কাব্য কবিতায় চল্লিশ

রোকসানা খন্দকার রুকু ১৩ নভেম্বর ২০২০, শুক্রবার, ০২:২৬:২৮অপরাহ্ন গল্প ২৯ মন্তব্য

ঘটনা বহু বছর আগের। তাদের কাল্পনিক নাম দিলাম কাব্য ও কবিতা-

আজ থেকে চল্লিশ বছর আগে চব্বিশ/পঁচিশ বছরের অবিবাহিত ছেলে মানে আইবুড়ো। এতবয়সী অবিবাহিত মেয়েতো প্রশ্নই ওঠেনা। ছেলের গতিতে চারিদিকে মেয়ে খোঁজার ধুম পরেছে। টাকা পয়সাঅলা বাবার একমাত্র ছেলের বিয়ে বলে কথা। এদিকে যার বিয়ে সে কারও চোখে কবিতা রচনা করতে পারছেনা। অনেক মেয়ে দেখা হয়েছে। ছোটবোন কলেজে পড়ে। বোনের কলেজে ঘনঘনই যায় সে। বোনকে দেখতে যাওয়ার পেছনে ছোট্ট উদ্দেশ্য ও আছে। একদিন হোস্টেল গেটে বোনের জন্য দাঁড়িয়ে।

সোনারোদের সেই সকালে কোথা থেকে প্রেম আলোর ঝলকানি চোখে এসে লাগলো। কাব্যের সাথে কবিতার হয়ে গেল চোখে চোখ। শুরু হল জোনাক পোকার আনাগোনা। রচনা হল নতুন এক কবিতার। এ কি প্রথম দর্শনে কবিতা রচনা! নাকি অন্যকিছু? কবিতাও কাউকে এমন করে দ্যাখেনি। কাব্যের চোখে কি ছিল! এপাশ- ওপাশ কি রকম বুক ধুকপুকানি সুখানুভূতি!

কিছুদিন পর:

– আপনি চাকুরী করছেন না কেন?

– মা দুরের চাকুরীতে যেতে দেয়না। আর দরকার কি? বাবা অনেক জমিজিরাত, ব্যাংক ব্যালেন্স রেখে গেছেন তা দিয়েই আমাদের চলে যাবে।

– তারপরও হবেনা। বাবা ডাক্তারের সাথে আমার বিয়ের কথা বলছে। ভালো চাকুরী ছাড়া আপনাকে পছন্দই করবে না!

– তুমি পছন্দ করলেই হবে। আর ডাক্তার ব্যাটা তোমাকে কি দেবে? আমি তোমায় প্রতিদিন কবিতা শোনাব, চাঁদ দেখব দুজনে, ভরা জোছনায় নদীর পাড়ে হাত ধরে হাঁটব।

-না তাতেও হবে না। আমি পছন্দ করলেও হবেনা, কোনদিন হবেনা।

– হবে সোনা হবে, তুমি চেষ্টা করলেই হবে! মনটা একটু নরম কর?

– অসহ্য! ভাল্লাগেনা কিছু। কোনদিন আর আমার সামনে আসবেন না।

– তুমি আমাকে ভালবাস, তাই বারবার আসব! 😭😭😭

কবিতার বড়ভাই বন্ধুসহ কাব্যদের বাড়িতে এসেছেন। সব ঘুরেটুরে দেখে তার চোখ আটকে গেল বই এর সেলফ এ। এত বই, এতবই! এত বই পড়ে যে সে তো মহাপুরুষ, মহামহাজ্ঞানী।

“এত বই কার; তোমার? পত্রিকা,ম্যাগাজিন সব আছে দেখছি। যাওয়ার সময় আমাকে কিছু বই প্যাক করে দিও তো? আর টেনশান নিওনা। আব্বাকে আমি ম্যানেজ করব। তোমাকে আমার ভীষন পছন্দ হয়েছে। আমার বোনকে কবিতা শোনাবে প্রতিদিন আর আমি যখন আসব তখন আমাকেও”।

বিয়ে বাড়ি। দুরের যাত্রা কুড়িগ্রাম টু পন্ঞ্চগর তাই ছেলেপক্ষ থেকে তার কয়েকজন বন্ধু-বান্ধব ও বোনজামাই গেছেন। বিয়ে ,বরকনের মুখ দেখার পালা শেষে সবাই মিলে খেতে বসেছেন। হাসিমস্করা চলছিল ভালোই। হঠাৎ বল্লম লাঠি হাতে কবিতার বাবার হুঙ্কার।

