করোনার দিনগুলো

রুমন আশরাফ ১৯ আগস্ট ২০২০, বুধবার, ১১:৫৫:৪০অপরাহ্ন সমসাময়িক ১৮ মন্তব্য

মাসিক বাজার করার জন্য সেদিন গিয়েছিলাম বাজারে। সাথে ছিল আমার গেস্ট হাউজের কুক। বাজার সদাই সাধারণত সেই করে। তবে ঐদিন অনেকটা শখের বসেই গিয়েছিলাম বাজারে। সবজি বাজার হতে সবজি কিনে ঢুকলাম মাছের আড়তে। করোনা কালে অন্যান্য সময়ের চাইতে জনসমাগম কম হলেও মাছের আধিক্যের কোন কমতি ছিলনা। মাছের দাম ছিল অন্যান্য সময়ের চাইতে বেশ কম। হরেক রকম মাছ কিনলাম। মাছ কেনা শেষে হঠাৎ লক্ষ্য করলাম এক বৃদ্ধ লোক আমার দিকে এগিয়ে আসছেন। লোকটার চলন দেখেই বুঝতে পারলাম আমাকে এতক্ষণ হয়তো ফলো করেছেন।

বৃদ্ধ লোকটা আমার কাছে এসে চুপচাপ দাঁড়ালেন। বেশভূষা মার্জিত। মুখাবয়ব দেখে বুঝতে পারলাম বৃদ্ধ লোকটি হয়তো আমাকে কিছু বলতে চায়। শঙ্কা এবং দ্বিধা মিশ্রিত অবয়বে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। আমি তাকে প্রশ্ন করলাম, ‘কিছু বলবেন চাচা?’ আমার প্রশ্নে লোকটি হতচকিত হয়ে গেল। আমি তাকে অভয় দিলাম। বললাম- ‘কি বলতে চান বলে ফেলুন।’ লোকটি প্রায় ফিসফিস করে করুণ কন্ঠে আমাকে বললেন- ‘বাবা আমারে আধা কেজি তেলাপিয়া মাছ কিনা দিবা?’ এবার আমি নিজেই অপ্রস্তুত হয়ে পড়লাম। বৃদ্ধের কাছ থেকে হঠাৎ এমন আবদার শোনার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। এদিকে বাজার করে কত টাকা পকেটে অবশিষ্ট আছে তা এখনো দেখা হয়নি। তবে লোকটি সস্তা তেলাপিয়া মাছ চেয়েছে তাও আবার আধা কেজি এটা ভেবে কিছুটা স্বস্তি বোধ করলাম।

কুককে বাজার সমেত গেস্ট হাউসে পাঠিয়ে দিলাম। বৃদ্ধ লোকটিকে এবার তার পছন্দের মাছগুলো বাছাই করতে বললাম। মাছ বিক্রেতা আধা কেজি মাছ মাপতে গিয়ে পড়লেন বিপত্তিতে। ছোট-বড় মিলিয়ে আধা কেজি মেলানো যাচ্ছে না। অতঃপর আমি তাকে এক কেজি মাছই দিতে বললাম। দোকানদারকে মাছের দাম মিটিয়ে দিতে গিয়ে দেখলাম আমার কাছে ২৭০ টাকা আছে। বৃদ্ধ লোকটি মাছগুলো হাতে পেয়ে কৃতজ্ঞতা চোখে আমার দিকে তাকালেন। তাঁর চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছিল। অতঃপর তাঁকে কিছু সবজি কিনে দেবার কথা বললে তিনি মানা করলেন। আমি তাঁর ‘মানা’ ব্যাপারটিকে উপেক্ষা করে খানিকটা জোরপূর্বক ১ কেজি আলু এবং ১ কেজি বেগুন কিনে দিলাম। তিনি কিছুটা ইতস্তত বোধ করছিলেন। শেষের বাজারগুলো হাতে পাবার পর তিনি এবার প্রায় কেঁদে ফেললেন।

দোকান থেকে খানিকটা দূরে এসে বৃদ্ধ লোকটির পরিচয় জানতে চাইলাম। জানলাম উনি গ্রামের এক মাদ্রাসার শিক্ষক। করোনা কালে মাদ্রাসাটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভীষণ বিপদে পড়েছেন। দুই মেয়ে এবং এক ছেলের জনক তিনি। মেয়ে দুটোর বিয়ে হয়েছে। স্বামীর সংসারে আছে। আর একমাত্র ছেলেটি কিছুদিন আগে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। ছেলের ঘরে তাঁর দুটো ছোট ছোট নাতি আছে। অভাবের তাড়নায় নিরুপায় হয়েই এভাবে চেয়ে মাছ নেবার জন্য তিনি দুঃখ প্রকাশ করলেন। প্রত্যুত্তরে আমার কি বলা উচিত বা করা উচিত তা ভুলে গেলাম। কিছু সময়ের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম।

মাদ্রাসার শিক্ষককে বিদায় দিয়ে রিক্সার জন্য অপেক্ষা করছি। মনে মনে ভাবছি, অভাবের তাড়নায় মানুষ কতটা অসহায় হয়ে যায়। চোখ দুটো কেমন ছল ছল করছে। হুহু করছে ভেতরটা। নাক মুখ ঢেকে রেখেছি মুখোশ দিয়ে। এবার ছল ছল চোখ দুটো ঢেকে দিলাম পকেটে গুঁজে রাখা রোদ চশমা দিয়ে।

১৮৮জন ৬২জন
0 Shares

১৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য