করোনাভাইরাস নিয়ে বিশ্বের সব দেশের মানুষ যখন মৃত্যু আতঙ্কে দিন অতিবাহিত করছে তখন কিছু মানুষের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল ভয়াবহ এই ভাইরাস থেকে মুক্তির জন্য আবিষ্কৃত ভ্যাকসিন মানবদেহে প্রয়োগের খবরে মনে আশার সঞ্চার হচ্ছে। হয়তো অচিরেই আমরা করোনাকে জয় করবো তবে তার জন্য টিকা গ্রহণের পাশাপাশি আমাদের অবশ্যই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ভ্যাকসিন প্রাপ্তির দৌড়ে অনেক দেশকে পিছনে ফেলে আমরাও করোনার ভ্যাকসিন পেয়েছি। সরকারি ওয়েব পোর্টাল এবং এন্ড্রয়েড মোবাইল এ্যাপ “সুরক্ষা” এর মাধ্যমে নিবন্ধন করে অথবা আপনার এলাকার টিকাকেন্দ্রে নিবন্ধিত হয়ে এই ভ্যাকসিন গ্রহণ করতে হবে।

“কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম “সুরক্ষা”- 

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তরের প্রোগ্রামারদের একটি দল নিজস্ব উদ্যোগ ও ব্যবস্থাপনায় কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম “সুরক্ষা” সফটওয়্যারটি প্রস্তুত করেছে। প্রস্তুতকৃত সুরক্ষা সফটওয়্যারটি সরকারের কোন অর্থ ব্যয় ছাড়া প্রস্তুত করা হয়েছে এবং এটি ব্যবহারের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে সরবরাহ করা হচ্ছে। উক্ত সিস্টেমটির উন্নয়ন এবং পরিচালনায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিবিভাগ, তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তর, বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি), এটুআই এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর একসাথে কাজ করে যাচ্ছে।

করোনা ভাইরাসের টিকা পেতে অবশ্যই নিবন্ধন করতে হবে সুরক্ষা প্লাটফর্মে। মোবাইল অ্যাপ বা কম্পিউটারে এই নিবন্ধনে প্রয়োজন হবে মোবাইল নম্বর এবং ন্যাশনাল আইডি কার্ড।

শুরুতেই নিবন্ধনে ক্লিক করলে জানতে চাওয়া হবে আপনি কোন কোটায় টিকা পাচ্ছেন। যেমন জাতীয় সংসদের সদস্য, বিভিন্ন সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভার নির্বাচিত চেয়ারম্যান, সদস্যদের জন্য আছে নির্বাচিত জন প্রতিনিধি কোটা। আলাদা বিভাগ করা হয়েছে সরকারের বিভিন্ন বাহিনী, সরকারি-বেসরকারি চিকিৎসাকর্মী এবং জরুরী সেবায় নিয়োজিতদের জন্য। মুক্তিযোদ্ধা, ধর্মীয় প্রতিনিধি, সংবাদকর্মীসহ ৫৫ উর্ধ্ব নাগরিকদের আলাদা কোটা।

সব মিলে ১৮ টি শ্রেণির পরিচয়ের মধ্যে বেশ কিছু ক্ষেত্রে আবার উপশ্রেণি রয়েছে। যেমন চিকিৎসাকর্মীদের জানাতে হবে, তিনি চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট বা কোন দায়িত্বে আছেন।

পরিচয় পর্ব দেওয়া হলেই জানতে চাওয়া হবে আপনার জাতীয় পরিচয়পত্র এবং জন্মতারিখ।

জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর যাচাই হওয়ার পর স্ক্রিনে নিবন্ধনকারীর নাম দেখানো হবে। সেখানেই প্রত্যেককে দিতে হবে আলাদা মোবাইল নম্বর। জানাতে হবে নিবন্ধনকারীর কোনও দীর্ঘমেয়াদী রোগ আছে কিনা। এরপর দিতে হবে বর্তমান ঠিকানা এবং নির্বাচন করতে হবে কোন কেন্দ্রে টিকা নিতে চান। এরপরপরই আপনার দেওয়া মোবাইলে চলে যাবে ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড বা ওটিপি। এই ওটিপি ব্যবহার করে স্ট্যাটাস যাচাই করলেই নিবন্ধন শেষ হবে।

