কাকতাড়ুয়া

তারিক ৩ ডিসেম্বর ২০১৯, মঙ্গলবার, ০৯:২৯:৪১অপরাহ্ন গল্প ২৫ মন্তব্য

নতুন বাসায় ওঠার পর থেকেই কেন জানি আমার রাতের ঘুম পালিয়ে গেছে। প্রতি মধ্যরাতে আমি চুপিচুপি ব্যলকনিতে গিয়ে পায়চারি করি৷ মাঝেমধ্যে বোকার মত আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি। নতুন বাসার চারপাশে অনেক গাছগাছালি আর তাতে প্রতি রাতে বিভিন্ন প্রজাতির পাখিরা এসে আশ্রয় নেয়। রাতে ওরা কত কিচিরমিচির করে। আমি মনযোগ দিয়ে শুনি। ওই পাখিদের মধ্যে কিছু দাঁড়কাকও আছে। গভীর রাতে ওরা অদ্ভুত ভঙ্গিতে ডাকে। ঠিক যেন মনে হয় ওরা একে অন্যের সাথে কথা বলছে। আমি বোঝার চেষ্টা করি ওদের কথা। এভাবেই এক মধ্যরাতে আমি খেয়াল করে শুনি দলের সবচেয়ে বৃদ্ধ কাকটি অন্যদের বলছে, “তোমরা কাল সন্ধ্যার আগেই বাড়ি ফিরবে। কাল সন্ধ্যায় প্রচন্ড ঝড় হবে। সবাই সাবধান।”

আমি পরের দিন মিথ্যে অসুস্থতার অজুহাত দিয়ে অফিস ফাঁকি দিলাম। সারাদিন বাসায়ই ছিলাম। আর অবাক হয়ে খেয়াল করলাম, সন্ধ্যায় প্রচন্ড ঝড় শুরু হলো। ঝড়ের মধ্যেও আমি কাকগুলোর অসহায় আর্তনাদ স্পষ্ট শুনতে পেলাম। ওই রাতে ঝড় থামার পর আমি চুপিচুপি ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়াই। খেয়াল করে শুনি কাকগুলোর কথোপকথন। ওদের কথার মধ্যে আজ একটা কাকের কথা আমাকে বেশ আহত করলো।

সেই কাক বেশ হতাশা নিয়ে বলেছিল,”কতদিন হয় সাবান খেতে পাইনা!!! আগে মানুষ সাবান খন্ড নিয়ে নদীতে গোসল করতে যেতো আর আমরা সুযোগ বুঝে সাবান নিয়ে পালাতাম। ইস সেই দিনগুলো কই?”

আমি পরের দিন বিকেলে অফিস থেকে ফেরার সময় কিছু লাল রঙের লাইফবয় সাবান কিনে আনলাম। ফিরেই সাবান গুলো ছোট ছোট টুকরো করে ব্যালকনি দিয়ে পাশের বাসার টিনের চালে ছড়িয়ে দিলাম। কয়েক মিনিটের মধ্যেই কাকগুলো এসে সাবান গুলো নিয়ে পালিয়ে গেল।

ওই রাতে আমি খেয়াল করে শুনলাম, কাকেরা আমার বেশ প্রশংসা করছিল। কাকের মুখে প্রশংসা শুনে আমারও বেশ ভাল্লাগছিল। এভাবেই প্রতিদিন বিকেলে মুড়ি, বিস্কিট, চানাচুর কিনে এনে বৌয়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে পাশের বাসার টিনের চালে ছড়িয়ে দেই আর কাকগুলো মহানন্দে সেগুলো খেয়ে নেয়। এভাবেই এক মধ্যরাতে আমি ব্যলকনিতে দাঁড়িয়ে কাকদের আলোচনা শুনছিলাম।

