সোনেলা দিগন্তে জলসিড়ির ধারে

কিশোর গল্প বগা ভাই ও আমরা (১ম পর্ব)

আতা স্বপন ১০ এপ্রিল ২০২০, শুক্রবার, ১২:৫৪:৪১অপরাহ্ন গল্প ১২ মন্তব্য

 

এক.


পুরোনো জমিদার বাড়ীর আমগাছ তলায় আড্ডা দিচ্ছিলাম আমরা কয়েকজন। আমরা বলতে আমি লিটু আর পল্টু। আমাদের এই আড্ডা সবসময়ে বসে। স্কুলে যাবার আগে এই জায়গায় আমরা কিছুক্ষন সময়কাটাই। আমাদের এই আড্ডার লিডার হলেন বগা ভাই। লিকলিকে চেহারা আর হাড্ডিসার শরিরের জন্য তাকে নববর্ষের খেতাবি নাম দেয়া হয় বগা। এই নামের মাঝে তার আসল নাম কবে হাওয়া হযে বঙ্গোপসাগর পারি দিয়েছে তা কেউ বলতে পারেনা। অসম্ভব চাপাবাজ আমাদের এই বগা ভাই। বয়সে আমাদের থেকে ৫/৬ বছরের বড় হবে। কিন্তু পরেন আমাদের সাথে ক্লাস নাইনে। তাই আমরা তাকে খুব সমিহ করে চলি। একটু আদব লেহাজ দেখিয়ে কথা বলি।

আমাদের আলোচনার মধ্যমনি বগা ভাই এখনো আমাদের মাঝে এসে উপস্থিত হননি। তাই আড্ডা তেমন জমছিলনা। তাই সবাই যার যার মত বাড়ী যাওযার জন্য প্রস্তুত হচ্ছি, ঠিক তখনই দেখা গেলো হাতে বইযের মত কি একটা নিযে ৮ ও ৯ এর নামতা পড়তে পড়তে বগা ভাই এদিকে আসছেন। পড়াশুনায় তিনি বড়াবড়ই একটু কাচা। বিশেষ করে অংকের ক্লাসে, একটা সাধারণ গুন অংক করতে দিলে তিনি কলমের মাথা কামড়ানো শুরু করেন। যার অর্থ এটা তিনি পারবেন না। কোন কিছু না পাড়লে বগা ভাইয়ের একটা বদ খাছিলত হল কলম কামড়ানো। অংক স্যার ধীরেন বাবু তাই তাকে বেশী বেশী নামতা পড়তে বলেছেন। সব নামতাই তার মুখস্থ হয়েছে তবে ৮ আর ৯ এর নামতা তার কিছুতেই মুখস্থ হতে চায় না। কিন্তু বগা ভাই ছাড়বার পাত্র নয় তিনি ঠিক করেছেন সবসময় হাটাচলা উঠাবসায় এই নামতা আওরাবেন। আর এভাবে একদিন তার নামতাদ্বয় মুখস্থ হয়ে গেল। কিন্তু নামতা পড়াটা তার মুদ্রাদোষে পরিনত হয়েছে। এখনো হাটাচলার সময় মাঝে মাঝে নামতা পড়তে থাকেন। আমাদের বগাভাই একটি গুনের কথা বলা হয়নি তিনি কিন্তু একজন ছড়াকার। অংক স্যার ধিরেন বাবুকে তিনি নামতার উপর একটি ছড়া লিখে দেখান- ছড়াটি এরকম

আট এর নামতা খুব ভাল
নয় এর নামতা মুখস্থ হল
পড়তে লাগে দারুন মজা
নামতা জানলে গুন সোজা।
এইহেন বগা ভাই হাজির হলেন আমাদের মজলিসে। কিন্তু আগের মত কথা তেমন বলছেননা। কি যেন চিন্তা করছেন।


