কালনা

আজিম ২ এপ্রিল ২০১৪, বুধবার, ১০:৩৪:৪৯পূর্বাহ্ন গল্প ১৩ মন্তব্য

রাতের আঁধার কাটেনি তখনো ভালো করে । লোহাগড়া, নড়াইলগামী বাসটি ঢাকা থেকে এসে থামে ফেরিঘাট কালনা-য় । নদীর ঐপারে ফেরি, এপারে আসতে আরো প্রায় ঘন্টাখানেক সময় বাকী । চার/পাঁচ ঘন্টা বাসের সীটে বিরতিহীনভাবে বসে আছি, ক্লান্তিকর ভাবটা কাটাতে বাস থেকে নীচে নেমে আসি, হেঁটে বেড়াই । প্রত্যূষের এই সময়টা আমার অতি অদ্ভুত লাগে, মনে হয় পৃথিবীর সব সৌন্ধর্য্য এই সময়টাতেই দেখা যায় । আঁধার কেটে আলো ফোটার এই সময়টা দেখার সাধ থাকলেও ঘুমের কারনে হয়ে ওঠে খুবই কম । প্রকৃতির এই সৌন্ধর্য্যরে সাথে আবার যোগ হয়েছে নদী, সেখানেও আঁধার কেটে আলো ফুটছে, পানি ক্রমেই ভোরের আলোয় আলোকিত হয়ে উঠছে, এ-এক অপুর্ব প্রকৃতি ।

এরই মধ্যে নাস্তার দোকান খুলেছে একটি, নাস্তা বানানো চলছে । দোকান মানে ঘেরা কোনকিছু নয়, বারান্দার মতো একটা খোলা জায়গা, সেখানেই দোকান করেন তিনি । রাত্রির জার্নির কারনে এবং সাথে নাস্তা বানানো দেখে ইচ্ছা হোল নাস্তা খেতে । একজনই বানাচ্ছেন রুটি এবং দিচ্ছেন তিনিই, মাঝবয়স তাঁর । আগেই উঠেছেন তিনি এবং এরই মধ্যে ডাল এবং কিছু ভাজি বানিয়ে রেখেছেন । মানুষ খাইয়ে পরিবারসহ নিজের খোরাক যোগাড় করতে এভাবেই প্রতিদিন ভোরের আলো ফুটে ওঠার অনেক আগে সব শুরু করতে হয় তাঁকে ।

ফেরি নাই বলে পারাপার বন্দ থাকতে পারেনা । আছে শ্যালোনৌকা । ওপার থেকে মানুষজন আসছে, এপার থেকেও যাচ্ছে । শ্যালোনৌকার ভটভট্ শব্দ নদীর পানিতে ফুটে ওঠা প্রভাতের আলোর সাথে মিশে প্রকৃতির মধুর এই সময়টা আমার মনকে অনেক ভালো করে তুলেছে। এখানে নদীর দুই পারে মোটরসাইকেল ভাড়ায় পাওয়া যায় । যারা চাকরী করেন, গোপালগঞ্জ অথবা খুলনা যেতে চান অল্পসময়ে, তারা অতি প্রত্যূষে শ্যালোতে এপারে আসেন, মোটরসাইকেলে ভাড়ায় যান ভাইট্টাপাড়া পর্যন্ত এবং তারপর বাস ধরে খুলনা কিংবা গোপালগঞ্জ । মোটরসাইকেলে ভাড়ায় যাত্রীবহন করেন, এরকম একজনের সাথে কথা হল । আগে ছেলেটা ঢাকায় গার্মেন্টসে চাকরী করত সুপারভাইজার পদে, বেতন প্রথমে পেত সাত হাজার টাকা, পরে বেড়ে হয়েছিল দশ হাজার আর এখন মোটরসাইকেলে সব খরচ বাদে তার থাকে ঐ হাজার দশেকই বা তার চেয়ে কিছুটা কম । জিজ্ঞেস করলাম, ঢাকা থেকে এলে কেন । বলে ঢাকায় আয় কিছু বেশী হলেও সেখানে খরচ এখানকার চেয়ে অনেক বেশী । ঢাকায় থাকতে তার মাসের শেষে ধার না করলে মোটেও চলতোনা, কোন সঞ্চয়তো থাকতোইনা। আর এখানে তার থাকার পরিবেশ ঢাকা অপেক্ষা অনেক ভালো, সব্জিসহ অন্যান্য জিনিসের দাম কম এবং ব্যয় করেও কিছু না কিছু সঞ্চয় হয় ।

