সোনেলা দিগন্তে জলসিড়ির ধারে

প্রাণঘাতী মহামারী করোনাভাইরাস সারা বিশ্বকে বলতে গেলে উলট পালট করে দিয়েছে। ঘটেছে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বিরাট ছন্দপতন। থমকে গেছে পৃথিবী। স্থবির হয়ে পড়েছে বিশ্ব আর্থসামাজিক অবস্থা। তাছাড়া বিশ্ব স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বলতে গেলে পুরোপুরিই ভেঙ্গে পড়েছে। পাশাপাশি মারাত্মক মৃত্যু ও স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছে বিশ্বের প্রায় সব দেশ এবং অঞ্চল। প্রতিদিনই বেড়ে চলেছে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর পাশাপাশি মানুষের মৃত্যুর মিছিল। করোনাভাইরাস রোগটি ছোঁয়াচেঅদৃশ্যচোখে দেখা যায় না এবং তা বায়ু বাহিতও বটে। মানুষের হাঁচি কাশি তুথু লালা এবং কফের মাধ্যেমে এ ভাইরাসের সংক্রমণ হয়। আর এজন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সামাজিক বা শারীরিক দুরূত্ব কমপক্ষে ২ মিটার বা ছয় ফুট দূরে থাকা। জন সমাগম যেমন হাট বাজারপার্কসিনেমা হল, লঞ্চ ঘাট, রেলওয়ে ষ্টেশন, বাস টার্মিনাল, বিভিন্ন বিনোদন কেন্দ্র ইত্যাদি যেখানে প্রচুর লোক সমাগম হয় সেসব স্থানের ভিড় এড়িয়ে চলা। নিজেকে সচেতন এবং সুরক্ষিত রাখা।

অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়,জীবিকার তাগিদে সরকার ৬৩ দিন পর গত ৩১ মে’২০ থেকে সাধারণ ছুটির মেয়াদ আর বৃদ্ধি করেনি। জীবিকার কাছে, ক্ষুধার কাছে মানুষের জীবন আজ পরাজিত। হয়েছে পরাভূত। সম্প্রতি সংক্রমণের বৃদ্ধি অনুযায়ী দেশের বিভিন্ন স্থানে লক ডাউনের আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে। এ প্রেক্ষিতে দেশকে রেড জোন যেখানে জনসংখ্যার অনুপাতে সংক্রমণের হার বেশি, ইয়েলো জোন যেখানে সংক্রমণের হার মাঝামাঝি পর্যায়ের এবং গ্রীন জোন যেখানে কোনো মানুষ আক্রান্ত হয়নি এই তিনটি জোনে ভাগ করা হয়েছে। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হচ্ছে, আমাদের দেশের মানুষদেরকে কোনোভাবেই ঘরে আটকিয়ে রাখা যাচ্ছে না। অহেতুকঅকারণেঅযথাআড্ডা দেয়ার জন্যবিভিন্ন উৎসুক্যতাসহ হাস্যস্পদ কারণে বেশির ভাগ মানুষ ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে পড়ছে যা আইনশৃঙ্খলা-রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে সামাল দেয়া বেশ দুঃসাধ্যকষ্টসাধ্য হয়ে উঠছে দিনদিন। দেশের বিভিন্ন ইলেট্রনিক এবং প্রিন্টিং মিডিয়ায় প্রকাশিত খবরে দেখা যায়আমাদের দেশের মানুষ করোনাভাইরাসের সংক্রমণে স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়ে খুব কমই সচেতন এবং উদ্বিগ্ন। বরং অসচেতনতাস্বাস্থ্য ঝুঁকির ভয়াবহতা উপলব্ধি বা অনুধাবন করতে চাইছে না মোটেও। ফলে বাজারে হাটে মাটে ঘাটে অলিতে গলিতে সব জায়গায় মানুষ গিজ গিজ করছে। গরীব দুঃখী অসহায় খেঁটে খাওয়া মানুষের ঘরের বাইরে বের হওয়ার অবশ্যই কারণ আছে। এটা ব্যতিক্রম ও সহজবোধ্য। তাই তাঁদের ঘর থেকে বের হতেই হয়। কিন্তু সেসব মানুষের সংখ্যা কম কিন্তু বাইরে ঘুরাঘুরি করা মানুষের সংখ্যা অনেক অনেক গুণ বেশি। যদিও সরকার বিভিন্ন প্রণোদনা ঘোষণার পাশাপাশি গরীব দুঃখী অসহায় মানুষের জন্য চালতেল সহ বিভিন্ন ত্রাণসামগ্রী জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার নানামুখী পদক্ষেপ এবং ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। গত ১৫ এপ্রিল২০ থকে দেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দেশকে করোনাঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা দেয়।  