নিবন্ধন হয়ে গেলেই আপনাকে টিকা দেবার তারিখ ও স্থান জানিয়ে এসএমএস করা হবে। এরপর জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর, জন্ম তারিখ দিয়ে লগ ইন করে এসএমএস এর মাধ্যমে পাওয়া ওটিপি কোড দিয়ে টিকা কার্ড ডাউনলোড করতে হবে।

র্নিধারিত তারিখে সেই টিকা কার্ডের প্রিন্ট কপি এবং জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে যেতে হবে টিকা কেন্দ্রে। এর ৮ সপ্তাহ পর একইভাবে নিতে হবে দ্বিতীয় ডোজ। দুটি ডোজ শেষ হলে সুরক্ষা প্ল্যাটফর্মের ওয়েব অ্যাপ্লিকেশন থেকে ভ্যাকসিন প্রাপ্তির সনদ সংগ্রহ করা যাবে।

🔵 “সুরক্ষা” ভ্যাকসিন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম এর প্রধান বৈশিষ্ট্য সমূহঃ

◾সেলফ রেজিস্ট্রেশন এর মাধ্যমে অনলাইনে নিবন্ধন ও ভ্যাকসিন কার্ড ডাউনলোডের ব্যবস্থা রয়েছে।

◾ভ্যাক্সিন গ্রহণ ও ভ্যাকসিন প্রদানের তথ্য অনলাইনের মাধ্যমে যাচাই ও মনিটরিং করা যাবে।

◾ভ্যাক্সিনের দুইটি ডোজ সম্পন্ন হওয়ার পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে সুরক্ষা সিস্টেম হতে অনলাইনের মাধ্যমে টিকা গ্রহণের সার্টিফিকেট পাওয়া যাবে।

◾জাতীয় পরিচয় পত্রের গেটওয়ে “পরিচয়” এর মাধ্যমে নিবন্ধনকৃত ব্যক্তির পরিচয় যাচাই-বাছাই করা হবে।

◾নিরাপদ নিবন্ধন নিশ্চিতকল্পে নিবন্ধনকৃত ব্যক্তির মোবাইল নম্বরে OTP বা ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড প্রেরনের ব্যবস্থা রয়েছে।

◾SMS এর মাধ্যমে নিবন্ধনকৃত ব্যক্তিকে ভ্যাকসিন প্রদানের তারিখ ও তথ্য প্রদাণ করা যাবে।

◾নাগরিকের ভ্যাকসিন ডোজ গ্রহণ সম্পর্কিত তথ্য QR code scan এর মাধ্যমে নেয়া এবং সংরক্ষণের ব্যবস্থা আছে।

◾ভ্যাকসিন প্রদান সম্পর্কিত বিভিন্ন তালিকা, পরিসংখ্যান ও প্রতিবেদন প্রস্তুতের ব্যবস্থা আছে।

◾জাতীয় পরিচয় পত্র নাম্বার ও জন্ম তারিখ ব্যবহার করে নিবন্ধন সম্পন্ন করা যাবে।

🔵 যেভাবে “সুরক্ষা” ভ্যাকসিন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম কাজ করবে:

www.surokkha.gov.bdওয়েব পোর্টালে প্রবেশ করতে হবে।

➡ “নিবন্ধন” বাটনে ক্লিক করে নাগরিক শ্রেণী সিলেক্ট পূর্বক জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর এবং জন্ম তারিখ দিতে হবে। তারপর যাচাই বাটনে ক্লিক করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচয় নিশ্চিত করতে হবে। পরিচয় যথাযথ হলে বাংলা ও ইংরেজিতে নাম ফর্মে দেখা যাবে। দীর্ঘমেয়াদী রোগ, কোমরবিডি আছে কিনা হ্যাঁ অথবা না সিলেক্ট করতে হবে।

➡ নিবন্ধনকারী নাগরিকের পেশা এবং সরাসরি কোভিড-১৯ কাজের সাথে জড়িত কিনা তা নির্বাচন করতে হবে।

