কিছুক্ষন ট্রেনে

রোকসানা খন্দকার রুকু ৩০ ডিসেম্বর ২০২১, বৃহস্পতিবার, ০৬:৫৮:০৩অপরাহ্ন গল্প ৭ মন্তব্য

ঢাকা টু কুড়িগ্রাম আন্তনগর ট্রেন তখনও চালু হয়নি। এর আগে ঢাকা রংপুর থেকে যাওয়া যেত। তবে কুড়িগ্রাম থেকে ঢাকা যাওয়ার সর্ট- কাট উপায় ছিল।

সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা নাগাদ একটা বগি লেংটি সাপের মতো হেলে-দুলে এসে লোকজন ভরিয়ে নিয়ে পার্বতীপূর যেত। সেখানে অজগর সাইজের ট্রেনের সাথে এক হয়ে তারপর ঢাকা গমন।

কোন কোন সময় পার্বতীপূর না পৌঁছাতেই বগীটি নষ্ট হয়ে যেত। সেদিনকার মতো আর ঢাকা যাওয়া হতো না। কোন এক কারনে রেলের সবচেয়ে ফেলনা বগীটাই নামকাওয়াস্তে এ এলাকায় দেয়া হয়েছে। গরীব এলাকার এটাই সমস্যা। সব দিকে তাকে আরও গরীব করে রাখা হয়।

সেবার আমার ট্রেনের সাওয়ারী হবার নিদারুণ শখ হলো। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা নাগাদ গিয়ে বসে আছি। শীতের রাত, গরীব এলাকায় শীতও বেশী। আঁশে পাশে কমদামী ফাটা- কোম্পানী যাকে বলা হয়। সেসব শীতের কাপড় বিক্রি হচ্ছে।

উৎসুক জনগন যারা উপস্থিত সওয়ারী হতে, তারা কিনছে। কারন দশটাতেও ট্রেনের বগিটির কোন খবর নেই। অবশেষে জানা গেলো, আসার সময় বগীটি নষ্ট হয়েছে। মনটা খারাপ হয়ে গেলো।

এই এলাকায় বাইরের মানুষ, যাঁরা চাকুরী, ব্যবসাসহ বিভিন্ন সুবাদেই থাকেন। বগীটি না আশায় অনবরতই তাঁরা কুড়িগ্রামের লোকের নানা কুৎসায় ব্যস্ত।আজকের ট্রেনের এ অবস্থার জন্য এ এলাকার লোকই দায়ী। কারন এ এলাকার অশিক্ষিত, গরীব, ছোটলোকরা সঠিক ভাড়া দেয়না বলেই ভালো ট্রেন সরকার দেয়না।

কি চমৎকার! তাঁরা যেন পুঁজিবাদী দেশের ভাষায় কথা বলছে। পুঁজিবাদী দেশগুলো একসময় লুটতরাজ করেই কিছুদেশকে গরীব বানিয়ে পুঁজিপতির খাতায় নাম লেখায়। তারপর সভ্যতার গুণগাণ গায়।

একসময় এসে আবার এসব গরীব দেশকে দান- খয়রাত করে। তখন গরীবদের লুটে যাঁরা পুঁজিপতি তাঁরা হয় দাতা, আর গরীবরা হয়ে যায় ‘খয়রাতী’।

আমি অপরাধী হয়ে তাঁদের সংলাপ শুনছি। এ এলাকার মানুষ আমি, তাই সমস্ত দোষ যেন আমাদেরই।অথচ, প্রথম যখন এই শিক্ষিতরা আমাদের গরীব এলাকায় আসে। স্বামর্থ্য না থাকলেও আমাদের আতিথেয়তার কমতি থাকে না।

সামান্য চালের আটার সাথে হাঁসের ডিম আর পেঁয়াজ মরিচ মেখে সুস্বাদু পিঠা বানিয়ে খাওয়াতে আমরা ব্যস্ত হয়ে পড়ি।

একসময় তাঁরা গরীবের পিঠের উপর বসত করে কিংবা মফিজ, অশিক্ষিত, ক্ষ্যাত বলে গালি দিয়ে চলে যায়। তখন আবার আমাদের তা মাথা পেতে মেনে নেওয়াই নিয়মের মধ্যে পড়ে।

এই ফাঁকে বসে বসে স্বপ্ন দেখছিলাম, কোন একদিন আমিও সমান্তরাল প্লাটফরমে দাঁড়িয়ে আছি। ট্রেন এলো, নিমিষেই খুলে গেলো দরজা। পিঁপড়ের মতো লোকজন তাতে চড়ে বসলো। মিনিটেই সব নিয়ে উধাও হলো ট্রেন।

