বাংলা সাহিত্যের দিকপাল কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছারি বাড়ি হচ্ছে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে। শাহজাদপুরের একটি বিখ্যাত পুরাকীর্তি হচ্ছে বিশ্বকবির কাছারি বাড়ি। এটি রবীন্দ্রনাথের পৈতৃক জমিদারি তত্ত্বাবধানের কাছারি ছিল। তারও পূর্বে অষ্টাদশ শতাব্দীতে এটি নীলকরদের নীলকুঠি ছিল বলে অনেকই বাড়িটিকে কুঠিবাড়ী বলে। পরে রবীন্দ্রনাথের দাদা প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর এটি মাত্র তের টাকা দশ আনায় নিলামে কিনে নেন। বর্তমানে নীলকরদের খাজনা আদায়ের একটি ধ্বংসাবশেষ ও একটি দ্বিতল ভবন এবং বর্তমানে নির্মিত একটি অডিটোরিয়াম রয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ পিতার আদেশে ঊনত্রিশ বছর বয়সে ১৮৯০ সালে জমিদারি তত্ত্বাবধানের জন্য প্রথম শাহজদাপুর আসেন। ১৮৯০ থেকে ১৮৯৬ মোট ৭ বছর জমিদারির কাজে শাহজাদপুরে আসা-যাওয়া করেছেন। এই আসা-যাওয়ার মধ্যেই কবি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ সোনার তরী, বৈষ্ণব কবিতা, দুইপাখি, আকাশের চাঁদ, পুরস্কার, হৃদয়, যমুনা, চিত্রা, চৈতালী, পোস্ট মাস্টার গল্পের ‘রতন’ চরিত্র, চিত্রা, শীতে ও বসন্তে, নগর সঙ্গীতে এবং চৈত্রালীর ২৮টি কবিতা, ছিন্ন পত্রাবলীর ৩৮টি, পঞ্চভূতের অংশবিশেষ, বিসর্জন নাটক ও প্রবন্ধের মধ্যে ‘ছেলে ভুলানো ছড়া’ শাহজাদপুরেই রচনা করেছেন।
১৮৯৭ সালে কবির বাবা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর জমিদারী ভাগাভাগি করেলে কবি নিজে পতিসরের দায়িত্ব পান। শাহজাদপুরের অংশ চলে যাওয়ার পরে ১৩০৪ সালের ৮ আশ্বিন কবি পতিসর যাওয়ার পথে শাহজাদপুরে আর একবার এসেছিলেন। সেদিন শাহজাদপুরের বিচ্ছেদ স্মরণ করে কবি বিখ্যাত কবিতা – “ভালোবেসে সখি নিভৃতে যতনে – আমার নামটি লিখো তোমার মনের মন্দিরে” লিখেছিলেন।
১৮৯৬ সালে তিনি শেষ বারের মতো শাহজাদপুর ছেড়ে চলে যান। আর কখনো আসেননি।
কবি শাহজাদপুরে স্থায়ী ভাবে বসবাস করেননি।
শুধুমাত্র জমিদারী দেখাশুনার জন্য মাঝেমধ্যে আসতেন এবং সাময়িক ভাবে বসবাস করতেন। সম্ভবত একারণেই শাহজাদপুরের বাড়িটি কাছারি বাড়ি নামে পরিচিত।
শাহজাদপুরের কাছারি বাড়ির ভবনটি ইন্দো-ইউরোপীয় স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত। ভবনটির নিচের তলাতে তিনটি কক্ষ এবং উপরের তলাতে চারটি কক্ষ রয়েছে। মূলত এই ভবনটিই জাদুঘর হিসেবে পরিচিত। ১৯৬৯ সনে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কর্তৃক জরাজীর্ণ অবস্থায় ভবনটিকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সরকার এই ভবনটিকে জাদুঘর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। ভবনটির নিচের তলায় তিনটি এবং উপরের তলায় চারটি ঘর রয়েছ। যা কবির নিজের এবং পরিবাসহ বিভিন্ন ব্যক্তিদের সাথে সাক্ষাতের ছবি, ব্যবহৃত বোট পদ্মা, গান্ধীর সাথে রবীন্দ্রনাথ, আমার শেষ বেলার ঘরখানি, পদ্মাসনে উপবিষ্ট রবীন্দ্রনাথ, বার্ধক্যে রবীন্দ্রনাথ এবং কবির আঁকা বৃক্ষ রাজী, নৈসর্গিক দৃশ্য, উপবিষ্ট চিত্র, মুখ নিরীক্ষা ও বিভিন্ন রকমের প্রতিকৃতি দিয়ে সাজানো। রয়েছে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার ছবি, কবির ব্যবহৃত খাঁট, পালকি, খড়ম, হুঁকো, ফুলদানি, রান্নাঘরে ব্যবহৃত তৈজসপত্র, হট ওয়্যাঁর পট, হট ওয়্যাঁর ট্রে, লণ্ঠন, চিঠি লেখার ডেক্স, পড়ার টেবিল, দেয়ালে আলোকচিত্র, পান্ডুলিপি, জ্যামিতিক নকশা, ড্রেসিং টেবিল, শ্বেত পাথরের গোল টেবিল, টেবিল বেসিন, দেবতার আসন, হাতল যুক্ত কাঠের চেয়ার, কাঠের টেবিল, কাঠের আলনা, সোফা, বিছানা, কেরোসিনের বাতি, মোম দানী, অর্গ্যান, চিনামাটির বাসনকোসন, দেয়াল ঘড়ি, ব্রোঞ্জের তৈরি বালতি, রান্নার পাতিল, ঘটি ইত্যাদি।
শাহজাদপুর ছিল রবীন্দ্রনাথের অত্যান্ত ভালোবাসার একটি স্থান। তাঁর ভালোবাসার কথা তিনি ‘ছিন্নপত্র’ ও ‘ছিন্নপত্রাবলী’সহ বিভিন্ন লেখায় গভীর আবেগ এবং আন্তরিকতায় উল্লেখ করেছেন। ১৮৯৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর শাহজাদপুর থেকে লেখা একটি চিঠিতে তিনি স্পষ্টই বলেছেন,‘‘এখানে (শাহজাদপুরে) যেমন আমার মনে লেখার ভাব ও ইচ্ছা আসে এমন আর কোথাও না (ছিন্নপত্র- পত্র সংখ্যা-১১৯)।’’ কবির মৃত্যুর এক বছর আগে ১৯৪০ সালে শাহজাদপুরের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হরিদাস বসাকের চিঠির জবাবে কবি লিখেছেন, ‘শাহজাদপুরের সাথে আমার বাহিরের যোগসূত্র যদিও বিচ্ছিন্ন তবুও অন্তরের যোগ নিবিড়ভাবে আমার স্মৃতির সঙ্গে জড়িত।
প্রতি বছর ২৫শে বৈশাখ রবীন্দ্র কাছারি বাড়িতে রবীন্দ্র মেলার আয়োজন করা হয়।

১৯৫জন ৬৯জন
8 Shares

২২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য