ছোটবেলা থেকেই রমেশের খুব শখ, কুকুর-বিড়াল পোষার। কিন্তু নিজের পৈতৃক ভিটেমাটি না থাকার কারণে এসব মনের শখ তার ভেস্তে যায়। তবুও রাস্তা-ঘাটে কোনও কুকুর-বিড়াল দেখলে রমেশ কাছে গিয়ে নিজ হাতে হাত বুলিয়ে আদর করে। রমেশ ছোটখাটো একটা চাকরি করে। বেতন যৎসামান্য! তবুও সবসময়ই ওদের কাছে ডাকে, খাবার কিনে দেয়, খাওয়ায়। এভাবেই রাস্তা-ঘাটে অযত্নে-অবহেলায় থাকা বেওয়ারিশ কুকুর- বিড়াল ভালোবেসে রমেশ দিন কাটাচ্ছিল। কিন্তু নিজের বাসায় রেখে মনোমত পোষতে পারছিল না। তারপরও মনের আশা কখনও বাদ দেয় না।

রমেশ প্রতিদিন নিজের কর্মস্থলে আসা-যাওয়ার সময় ছোট্ট একটা কুকুরর বাচ্চাকে ফলো করতো। কুকুরের বাচ্চাটার গায়ের রং ছিলো ধবধবে সাদা মোঝে হালকা লাল খয়েরী। দেখতে খবই সুন্দর ছিলো বিধায়, রমেশ কুকুরের বাচ্চাটাকে খুবই পছন্দ করতো। তার কর্মস্থলে আসা-যাওয়ার সময় রাস্তার পাশে থাকা দোকান থেকে দু’একটা বিস্কুট কিনে ভেঙে ভেঙে কুকুরের বাচ্চাকে খাওয়াতো। সাথে কুকুরের বাচ্চার মা কুকুরটাকেও খেতে দিতো।

এভাবে কেটে গেলো প্রায় সপ্তাহ খানেক। এর মধ্যেই  কুকুরের বাচ্চাটাকে নিজের ভাড়া বাসায় নিয়ে যাবার জন্য মনস্থির করলো। তা যেভাবেই হোক। যেই ভাবা সেই কাজ! একদিন রমেশ দুপুরবেলা টিফিন টাইমে নিজের বাসায় যাওয়ার সময় কাউকে না বলেই কুকুরের বাচ্চাটাকে একটা রিকশা করে নিজের বাসায় নিয়ে যায়। কুকুরের বাচ্চাটাকে যখন রমেশের ভাড়া বাসায় নিয়ে গেলো, তখনই নিজের সহধর্মিণীর সাথে বাঁধলো খটকা!

হিন্দু বলে কথা তো একটা কথা আছে। সেই কথাই রমেশের গিন্নীর ছিছিছি, রাম রাম, হায় ঠাকুর, হায় ঠাকুর করে শুরু করে দিলো লীলা কীর্তন! এই লীলা কীর্তনের মধ্যে রমেশ চোরের মতো ঘরে ঢুকে একটা দড়ি এনে কুকুরের বাচ্চাটিকে বেঁধে রাখলো। একটু পর সাবান দিয়ে স্নান করালো। একমুঠো ভাতের সাথে একটু মাছ দিয়ে মেখে দিলো, কুকুরের বাচ্চাটার সামনে। কুকুরের বাচ্চাটা কিছু খেলো কিছু খেলো না। বেঁধে রাখা হলো নিজ বাসার দরজার সামনে, টেলিভিশনের এন্টেনার খুঁটির সাথে। কুকুরের বাচ্চাটার নাম রাখা হলো ধলু।

রমেশের আবার প্রতিদিন দুপুরবেলা খাওয়া-দাওয়ার পর একটু ঘুমানোর অভ্যাস ছিলো। কিন্তু সেদিন আর না ঘুমিয়ে ধলুকে এভাবে রেখেই চলে গেলো নিকটস্থ বাজারে। বাজারে গিয়ে ধলুকে বেঁধে রাখার জন্য একটা শিকল কিনলো। সাথে একটা তালাও কিনলো, কিছু ভালো বিস্কুট কিনে তাড়াতাড়ি বাসায় চলে আসলো। বাসায় এসে ধলু’র গলায় শিকল লাগালো। শিকল খুঁটির সাথে পেছিয়ে তালা দিয়ে আটকে রাখলো। ধলু’র সামনে কিছু বিস্কুট ভেঙে দিয়ে নিজের কর্মস্থলে চলে গেলো।