আমি বললাম, আজ এত দেরি করলে যে? খানিক পড়েইতো স্কুলে যেতে হবে।
তোর কাছে মনে হচ্ছে কৈফিয়ত দেওয়া লাগবে। রেগে গেলেন বগা ভাই|
তোমার এই অভ্যাসটা কবে থেকে হলো? হঠাত করে রেগে যাও। পাসে বসে থাকা লিটু বলল।
কি আমি রাগি! আমি যদি রাগি হই তোরা কি? তোরাত হলি, তোরাত হলি রাগি২(রাগি স্কযার)।
পরিস্থিতি অন্যদিকে চলে যাচ্ছে দেখে বললাম, আপাতত এচাপ্টার ক্লোজ। তা বগা ভাই ধুমছে পড়াশুনা করছ মনে হয়। হাতে বই নিয়ে ঘুরছ।
আরে গবেট এটা বইনা, এটা হল ডয়েরী। এটাতে সবাই তার স্মরনীয় ঘটনা লেখে। এ্যনাফ্রাংক নামে একটি ছোট্ট মেয়ে ডায়েরী লিখে বিখ্যাত হয়েছিল। ভাবছি এটাতে আমি আমার স্মরনীয় ঘটনাগুলো লিখে ফেলবো। তখন সবাই এ্যানাফ্রাংকের কথা বেমালুম ভুলে আমার প্রসংসা করবে।

তোমার ডায়েরীও তখন খুব বিখ্যাত হবে তাই না। লোকে বলবে বগা মিয়ার ডায়েরী হি-হি-হি। ফোরন কাটলাম আমি।

বগ মিয়ার ডাযেরী নামটা একদম বেগডেটেড। বগা ভাইয়ের ডাযেরীর নাম হবে দ্যা ডায়েরী অব বগ খানা। বলল লিটু।
রাখ তোদের ফাউল পেচাল। মিয়া আর খান দিয়ে কোন ডায়েরীর নাম কখনো শুনেছিস। আমার ডায়েরীর নাম হবে মি: বগা এন্ড হিজ ডায়েরী।
ঘাপটি মেরে বমে থাকা পল্টু এতক্ষনে মুখ খুলল- তা তুমি জীবনের কোন স্মরনীয় ঘটনাটা লিখবে বলে ঠিক করেছ। ঐ যে, চেয়ারমেনের বাড়ীতে আম চুরি করতে গিয়ে উত্তম-মধ্যম খাওয়ার ঘটনাটা বুঝি।
রেগে মেগে লাল হয়ে বগা ভাই বললেন, গুরুজনের সাথে বেয়াদবী করবিনা। গুরুজনের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় আগে শিখ তারপর কথা বলবি গবেট। আমার মেধাটা নেহায়েত কম তাই তোদের মত অকালকুষ্মান্ডদের সাথে পড়ছি।
সরি । রাগ কর না। আমার ভুল হয়েছে। মাফ চাইল পল্টু।
আমি রাগ করি নাই। যা বলেছি খাটি কথাই বলেছি। তোদের সাথে না পড়লে, এতো দিনে আমি বি.এ- এম.এ পাশ করতাম।
একটা ডক্টরেটও নিতে, তাই না। ফোড়ন কাটল লিটু।
আবারও ইয়াকি । কিল মেরে তক্তা বানিযে ফেলব।
বগা ভাইযের হাতুরি কিল যে খেযেছে সে বুজেছে বছর কয় দিনে যায়। তাই সে কিলের ভয়ে তখনকার মত চুপসে গেলাম আমরা। সেবার পাশের গ্রামে ফুটবল খেলা দেখতে গিয়ে ঝগড়া বাধল। সে সময় বগা ভাই গদা নামের একটা ছেলেকে এমন কিল মেরেছিলি যে, সে আর হেটে বাসায় যেতে পারেনি।
তোদের মত হা ভাতেদের সাথে বসে বেহুদা সময় নষ্ট করতে আমি আর নাই। বাসায় বসে কবিতা লিখব। তোদের মত গাধাদের সাথে আড্ডামারার চেয়ে কবিতা লেখা অনেক ভাল।
তুমিতো লেখ কু-বিতা। কবিতা লেখবে তুমি । একটু তাচ্চিল্যের ভংগিতে বলল লিটু।
আমিই। তোরা ভাবিস আমি কবিতা লিখতে পারিনা। দেখবি এবার, এমন কবিতা লিখব, শেখ সাদী যদি থাকত সেও শুনে ভিমড়ী খেত।
ভাগ্যিস শেখ সাদি বেচরা বেচে নেই। তা না হলে………………..। আবারো ফোড়ন কাটতে যেযে জিভে কামড় দিল লিটু।
রাগতে গিয়েও রাগলেন না বগা ভাই।
আমি বললাম , তোমার কবিতার জবাব নাই। এইতো সেদিন লিখলে-