ও পর্যন্তই! স্বপ্ন আর বাড়তে পারলো না। কারন আমাদের কাঙ্খিত বগীটি ততোক্ষনে  হাজির হয়েছে। আনন্দিত মনে রওয়ানা দিলাম ঢাকা অভিমুখে।

দুপাশের প্রাকৃতিক দৃশ্যে মন ভরাতে ভরাতে এগুচ্ছি। কারও সাথে কথা নেই, কারন কেউই আমার পরিচিত না।শুধু প্রকৃতির সাথেই কথা বলছি। প্রকৃতি সবার, পরিচয় লাগে না কথা বলতে।

আশেপাশের লোকজন তখন ব্যবসা- বানিজ্য, চাকুরী সব ট্রেনেই সেরে ফেলছেন। আমার কাছে কেবলই বাকওয়াচ বলে মনে হলো। এতো দৌড়- ঝাঁপ, কম্পিটিশান এদের মাঝে। অথচ পৃথিবীটাই অবান্তর, ভোগটুকু ছাড়া।

শেষটায় টাকার পাহাড়, ক্ষমতার পাহাড় গড়ে ফুঁস হয়ে যায়। অথচ আজ প্রকৃতির অপার প্রেম তাঁরা মিস করছে। দেখছিলাম, একই দেশ অথচ মাটির রং কেমন আলাদা। তাই বোধহয় মানুষের মন- মানসিকতাও আলাদা।

ট্রেন পরদিন সকাল আটটা নাগাদ ঢাকা ছুঁইছুঁই হলো। আমি তখন আর প্রকৃতিতে নেই। যে কারনে আমার ঢাকা গমন সেটি ভেবে ক্ষনে ক্ষনে শিহরিত হচ্ছি।

এ মানুষটাকে আমি কি ভালোবাসি? আমি কি তাঁর প্রেমে পড়েছি? হয়তোবা না হলে ভেতরে ভেতরে এতো পুলক অনুভূত হবার তো কোন কারণ নেই!

আমাদের বিয়ে হয়েছে পাঁচ মাস নয় দিন। তাঁর চাকুরী ঢাকাতেই। তিনি একজন প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা। আমার ছোটখাট চাকুরী। আমি চেষ্টা করছি ঢাকায় চলে যাওয়ার। স্বামীর কর্মস্থলেই স্ত্রীর থাকা উচিত। এটাই পুরুষ শাসনের নিয়ম।

আমার অনেক বছরের প্রিয় প্রাঙ্গন ছেড়ে যেতে কষ্ট হলেও আমাকে যেতে হবে। এই সব নিয়ম আমার মোটেও মানতে মন চায় না। তবুও পরিবার থেকে পই পই করে বড়রা বলে দিচ্ছে, পুস্পিতা, তুমি বেশ অবাধ্য। মেয়েদের এমন হতে নেই। শফিক যেটা বলবে, তাঁর যেটা আবশ্যক সেটা তোমার জন্য আইন স্বরুপ। তোমাকে অবশ্যই মেনে চলতে হবে। না হলে সংসার টিকবে না।

আল্লাহর হুকুম যেমন অমান্য করার হাজারও শাস্তির বিধান রয়েছে। মেয়েদের সংসার ব্যাপারটাও তেমনি। হুকুম মানতে হবে নয়তো কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা। সমাজ, পরিবার সবাই ত্যাগ করবে!

যাই হোক, আমি অন্তত: একটিতে এখনও টিকে আছি। তা হলো আমার বিদ্যুৎ অফিসের ছোট চাকুরীটি শফিক আমাকে ছাড়াতে পারেনি। তবে, প্রতিনিয়ত চাপ চলছেই। কারন প্রথম শ্রেনীর একজন মানুষের বেতন যাই হোক। পয়সার নাকি অভাব নেই। উড়ে উড়ে আসে। কিভাবে আসে কারও জানা নেই! তাঁর বউ রাঁধবে আর সাজবে। চাকুরী করার কি দরকার?