রমেশ কর্মস্থলে যাবার সময় দেখে ধলু’র মা রাস্তার পাশে এদিক-সেদিক ছোটাছুটি, দৌড়াদৌড়ি করছিল। তা দেখে রমেশ বুঝতে পারলো যে, নিজের বাচ্চার জন্য মা কুকুরটি পাগলের মতো হয়ে এদিক-সেদিক ছোটাছুটি করছে। তা দেখে রমেশের একটু কষ্ট লাগলো ঠিকই, কিন্তু ধলুকে পোষ-মানিয়ে বড় করার ইচ্ছায় কষ্ট লাগা সত্বেও মনটাকে ঠিক রেখে নিজের কর্মস্থলে চলে যায়।

রমেশ প্রতিদিনের মতো নিজ কর্ম শেষ করে তাড়াতাড়ি চলে যায় বাসায়। ভাড়া বাড়ি গেইটের সামনে যেতেই ধলু’র কান্নাকাটি তার কানে পৌঁছল। দৌড়ে এসে ধলু’র সামনে দাঁড়ানোর সাথেই ধলু কান্না-কাটি বন্ধ করে ফেলফেল করে রমেশের দিকে তাকিয়ে লেজ নাড়তে লাগলো। একটু আদর করে হাত বুলিয়ে দিয়ে আরও কিছু বিস্কুট ভেঙে দিলো, ধলু’র  সামনে। ধলু লেজ নেড়ে নেড়ে কিছু বিস্কুট খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লো আরামে। এভাবে কেটে গেলো সারারাত। ভোরবেলা শুরু হলো ধলু’র কেঁ-কেঁ  কান্না-কাটি চিল্লা-চিল্লি।

রমেশ সাতসকালে ঘুম থেকে হুর-মুর করে উঠে একটু আদর করে আরও কিছু বিস্কুট ভেঙে সামনে দিতেই, ধলু  খেতে শুরু করলো। এই দেখে রমেশের গিন্নী রেগে-মেগে অস্থির হয়ে বলতে লাগলো, “এ্যাঁ, নিজে পায় না জায়গা, কুত্তা আনে বাগা। এই কুত্তা যেখান থেকে এনেছ, সেখানে নিয়ে ছেড়ে দিয়ে আসো। এই জ্বালা আর আমার সহ্য হবে না বলছি! এখানে আরও আরও ভাড়াটিয়াদের সমস্যা হবে। নানান কথাও হবে। তারপর ঝগড়াঝাঁটির সৃষ্টি হবে! এই বুড়ো বয়সে পরের বাড়ি ছোট একটা ডেরা ঘরে থেকে আবার কুত্তা রাখার শখ হয়েছে, না?”

গিন্নীর কথায় কান না দিয়ে রমেশ চলে গেলো নিজের কর্মস্থলে। দুপুরবেলা টিফিন টাইমে আবার এক দৌড়ে বাসায় পোঁছে গেলো। বাসায় গিয়ে শুনল পাশের ঘরে থাকা এক মহিলার সাথে ঝগড়ার কথা। কী নিয়ে ঝগড়া? ঝগড়ার সৃষ্টি ধলুকে নিয়ে! পাশের বাসার ছোট একটা মেয়ে ধলুকে দেখে ভয় পায়, তাই ঝগড়ার সৃষ্টি।

এই শুনে রমেশ সিদ্ধান্ত নিলো ঘরের সামনে আর ধলুকে  বেঁধে রাখবে না। কর্মস্থলে যাবার আগে বাড়ির পেছনে একটা কলাগাছের সাথে বেঁধে রেখে যাবে। যেই কথা, তা-ই করা হলো। রমেশ কর্মস্থলে যাবার আগে বাড়ির পেছনে ধলুকে বেঁধে রাখলো। সন্ধ্যার পর বাসায় গিয়ে শুনে ধলু’র কেঁ-কেঁ চিল্লা-চিল্লির শব্দ। আবার বাড়ির পেছন থেকে বাঁধ খুলে এনে বাসার সামনে বেঁধে রেখে কিছু খাবার দিলেই, চুপ করে খেয়ে চিৎপটাং!