খেয়ে মুরগির ঠ্যাং
আরো খেয়ে ব্যঙ
করি ঘ্যাংর ঘ্যাং|
আদতে বগা ভাই এমন কবিতা লিখেনি। তাকে খেপানোর জন্য এট আমার আবিস্কার|
দেখ আমি ঠ্যাং -ব্যঙ দিয়ে কবিতা লিখিনা।

তা হলে কিভাবে লিখ? সমস্বরে জানতে চাইলাম আমরা।
শুন তাহলে (ডায়েরী খুলে পড়তে লাগলেন)-

আমি হব দুর আকাশে পাখি
দুর দুরান্তে উড়ে যাব
পড়ায় দিব ফাকি।
চেয়ারমেনের আম বাগানে
বসতাম গিয়ে উড়ে
ডাসা ডাসা আম খেতাম
এই পেটটা ভড়ে।

কবিতাটি শুনে আমাদের টাসকি লাগার যোগার। নজরুলে কবিতার কবিতার ১২টা বাজিয়েছে বগা ভাই। বগা ভাইকে আর রাগাতে চাইলাম না। আহলাদে গদগদ ভাব নিয়ে বললাম, খুব ভাল হয়েছে তোমার কবিতা।
কবিতাটি শুনে আমার পাখি হযে উড়ে যেতে ইচ্ছে করছে। আহা। প্রানটা জুড়িয়ে গেল। ফের ফোড়ন কাটল লিটু।
আমাদের বিটলামি বগা ভাই ধরতে পারলেন না। উল্টো বুক ফুলিয়ে গর্বকরে বললেন, ভাল হবে না আবার, দেখতে হবেতো কে লিখেছে।
এমন দাম্বিকতা দেখে মনে মনে বললাম, ছাই হয়েছে তোমার কবিতা। ঠিক যেন দোকানের পচা সন্দেশ। ভাগ্যিস বগা ভাই শুনতে পায়নি।
এখন তাহলে যাই। এখানে অনেক সময় নষ্ট করলাম। চলে গেলেন বগা ভাই।
কিন্তু গেল আর কোথায়! কিছুদুর যেয়ে আবার ফিরে আসলেন।
তোদের জন্য একটা সুখবর আছে। ফাউল পেচালের জ্বালায় সেটাই বলা হয় নাই।
তা সুখবরটা কি বলবেত! সমস্বরে বললাম আমরা।

চেয়ারমেনের বাড়ীতে আসার সময় দেখলাম প্যান্ডেল টাঙ্গীয়ে বিশাল আয়োজন চলছে। কাছে রামলাল মালিকে দেখে জিজ্ঞাসা করতেই বলল, আজ ছোট সাহেবের জম্ম দিন। ছোট সাহেব তোমাদের দাওয়াত দিছে।
কি বগা ভাই! আজ হাসানের জম্মদিন!
তাহলে আর বলছি কি ! এই কথাটাই তোদের বলার জন্য ছুটে আসলাম।
এত বড় একটি জম্পেস খবর আগেতো দিবে। বলল লিটু।
সেই সময আর তোরা দিলি কই। শুরু করিল ফাউল পেচাল।
আমি বললাম, আহা কি আনন্দ। দাওয়াত মানে মজার মজার খাবার। তা কি খাওয়াতে পারে বলে তোমার মনে হয়?
তার আমি কি জানি। আমি কি গণক। ভালই খাওয়াবে, চেয়ারমেনের বাড়ীর একটা ইজ্জত আছে না। বগা ভাইয়ের উত্তর।
লিটু বলল, জম্মদিনে যা খাওয়ায় তাই খাওযাবে। কেক, কলা, মিষ্টি, দুই, সন্দেশ……….। আরে থাম থাম আর বলিস না, জিভটা এখনই টস টস করছে। | (পল্টু জিভ থেকে লালা পরার এমন একটি ভঙ্গি করল যে,আমরা না হেসে পারলাম না ) ।
কিন্তু হাসানরা যা বড়লোক। যদি আমাদের তিন দিনের পচা রসগোল্লা আর বাসি কেক খেতে দেয়, বিরাট অপমান হবে। বড় লোকেরা তাদের চেয়ে নিচুদের পাত্তা দেয় না। সন্দেহ মনে বলল পল্টু।