মহামারী প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস যুগপৎ মানুষের মানবিক মূল্যবোধ মমত্ববোধ এবং অবক্ষয়ের দুটো চিত্রই চোখে আংগুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। এক দিকে ঘরে অবস্থানের কারণে পারিবারিক বন্ধন, সুখ, শান্তি বৃদ্ধি পেয়েছে। আগে অনেকেই নানান কর্মব্যস্ততার জন্য পরিবারকে সময় দিতে পারেনি। করোনা সেই অভাব ঘুচিয়ে দিয়েছে। মানবতার ডাকে সাড়া দিয়ে অনেকেই গরীব অসহায় মানুষের সাহায্যে ত্রাণ নিয়ে ঘরে ঘরে ছুটে যাচ্ছে। অন্যদিকে করোনাভাইরাস ছোঁয়াচে বলে সন্তানেরা মা বাবাকে হাসপাতালে রেখে পালিয়ে এসেছে। দাফনে , শ্মশানে, সমাধিক্ষেত্রে আত্মীয় স্বজন পরিবার পরিজনবিহীন বেওয়ারিশ লাশের মতো দাফন, শেষকৃত্য সম্পাদন করেছেন কিছু পুলিশসহ কিছু মানবিক স্বেচ্ছাসেবী সমাজসেবা সংঘটন। মানবতার এমন অবক্ষয় মানুষকে হতবিহবল আর শোকাভিভূত না করে পারে না। তবে জানা গেছে মারা যাওয়ার দুই তিন ঘণ্টা পরে মৃতদেহ থেকে করোনাভাইরাস ছড়ায় না। তাছাড়া এমন দুঃসময়ে কিছু অসৎ জনপ্রতিনিধি ত্রাণ, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঈদ উপহার চুরি করেছে, তছরুপ করেছে। এমন কি ভেজাল ও নকল ঔষধ, চিকিৎসা সুরক্ষা সরঞ্জাম, অক্সিজেনের কৃত্রিম সঙ্কট করে সিণ্ডিকেটের মাধ্যমে অসহায় মানুষের জীবনকে আরো বিষময়, দুঃসহ, দুর্দশাগ্রস্থ করে তুলেছে। সরকারি বেসরকারি হাসপাতালে রোগীরা চিকিৎসা না পেয়ে, ঘরে, এম্বুলেন্সে, হাসপাতালের বারান্দায় বিনা চিকিৎসায় প্রাণ হারাচ্ছে। করোনা নমুনা পরীক্ষার রিপোর্ট ছাড়া সরকারি বেসরকারি হাসপাতাল ক্লিনিকগুলো হৃদরোগ, কিডনি রোগ, উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন রোগীদের ভর্তি করছে না যা খুব নির্মম এবং বেদনাদায়ক। চট্টগ্রামের প্রাইভেট ক্লিনিকগুলোর বিরুদ্ধে সিণ্ডিকেটের মাধ্যমে বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীদের ভর্তি না করার ব্যাপারে অভিযোগ উঠেছে। আরেকটি দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে ডাক্তার সাহেবরা চেম্বার করছেন না। ফলে বিভিন্ন জটিল রোগীদের রুটিন চেক আপ না হওয়ায় জীবন সঙ্কটাপন্ন হওয়ার পাশাপাশি বিনা চিকিৎসায় অনেকেই মৃত্যুবরণ করছে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, নারী নির্যাতন, খুন, ধর্ষণ এই মহামারীকালেও বন্ধ থাকেনি। যখন মানুষের ঘাড়ে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত এবং মৃত্যু ঝুঁকি নিঃস্বাস ফেলছে এমন সময়ে কতিপয় মানুষের মানবিক, নৈতিক, ধর্মীয় অধঃপতন বিবেকবান মানুষকে শঙ্কিত এবং লজ্জিত না করে পারে না। মনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক এসব অমানুষ, দানব, হায়েনারা কি কোনো মায়ের গর্ভ থেকে জন্ম নেয়নি? পাশাপাশি চট্টগ্রামের কিছু অসৎ অবিবেচক ভুমিদস্যু এই দুঃসময়ে পাহাড় কাটা বন্ধ রাখেনি। দুই ব্যাক্তিকে পাহাড় কাঁটার দায়ে ৫০ লক্ষ টাকা জরিমানা করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। করোনাভাইরাসের এই কঠিন সময়ে মানুষ ঘরবন্দী থাকায় বাংলাদেশ সহ বিশ্বের প্রকৃতিতে বিরাট পরিবর্তন এসেছে। পরিবেশ আর প্রতিবেশের ওপর মানুষের নিষ্ঠুর নির্দয় নির্মম বর্বর অবিচার অন্যায় জুলুম বন্ধ থাকার পাশাপাশি যানবাহন, শিল্প কারখানা, ইট ভাটাসহ পরিবেশ দূষণের সবকিছু বন্ধ থাকায় প্রকৃতি যেন তার হারানো রূপ লাবণ্য জৌলুশ সবুজের সমারোহ ফিরে পেয়েছে। জীব জন্তু পশুপাখি এ সুযোগে লোকালয়ে অবাধে বিচরণ করেছে নির্বিঘ্নে নির্ভয়ে। প্রকৃতি পরিবেশ তার পুরানো চরিত্র ফিরে ফিতে করোনাভাইরাস যেন অণুঘটকের কাজ করেছে। সবচেয়ে বড় কথা বিশ্ব আজ দূষণমূক্ত হয়েছে। ঢাকার বায়ু দূষণ কমেছে, সীসার অস্তিত্ব হ্রাস পেয়েছে ওজোন স্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। মনে হয় এটা মানব জাতির জন্য করোনাকালের ভীষণ সুসংবাদ।