এভাবে ভাড়া বাসায় রাখল সপ্তাহখানেক। এই এক সপ্তাহের মধ্যেই কয়েকবার বাড়ির আরও আরও ভাড়াটিয়াদের সাথে বেশ কয়েকবার হয়ে গেলো ঝগড়া-ঝাঁটি। কিন্তু রমেশ ধলুকে নিয়ে বাড়িতে ঝগড়াঝাটিতে কান দিচ্ছিল না। বরং সময় পেলেই রমেশ আদরের ধলুকে নিয়ে রাস্তায় ঘুরতে বের হয়, নিয়মিতই। যখন ধলুকে সাথে নিয়ে রমেশ রাস্তায় বের হয়, তখন অনেকে দেখে জিজ্ঞেস করে, “এই বিদেশি কুত্তার বাচ্চাটি কোত্থেকে এনেছেন?”

মানুষের কথার জবাবে রমেশ আর  মিথ্যা বলে না। সত্য কথাই বলে, ‘এটা বিদেশি কুত্তার বাচ্চা না, এটা এদেশি।’ একথা শুনে অনেকেই রমেশকে বলে, “দাদা আপনার নিজের বাড়ি নেই। থাকেন পরের বাড়িতে ভাড়া। এটা বরং আমাকে দিয়ে দেন।”

রমেশ কারোর কথায় কান না দিয়ে ভাবে, যতদিন রাখা যায় ততদিনই নিজের কাছে ধলুকে রাখবো। এটা ছিল রমেশের সিদ্ধান্ত। খটকা বাঁধল বাড়ির ভাড়াটিয়াদের সাথে, আর রমেশের গিন্নীর সাথে। প্রতিদিনই এই ধলুকে নিয়ে, কারণে অকারণে বাড়িতে আর নিজ ঘরে ঝগড়া করতে হয়।

এই ঝগড়া-ঝাঁটির কারণে রমেশ সিদ্ধান্ত নিলো, এভাবে এখানে ধলুকে আর রাখা যাবে না। তারচে বরং যেখান থেকে আনা হয়েছে সেখানে নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হবে। পরদিন রমেশ ঠিক তা-ই করলো। বিকালবেলা সকালের নাস্তা সেরে ধলুকে কিছু খাইয়ে একটা রিকশা চেপে রওনা হলো, নিজের কর্মস্থলের উদ্দেশে।

রমেশ যখন ধলুকে রিকশা করে রাস্তা দিয়ে কর্মস্থলে যাচ্ছিল, ধলু তখন দূর থেকে ওর মাকে দেখে শুরু করলো, কেঁউ-কেঁউ। কিন্তু রমেশ রিকশায় বসে দূরে ফলো করতে পারেনি। যখন রিকশা একটু সামনে বাড়লো, তখন রমেশ ধলু’র মা কুকুরটাকে দেখতে পেলো। সাথে সাথে রিকশা থামাতে বললে, রিকশাওয়ালা রিকশার ব্রেক চেপে রিকশা থামাল। রিকশা থামানোর সাথে সাথে ধলু রিকশা থেকে লাপ দিয়ে ওর মায়ের কাছে দে দৌড়! মা কুকুরটা নিজের বাচ্চাকে ক’দিন পর কাছে পেয়ে চাটতে লাগলো, মনের আনন্দে! ধলুও ওর মাকে পেয়ে আনন্দে লেজ নাড়তে নাড়তে মায়ের সাথে শুরু করলো আদরের খেলা। এই দৃশ্য রমেশ রিকশায় বসেই দেখছিল। কিছুক্ষণ পর ধলু ওর মায়ের সাথে খেলতে খেলতে ঢুকে পড়লো, মহল্লার ভেতরে। রমেশও রিকশা চেপে চলে গেলো নিজের কর্মস্থলে।