কি বলছিস পাগলের মত। আমাদের পচা আর বাসি খাওয়াতে যাবে কোন কারনে। শত হলেও আমরা হাসানের ক্লাসমিট। বলল লিটু।
যাই বলিস তোরা জেনেশুনে ডাইরিয়া বাধাতে আমি চাই না। সারাদিন বদনা নিয়ে বাথরুমে দোরাতে হবে।
(পেটের মধ্যে হাত দিয়ে পল্টু এমন একটা ভঙ্গি করে কথাগুলো বলল যে, আবার আমরা হো হো করে হেসে উঠলাম।)

বগা ভাই এতক্ষন চুপ করে আমাদের কথা শুনছিলেন। একসময় বিরক্ত হয়ে বললেন, রাখ তোদের বাজে পেচাল। যতসব আজেবাজে চিন্তা। আমি সরেশ সন্দেশ, জিলেপি, নিমকি আর রশগোল্লার কথা আর ওনারা আছেন পচা আর বাসি নিয়ে। এই পচা বাসি করতে করতে তোরা লাইফটাই পচা করে দিবি। তারচেয়ে খাবার এর উপর একটা কবিতা লিখেচি শোন-

যদি ঠিক রাখতে চাও স্বাস্থ
মুরগী খাও আস্ত
আরও খাও কালিয়া কাবাব
বিরানী হলে নেইতো জবাব।
বেশী বেশী খেয়ে যাও
পেট না ভড়লে জীবন ফাও।
সরেশ খাবার বেশী খাও
পচা বাসী ছেড়ে দাও।

দুই.
বিকেলে আমরা রওনা হলাম চেয়ারম্যন বাড়ীর উদ্দেশ্যে। পথে দেখা হলো অংক স্যার ধিরেন বাবুর সাথে। স্যারকে দেখে বগা ভাই গাছের আড়ালে লুকালো। কারন তিনি আজ কবিতা লেখার জন্য স্কুল কামাই দিয়েছেন। স্যারের যা রাগ একটা ধমক দিলেই পেচ্ছাব হয়ে যাবে।

কোথায় যাচ্ছিস তোরা?
আমি বললাম, নিমন্ত্রন খেতে। ঐ জমিদার বাড়ীতে।
ভাল! ভাল! খুব ভালো। তা তোদের নাটের গুরু বগা কোথায়?
ওনি গাছের আড়ালে। ডাক দিবো স্যার?
ডেকে নিয়ে আয়।
আমি বগা ভাইকে ডাকতে গিয়ে দেখি তিনি গাছের আড়ালে দাড়িয়ে দাড়িয়ে বিরবির করে বলছেন-

