কালো গোলাপ

রুমানা পারভিন রনি ২৭ মে ২০২১, বৃহস্পতিবার, ১১:৪৭:৩৩অপরাহ্ন অণুগল্প ৭ মন্তব্য

সুপ্তি কাঁদছে,জানালার পাশে বসে ঘন ঘন চোখ মুছছে।সাধারণত ও যখন কাঁদতে বসে তখন বেশ আয়োজন করে কাঁদতে বসে।গ্লাসে পানি,চোখ মোছার রুমাল আর ফ্যান ছাড়া থাকে ফুল স্পীডে।কিন্তু আজকে সেরকম কিছু না।তবুও মেয়েটা কাঁদছে।

বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান সুপ্তি।ওর আগে একটা ভাই হয়ে জান্নাতের মেহমান হয়ে চলে যাওয়ার পর সুপ্তির জন্ম।একারণে বাবা মা ওকে বেশীই ভালোবাসে।গায়ের রং পেয়েছে দাদার।পাথর কুঁদে বানানো অবয়ব।তবুও মায়াকাড়া মিষ্টি মুখখানি দেখলে মন ভরে যায়।ঘন কালো লম্বা চুল,বড় বড় চোখ তবুও দেখতে ভীষণ মায়াবী।প্রচন্ড মেধাবী, তীক্ষ্ণ বুদ্ধির অধিকারী মেয়েটা গায়ের রং এর কারণে ভেতরে ভেতরে একটু মরমে মরে থাকে।ও জানে, আজকাল সবাই গায়ের রং খোঁজে।অন্য কিছু মূল্য পায়না।আর গায়ের রং এর কারণে ঋশিতা আজ ওকে এতগুলো কথা শোনালো।কেন শোনালো সেটা ভেবেই কাঁদছে মেয়েটা।

সুপ্তি বরাবর ভালো ছাত্রী।আগামীতে সায়েন্স থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দিবে।বরাবরই প্রথম সারিতে তার রেজাল্ট থাকে।পড়াশোনার পাশাপাশি গল্পের বই পড়ায় তার তীব্র নেশা।তার কলেজের হয়ে বেশ কয়েকবার আন্তঃকলেজ ডিবেটে অংশ নিয়ে সুনাম কুড়িয়েছে।এত কিছুর পরও তার জগৎ আটকে আছে গল্পের বই আর পাঠ্য বইয়ে।এসব যে কারও মনে হিংসার জন্ম দিতে পারে তা ও ভাবেইনি কখনো।
আজ ঋশিতার কথা শুনে বুঝতে পেরেছে,সবাই বন্ধু হয় না।এটা ভেবেই তার মন ভীষণ খারাপ,একারণেই কাঁদছে।

ঋশিতা ওর ক্লাসে পড়ে। খুবই সুন্দরী, যাকে বলে চোখে পড়ার মতো।বড়লোক বাবা মায়ের আদুরে সন্তান।গাড়ী চড়ে কলেজে আসে।পড়াশোনায় মোটামুটি। তবুও সবাই যখন সুপ্তির রেজাল্ট আর ওর সহজ ব্যবহারের প্রশংসা করে তখন ঋশিতার মেজাজ খারাপ হয়।ওই কালো মেয়েটার থেকে সে অনেক বেশী সুন্দর।তবুও সব টিচার কেন সুপ্তির কথা বলে?একারণে আজ সুপ্তির সাধারণ অবস্থান আর গায়ের রং নিয়ে ক্লাসে কটাক্ষ করে কথা বলতেও ছাড়েনি। যথেষ্টই অপমান করে।