রমেশ সেদিন কর্মস্থলে গিয়ে আগের মতো আর কাজে মন বসাতে পারলো না। শুধু ধলু’র কথাই রমেশের মনে পড়ছিল। তারপর যখনই সময় পাচ্ছিল ধলুকে দেখার জন্য রমেশ ছুটে যাচ্ছিল দোকানের সামনে। দেখা হলেই ধলু’র জন্য বিস্কুট কিনে খেতে দেয়। সাথে একটু চা-ও মাটিতে ঢেলে দেয়, ধলু মাটি থেকে চা চেটে-চেটে খায়। এভাবে কেটে গেলো কয়েক মাস। এই কয়েক মাসের মধ্যে ধলু ছোট থেকে অনেক বড়সড় হয়ে উঠলো। একসময় ধলু’র মা কুকুরটাও মারা গেলো। মা কুকুরটা মারা যাবার পর থেকে ধলু হয়ে গেলো এতিম।

তারপর থেকে প্রায় সবসময়ই রমেশের কর্মস্থল অফিসের সামনেই শুয়ে থাকে। রমেশ যখন অফিস থেকে বের হয়, ধলুও লেজ নেড়ে সাথে সাথে হাঁটতে থাকে। ধলু জানতো যে, চা-বিস্কুট খাওয়া যাবে। রমেশও সময় সময় নিজে কিছু না খেয়ে আদরের ধলুকে খাওয়ায়। আবার অনেক সময় দুপুরে টিফিন টাইমে ধলু রমেশের সাথে বাসায়ও যায়। দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর আবার রমেশের সাথে বাসা থেকে বের হয়। এভাবে চলতে চলতে বছরখানেক গড়ালো।

একদিন দুপুরবেলা টিফিন টাইমে ধলু রমেশের সাথে বাসায় গিয়ে দুপুরে কিছু খেয়ে বাসার সামনেই শুয়ে থাকলো। রমেশ অফিসে যাবার সময় অনেক ডাকাডাকি করার পরও ধলুকে উঠাতে পারেনি। হাতে সময় নেই বলে রমেশ ধলুকে বাসার সামনে রেখেই নিজের অফিসে চলে যায়। কিন্তু রমেশের মাথায় থাকে ধলু’র কথা। কারণ, পাশের এক বড়লোকের বাড়িতে একটা কুকুর ছিলো। সেই কুকুরটা অনেকসময় ধলুকে দেখে ঘেউঘেউ করতো। এতে ওই বাড়িওয়ালার ভালো লাগতো না। এ-নিয়ে অনেকবার ওই বড়লোক বাড়িওয়ালা রমেশকে  শাসিয়েছিল, কুকুর বাড়িতে না আনার জন্য। কিন্তু রমেশ  ছিলো নিরুপায়! শত চেষ্টা করেও ধলুকে ফেরানো যাচ্ছিল   না, ধলু রমেশের সাথে তার বাসায় যাবেই যাবে। এই নিয়েই রমেশের ছিলো যতো দুশ্চিন্তা! যিদি ওই বড়লোকের বাড়ির কুকুরের সাথে ঝগড়া বাঁধে? আর যদি ওই বড়লোক আদরের ধলুকে মেরে ফেলে? এসব চিন্তার মাঝেই রমেশ অফিসের কাজ শেষে তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরে।

একদিন বাসায় গিয়ে গিন্নীর কাছে শুনে ওই বড়লোকের রাগা-রাগি ফালা-ফালির কথা। তখন রমেশ ভাবলো, ‘ধলুকে আর এখানে আনা যাবে না। যেভাবেই হোক ধলুকে দূরে কোথাও নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হবে’। যেই ভাবা, সেই কাজ!

এর পরদিনই ছিলো শুক্রবার, রমেশের সাপ্তাহিক ছুটির দিন। খুব ভোরবেলা রমেশ ঘুম থেকে উঠে ধলুকে দুটো বিস্কুট খেতে দিয়ে একটা খালি রিকশা বাসার সামনে আনার জন্য বের হলো। রিকশা নিয়ে আসলো বাসার সামনে। ধলুকে কোলে করে রিকশায় উঠে চলে গেলো শীতলক্ষ্যা নদীর পারাপারের গুদারা ঘাটে। ঘাটে গিয়ে ধলুকে নিয়ে রিকশা থেকে নামলো। সামনেই ছিলো পরিচিত চা’র দোকান। দোকান থেকে এক প্যাকেট বিস্কুট কিনে প্যাকেট ছিঁড়ে ধলুকে খেতে দিলো। ধলু মনের আনন্দে বিস্কুট খাচ্ছে।

