিত। সোনাহাট স্থলবন্দরটি ২০১২ সালের ১৭ নভেম্বর উদ্বোধন হয়। পণ্য আমদানি চালু হয় ২৮ এপ্রিল ২০১৪ খ্রিঃ । বর্তমানে ভারতের সাথে সকল আমদানী রফতানিকৃত মালামাল আসা- যাওয়া করে এ পথে।

বঙ্গসোনাহাট ব্রীজ( Bonggoshonahat Bridge) : এটি প্রাচীন ব্রীজ যা ভূরুঙ্গামারী উপজেলার বঙ্গসোনাহাট ইউনিয়নের দুধকুমার নদীর উপর নির্মিত।

টুপামারী পুকুর ( Tupamari Dighi) জিয়া পুকুর নামেও এ পুকুর পরিচিত। যা জিয়াউর রহমানের আমলে খাল খনন প্রক্রিয়ার একটি অংশ। এটি পিকনিক স্পট হিসেবে ব্যবহ্ত হয়। যা টুপামারীর দোলায় অবস্থিত। প্রচুর দেশী মাছের সমাহার এ পুকুরে তাই লোকজন পাহারায় থাকে।

উলিপুর মুন্সিবাড়ী( Ulipur Munshi Bari) : উলিপুর উপজেলার উলিপুর বাজার থেকে ৭ কিলোমিটার দুরে ধরনীবাড়ি ইউনিয়নে অবস্থিত। শোনা যায়, ব্রিটিশ আমলে রাণী এ বাড়িতে নিমন্ত্রিত হতেন। উলিপুরের জমিদার স্বর্ণময়ীর নায়েব ব্রজেন মুন্সির নায়েব ১৮৮০ সালের কিছু পূর্বে এটি নিজ বসবাসের জন্য নির্মাণ করেন। বর্তমানে এটি ইউনিয়ন তহসীল অফিস হিসেবে ব্যবহ্যত হচ্ছে।

শহীদ মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতিফলকঃ এটি মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের  উপর বর্বরোচিত হামলার স্মরনে শহীদদের জন্য ১৯৭১ সালে নির্মিত।

ধরলা ব্রীজ( Dharla Bridge): বাংলাদেশ ভারত আন্তঃসীমানা নদীর নাম ধরলা। এ নদীর উপর তৈরি হয়েছে ব্রীজ। ফলে সোনাহাট স্থলবন্দর যোগাযোগ এখন সহজতর। ধরলা ওপারের উপজেলার লোকজন এখন সহজে ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে যেতে পারে।

ভিতরবন্দ জমিদার বাড়ী( Vitorbond Razbari): কুড়িগ্রাম সদর থেকে ১৬ কিলোমিটার দূরে নাগেশ্বরী জেলায় অবস্থিত। ইংরেজ আমলে ভেতরবন্দ পরগনার সদরদপ্তর ছিল রাজশাহীতে। পরে সেটি স্থানান্তর করে ভেতরবন্দে স্থানান্তর করা হয়।

চান্দামারী মসজিদ( Chandamari Mousquto):  রাজারহাট উপজেলায় অবস্থিত। একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা। তবে বর্তমানে কিছুটা সংস্কার করা হয়েছে।

নাওডাঙ্গা জমিদারবাড়ি ( Nawdanga Razbari) : একটি প্রাচীন স্থাপনা। ফুলবাড়ী উপজেলা থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।

কুড়িগ্রামে রয়েছে অনেক ঐতিহাসিক ও প্রাচীন নিদর্শন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো – নয়ারহাটে (রাজারহাট) মুগল আমলে মসজিদের ধ্বংসাবশেষ (১১৭৬ হিজরী), ভূরুঙ্গামারী উপজেলার পাটেশ্বরী বাজারের নিকট একটি পুরানো মসজিদের ধ্বংসাবশেষ(মুগল আমল), মজিদেরপাড় গ্রামের ৩ গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদ ( মোগল আমল) আরবি ভাষায় খোদিত মসজিদের শিলালিপি, জয়মনির  জমিদারবাড়ী, বিডিআর গেটে রক্ষিত পাংগা রাজ্যের ২টি কামান, নাওডাংগা (ফুলবাড়ী)পরিত্যাক্ত জমিদারবাড়ী ও মন্দির, রাজারহাটের পাঙ্গেশ্বরী মন্দির ও পাংগারাজবাড়ীর ধ্বংসাবশেষ, দাসেরহাটের ( কুড়িগ্রাম সদর) বিশালাকার কালীমুর্তি, ভিতরবন্দের জমিদার বাড়ীর সামনে মঙ্গলচন্ডী,কামাখ্যাদেবী লক্ষ্মী ও সত্যনারায়ণের বিগ্রহ এবং উলিপুরের কালী সিদ্ধেশ্বরী মন্দির।

আসুন ঘুরে যাবেন আমাদের সম্ভাবনার জেলা কুড়িগ্রাম থেকে। আমন্ত্রণ রইলো।

ছবি ও তথ্যসূত্র- নেট।

২৬১জন ২৪জন
0 Shares

১৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