কবি মশাইয়ের রু

খাদিজাতুল কুবরা ২৬ এপ্রিল ২০২২, মঙ্গলবার, ০৬:২১:২৫অপরাহ্ন গল্প ১০ মন্তব্য

অদ্ভুত লাগছে? কিছুটা অদ্ভুততো বটেই!  আমি রু। মানে আমার কবি মশাই আমাকে রু বলে ডাকে। ‘র’ আমার নামের আদ্যোক্ষর।  আমি মনে মনে তাকে রাজা সাহেব বলে ডাকি। সামনা সামনি বলা হয়না। তাকে দেখলে আড়ষ্ট হয়ে পড়ি। কিছুটা লজ্জা, কিছুটা অচেনা শিহরনে এতটা পুলকিত থাকি যে আমাকে কথা বলতে হয়না!আমার চোখ মুখ চিবুক তাদের নিজস্ব ভাষায় কথা বলে! সে-ও যেন বুঝে নেয়,আর পাল্টা জবাব দেয় একই অভিভ্যাক্তিতে! সেসব কথাগুলো আমি সমস্ত ইন্দ্রিয় দিয়ে শুনতে পাই। মৌখিক ভাষা থাকে খুবই কেতাবি। সে-ও আমারই মত চাপা , সহজে সহজ হতে পারেনা। আগাগোড়া নিপাট ভদ্রলোক। প্রেমিকাকে ভালোবাসি বলতে তার দাঁতের আড়মোড়া ভেঙে আসে। তাই বলে ভালোবাসা কিন্তু কম নয়। আদিগন্ত বিস্তৃত মন তার, সেখানে রামধনু সাতরঙা ভালোবাসা থরেথরে সাজানো আমার জন্য। আমি অবশ্য চিঠির আশ্রয় নিই। একেবারে   ভালোবাসার রচনা লিখে ফেলি । দেখা হলে যথারীতি মুখে তালা। সে যখন আমায় ‘রু শোন ‘ বলে আমার জীবনের জটিল সমীকরণ সমাধানের সুত্রগুলি এক এক করে বলে আমি মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনি! সবকিছু জলের মত পরিস্কার হয়ে যায়। অথচ কিছুক্ষণ আগেও সমস্যার সমুদ্রে ডুবে মরে যাচ্ছিলাম। এমন ভালো রাখার, ভালোবাসার মানুষটিকে, ভালোবাসার  লোভ আমি সামলাতে পারিনি। একদিন কিছু না ভেবেই তাকে ফ্রেণ্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছিলাম। তার কবিতা পড়তাম কিন্তু বুঝতে পারতাম না। জিজ্ঞেস করলে বলতেন, কবিতার বিশেষ অর্থ হয়না, যা মনে আসে লিখি, পাঠক নিজের মত বুঝে নিতে পারে কোন সমস্যা নেই। মনে মনে বিরক্ত হতাম এমন গা- ছাড়া জবাবে। আগেই বলে রাখি আমি কবিতা অন্তপ্রাণ মানুষ। আমার রিকোয়েস্ট একসেপ্ট করে তিনি ইনবক্সে এসে পরিচিত হলেন। তার অমায়িক আচরণে আমি কবিতার সারমর্ম না বলে এড়িয়ে যাওয়ার দুঃখ ভুলে গেলাম। ভাবলাম মেসেজিং ব্যাপারটা একেবারেই খারাপ না। প্রিয় কবির সাথে আলাপ হওয়ার পুলক আমাকে ভালোই আন্দোলিত করেছিল সেদিন। তারপর টুকটাক কথা হত। বেশিরভাগই কবিতার নাড়িনক্ষত্র নিয়ে আলাপ হত। পরস্পরকে চেনার সুযোগ ও হল কোন এক ফাঁকে। তার ডাক নাম নিরব। মেঘে-মেঘে বেলা বেড়ে চল্লিশ ছুঁই ছুঁই বয়স। বিয়ের মত বোকামি করা ও হয়ে উঠেনি। সম্ভবত কবিতাই অধিকার করে নিয়েছিল মনপ্রাণ! মনে মনে জীবন্ত কবিতা  নাকি অনেক খুঁজেছেন। অবশেষে পেলেন আমার মত পঁয়তাল্লিশোর্ধ পৌঢ়ার পোড়া বাড়িতে। আমি ডিভোর্সি। তিন সন্তানের গর্বিত মা। ভাবছেন তিন সন্তান জন্ম দিয়ে তারপর কেন ডিভোর্স নিলাম। নেইনিগো, আমাকে ডিভোর্স দিয়েছে। বাচ্চাদের বাপহারা করার কোন ইচ্ছেই আমার ছিলোনা।

বড় মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী। ছেলে ক্লাস এইটে পড়ে। ছোট মেয়ে ক্লাস ফাইভে পড়ে।সংসার সন্তান সামলে চাকরি করার সুযোগ হয়নি। পৈতৃক সুত্রে কিছু প্রপার্টিজ পেয়েছি তাই দিয়ে আমার চলে যাচ্ছে।