রমেশ সামনে বসে কেঁদে কেঁদে ধলু’র মাথায় হাত বুলিয়ে বললো, ‘ধলু, তোকে ওপারে নিয়ে যাবো রে। তুই আজ থেকে ওপারেই থাকিস। আমার বাসায় আর যাসনে। তোর জন্য আমার খুবই সমস্যা হচ্ছে। আমি তোকে প্রতিদিন বিকালে ওপার গিয়ে একবার করে দেখে আসবো। তুই আমাকে ক্ষমা করে দিবি।’ এই বলেই রমেশ হাউমাউ করে ধলু’র গলা ধরে কাঁদতে লাগলো।

রমেশের এরকম কান্না-কাটি দেখে দোকানদার-সহ আরও অনেক মানুষ জড়ো হয়ে গেলো। জিজ্ঞেস করলো, “কী ব্যাপার! কী হয়েছে? কুকুরটাকে ধরে এভাবে কাঁদছেন কেন?”  ইত্যাদি ইত্যাদি।

রমেশ বললো, ‘কুকুরটাকে ওপারে নিয়ে রেখে আসবো, তাই ভালো গালছে না। এখানে ওকে আর রাখতে পারছি না। ওর জন্য আমার খুব ঝামেলা হচ্ছে।’ এই বলেই রমেশ ধলুকে কোলে করে সোজা খেয়া নৌকায় চড়ে চলে গেলো নদীর ওপারে। খেয়ানৌকা থেকে ধলুকেও নামাল, নিজেও নামলো। সামনে পারাপারের যাত্রীদের এদিক-ওদিক যাবার জন্য দাড়িয়ে থাকা রিকশা। একটা রিকশাওয়ালার কানে-কানে রমেশ বললো, ‘ভাই আমি আপনার রিকশায় উঠবো। যাবার কোনও গন্তব্য নেই। আপনি যেদিকেই যান-না-কেন, খুব দ্রুত যেতে হবে। যাতে আমার সাথে এই কুকুরটা আমাকে ধরতে না পারে।’

রিকসাওয়ালা রমেশের কথা বুঝতে পারলো। তারপর বললো, “রিকশায় উঠে বসুন।”

রমেশ ধলুকে সামনে রেখে যখন রিকশায় উঠলো, ধলুও তখন রিকশায় উঠার জন্য রিকশার উপরে ওর পা তুলে দিলো। রমেশ রিকশা থেকে ধলু’র পা ছাড়িয়ে রিকশাওয়ালাকে বললো, ‘যতো দ্রুত পারেন রিকশা চালাতে থাকুন’।

রিকসাওয়ালা প্যাসেঞ্জারের কথা শুনে ফুল স্প্রিরিটে রিকশা চালাতে শুরু করলো। ধলুও দৌড়াতে লাগলো  রিকশার পেছনে পেছনে। সামনেই একটা তিন রাস্তার মোড়। আগে থেকেই রিকশাওয়ালা বলছিল, “কোনদিকে যাবো, ভাই? ডানে না বেয়ে”?

রমেশ বললো, ‘ডানের রাস্তা দিয়ে সামনের গুদারা ঘাটে যাবেন। আমি সেখান থেকে ওপাড়ে চলে যাবো’।

রিকশাওয়ালা রমেশের কথামতো ডানদিকের রাস্তাই ধরলো। ধলুও রিকশার পেছনে পেছনে দৌড়াচ্ছিল, ধলু কিছুতেই তার প্রভুকে চোখের আড়াল হতে দিচ্ছিল না। কিন্তু ধলু’র গতিপথ রোধ করে ফেলে ওখানকারই কিছু বেওয়ারিশ কুকুর। মুহূর্তেই লেগে গেলো তুমুল লড়াই। এই লড়াইয়ে কে হারে আর কে জিতে, সেদিকে না তাকিয়ে রমেশ দ্রুত চলে গেলো নদী পারাপারের গুদারা ঘাটে। রিকশা থেকে নেমে রিকশাওয়ালাকে ভাড়া দিয়ে তাড়াতাড়ি খেয়া নৌকায় গিয়ে ওঠার সাথে সাথে ইঞ্জিন চালিত খেয়ানৌকা চলতে লাগলো ওপারের দিকে।