স্কুল ফকি দিবনা
আল্লাহ তুমি বাঁচাওনা।
নামাজ আর রোজা
আর না হবে কাজা।


স্যার হাক দিলেন আবার। কইরে বগা।
আমি এইখানে! গাছের আড়াল থেকে কাচুমাচু করে বের হলেন বগা ভাই।
ঐ খানে কি করছিলি বেয়াকুব।
না মানে ইয়ে ইয়ে করছিলাম স্যার! তোতলাতে লাগলেন।
বুজেছি। তোকে আর ইয়ে ইয়ে করতে হবে না। স্কুলে যাসনি কেন?
না- মানে পেট ব্যথা।
ও বুজেছি! পেটের অসুখ বাজিয়েছিস। যা বাসায় যা। তোকের আর নিমন্ত্রন খেতে যেতে হবে না। বড় কোন অসুখা বাজিয়ে ফেলতে পারিস।
এই কথা শুনে বগা ভাইয়ের মুখ ইদুর মুখের মত হয়ে গেল। সিচিউশেন অন্যদিকে মোড় নিচ্ছে দেখে আমি বললাম, না স্যার আসল কথাটা হলো বগা ভাইয়ের পেটে ব্যাথা নয়। পেটে ব্যথা হলো ওনার আম্মা জানের। সারাটা সময় মায়ের পাশে থেকে মায়ের সেবা করেছেন তো তাই স্কুলে যেতে পারেন নি। নিজের মিথ্যাকথা বলার দক্ষতা দেখে নিজেই বিস্মিত হলাম।
ও তাহলে আজ এ কারনে স্কুলে যায়নি? তাই না।
বগা ভাই বললেন, হ্যাঁ স্যার।
দেখ আমার সাথে মিথ্যাকথা একদম বলবিনা। মিথ্যা বলা মহা পাপের কাজ। আমি এইমাত্র বগাদের বাসা থেকেই আসলাম। এখন যেখানে যাচ্ছিস যা। ক্লাসে এর মজা হারে হারে টের পাবি। কত বড় সাহস আমার সাথে চাতুরী। চাতুরী কত প্রকার ও কি কি ডান্ডা মেরে বুঝিয়ে দেব।
রাগে গজরাতে গজরাতে ধিরেন স্যার চলে গেলেন। সবাই স্বস্থির নিশ্বাস ফেললাম।
ক্লাসে যা হবার হবে। এখন চল নিমন্ত্রন খেয়ে আসি। বললেন বগা ভাই।
আমি বললাম, আমার দারুন ভয় করছে। স্যার কে ক্ষেপানো ঠিক হয়নি।
এতই যদি ভয়!মিথ্যা বলতে গেলি কেন? মুখ ভেংচিয়ে লিটু বলল।
তখন আমি কি আর জানতাম স্যার বগা ভাইদের বাসায় গেছেন।
এখন আর চিন্তা করে লাভ নাই। আল্লাহ কপালে দুভোগ রাখলে ঢেকায় কার সাধ্য।
এতক্ষনে একটা রাইট কথা বলেছিস। সবই কপাল! চল চল দেরি হয়ে যাচ্ছে। তারা দিলেন বগা ভাই (ছন্দে ছন্দে)।

পরে যা হোক হবে
তাই ভেবে কি তরুন দল
চুপটি করে রবে?
আমাদের নাই ভয়
আমরাই আতংক
সারা পাড়াময়।

জ্বালাময়ি কবিতার গুনে আমাদের সব ভয় চলে গেল। আমরা রওনা দিলাম বড় রাস্তা ধরে চেয়ারম্যন বাড়ীর উদ্দেশ্যে। হঠাত কি একটা দেখে পল্টু থেমে গেল।
কিরে থামলি কেন? বললাম আমি।
সামনে দেখ!
কি দেখব?
আরে ভাল করে দেখনা (বিরক্ত হয়ে পল্টু বলল)
আমাদের সবার দৃষ্টি তখন সামনে পড়ে থাকা একটি কাল বস্তুর উপর গিয়ে পরল।
কি ওটা? জানতে চাইলাম আমি।
লিটু বলল চুপ চুপ ওটা একটা পিস্তল।