ঢাকার আগে অনেকবারই ট্রেন থামে। যতগুলো মানুষ নেমে যায়, তার চেয়ে বেশি ওঠে। শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, চাকুরীজীবী সবাই উঠছে আর নামছে। ভালো লাগছে দেখতে।

আমার পাশে এসে একজন বসলেন। আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিলেন। তার সাথে আমার আর কোন কথা হয়নি। আমরা একসাথেই বেশ কিছুক্ষন সওয়ারী হলাম। ট্রেন থেমে গেলো কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে।

আমি সপ্তা- খানেকের ছুটিতে যাচ্ছি। তাই দুটো লাগেজ। মেয়েদের কোন কারন ছাড়াই অনেক বড় বড় লাগেজ হয়। কোথাও যাওয়ার সময় মনে হয়, সবটাই জরুরী। শেষে অর্ধেক জিনিসই ব্যাবহার করা হয় না।

উপরন্তু ফেরার সময় আরও একটা বাড়ে। আমি দুটো লাগেজ নিয়ে মহা- বিপদে। আবার কাঁধে একটা ঝোলা ব্যাগ তো আছেই!

সাহায্যে এগিয়ে এলেন আমার সাথে বসা সেই অচেনা ছেলেটি। সুট- টাই পরা নয় তবে চেহারার যথেষ্ঠ ভদ্র। আমার হাত থেকে বড় লাগেজটি নিয়ে সাথে সাথে চললেন।

তিনি বেসরকারী কোম্পানীতে জব করেন। ট্রেনেই যাওয়া আসা করেন, এমনটি বললেন। আমার কথা জানতে চাওয়ার আগেই আমাদের পথ ফুরিয়ে গেলো।

আমার জন্য শফিক দাঁড়িয়ে আছে। আমি তাকে দেখে পুলকিত হলাম। শফিক জানতে চাইলো, তোমার লাগেজ কই?

আমি হাতেরটি দিয়ে পাশের ছেলের লাগেজটি তাকে দেখিয়ে দিলাম। শফিক হঠাৎই আমার সাথের ছেলেটির কাছ থেকে লাগেজটি কেড়ে নিয়ে হাঁটা ধরলো। তাকে একটা ধন্যবাদ দেয়া জরুরী ছিলো। সে তা দিলো না। মনের ভেতর সন্দেহের একটা দলা নিয়ে হাঁটতে লাগলো। গাড়ির কাছে এলো কোন কথা ছাড়াই। আমি শুধু তাকে অনুসরণ করলাম।

ছেলেটিও বের হচ্ছিলো। আমাকে হাত নাড়লো, আমিও। এটা আমার মহা পাপ এবং অপরাধ হয়ে গেলো। গাড়ির ভেতর শফিক মুখ কালো করে বসে রইলো।

বাসায় ফিরে আমাকে অনেক কথা শুনতে হলো। আমি যেখানে যাই সেখানেই জমে যাই। লোকজনের সাথে খুব সহজে পিরিত হয়। এতো সহজে কিভাবে একটা অচেনা লোক আমার লাগেজ নেয়? সে কি আমার পূর্ব- পরিচিত? আমরা একসাথেই জার্নিতে ছিলাম কিনা? হাজারো প্রশ্ন?

আমার শফিকের প্রতি ঘৃনা হলো। সে বড় চাকুরে হতে পারে কিন্তু অত্যন্ত নিচু মন- মানসিকতার  মানুষ। যে আবেগ নিয়ে শফিকের জন্য ঢাকা এলাম। তা মুহূর্তেই পানি হয়ে গেলো। কিন্তু প্রতিবাদ করবো তার সাধ্য নেই। আমাকে সে কোন কথা বলার সুযোগই দিচ্ছে না। বরং বলেই যাচ্ছে। যেন সব সত্যি!

আমিও মেনে নিলাম। অফিস থেকে ফিরে শফিক আমার রান্না নানাপদ খেলো। বেশ প্রশংসাও করলো। এই আমার একটা গুণই ভালো। তাছাডা বিয়ে করা তো বউ এর হাতের রান্না খাওয়ার জন্যই?

রাতে শফিক বেশ ঘনিষ্ট হলো। আমার সোনা বউ বলে কাছে টেনে নিলো। আমিও গরীবএলাকা ও দেশের দেশের মতো তার অনুদান, দয়া গ্রহন করার জন্য প্রস্তুত হলাম। সে যতোই আমার ব্যাক্তিত্বে লাগুক না কেন?