অপেক্ষার পালা একসময় শেষ হয় এবং ওপার অভিমূখে চলতে শুরু করে ফেরি । কয়েকটি ট্রাক এবং দুটি বাস নিয়ে যাত্রা শুরু করে ফেরি । বাস-ট্রাকের ফেরিভাড়া নিচ্ছেন যারা সেখানে গেলাম । দেখি, ভাড়া নেয়া হচ্ছে যা, লিখা হচ্ছে তার চেয়ে ১০ টাকা করে কম । জানা কথা এটা আদায়কারীগনের নিজস্ব আয় । জিজ্ঞেস করলাম, এতে মালিক মানে যিনি নিলামে নিয়েছেন এই ফেরি, তিনি এই কম লিখার বিষয়টি জানেন কি-না । উত্তর এল, হাঁ জানেন । কথাটা বিশ্বাস হোল । জিনিসপত্রের যা দাম, আরো আছে ইনাদের প্রতিদিনের নাস্তা এবং সামান্যকিছু হাতখরচ । তাতে মনে হোল খুব বেশী নিচ্ছেননা তারা, পাশে দাঁড়ানো আরেক ভদ্রলোকেরও এমনই মন্তব্য ।

ফেরি থেকে নেমে বাস আবার চলতে শুরু করলো । দুপাশে অনেক সবুজ গাছ-পালা, যেগুলির উপর সকালের কাঁচা রোদ পড়ে তা মাখিয়ে দিচ্ছে গাছগুলোকে পরম আদরে । আবার মেঘ এসে রোদ ঢেকেও দিচ্ছে সময় সময়, আবার ধীরে ধীরে উঠছে রোদ, চলছে মেঘ এবং রোদের এই লুকোচুরি খেলা । প্রকৃতির অভিনব এই খেলা দেখছি আর এগিয়ে চলছে বাস । রাস্তাঘাট ফাঁকা । আজকাল রাস্তায় কতো রকমের যে যান চলে! ব্যাটারীচালিত ইজিবাইক , পুরনো মোটরসাইকেলের ইঞ্জিন বসিয়ে যান বানানো, এটা অবশ্য অনেক আগের ব্যাবস্থা, যার নাম ভটভটি । মনে পড়ে কয়দিন আগে আরেক উপজেলায় ইঞ্জিনিয়ারিং কাজে গিয়ে চলাফেরার একসময় এরকম দুতিনটি ভটভটিতে করে ফুটবল খেলোয়াড়দের চলাফেরা করতে দেখেছি । এরা বয়সে কতই আর, ১৮ থেকে ২২-এর মধ্যে হবে ।এদের মধ্যে যে জিনিসটা আমার বেশী করে চোখে পড়ে, তা হোল এদের ‘বুদ্ধিদীপ্ত দুটি চোখ’ । সবই দেখা যায় সেই চোখগুলিতে, বরং বলা যায়, কি দেখা যায়না চোখগুলিতে ? ছেলেগুলির অনেকে কুঁড়েঘরে বাস করে, দেখেছে পরিবারের চরম দুর্দশা-হতাশা-কান্না । এদের উপর অবিচারই করেছে এই সমাজ তথা এই দেশ এবং অবিরতভাবে করেই যাচ্ছে । এই দুর্নীতি, এই দুঃশাসন তাদের এরকম করে রেখেছে । এগুলি থেকে মূক্তি পাওয়ার পথের স্বপ্ন কোন দল অথবা কোন ব্যক্তি আজো এদের দেখায়নি । কোনদিন কেউ এদের বলেনি, চলো সত্যের পথে, চলো নায্যতার পথে, রুখি দুঃশাসন, আদায় করে নেই নিজের অধিকার ।