এবার রমেশ ফিরে তাকালো পেছনে। ঘাড় ফিরিয়ে পেছনে তাকিয়ে দেখে আদরের ধলু খেয়া নৌকার দিকে তাকিয়ে আছে। খেয়ানৌকা চলছে। রমেশও তাকিয়ে আছে ধলু’র দিকে। ধলুও তাকিয়ে আছে নৌকার দিকে। মুহূর্তে খেয়ানৌকা নদীর ওপার গিয়ে থামলে। রমেশ নৌকা থেকে নেমে অনেকক্ষণ ওপারের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ধলুকে দেখলো, আর চোখে জল মুছতে মুছতে নিজের গন্তব্যে চলে গেলো।

রমেশ নিজের বাসায় আসার পর তার গিন্নী জিজ্ঞেস করলো, “ধলুকে কোথায় রেখে এসেছো?”

বললো, ‘নদীর ওপার।”

এই কথা শুনে লোকটার গিন্নীরও মন খারাপ হয়ে গেলো। কারণ, “এই ধলুকে শীতের রাতে বাসার সামনে ধলু যখন শুয়ে থাকতো, তখন রমেশের গিন্নী ঘর থেকে ছেঁড়া কাঁথা অথবা ছেঁড়া কাপড় ধলু’র গায়ের উপর দিয়ে রাখতো। যাতে ধলু শীতে কষ্ট না করে। আজ সেই আদরের ধলুকে মানুষের যন্ত্রণার কারণে ঘরছাড়া করা হলো।”

এসব ভেবে রমেশকে গিন্নী শান্তনা দিয়ে বললো, “তুমি প্রতিদিন একবার করে নদীর ওপারে গিয়ে ধলুকে দেখে এসো। আর কিছু খেতেও দিও”।

গিন্নীর কথা শুনে রমেশ না শোনার ভান করে বিছানায় ঘুমিয়ে পড়লো। সারাদিন কেটে গেলো। কিছুই খাওয়া হয়নি রমেশের। সন্ধ্যার একটু আগেই ধলু রমেশের বাসায় এসে হাজির। ধলুকে দেখে রমেশের গিন্নী আনন্দে চিৎকার করে বলে উঠলো, “দেখো দেখো গো তোমার ধলু চলে এসেছে”।

গিন্নীর চিৎকার শুনে রমেশ ঘর থেকে দেখে, ঠিকই তো ধলু নদী সাঁতরে চলে এসেছে।

রমেশ তার গিন্নিকে বললো, ‘কী আর করা, চলে যখন এসেছে-ই, ওকে আগে দুমুঠো ভাত দাও’।

রমেশের কথা শুনে তার গিন্নী দুমুঠো ভাত মেখে দিলো, ধলু’র সামনে। ধলু খুব আরামে খেয়ে-দেয়ে বাসার সামনেই শুয়ে থাকলো। রাতে রমেশ ভাবে, ‘সকাল হলেই আবার ধলুকে নদীর ওপারে নিয়ে যাওয়া হবে। যেই ভাবা সেই কাজ! সকালবেলা আবার ধলুকে নিয়ে নদীর ওপারে নিয়ে ধলুকে রেখে খুব কষ্ট করে, ধলু’র চোখে ফাঁকি দিয়ে,  রমেশ নদী পাড় হয়ে নিজে কর্মস্থলে চলে আসে। সেদিন আর ধলু নদী সাঁতরে নদী পাড় হয়ে আসেনি। ধলু ওপারেই থেকে গেলো। পরদিন রমেশ নিজেই নদীর ওপারে গেলো, ধলুকে দেখতে। রমেশ খেয়ানৌকা থেকে নামার আগেই দেখে, ধলু গুদারা ঘাটেই বসে আছে, খেয়া নৌকার দিকে তাকিয়ে। খেয়ানৌকা থেকে রমেশ নামার সাথে সাথে ধলু রমেশের সামনে এসে ঘেউ-ঘেউ শুরু করে দিলো।

রমেশ ধলুকে নিয়ে ঘাটের উপরে গিয়ে ধলুকে দুটো পাউরুটি কিনে দিয়ে আবার চলে এলো নিজের গন্তব্যে। পরদিন আবার যখন ধলুকে দেখতে নদীর ওপারে যাবার জন্য গুদারা ঘাটে গেলো, দেখে ধলু ওপারেই বসে আছে রমেশের আশায়। রমেশ খেয়া নৌকার মাঝিদের জিজ্ঞেস করলো, ‘ভাই এই কুকুরটা কীভাবে এপার এলো?’