স্পষ্ট শুনলাম, নেতা গোছের বৃদ্ধ কাকটি বলছে, “পাশের ওই বিল্ডিং এর নতুন ভাড়াটিয়া আমাদের খাবারের কষ্ট বুঝতে পেরেছে। তাই প্রতিদিন আমাদের জন্য পছন্দসই খাবার কিনে আমাদের মাঝে বিলিয়ে দিচ্ছে। নিষ্ঠুর এই পৃথিবীতে এমন মানুষ পাওয়া বিরল। তাই আমরা আজকের এই কাক সমাবেশে ওই মানুষ কে #কাক_বন্ধু উপাধিতে ভূষিত করলাম।”
সব কাকেরা যেন উচ্চস্বরে কা কা কা শব্দ করে তাকে সমর্থন জানালো। আহ আনন্দে আমার বুকটা ভরে উঠলো! মনে হলো আমার নিরস হৃদয়ে কে জানি এক গ্যালন অক্সিজেন ভরে দিল। আমি আনন্দের আতিশয্যে মধ্যরাতে ঘুম থেকে ডেকে তুলে সব খুলে বললাম। বৌ আমার দিকে অবাক চোখে ড্যাবড্যাবিয়ে তাকিয়ে থাকে।
আর বৌকে এমন তথ্য দেয়ার ফল হাতেনাতে পেলাম ঠিক পরের দিন। বাবা, মা বড় ভাই বাসায় হাজির হলো। মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করলো ” বাবা তুই কি খারাপ ছেলেপেলের সাথে মিশে ছাইপাঁশ খাওয়া শুরু করেছিস? ওগুলো খাওয়া ভাল না। নামাজ রোজা কর বাবা”
মোট কথা সবাই ধরেই নিয়েছে আমি মাদকাসক্ত হয়ে গেছি। এভাবেই আমার জীবন চলছিল।

হঠাৎ এক বিকেলে বৌ আমাকে বললো, ” আজ তোমাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাব”

আমি বলি “আমার কি কোনো অসুখ হয়েছে, যে ডাক্তারের কাছে যেতে হবে?”

বৌ বললো, “তোমার মনের অসুখ হয়েছে”

সে আমাকে অনেকটা জোড় করেই ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেল। ডাক্তারের নাম মোল্লা শরফুদ্দিন। নামের নিচে উদ্ভট কিছু ডিগ্রীর নাম লেখা। সাথে “বিশিষ্ট মনোরোগবিদ” বিশেষণও আছে।
গোল ফ্রেমের চশমার ফাঁকা দিয়ে তাকিয়ে ডাক্তার আমাকে জিজ্ঞেস করলো, “আপনি কি বিশিষ্ট কাকবিদ মিঃ তনয়?”

এই বলে খ্যাক খ্যাক করে বিশ্রী শব্দে হেসে উঠলো। আমি বহু কষ্টে বিগড়ে যাওয়া মেজাজ টা নিয়ন্ত্রণ করলাম। এরপর ডাক্তার খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আমার আর কাকদের অদ্ভুত সম্পর্ক বিষয়ে তথ্য নিল। আমি খেয়াল করলাম, ঠিক জানালার বাইরে দুটো কাক আমাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছে। যখন ডাক্তার মজার ছলে কাকদের কাছে আমাকে জিজ্ঞেস করতে বললো, যে উনার গর্ভবতী স্ত্রীর জীবন অনাগত সন্তান ছেলে হবে নাকি মেয়ে?
তখন আমি স্পষ্ট শুনতে পেলাম কাকদুটো চিৎকার করে বলছে “ওকে বলে দাও কাল ওর স্ত্রী মৃত সন্তান প্রসব করবে”

আমিও বোকার মত ডাক্তারকে বললাম, “কাকেরা বলছে কাল আপনার স্ত্রী মৃত সন্তান প্রসব করবে”
ডাক্তার হো হো করে হেসে উঠলো।

এরপর কিছু ঘুমের ঔষধ দিয়ে আমাকে বিদায় দিল।
ওই রাতে আমি দুটা ঘুমের ঔষধ খেলাম তবুও মধ্যরাতে কেন জানি ঘুম ভেঙে গেল। আমি ব্যলকনিতে গিয়ে কাকদের আলোচনা শুনলাম। আজও ওরা কেমন জানি বিমর্ষ।