সে পিস্তলটি হাতে তুলে নিল। ঠিক তখনই পিছন থেকে একটা লোহার মত শক্ত হাত এসে ছো মেরে পিস্তলটা নিয়ে নিল।
পোলপান এইসব ধরেনা। বরই বিপদজনক যন্ত্র এইটা, বুজছ।
কিরে মাইংকা মালটা পাইছস?(চাদরে সারা শরির জড়ানো অর্ধমুখ ঢাকা একটা লোক দেৌড়ে এল)
হ ওস্তাদ পাইছি।
কতবার তোরে কইছি এইসব জিনিস সামলাইয়া রাখতে হয়। বেকুবের মত কাম কইরা কোনদিন যে আমাগরে লালদালানে ঢুকাইবি হেইডাই ভাবতাছি।


মুহুর্তেই দুটো লোক কোথায় যেন হাওয়া হয়ে গেল। আগণ্তক যুগলের এহেন আবির্ভাব আর প্রস্থানে আমরা ভেবাচেকা খেয়ে গেলাম। এতটা ঘাবরে গেলাম যে, কেউ কোন কথা বলতে পারলাম না।
কিরে কি বুঝলি? নিস্তব্দতার দেয়াল ভেঙ্গে প্রথম কথা বললেন বগা ভাই।
বুঝা বুঝির কিচ্ছু নাই এইখানে‍! এরা হইল খুনে ডাকাত। বলল লিটু্।
আবার ছদ্মবেশী ডিটেকটিভও হতে পারে!
বগা ভাই বললেন, তোদের বকবকানি একটু থামা। এরা ডিটেকটিভ না! তবে ডাকাত- ফাকাত হইতে পারে। দেখলিনা লাল দালানের কথা বলল।
লাল দালান! এটা আবার কোথাকার দালান! বললাম আমরা।
লাল দালান চিনলিনা তোরা। যত সব গবেটের দল। লাল দালান হল গারদ। যারে বলে জেলখানা।

লাল দালান এমন দালান
চৌদ্দ শিকের ঘর
সেখানে থাকে বান্ধা
যত চোর ছেচ্চর।

তিন.
চেয়ারম্যান বাড়ীর সদর দড়জায় রামলালের সাথে দেখা হলো আমাদের।
তোমারা আইয়া পড়ছ। খুব ভাল এই গেইট দিয়া সোজা ঢুইকা যাও।


আমরা সবাই হুরমুর করে ভিতরে ঢুকলাম। কিন্তু আমাদের হঠাৎ থেমে যেতে হলো। মনে যে আনন্দ ছিল তা মিইয়ে যেতে চাইল। পা কাঁপতে লাগলো ঠক ঠক করে। আমাদের এত কাপাকাপির কারন হলো চেয়ারম্যান সাহেবের কুকুর দ্বয়। জিমি আর টমি। এ দুই চিজকে আমরা জমের মত ভয় করি। এরা হলো এলশেশিয়ান ডগ। সাংঘাতিক ভয়ংকর। অপরিচিত মানুষ একদম সহ্য করতে পারে না। গ্রামের ছেলেদের দেখলেই তেরে আসতে চায়। বড়ই বদ।

চেয়ারম্যান সাহেবের একটি বড় আমবাগন রয়েছে। গ্রামের ছেলেরা প্রায়ই আম চুরি করে বাগান থেকে। একবার বগাভাই আমচুরি করতে গেলো। আর যায় কোথা ধরা খেল রামলালের হাতে। তারপর উত্তম মধ্যম। আমাদের লিডার এ হেনস্থা আমাদের সহ্য হলো না। আমরা তখন পরের রাত্রিতে আমবাগানে অভিযান চালালাম। একরাতে সব আম সাবরে দিলাম। আর রামলাল মালিকে গাছের সাথে বেঁধে তার গায়ে লাল পিপড়ে ছেড়ে দিলাম। এই ঘটনার জের হিসাবে আমাদের পিতা মাতার হাতে আমাদের ধোলাইটা কেমন হয়েছিল তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। যাই হোক বাগান রক্ষনা বেক্ষন মালী রামলাল একা সামল দিতে না পাড়ায় অবশেষে চেয়ারম্যান সাব এই হিংস্র দানব দুটি আমদানি করেছেন। এরপর থেকে বাগানে চুরি টুরি বন্ধ।