“এই কাজ কে করেছে তাকে আমার সামনে নিয়ে আস টুকরা টুকরা করব।”

যিনি করেছেন তিনি কেবল শিনার মাংসখানা গালে দিয়ে চিবোনোর চেষ্টা করছিলেন। হঠাৎ কি হয়েছে, কি হয়েছে শুনে চমকে উঠলেন। চোরের মন তো পুলিশ পুলিশ হবেই। মাংস গালে নিয়ে ভাত রেখে দিলেন ভোঁ দৌড়। শুরু হল চারিদিকে দৌড় ঝাঁপ চিৎকার চেঁচামেচি অতঃপর বিয়ে বাড়ি ফাঁকা। মেয়ের মা অজ্ঞান আর বাবা মুক্তিযোদ্ধা কাঁপছেন থরথর করে। কোথায় সে যার এতবড় সাহস !

ঘটনা: আমরা সবাই জানি বিয়েতে কবুল রেজিষ্ট্রি ছাড়াও কাজী সাহেব তার রেজিষ্টার খাতায় কিছু শর্তাবলী লিখে থাকেন। সেটা বরের জন্য বিয়ের পর সে সেগুলো পালন করবে। যেমন- দেনমোহর, ভরনপোষন, সকল দায়িত্বের এরকম সিরিয়ালী দশ/ বারোটা শর্ত থাকে। বরের দুলাভাই দুএকটা রেখে বাকি সব কেটে দিয়েছেন। তার মনে হয়েছে এসব অযথা কোন ছেলেই পালন করেনা। পরে কোন ঝামেলা হলে কিছুটা স্বস্তি মিলতে পারে। ইনি হলেন কঠিন এলজেবরীয় ম্যাথের পাগল শিক্ষক। অংকে অংকে আউলা মাথা।

এমনি ছেলে পছন্দ না তার উপর খাতা কাটা কাটা দেখে মেয়ের বাবা ক্ষেপে গিয়ে যাচ্ছেতাই অবস্থা হয়ে গেল। গনিত দুলাভাই এর মাংস দৌড়তে দৌড়তে খাওয়া হলেও হাত ধোয়া হয়নি। তিনি রাস্তার পাশের ডোবায় হাত ধুয়ে নিলেন। ডোবায় দুঢোক পানিও খেলেন। কি দৌঁড়টাই না হল!

দুরে কাউকে দেখা যাচ্ছে হাঁফাতে হাঁফাতে আসছেন। বরের বুজম বন্ধু। বেচারা কাছে এসে বললেন, ভাই আপনি এই কাজটা কেন করছেন?

– আরে মজা করেছি! এরা এত ক্ষেপে যাবে বুঝিনি।

– আমি তো পানিও খাইনি। এক বাড়িতে গিয়ে পানি চাইলাম। কলের পার থেকে বদনায় পানি এনে দিল তাই খাইলাম।

একে একে সবাই জড়ো হলেন।এদিকে রাত মোটামুটি হয়েছে। গাড়ি ঘোড়া কিছু না থাকায় হেটে হেটে রওয়ানা দিলেন। আল্লাহ যা রাখে কপালে!

বর মানে কাব্য তখনও শশুর বাড়িতে। সে পন করেছে জীবন গেলে যাক! বউ ছেড়ে যাবেনা। সারারাতই একটা অন্ধকার ঘরে তাকে আটকে রেখেছে। ভয়ে তার কাছে কেউ আসেওনি। যার আসার কথা সে ভীষন অভিমানে গাল ফুলিয়ে। এরকম কাজ যারা করে তারা নিশ্চয়ই খুব খারাপ মানুষ। বাবার কথা শোনাই উচিত ছিল।

কাব্য ভাবছে, এমনটা হতেই পারে। কাল কবিতা ঠিকই আমাকে ছাড়িয়ে নেবে।

এদিকে  বাড়িতে লোকজন এসে খবর দেবার সাথেই মা অজ্ঞান হয়ে গেলেন। তার একমাত্র ছেলে কতবার বলেছেন অতদূরে বিয়ে করার দরকার নাই। মেয়ে যতই হুর পরী হোক। জ্ঞান ফিরলে তিনি ডাকলেন তার জামাইকে। জামাই বেচারা ভাবতেই পারেনি এমনটা হবে। শাশুড়ি পাশে রাখা ঝাঁটা দিয়ে শুরু করলেন জামাই পেটানো। আচ্ছা মত জামাইকে ঝাড়ু পেটা করলেন। জামাই অপরাধ করেছেন তাই চুপচাপ অংক কষতে থাকলেন। সমাধান কি এমন হবার কথা  ছিল?😜😜