➡ যে মোবাইলে ভ্যাকসিনের তথ্য ও ভেরিফিকেশন এসএমএস পেতে চান তা নিবন্ধনের সময় দিতে হবে।

➡ ফর্মে বর্তমান ঠিকানা ও টিকা কেন্দ্র নির্বাচন করতে হবে।

➡ সবশেষে মোবাইল নাম্বারে প্রাপ্ত OTP দিয়ে নিবন্ধন শেষ করতে হবে।

➡ নিবন্ধন সম্পন্ন হলে “টিকা কার্ড সংগ্রহ ” বাটনে ক্লিক করে কার্ড সংগ্রহ করতে হবে।

➡ নিবন্ধিত মোবাইল নাম্বারে নির্ধারিত সময়ে এসএমএসের মাধ্যমে টিকা গ্রহনের কেন্দ্র ও তারিখ জানানো হবে।

➡ টিকা কেন্দ্রে যাওয়ার সময় প্রিন্টেড টিকা কার্ড ও জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি সাথে নিতে হবে।

🔴 কারা এই ভ্যাকসিন নিতে পারবেন না-

◽ ১৮ বছরের কম বয়সিদের কোভিড১৯ এর ভ্যাকসিন নেওয়ার অনুমতি নেই।

◽ প্রসূতী এবং যাঁরা শিশুকে স্তন্যপান করান তাঁরাও টিকা নিতে পারবেন না।

◽ ওষুধ, বিশেষ খাবার বা ভ্যাকসিনে যাঁদের অ্যালার্জি হয় তাঁরা টিকা নিতে পারবেন না।

🔴 দ্বিতীয়ত কারা আপাতত ভ্যাকসিন নিতে পারবেন না?

◽ কোভিড১৯ এর সক্রিয় উপসর্গ যাঁদের মধ্যে এখন রয়েছে।

◽ কোভিড আক্রান্ত যে রোগীদের অ্যান্টিবডি বা প্লাজমা চিকিৎসা হয়েছে। এরা সুস্থ হওয়ার ৪ থেকে ৮ সপ্তাহ পরে টিকা নিতে পারবেন।

◽ যাঁরা সংকটজনক অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। অথবা যে কোনও অসুখেই হাসপাতালে চিকিৎসা করাচ্ছেন।

◽ যাঁদের রক্তপাতের কোনও রেকর্ড রয়েছে বা প্লেটলেট এর সমস্যা রয়েছে, বা রক্ত জমাট বেঁধে যাওয়ার প্রবণতা রয়েছে তাঁদের সতর্কীকরণ মেনে ভ্যাকসিন দেওয়ার প্রয়োজন আছে।

এছাড়াও কেন্দ্রের এই নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, প্রথম ডোজে যে ভ্যাকসিন দেওয়া হবে, দ্বিতীয় ডোজেও সেটিই দিতে হবে। ভ্যাকসিনগুলি +2°C to +8°C এই তাপমাত্রার মধ্যে রাখতে হবে। আলোর থেকে দূরে রাখারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোনও ভ্যাকসিন জমে গেলে সেটি বাতিল করা হবে।

বিশেষভাবে উল্লেখ্য, হৃদযন্ত্রের অসুখ, স্নায়ুরোগে আক্রান্তরা এবং এইচআইভি রোগীরাও ভ্যাকসিন নিতে পারবেন।

“সুরক্ষা” পোর্টালে নিবন্ধনের পুরো প্রকৃয়াটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন-

করোনাভাইরাস প্রতিরোধে নিজে টিকা নিন, অন্যকেও উৎসাহিত করুন।

তথ্যসূত্র ও কৃতজ্ঞতা –

১. সরকারি ওয়েবসাইট
২. News 18 Bangla এবং
৩. শ্রদ্ধেয় কুমার বিশ্বজিৎ রায় এর লেখার  অংশবিশেষ থেকে নেয়া।
৪. ছবি- বাংলা ট্রিবিউন।

১২৬২জন ৪৫২জন
39 Shares

৩৯টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য