আসুনব্যাক্তিপরিবার সমাজ ও দেশের বৃহত্তর স্বার্থে করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধ করার জন্য সরকার নির্দেশিত স্বাস্থ্যবিধি মানার জন্য সবাই আন্তরিকভাবে সচেতন হই। সচেতন হই করোনাভাইরাসমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার জন্য এবং আমাদের সেই চিরচেনা পুরানো জীবনে ফিরে যাওয়ার জন্য। আসুনজীবন চাঞ্চল্য ফিরে পাওয়ার জন্য আবেগকে অবদমিত করে মানুষকে বাঁচানোর যুদ্ধে সামিল হই। ত্যাগের পর আনন্দ বরণ করার জন্য নিজেদেরকে প্রস্তুত করি। কায়োবাক্য মনে প্রত্যাশা করি করোনাভাইরাসমুক্ত বাংলাদেশ হবে সাম্য, ভ্রাতৃত্ব, সৌহার্দ্য, অসাম্প্রদায়িক, মানবিক এবং ন্যায় বিচারের চারণভূমি। জুলুম অন্যায় খুন রাহাজানি, ভূমি দখল নদী দখল মুক্ত রাখার পাশাপাশি দূষণ মুক্ত পরিবেশ রক্ষায় সবাই সজাগ এবং সচতেন হই। ব্জ্র কঠোর এবং কঠিন শপথ নেই আমাদের শিশু নারীরা অবাধে নির্ভয়ে নির্বিঘ্নে মুক্ত স্বাধীন স্বদেশের নাগরিক হিসেবে মাথা উঁচু করে হাঠবে। নারী নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন, হত্যা, খুন, ধর্ষণ এদেশ থেকে চিরতরে বিধায় নেবে। অপেক্ষায় আছি নব সূর্যোদয়ের এবং শুভ সুখী সুন্দর বাংলাদেশের। 
ছবিঃ সোনেলা ব্লগের মিডিয়া থেকে নেয়া ।
৪৪০জন ৩১৩জন
55 Shares

২০টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য