দল বেধে এরা স্কুলে যায়, কলেজে যায়, ছাত্ররা একত্রে, আর আরেকদলে ছাত্রীরা । ছাত্রীরা ছাত্রদের চেয়ে আরেকটু বেশী শোষিত তাদের শারিরীক শক্তি কম বলে । এরাও পরম করুনাময় খোদাতা’লারই সৃষ্টি । কারো কিছু করার নাই । তবে আমরা যা করতে পারি, তা হচ্ছে আমাদের ‘মা’ জাতি হিসেবে দেখতে হবে এদেরকে । আমার দৃঢ বিশ্বাস, একেবারেই প্রতারনাহীনভাবে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য এদের প্রতি আহ্বান আসলে ছাত্র অপেক্ষা ছাত্রীদের সংশ্লিষ্টতা বেশীই হবে । লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, এই ছাত্রীদের চোখের ধার বেশী তীহ্ম, বেশী বুদ্ধিদীপ্তও তাদের চোখ । হয়তো শক্তি কম বলে হরিণীর মতো চঞ্চল এই মেয়েদের মানসিক অনূভুতি শারিরীক শক্তির সেই স্বল্পতা পূষিয়ে দেয়, যার ছাপ তাদের চোখেমুখে । দেশের সকল অন্যায়-অবিচার-দুঃশাসন এই চোখের সন্মিলিত শক্তির কাছে ভস্মীভূত হয়ে যাচ্ছে, সেই স্বপ্ন দেখি আমি । আমি স্বপ্ন দেখি, নীরোর মত কেউ বাঁশি বাজিয়ে চলেছে এবং সারাদেশব্যপী বিস্তৃত বিশাল-বিপুল এই ছাত্র-ছাত্রীগনের তোড়ে সমাজ হতে দুর্নীতি-দুঃশাসনের বিরাট বিরাট সব জগদ্দল পাথর তাসের ঘরের মতো উড়ে উড়ে চলে যাচ্ছে কোথায়, কোন নীলিমায় যেন । দেশ হয়ে উঠছে স্বচ্ছ, শুভ্র, ধবল; ঠিক রাতের আঁধার কেটে সকালের আলো ফোটে যেভাবে ।

গ্রামের একটা স্কুলের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় অনেক ছাত্র-ছাত্রীকে দেখা গেল, সম্ভবতঃ টিফিনের সময় সেটা, বিভিন্নভাবে দলবদ্ধভাবে ওরা সময় কাটাচ্ছে । কেউ টিফিন খাচ্ছে, কেউ আচার খাচ্ছে, কেউ আবার বিভিন্নভাবে দলবদ্ধ হয়ে তাদের মতো করে গল্পগুজব করছে । স্কুল-কলেজের এই সময়টাই হচ্ছে আনন্দের একটা সময়, তারা মাতিয়ে রেখেছে এটাকে ।