সবই যখন ঠিক থাকে তখন চারপাশের মানুষের কাছে আবার বেঠিক লাগে। মানে একজন ডিভোর্সি মহিলার সবঠিক চলাটা তাদের বেমানান লাগে। ছেলে মেয়ে নিয়ে হৈহৈ করে দিন কাটছে আবার বাতাসে খবর ভেসে ভেড়াচ্ছে বন্ধু ও নাকি জুটিয়েছে একটা। বুড়ো ধাড়ির আবার ছেলে বন্ধু! নিজের মানুষগুলো মুখের উপর ছি ছি রি রি করে আমার জীবন বিষিয়ে তোলে। আমি আধমরা মাছের মত তাঁদের কটাক্ষের পাঁকে ডুবি আর ভাসি। টেনে তোলেন আমার নিরব কবি মশাই। সরব হতে পারেননা কারণ আমরা ভিন্নধর্মাবলম্বী। আমার পরিবার রক্ষণশীল। আমার বাচ্চারা তাদের বাবার কদর্য আচরণ দেখে বড় হয়েছে। ফলস্বরূপ তারা আমাদের মাঝে তৃতীয় কাউকে মেনে নিতে পারবেনা সাফ জানিয়েছে আমাকে। আর কবি মশাই ও চান না কাগজে কলমের স্বীকারোক্তি। কেননা তার ও পরিবারের মানুষকে কষ্ট দেওয়ার দুঃসাহস নেই। আমি ও বাচ্চাদের ইচ্ছেকে অসম্মান করতে পারিনা। প্রায় প্রতি রাতেই ইনসমনিয়ার তাড়া খেয়ে আমি ফিরে যাই কুড়ি বছর আগে। একদিন দুমদাম করে বিয়ে হয়েছিল জামিলের সাথে। ফুলশয্যায় তাঁর অসভ্যতার চিহ্ন আজো শরীরে জ্বলজ্বলে। এর পর বছরের পর বছর ধরে মনের গায়ে গরম স্যাঁকাগুলোর ক্ষত শুকালেও দাগগুলি বড় বিচ্ছিরি! একজন মানুষ যখন বহুগামী হয় তখন স্বামী বা স্ত্রী ব্যাক্তিটির তার কাছে কোন গুরুত্ব থাকেনা। যৌবনে যথেচ্ছাচারের ফলস্বরূপ মধ্যবয়সে যখন নপুংসক হয়ে পড়ে তখনতো সোনায় সোহাগা। তিনি তখন সন্দেহবাতিকে আক্রান্ত হয়ে নিজেকে ভাবেন দেবতা আর সঙ্গীকে ভাবেন দুশ্চরিত্রা। ঝগড়াঝাটি, অশান্তি নিত্যকার চালচিত্র ছিল। অথচ আট দশটা দম্পতির মত আমার ও সুখের সংসার হতে পারত। একটা মদ্যপ বিকৃত মনা মানুষের জন্য আজ এ অবস্থা। কবি মশাই দৈত্যের স্টিকার পাঠান ফোনে। বলেন, “এক্ষুণি ঘুমাও নইলে ভূতে ধরবে!” আমি ভালোবাসার পরশ পেয়ে বিবশ হয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। একজীবনে কত মানুষের সাথে আমাদের কত রকম সম্পর্ক হয়। প্রতিটি সম্পর্কের আলাদা সৌন্দর্য আছে। ছুরি কাঁচির মতই ব্যবহারকারীর উপর নির্ভর করে এর উপকার অপকার। আমার দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা বলে কবি মশাই সেই সুপুরুষ যার স্বপ্ন দেখে প্রতিটি নারী। তার শহরে আমার আত্মীয় আছে। এক পারিবারিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গিয়ে আমাদের দেখা হয়, আমি একটি গাঢ় কমলা রঙের মণিপুরী শাড়ির সাথে  পার্লের গয়না পরেছিলাম। আমার কবি মশাইয়ের চোখের প্রেমের সুধা বলে দিয়েছিল আমাক সুন্দর দেখাচ্ছিল। সে শুধু অস্ফুটে  বলল তুমি রাজকন্যা!আমি আহ্লাদী হয়ে উঠেছিলাম মনে মনে, কেননা আমার মরহুম বাবা আমায় রাজকন্যা ডাকত।এক ঝটিকায় মনে পড়ে, শাড়ি পরলে জামিল অত্যন্ত বাজে মন্তব্য করত উচ্চতা কম বলে, সাজলে বলত, “আয়না দ্যাখো”? তোমার গায়ের রঙের সাথে সাজ মানায়? এগুলো শোনার ভয়ে বহু বছর আমি শাড়ি পরিনি, সাজিনি। অথচ বিয়ের আগে আম্মার শাড়ি পরতাম ইচ্ছে হলেই। ছোট ফুফুতো নতুন শাড়ির মাড় ভাঙ্গার জন্য আমাকে পরতে দিতেন। যা-ই হোক, আমি এখন কবি মশাইয়ের চোখে সুন্দরীতমা। আর কিছু চাইনা।

সেখান থেকে ফিরে এসে আমি তাকে একটি চিঠি লিখলাম-

 

প্রিয় কবি মশাই!

