কেমন কেটেছে প্রবাসে আমাদের ঈদ, এমন প্রশ্নের উত্তরে এবার অনেককেই বলতে শুনেছি, ‘বেশ ভালো’। প্রবাসে আমাদের নিঃসঙ্গতায় ভরা ঈদ দিনে দিনে ফিকে হয়ে এসেছে। যতই দিন যাচ্ছে প্রবাসে বাংলাদেশিরা সংখ্যায় বাড়ছে। খুব দ্রুতই যেন সংখ্যাটি বেড়েছে কয়েক গুণ। এবার চাঁদ রাতের উৎসব সে সত্যতার জানান দেয়। অন্যবার নিউইয়র্কের বাংলাদেশিদের প্রাণকেন্দ্র জ্যাকসন হাইটসের ফুটপাতে যে মেহেদি উৎসব বসে, পাশাপাশি পোশাক, জুয়েলারির পশরা বসে, সে পথ ধরে ভিড়ভাট্টায় হেঁটে যাওয়া বেশ যুদ্ধই ছিল বলা চলে। তবে এবার এর পরিসর বেড়েছে ব্যাপকভাবে। সেভেনটি থ্রি, সেভেনটি ফোর ষ্ট্রীটে গাড়ি চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। উন্মুক্ত রাস্তায় মানুষজনের ঢল নামে। সপরিবারে সবাই ঘর ছেড়ে বাহিরে বেরিয়ে আসে যেন এই আনন্দ উৎসবে সামিল হতে। পেনসিলভেনিয়া থেকে আমার বন্ধু পরিবার প্রতি বছরের মতো এবারও চাঁদরাতে এসে হাজির হয়েছে কেনাকাটা সহ যাবতীয় কাজ সেরে আনন্দে যোগ দিতে। ভোরের দিকে নিজ এলাকায় ফিরে গিয়ে নামাজে যোগ দিবেন তারা। এবার একদিকে জ্যাকসন হাইটসের সেভেনটি থ্রি ষ্ট্রীটের আকাশে বিকট শব্দে আতশবাজি দেখেছে শতশত মানুষ, অন্যদিকে সেভেনটি ফোর ষ্ট্রীটে পিচঢালা পথে অনেকেই বৃত্তাকারে বসে খালি গলায় গলা ছেড়ে গান গেয়েছে মধ্যরাত অবধি। কেউ কেউ দরদাম করে পোশাক কিনায় ব্যস্ত, কেউ বা মেহেদির আল্পনায় হাত রাঙাতে ব্যস্ত ছিল। আবার ডাইভারসিটি প্লাজায় টাইম টেলিভিশনের উদ্যোগে উদযাপিত হয়েছে চাঁদরাত। প্রবাসী শিল্পীদের পরিবাশনায় কনসার্ট চলেছে মধ্যরাত পর্যন্ত। সপরিবারে অনুষ্ঠানটি উপভোগ করেছেন বিপুল সংখ্যক দর্শক-শ্রোতা। কারোরই যেন ঘরে ফেরার তাড়া নেই। কে বলবে এই শহরের মানুষ রুটি রুজির সন্ধানে রুদ্ধশ্বাসে ছুটে চলে সারা বছর ? অবিশ্বাস্য হলেও সত্য,  মুসলমানদের ধর্মীয় উৎসবের এই দিনে নিরাপদে, স্বাচ্ছন্দ্যে উৎসব করবার জন্যে অমুসলিম পুলিশ অফিসাররা রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে নিরাপত্তা দিয়েছে রাতভর। এইসব দেখে বারবারই মনে হয়েছে , কে বলে প্রবাসের ঈদ মলিন আর ফ্যাকাসে !

এক ছোট ভাইয়ের সাথে দেখা হতেই জানতে চাইলাম কেমন লাগছে চাঁদরাত ? প্রথমবারের মত এদেশে ঈদ করছে সে, বিধায় একরাশ বিস্ময় নিয়ে উচ্ছ্বাসে জানায়, ‘ বাংলাদেশেও চাঁদরাতে এমন আনন্দ-উৎসব দেখিনি যেমনটি এদেশে দেখেছি। পরিবার নিয়ে মধ্যরাত পর্যন্ত ঘুরে বেড়ানো, কেনাকাটা, আনন্দ জীবনে এই প্রথম। এতো ভিড়, হৈচৈ, কোলাহল, তবুও কোন ধাক্কাধাক্কি নেই, অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা নেই ! ভোরে উঠেই নামাজে যেতে হবে, তবুও যেন তাড়া নেই ঘুমাবার। এমন রাত তো আর বারেবারে আসে না। ‘ সত্যিই এমন নির্ঘুম জেগে থাকা আনন্দের রাত বারেবারে আসে না। আমরা বন্ধুরা পরিকল্পনা করে ঈদের দিনের জন্যে রান্নার কাজ আগেই গুছিয়ে রেখেছিলাম চাঁদরাতে বেরুবো বলে। ইফতার সেরে সেই যে বেরিয়েছি সকলে, ফিরেছি শেষরাতের দিকে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে আড্ডা দেয়া, মেহেদি দেয়া, দরদাম করে জামা কেনা, গান শুনা, আতশবাজি দেখা, কিছুই বাদ যায়নি। বাড়ি ফিরে দুই ঘণ্টা ঘুমিয়েই আবার ঈদের নামাজের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেই সপরিবারে। চমৎকার রৌদ্রজ্জ্বল ঈদের সকালে এবার নতুন করে যে বিষয়টি লক্ষ্য করেছি তা হলো, প্রতি দুই ব্লক পরপরই ঈদের জমাত হতে দেখছি দফায় দফায়। কোথাও বা পার্কের খোলা মাঠে, আবার কোথাও ব্যস্ততম রাস্তায় গাড়ি চলাচল বন্ধ রেখে, কিংবা স্কুলের মাঠে। সর্বত্রই বিপুল সংখ্যক মানুষের উপস্থিতি দেখেছি। নামাজ শেষে একে অপরের সাথে কোলাকুলির দৃশ্য মনে করিয়ে দেয় দেশের বাহিরে এ আরেক বাংলাদেশ যেন ! সকলের জন্যে মিষ্টান্ন, খেজুর আর পানির ব্যবস্থাও ছিল বেশ অনেক জায়গায়।

এই যে পরিবার নিয়ে সারাদিন বন্ধুদের বাড়ি ঘুরে বেড়ানো, খাওয়া-দাওয়া, আনন্দ, এটিই এখন প্রবাসীদের ঈদের বাস্তব চিত্র। একটি দিন পুরোটাই আমাদের সন্তানদের পাঞ্জাবী, পাজামা, টুপি পরে এ বাড়ি ও বাড়ি ঘুরে বেড়ানো, একসাথে কাটানো প্রবাসে এমন একটি মায়াময় ঈদের দিনের স্বপ্ন দেখেছিলাম কয়েক বছর আগেও। কতো দ্রুতই না সে স্বপ্ন বাস্তবে রুপ নিলো ! দেশ ছেড়ে, শেকড় ছেড়ে এই ভিনদেশে সব হাহাকার, শূন্যতার পরেও সত্যই এ যেন কল্পনার চেয়েও বড় পাওয়া।

রিমি রুম্মান

নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র

 

 

 

৫৪৪জন ৪৫৩জন
11 Shares

৯টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