এক কাক বললো “সত্যিই খুব দুঃখজনক যে আমাদের বন্ধুর স্ত্রী আর মাত্র চার দিন বেঁচে থাকবে!!! সত্যিই বন্ধুর জন্য খুব কষ্ট হচ্ছে”
একথা শুনে আমি বেশ ভয় পেয়ে গেলাম। কিসব বাজে বকছে কাকগুলো। আমার স্ত্রী মীরা বেশ সুস্থ সবল একটা মানুষ। আমি বিছানায় গিয়ে মীরার মাথায় হাত বোলাতে লাগলাম। কিন্তু মনেমনে প্রচন্ড ভয়ে কুকড়ে যাচ্ছিলাম। কাকেরা যেহেতু ৪ দিনের কথা বলছে আমি ৭ দিন ছায়ার মত মীরার পাশে থাকব সিদ্ধান্ত নিলাম। এক মুহূর্তও ওকে চোখের আড়াল হতে দেব না। পরের দিন সকালেই দুঃসংবাদ টা পেলাম যে, ডাক্তারের স্ত্রী মৃত সন্তান প্রসব করেছে। মীরা খবর‍টা শুনে বেশ দুঃখ এবং ভয় উভয়টাই পেল। কাকদের কথা এভাবে ফলে যাবে আমিও ভাবিনি। ৭ দিনের ছুটি নিলাম অফিস থেকে।
এ ক’দিন ভয়ে আমি ব্যলকনিতে যাইনি। কি না কি বলে কাকেরা। মীরা এই ৪ দিনে আমার উপর বেশ বিরক্ত। সারাক্ষন ওর পাশে থাকার কারণ জিজ্ঞেস করলেও আমি সব এড়িয়ে শুধু ওর পেছন পেছন ঘুরঘুর করছিলাম। ঠিক ৫ম দিন সকালে মীরা ওয়াসরুমে ঢুকলো। আমি বিছানায় শুয়ে ছিলাম। প্রায় ঘন্টাখানেক পরও মীরা বেরোচ্ছে না দেখে ওকে অনেক ডাকাডাকি করলাম কিন্তু কোনো সাড়া পাচ্ছিলাম না। অগত্যা দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে দেখলাম মীরা মেঝেতে পড়ে আছে৷ ওর নাক দিয়ে সামান্য রক্ত বেরিয়ে শুকিয়ে গেছে। দ্রুত ওকে নিয়ে হাসপাতালে ছুটলাম। কিন্তু ততক্ষনে সব শেষ। ও নাকি বাথরুমেই স্ট্রোক করেছিল। এটা শুনে আমি জ্ঞান হারালাম। প্রায় ঘন্টা তিনেক পর আমার জ্ঞান ফিরলো। জ্ঞান ফিরেই শুনলাম কতগুলো কাক বিশ্রী শব্দে ডেকে চলছে। বিকেলেই মীরার দাফন হয়ে গেল। গোরস্থানে আশেপাশে গাছগাছালিতে যেথায়ই আমি কাক দেখেছি সেথায়ই আমি ঢিল ছুড়ে চলেছি। আমার এই অদ্ভুত আচরণে সবাই বেশ অবাক হচ্ছিল কিন্তু আমার সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ ছিল না।
এরপর থেকে যেন আমার জীবনের উদ্দেশ্যই হয়ে গেল কাক তাড়ানো। যখনই কোথাও কাক দেখতাম, আমি ওদের গালি দিতাম আর ঢিল ছুড়তাম। সময়ের সাথে সাথে আমার পাগলামি বেড়েই চললো। চাকুরীটাও গেল। এক পর্যায়ে আমাকে সুস্থ করার জন্য বছর খানেক আগে বাবা আমাকে একটা মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করে দিলেন। সেই থেকে আমি এখানেই আছি। রোজ বিকেলে আমি জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকি। কাকদের খুঁজে বেড়াই। প্রতিদিনই হাসপাতালের মধ্যে যে জারুল গাছটা আছে, সেটাতে বসে দুটো দাঁড়কাক আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। মনে হয় যেন ওরা অদ্ভুত ভঙ্গিতে হেসে চলছে। বিশ্রী সে হাসি, আর তার চেয়েও বিশ্রী সে হাসির শব্দ। সে শব্দ ক্রমেই বাড়তে থাকে। আমি দু হাতে কান চেপে ছুটে বেড়াই হাসপাতালের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত।

(কাল্পনিক)

#নোট_: আমাদের জীবনে ঘটে যাওয়া সব ঘটনার যেমন ব্যাখ্যা খুঁজতে নেই, ঠিক তেমনি সব গল্পে শিক্ষা খুঁজতে নেই। কিছু কিছু ঘটনা আর কিছু কিছু গল্প রহস্য হিসেবেই থেকে যায়। জীবন হচ্ছে একটা রহস্যোপন্যাস। কেউ কেউ এই উপন্যাসের শেষ পর্যন্ত পড়ে যায়, আর কেউ কেউ মাঝপথেই হারিয়ে যায়। তবুও জীবন চলেই যায়।

৪২৭জন ২৬২জন
13 Shares

২৫টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য