স্কুল-কলেজের এইসব জমায়েত দেখলে কিছু বলতে খুব ইচ্ছা করে আমার । দেশের ভবিষ্যত এইসব সন্তানদের আমার বলতে ইচ্ছা করে, তোমরা তোমাদের লেখাপড়াকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব এবং প্রাধান্য দিবে । এটার কোন বিকল্প নাই । আর করবে মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা, সর্বদা । হতাশ-দরিদ্র-অসহায় মানুষদের জন্য কিছু করতে না পারো, সহানুভূতির ভাবটা মন থেকে মুছে ফেলনা কথনো। সাথে সাথে সমাজ এবং দেশকে ভুলে যাবেনা এবং দেশের জন্য কিছু করার চিন্তাটাকে সবসময় মনের মধ্যে লালন করবে পরম যতেœ । কারন জন্মসূত্রে এদেশের উপর তোমার একধরনের ঋন আছে এবং এই ঋন তোমাকে তোমার জীবদ্দশায়-ই শোধ করে যেতে হবে অথবা শোধ করার একটা চেষ্টা তোমার মধ্যে সবসময় থাকতে হবে । এই চিন্তাটাকে মনের মধ্যে সযতেœ এবং পরম আবেগের সাথে তোমরা লালন করবে । কারন, এককথায় বলতে গেলে বলতে হয় যে, এই দেশ মোটেই কিন্তু ভালো চলছেনা । দেশটাও হয়েছে ছোট্ট একটা দেশ, কিন্তু এর লোকসংখ্যা প্রচুর । বিরাট ঘনবসতিপুর্ন এই দেশটা, এটা ভালোভাবে চালানোও খুব সোজা কাজ নয় । দেশের প্রধান সমস্যা হচ্ছে যে, এদেশে কোন সুবিচার নাই । তোমাদের স্বার্থ-সংশিষ্ট বিষয়টি হোল, লেখাপড়া শেষ করে তোমাদেরকে ঘুষ দিয়ে চাকরী নিতে হবে । রাজনৈতিক ব্যক্তির কাছে তোমাকে তদবির করতে হবে এবং তাতেই শুধু হবেনা, তোমাকে ঘুষও দিতে হবে । একটা অন্যায়ের কথা শুধু বললাম, আর বললামনা । কারন তোমাদের কচি মাথা, ধারনক্ষমতা কম । একটি কথা শুধু বলবো ।

তোমরা যেসব রাস্তাঘাট দিয়ে চলাচল করো, দেখবে সেগুলি ভালো নয় । অনেক রাস্তা নির্মানের পর মাত্র ১/২ বছর টিকে, তারপর নষ্ট হতে থাকে, গর্তের সৃষ্টি হয়, গর্ত বাড়তে থাকে এবং আস্তে আস্তে রাস্তাটি চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে । চলাচল করতে যে কি কষ্ট হয়, তা তোমাদের চেয়ে ভালো আর কে জানবে ? এই ব্যাপারে তোমাদের বেশ কিছু করার আছে । তোমরা শিডিউল দেখে কাজ বুঝে নিতে পারো । রাস্তার কাজে বিভিন্ন স্তর থাকে । এইসব স্তরের পুরুত্ব মাপা খুব সোজা । নিদৃষ্ট স্তরের কাজ সঠিক পুরুত্বে হচ্ছে কি-না, তা তোমরা সন্মিলিতভাবে মেপে দেখে সঠিক না পেলে কন্ট্রাক্টর এবং ইঞ্জিনিয়ারকে চাপ দিবে সঠিকভাবে কাজ করার জন্য । এরকমভাবে না ধরলে কাজ তো ভালো করা মোটেই যাচ্ছেনা । তোমাদের সাথে সাথে স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেনী-পেশার মানুষেরও এগুলি দেখা দায়িত্ব । কারন রাস্তা খারাপ হয়ে গেলে সবারই চলাচলে দারূন কষ্ট হয় ।

আবারও বলি, পড়ালেখা তোমাদের প্রধান কর্তব্য । পাঠ্যবইয়ের সাথে সাথে অন্য বইও পড়বে, মানুষের সেবা করবে, মানুষের মুখে হাসি ফোটাবার চেষ্টা করবে । সেবা করার চিন্তাটা সবসময় মনের মধ্যে লালন করবে । নিজেকে আলোকিত করার এর চেয়ে অন্য আর কোন পথ নাই । পড়ালেখা করো, আলোকিত হও, সৎ, চরিত্রবান ও বিবেকবান হও; তোমার সামনে সুন্দর এক ভবিষ্যৎ  প্রভাতের ঐ সূর্যের মতো উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে,  যেখানে তুমি শান্তি পাবে কমপক্ষে এই জন্য যে, তোমার সেরাটা তুমি এদেশের অসহায়-দিশেহারা মানুষের জন্য দিয়েছো ।  আর এই অনুভূতির জন্য জীবনে তুমি পাবে আনন্দ, কমপক্ষে নিরানন্দভাবে কাটবেনা তোমার জীবন ।

— মো: আজিমুল হক ; সেপ্টেম্বর, ২০১৩ ইং ।

 

২৫১জন ২৫১জন
0 Shares

১৩টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য