তোমাকে ভালোবেসে,

স্বেচ্ছায় সজ্ঞানে মনের ঘরে কড়া নাড়ার শব্দে ধীর পদে খিল খুলেছি। তোমার জন্য যত্নে বোনা মাদুর পেতেছি। তালপাখা হাতে,পঞ্চব্যাঞ্জন সাজিয়েছি, দুধের সর তুলে রেখেছি। গৃহকর্মে নিপুণা নই তবু আনাড়ি হাতে রেঁধেছি।

তুমি খাবে, বিশ্রাম নিবে, আমি শুধু দেখে চোখ জুড়াব! এমন কত সাদাসিধে স্বপ্ন আমার চোখে! স্বপ্নগুলোর পাশাপাশি হাঁটে হারানোর ভয়, একদিন হারিয়ে যাবে, হয় ঘটনাক্রমে নয় দৈবক্রমে। ক্ষীণ আশা এই, যদি আগাম টের পাই স্বেচ্ছায় আড়াল হব। যে সোয়েটার বুনবে বলে সূচ হয়ে এসে ফাল হয়ে বেরিয়েছে তাকে ক্ষমা করেছি সব অভিযোগ ভুলে। আর যে খেলাঘর ভেঙে পালিয়েছে তার ছেলেমানুষী ধর্তব্যে রাখিনি। শুধু নিজের বোকামোর দণ্ড দিচ্ছি ; হয়তো আজন্ম দিব। ঘটনাচক্রে আমার কোমল মন জেনেছে পৃথিবীটা এক চিরহরিৎ বন। এখানে কে কখন হারায়, খোয়া যায় ঠিক নেই, শুধু সূর্য ডোবার আগে পৌঁছাতে হবে নিজের ডেরায়, পেছন ফেরা যাবেনা, থামলে চলবেনা। এতসব অদূরদর্শী দর্শনের আড়ালে আমার একটা ছোট্ট মন আছে। যে মন একদিন নিংড়ানো ভালোবাসা ঢেলে দিয়েছিল, যদি  ও তা অপাত্র বলাই যথার্থ। কিন্তু শরীরে ছিল আত্মরক্ষার জন্য  অক্টোপাসের মত আটটা হাত পা। কে বেশি মূল্যবান শরীর না মন? মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে সংজ্ঞাটা আমার কাছে বদলে গেল। নিজের ভুল সম্ভবত অন্য সবার মত আমি ও দেখতে পাইনা। এখন আমার কেবল মনে হয়, যে আমার মন ছুঁয়েছে শরীর ছোঁয়ার অধিকার কিংবা প্রয়োজন কেবল তারই। যদি ঈশ্বর পাপ দেন তাহলে শরীরে এতপ্রকার আততায়ী কেন দিয়েছেন? লোকে শুনলে পাগল বলবে, ধর্মদ্রোহী বলবে। যে কাগজে সিগনেচার করে দু’চারটা স্বীকারোক্তি আওড়ে শরীরে রোলার চালানোর লাইসেন্স পেয়েছিল তার আগ্রাসনের মুখে মন কেবল নেতিয়ে পড়েছিল অপেক্ষাকৃত দুর্বল বলে। ভীবৎস সে রাতটির নাম ছিল ফুলসজ্জা। সবাই কি ফুলসজ্জা পায়? কারো কারো শরীরে ফুলগুলো কাঁটা হয়ে হুল ফোটায়! আমি ও সে হতভাগ্যদের একজন। লাল বেনারসি জড়োয়া কিছুই গায়ে ওঠেনি উন্মাদনার চাদর ছাড়া! আজ এ অবেলায় তোমার জন্য আবারও পলাশ হতে ইচ্ছে করে। না যা ভাবছ তা নয়। কাগজে কলমে আমার আর আস্থা নেই।

ভালোবাসি তোমাকে প্রিয়তম শুকতারা! দূর আকাশেই থেকো, জেনে রেখো  আমার চারপাশে অদৃশ্য তারকাঁটা ঘেরা।

 

ইতি

রু

 

জবাবে কবি মশাই লিখেছেন, আমার মালদ্বীপে চাকরি হয়েছে। সামনের সপ্তাহে ফ্লাইট। তুমি বেড়াতে আসবে?

আমরা মালে আইল্যান্ডের বেলাভূমিতে বালির উপর শুয়ে গল্প করব। বুড়ো বেলায় এলেও সমস্যা নেই। আসবেতো? বললাম, তুমি ডেকেছ আমি না এসে পারি?  আসব। ছেলে মেয়েদের সংসার গুছিয়ে দিয়ে একদিন সময় করে আসব………

২২৬জন ১৪জন
0 Shares

১০টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য