কাঁদতে কাঁদতেই মনে হলো,সে তার যোগ্যতা প্রমাণ করে আজকের অপমানের জবাব দেবে।

একসময় ফাইনাল এক্সাম চলে এলো,যথা সময়ে পরীক্ষাও শেষ হলো।যখন ফলাফল ঘোষণা হলো,তখন দেখা গেলো,সুপ্তি তার কলেজে থেকে সবচেয়ে ভালো রেজাল্ট করে। ওর মা বাবাও খুব খুশি।
সুপ্তির ইচ্ছে ছিলো চিকিৎসক হয়ে দরিদ্র মানুষের সেবা করবে।তাই ওর রেজাল্টের কারণে ও সহজেই সরকারি মেডিকেলে চান্স পেয়ে গেল।প্রচন্ড পরিশ্রম আর অধ্যাবসায়ের ফলে এখানেও ভালো রেজাল্ট করলো।বিসিএস দিয়ে সে এখন সরকারি হসপিটালের ডাক্তার।ধীরে ধীরে গাইনেলজির ডাক্তার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলো।তার শহরের সেরা ডাক্তার এখন সে।প্রচুর নামডাক। তবুও সেই আগের মতোই সহজ মানুষ রয়ে গেছে।

এমনই এক দিনে ঋশিতা রোগী হয়ে ওর চেম্বারে আসে।সুপ্তি ঋশিতাকে চিনতে পারলেও ঋশিতা ওকে চেনেনি।

সুপ্তি ওকে দেখে কিছু টেস্ট করতে দেয়।রিপোর্ট পাওয়ার পর জানতে পারে ঋশিতা মা হতে চলেছে এবং এটাই ওর প্রথম সন্তান।বিয়ে হয়েছে ছয় বছর আগে।এতদিন পর আল্লাহ মুখ তুলে চাইলেন।ঋশিতা খুব খুশী।

হঠাৎ অপ্রসঙ্গিক ভাবে সুপ্তি জিগেস কর, সন্তান যদি কালো হয় তাহলে কি করবে?

ঋশিতা বলে,সন্তান কালো বা ফর্সা যাই হোক না কেন,সন্তান তো সন্তানই।সবই উপরওয়ালার দান।আমি ওকে বুকে আগলে মানুষ করবো।

সুপ্তি তখন জানতে চায়,ওকে চিনেছে কিনা?

ঋশিতা বলে, না চিনতে পারিনি।সুপ্তি নিজের পরিচয় দিয়ে বলে,মনে আছে ঋশিতা আমি কালো ছিলাম বলে তুমি আনাকে ঘৃণা করতে!সেই তোমার আজ এতটা পরিবর্তন কেন?

ঋশিতা অবাক হয়ে সুপ্তিকে দেখতেই থাকে,ওর বিশ্বাসই হতে চায় না!তখন সে মাথা নীচু করে জানায় তার বরও কালো।কিন্তু সে অসম্ভব ভালো মনের মানুষ।তাই সে বুঝতে শিখেছে কালো মানেই খারাপ না,কুৎসিত না।সে সুপ্তির কাছে ক্ষমা চায়।

সুপ্তিও বলে,সেদিন যদি ওভাবে আঘাত না করতো তবে হয়তো আজকের অবস্থানে সে পৌঁছুতে পারতো না।এজন্য তুমিও ধন্যবাদ পাওনা আছো।তখন ঋশিতা জানায়,তার অহংকারের কারণে বেশীদূর পড়াশোনা করতে পারেনি।বাবা বিয়ে দিয়ে দেন।সেদিনের আচরণের জন্য সে বারবার সুপ্তির কাছে ক্ষমা চায়।

বেরিয়ে যাবার সময় ঋশিতা গাঢ় চোখে সুপ্তিকে লুকিয়ে দেখে। সেদিনের সেই কালো গরীব মেয়েটা আজ যোগ্য জবাব দিয়েছে। পেটের উপর অজান্তে হাত বুলায়, ফিসিফিস করে নতুন শিশুকে জানায়, তোমাকে এমনি মানুষের মত মানুষ হয়ে উঠতে হবে, তবেই তুমি সুন্দর হবে,  ঠিক যেন ফুটন্ত লাল গোলাপ।

৯০জন ৬জন
0 Shares

৭টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য