নারীরা গরীব দেশের মতো, গরীব এলাকার মতো। ভীষন গরীব। যতোই প্রতিষ্ঠা বাক্ষমতাবান হোক না কেন? পুরুষের হুকুমের গোলাম হয়ে চলাটা নিয়মের মধ্যে পড়ে। মাথা নিচু করে প্রতিবাদহীন হয়ে নিজের কুৎসা শুনতে হয়। এবং তা কারন ছাড়াই মেনেও নিয়ে চলতে হয়।

আমি জানালার বাতাসে দাঁড়ালাম। মুক্ত বাতাস, কাউকে আটকে রাখার প্রচেষ্টা নেই। অচেনা ছেলেটির মুখটা মনে পড়লো। তার কাছে আমার একটা আজন্ম কৃতজ্ঞতা রয়ে গেলো।

এমন যদি হতো, আমি বিবাহিত না হতাম। মুক্ত বাতাসের মতো হয়তো ছেলেটির মুক্ত মনের সাথে এতোক্ষন বসে গল্প করতাম। যা শফিকের সাথে আমার কোনদিনই করা হবে না। গুণগুন করে গাইতে ইচ্ছে হলো- আরও কিছুক্ষন না হয় রহিতে পাশে,,

ছবি- নেটের

২৭৪জন ১৩৩জন
0 Shares

৭টি মন্তব্য

  • মনিরুজ্জামান অনিক

    আজ শুক্রবার।
    আমার অফিস বন্ধ।
    হাতে তেমন কাজও নেই। ঘুম থেকে উঠে মনের ভেতর কেমন জানি মেঘ জমেছে। বৃষ্টি হবে হয়তো।মনের শহরে দূরে কোথাও বৃষ্টি হচ্ছে। দূর হতে বৃষ্টির ঘ্রাণ টের পাচ্ছি। সকালে বিছানায় শুয়ে শুয়ে আপনার গল্পটা পড়ছি ট্রেন আসা অব্দি পড়ে চোখ বন্ধ করলাম। দেখতে পেলাম স্টেশনের একপাশে একজন অপরিচিত মেয়ে বসে আছে সাথে তার দুটো লাগেজ।চারপাশে মানুষের ছুটাছুটি। সবাই ব্যস্ত যে যার মতো।মেয়েটির চোখে রাজ্যের বিস্ময়। এতো মানুষ তবুও নিজের ভেতর কেমন জানি একাকিত্ব জমে আছে আন্দিজ পর্বতের মতো।

    শুক্রবার সকালে আমার মেসে খিচুড়ির ব্যবস্থা করা হয়। সারা সপ্তাহের মাঝে এই সকালের নাস্তাটাই আমি উপভোগ করি। ধোঁয়া উঠা হলুদ রঙের খিচুড়ি। যেনো শরষে ক্ষেতে নেমে গেছে একদল মৌমাছি।

    নাস্তা করতে করতে গল্পটা শেষ করলাম।

    মনের ভেতর জমে থাকা মেঘ সরে গেলো মনে হলো
    কিন্তু নাহ্ মনের ভেতর যেই মেঘগুলোর আনাগোনা ছিলো ওরা এবার তার সঙ্গী সাথীদের নিয়ে আমার মনের আকাশ দখল নিলো। বৃষ্টি হবে হয়তো। আমিও ভিজে যাবো।

    হয়তো গল্পের সেই ছেলেটি যাকে আর কোনদিন দেখা যাবেনা সেই ছেলেটিও বৃষ্টিতে ভিজে হেঁটে যাবে বহুদূরে। একটা মেয়ে কাজল চোখে তাকিয়ে থাকবে তার চলে যাবার রাস্তার দিকে।

    মেয়েটির মনে মনে ভাসবে শুধু কিছু কথা
    ওগো আগুন্তক তুমি আমাকে সারাজীবনের তরে ঋণী করে গেলে। কি করে ঘোচাবো তোমার ঋণ।

    মেয়েটি কোনদিন মুখ ফুটে বলতে পারবেনা সে কথা।
    আস্তে আস্তে মেয়েটির চোখে বৃষ্টি নামবে – আজ ঘন বরষা।

    * আপা আপনার গল্পের মন্তব্য করার মতো যোগ্যতা আমার নেই। শুধু মন থেকে দোয়া রইলো।
    আপনার সুস্থতা কামনা করছি। ভালো থাকবেনা।

  • হালিমা আক্তার

    জীবন চলার পথে অনেক কিছুই ঘটে যায়। যা ক্ষুদ্র হলেও স্মৃতি পটে মিশে থাকে সারা জীবন। সেখানে চাওয়া পাওয়া, লেনা দেনার হিসেব থাকে না।এক অদৃশ্য ভালো লাগা জড়িয়ে থাকে। মেয়েদের জীবনের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন। শফিকদের যাবতীয় আবদার মেনে নেওয়া ই যেন একমাত্র আরাধ্য। শুভ কামনা রইলো।

মন্তব্য করুন



লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য




ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