গ্রামের মহত মহোদয় উদয় হলেন। চিঠিপত্রের যুগে খোঁজ পাবার কোন উপায় নেই। একমাত্র কাজ ছেলেকে ফেরত পাওয়ার জন্য মানত করতে হবে। পীরের পড়পানি দিয়ে গ্রামের লোকজনকে রান্না করে খাওয়াতে হবে। লোকজনকে না খাওয়ালে বিপদ মুক্ত হবেনা।

মহিষ, গরু জবাই হয়েছে। দলেদলে গ্রামের মানুষ খেতে আসছেন কিন্তু কেউ পরিস্কার না, এটা বিয়ের দাওয়াত না কুলখানি। যেটাই হোক খাওয়া দাওয়া খুবই ভালো হয়েছে।🤪😜

দুজন ষাটোর্ধ্ব মানুষ পাশাপাশি গায়ে গা এলিয়ে প্রেমের জোনাক গুনছে। একজন সদ্য রিটায়ার করা কলেজ অধ্যক্ষ আর তার স্ত্রী। চাঁদও তার আলোর বিচ্ছুরণ ঘটিয়েছে পাল্লা দিয়ে আজীবন প্রেমের সাক্ষী হয়ে থাকবে বলে। আজ সে পাল্লা দিয়েছে কাব্যিক রুপ,রস, গন্ধেভরা পৃথিবীর সাথে। বকুল ফুল তার সমস্ত কড়া গন্ধে দুজনের প্রেমের জোগান দিচ্ছে। এদিকে শোধ নিচ্ছেন একজন সারারাত অন্ধকার ঘরে বন্দী থাকার। অন্যজন সে রাতের চোখের পানির। আজ তাদের চল্লিশতম বছরের ভালোবাসার রাত!

– কবিতা শুনবে?

– তুমি লিখেছ? বাহ্! শোনাও তবে।

**বয়স কত হল তোমার?

কত আর হবে ষোল-আঠারো।হা হা হি হি! হাসছ কেন?

হাসব না,ষোল তাই? হা হা হা!

হাসবে না বুড়ো,এক পৃথিবী ঘুরে আস পাবে কি দেখা এমন ভালোবাসার কড়া আবর্তন, আগলে রেখেছি,তুলে রেখেছি,পুশে রেখেছি তোমার সমস্ত পাগলামী আমার ষোল আঠারো বিশে॥

তোমার চোখে একপলক তাকিয়েই বলে দিতে পারি তোমার কখন,কি,কিভাবে,কেন?

যাও,যেতে পারছ না তাইতো? যাবে কেমনে আমি ষোড়শীই যে!

আমার গালের টোলে,কপালের রেখায়,শেষ বার্ধক্যে, কোমর ব্যাথায় লুকিয়ে আছে শুধু ষোল।

তাইতো দেখতে আস কিছু পর পর ওঘর থেকে, বাইরে গেলে ফোন দাও আবেগী গলায় অকারন।

শার্ট প্যান্ট লন্ডি কর,ভুরি টেনে সিক্স প্যাক খোঁজ, দাঁড়ি শেভ করে গাল কর টান টান,

কলপ কর দুটো চুল পাকলেই, ঘুরে ঘুরে আয়নায় নিজেকে দেখ।কেন? বুড়ো হবার ভয়? তা আমি ষোড়শী বলেই তো!

বারবার অকারন ডাকো, বিকেলের বারান্দায় আমার জন্য চিনি ছাড়া চা, কফি। মোবাইল এ তোলা ছবি দেখ চুপি চুপি হলিউড বলিউড সব রেখে,

আমি ষোলো বলেই তো, বুড়ো কোথাকার!**

– আমি বুড়ো আর তুমি ষোড়শী! হা হা হা। কবিতা সুন্দর হয়েছে।

– অবশ্যই! এই ধর কফি নাও, চিনি ছাড়া!

– হ্যাঁ দাও, তোমারটাও নিয়ে এস ষোড়শী।😜😜

গান, কবিতা, গল্পে ছুটেছে আজ হাসির ফোয়ারা। প্রকৃতিও যোগ দিয়েছে তাদের সাথে।

” পৃথিবী বদলে গেছে যা দেখি নতুন লাগে,

তুমি আমি একই আছি দুজনে যা ছিলাম আগে”!

আসুন আমরাও এমন ভালোবাসার সৃষ্টি করি!!!🌹🌹🌹

 

১৭২জন ৫জন
0 Shares

২৯টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য