মাঝিরা বললো, “দাদা, কুকুরটা তো পারাপারের গুদারা নৌকা দিয়েই পাড় হয়েছে। ও যখন গুদারা নৌকায় উঠে বসে, কেউ ওকে নামাতে পারে না। বাধ্য হয়ে খেয়া নৌকার মাঝিরা ওকে নিয়েই এপারে আসে। আর সবাইত জানে যে, এটা আপনার পালা কুকুর। তাই কেউ কিছু বলে না। আপনার কুকুরও কাউকে কিছু করে না”।

মাঝিদের কথা শুনে রমেশ একটু শান্তি পেলো। ধলুকে ওখান থেকেই কিছু খাবার কিনে ধলু’র সামনে দিয়ে তার গন্তব্যে চলে গেলো। এরপর থেকে ধলু এপার-ওপার দুপারেই থাকতে থাকলো। এভাবে কেটে গেলো প্রায় ছ’মাস। কিন্তু ধলু রমেশের বাসায় আর যায় না, দুপারের গুদারা ঘাটেই থাকে।

একদিন রমেশ সপরিবারে নিজের এক আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে যায়। সেখানে কেটে গেলো প্রায় ১৫ দিন। ১৫ দিন পর নিজ এলাকায় এসেই তার গিন্নীকে বাসায় পাঠিয়ে দিলো। রমেশ  চলে গেলেন গুদারা ঘাট, ধলুকে দেখতে। গুদারা ঘাট গিয়ে এদিক-ওদিক ঘুরে ধলু ধলু বলে যখন ডাকছিল, তখন গুদারা ঘাটের দোকানদার-সহ ঘাটের নৌকার মাঝিরা বললো, “দাদা, আপনার কুকুর তো  দুইদিন আগে মারা গেছে। মারা যাবার তিন-চার দিন যাবত কিছুই খায়নি। আমরা অনেকেই অনেককিছু কিনে ওর সামনে দিয়েছিলাম, কিন্তু ও কিছুই খায়নি। শুধু আপনার আসার রাস্তার দিকেই তাকিয়ে থাকতো। কুকুরটা মারা যাবার পর আপনার জন্য আমরা প্রায় একবেলা অপেক্ষা করেছিলাম। কিন্তু আপনার দেখা না পেয়ে অবশেষে কুকুরটাকে আমরা কয়েকজন মিলে একটা নৌকা করে নদীর মাঝখানে ফেলে দিয়েছি”।

গুদারা ঘাটের মাঝিদের কথা শুনে রমেশ চোখের জল ফেলতে ফেলতে বাসায় ফিরে আসলে, তার গিন্নী ধলু’র কথা জিজ্ঞেস করলো, “ধলুকে দেখে আসলে? কেমন আছে, ও”?  রমেশ কেঁদে কেঁদে বললো, ধলু আর নেই! ও তিন-চার দিন আগে মারা গেছে’।

একথা বলে যখন কাঁদতে লাগলো, তখন বাসার আরও আরও ভাড়াটিয়ারা বলতে লাগলো, “ওহ্, এই কারণেই কুকুরটাকে দেখি না। ক’দিন আগেও তো এসেছিল।আসতো তো প্রতিদিনই। আপনারা যেদিন বেড়াতে গিয়েছিলন, তারপর দিন থেকে প্রতিদিন সকালে একবার, বিকালে একবার করে বাসায় আসতো। অনেকক্ষণ বাসার সামনে শুয়ে-বসে থেকে আবার কোথাও চলে যেতো। কিন্তু গত দিন চারেক আগে থেকে আর বাসায় আপনাদের  কুকুরটা আসেনি”।

ভাড়াটিয়াদের মুখে এসব শুনে রমেশ বুঝতে পারলো, আদরের ধলু তাকে দীর্ঘদিন না দেখে শোকে, না খেয়ে আর মনে কষ্ট নিয়েই শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছে। রেখে গেছে ভালোবাসার কিছু স্মৃতি আর কিছু কথা। সৃষ্টি করে রেখেছে এক ভালোবাসার গল্প।

১০১জন ১৩জন
0 Shares

৭টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