এই কুত্তা চিল্লাস কেন? সর সর! আমরা চোরও না ডাকাতও না। নেমন্ত্রন খেতে এসেছি। বলল পল্টু।
কুকুর কি আর এতো শত বুঝে বুঝে শুধু ঘেউ ঘেউ। কুকুর গুলো যদিও শিকলে বাধা ছিল তবুও ওদের চিৎকার শুনে
আমাদের আত্মা খাঁচা ছাড়ার যোগাড়।
পল্টু আবার বলল, এই কুত্তারগুষ্টি চিল্লানি বন্ধ করলি। না লাথ্থি দিব।
বগা ভাই মুখে যতই হাতি ঘোড়া মাছি মেরে শেষ করুন না কেন। ভিতুর ডিম একটা। তিনি এমন ভয় পেলেন যে চিৎকার করে বিলাপ করতে লাগলেন ছড়ায় ছড়ায়-

কেন এসেছি এই কুত্তার আখরায়
পৈত্রিক প্রানটা এখন বুঝি যায়।
খাইতে চাইনা সরেষ খাবার
খাইতে চাইনা বিরানী
প্রানটা বাঁচলে আল্লার নামে
ছাগল দিমু কোরবানী।

বগা ভাইকে ভয় পেতে দেখে আমি বললাম, আরে এতো অস্থির হওয়ার কি আছে? দেখছোনা সোনার চানরা শিকলে বান্ধা।
বান্ধা আছে তো তাতে কি? যেইভাবে লাফঝাপ মারছে তাতেতো মনে হয় শিকল ছিইরা ফেলব। বলল লিটু।
আমাদের চিল্লাফাল্লা শুনে রামলাল ছুটে আসল।
কি হইল! অখনো ভিতরে যাও নাই! অ বুজছি! কুত্তারে ডরাও। ভগবানের সৃষ্টিরমধ্যে মানুষ হইল সেরা জীব। সেরা জীব হইয়া কুত্তার মত নিচা জানোয়াররে ডারানি ঠিক না।
বেটায় দার্শনিক হইছে। আমরা আছি বিপদে আর এই গবেট দর্শন কপচায়। দর্শন ওর পাছার ভিতরে….. । কথাগুলো বিরবর করে বললাম আমি।
বগা ভাই অবশ্য বললেন, না! না! কুকুর টুকুররে ভয় পাওয়ার কি আছে? তবে কামর দিলেই তো সিউর জলাতংক।
নাভীর চারদিকে চৌদ্দটা ইনজেকশন। ওরে বাবা! কি সাংঘাতিক। বলল লিটু।
বেশী ডরাইওনা ! ডরাইলে ডরে ধরে বুজলা! যাও যাও ভিতরে যাও। আবারো দার্শনিকের মতো ভাব নিয়ে তারা দিল রামলাল।
রামলালের কথা মত আমরা যখন ভিতরে যাচ্ছিলাম তখনই ঘটল ঘটনাটা!
আমরা দেখলাম জিমি আর টমি আমাদের দিকে পাগেলের মতো ছুটে আসছে। কিভাবে ওরা শিকল থেকে মুক্ত হলো এই কথা ভাবার সময় কারো নেই। ওদোর হিংস্রতা থেকে বাঁচতে যে যেদিকে পারলাম মারলাম ভোঁ দৌড়।


পল্টু বলল জম্মদিন চুলোয় যাক। বাঁচলে কত জম্মদিন খাওয়া যাবে। দৌড় দে জোড়ে দৌড় দে।
আমরা প্রান পনে দৌড়াচ্ছি। কুকুর দুটি পেছনে লেগে আছে আঠার মতো। একসময় কুকুর দুটি আর দেখা গেল না। আমরা হাফ ছেরে বাঁচলাম। কিন্তু সবাই আছি আমরা বগা ভাই কোথায়? কোথায় বগা ভাই? হন্যে হয়ে বগাভাইকে খুঁজতে লাগলম আমরা।

(চলবে)

৪০২জন ২৫৪জন
0 Shares

১২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য